ডুবে যাওয়ার ১০০ বছরের বেশি সময় পর অ্যান্টার্কটিকায় সন্ধান মিলেছে ইতিহাস বিখ্যাত জাহাজ এন্ডুরেন্সের। সম্প্রতি ওয়েডেল সাগরের বরফশীতল পানির প্রায় ১০ হাজার ফুট গভীরে জাহাজটির ধ্বংসাবশেষের সন্ধান পেয়েছেন একদল গবেষক-অভিযাত্রী।
১৯১৫ সালে বিখ্যাত সমুদ্র অভিযাত্রী স্যার আর্নেস্ট শ্যাকলটন এন্ডুরেন্সকে নিয়ে এক অভিযানে যাওয়ার পথে এটি ডুবে যায়। কাঠের তৈরি জাহাজটির ধ্বংসাবশেষের সন্ধানে অনেক অভিযান চালানো হলেও এর হদিস পাওয়া যাচ্ছিল না। তবে সম্প্রতি ড. জন শিয়ার্সের নেতৃত্বাধীন এক অভিযাত্রী দল জাহাজটির সন্ধান পাওয়ার দাবি করেছে।
তাদের এই সাফল্য অনেক কষ্টার্জিত। প্রথম দফার অনুসন্ধান অভিযানে ব্যর্থ হওয়ার পর দ্বিতীয়বারের প্রচেষ্টায় সফল হয়েছেন তারা। দক্ষিণ আফ্রিকা থেকে গত ফেব্রুয়ারিতে শুরু হওয়া এই অভিযানের সমাপ্তি ঘোষণার ঠিক আগ মুহূর্তে জাহাজটির সন্ধান মিলল।
ড. জন শিয়ার্স তাদের এই অভিযানকে জাহাজের ধ্বংসাবশেষের সন্ধানে সবচেয়ে বিপজ্জনক অভিযান হিসেবে অভিহিত করেছেন। এক বিবৃতিতে তিনি বলেছেন, ‘এন্ডুরেন্স টোয়েন্টি টু অভিযান অবশেষে সফলভাবে সমাপ্ত হলো। জাহাজটির ধ্বংসাবশেষ খুঁজে পাওয়ার মধ্য দিয়ে আমরা দক্ষিণ মেরুর ইতিহাসে নতুন এক অধ্যায় যোগ করলাম।’

স্যার আর্নেস্ট শ্যাকলটন ইতিহাসের পাতায় বিখ্যাত হয়ে আছেন অ্যান্টার্কটিকার রস সাগর ও ওয়েডেল সাগরের মধ্যে প্রথম ল্যান্ড ক্রসিং অভিযানের প্রচেষ্টার কারণে। ২৭ জনের একদল অভিযাত্রী তিন মাস্তুলের ১৪৪ ফুট দীর্ঘ জাহাজ এন্ডুরেন্সে করে ১৯১৪ সালে এই যাত্রা শুরু করেন।
মেরু অঞ্চলে অভিযানের জন্য উপযোগী বেশ শক্তপোক্ত করে জাহাজটি নির্মাণ করা হয়েছিল। এর দেয়ালগুলোর পুরুত্ব ছিল ১৮ থেকে ৩০ ইঞ্চির মধ্যে। কয়লা ইঞ্জিনের জাহাজটি নির্মাণে ব্যবহার করা হয়েছিল ওক ও নরওয়েজিয়ান ফার কাঠ।
অভিযান শুরুর পর একটি দল সাপ্লাই পোস্ট স্থাপনের উদ্দেশ্যে রস সাগরে ল্যান্ড করে। এ সময় তীব্র প্রতিকূল পরিবেশে তিনজন ক্রু মারা যান। অন্যদিকে শ্যাকলটনসহ বাকি ক্রুরা ওয়েডেল সাগর অভিমুখে যাত্রা করেন। কিন্তু তারা কখনই স্থলভাগে পৌঁছতে পারেননি। বরং ঘন বরফের মাঝে আটকে যায় তাদের জাহাজ। এক সময় বরফের চাপে এন্ডুরেন্স ভেঙ্গে যেতে শুরু করে। কোনো উপায় না দেখে শ্যাকলটন জাহাজটিকে পরিত্যাক্ত ঘোষণা করে দলবলসহ এলিফ্যান্ট আইল্যান্ডস নামের জনমানবহীন এক দ্বীপে আশ্রয় নেন।

পরে কয়েকজনকে সেখানে রেখে পাঁচ সহযাত্রীকে নিয়ে দুঃসাহসী এক সমুদ্রযাত্রায় বেরিয়ে পড়েন শ্যাকলটন। বিপদসংকুল পরিবেশে খোলা নৌকায় ৮০০ মাইল সাগরপথ পাড়ি ও ওভারল্যান্ড ট্রেকিং শেষে তারা সাউথ জর্জিয়ায় পৌঁছান। এরপর শ্যাকলটন সেখান থেকে একটি উদ্ধার অভিযান শুরু করেন এবং এলিফ্যান্ট আইল্যান্ডে আটকা পড়া তার ক্রুদের জীবিত অবস্থায় উদ্ধার করেন।
আর্নেস্ট শ্যাকলটন ১৯২২ সালের ৫ জানুয়ারি মৃত্যুবরণ করেন। তার মৃত্যুর ঠিক ১০০ বছরের মাথায় এন্ডুরেন্সের ধ্বংসাবশেষের সন্ধান পাওয়া গেল।