মার্চ কি তবে এভারগ্রিন মেরিনের জন্য অপয়া একটি মাস? পরপর দুই বছরের দুটি ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে এমন প্রশ্ন ওঠা অস্বাভাবিক নয়।
প্রথমে সাম্প্রতিকতম ঘটনাটির প্রসঙ্গে আসা যাক। প্রায় সপ্তাহখানেক ধরে যুক্তরাষ্ট্রের মেরিল্যান্ড উপকূলের কাছে চেসাপিক বে-তে ডুবোচরে আটকে রয়েছে এভারগ্রিন মেরিন করপোরেশনের মালিকানাধীন জাহাজ এভার ফরোয়ার্ড। গত ১৩ মার্চ বাল্টিমোর পোর্টের সিগার্ট টার্মিনাল ছেড়ে আসার পর ৩৩৪ মিটার দীর্ঘ জাহাজটি সেখানে আটকে যায়। হংকংয়ের পতাকাবাহী জাহাজটি ভার্জিনিয়ার নরফোকের উদ্দেশে যাচ্ছিল।
মেরিল্যান্ড পোর্ট অ্যাডমিনিস্ট্রেশনের এক্সিকিউটিভ ডিরেক্টর উইলিয়াম পি ডয়েল জানান, ‘এভার ফরোয়ার্ড আটকে যাওয়ায় অন্য কোনো জাহাজের চলাচল বিঘ্নিত হচ্ছে না। জাহাজটিকে ডুবোচর থেকে টেনে তোলার জন্য যথাসাধ্য চেষ্টা করা হচ্ছে। কোস্ট গার্ড পুরো প্রক্রিয়াটির তদারকি করছে।’

এদিকে ডুবোচরের সঙ্গে ধাক্কা লেগে জাহাজের কোনো ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে কিনা, তা খতিয়ে দেখার জন্য এভারগ্রিনের পক্ষ থেকে ডুবুরি নিয়োগ করা হয়েছে। এছাড়া জাহাজটিকে মুক্ত করার কাজেও সহায়তা করবেন তারা। তাইওয়ানভিত্তিক কনটেইনার পরিবহন ও শিপিং কোম্পানিটি জানিয়েছে, কী কারণে এভার ফরোয়ার্ড আটকে গেল, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
প্রাথমিক পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, জাহাজটির তলদেশ কাদামাটির প্রায় ২৪ ফুট নিচে পর্যন্ত গেঁথে গেছে। এ অবস্থায় জাহাজটিকে পুনরায় পানিতে ভাসাতে আরও দিন দশেক সময় লেগে যেতে পারে।
এবার আসা যাক পুরনো ঘটনার প্রসঙ্গে। ২০২১ সালে চায়ের কাপে ঝড় তুলেছিল যেসব বিষয় তার মধ্যে অন্যতম ছিল দানবীয় কনটেইনারবাহী জাহাজ এভার গিভেনের সুয়েজ খালে আটকা পড়া। খালি চোখে দেখলে অনেকের কাছেই এটি সাধারণ একটি ঘটনা মনে হতে পারে। কিন্তু বৈশ্বিক সমুদ্র পরিবহন খাতকে অনেক চড়া মূল্য দিতে হয়েছে এই অচলাবস্থার।
গত বছররের ২৩ মার্চ সুয়েজ খালে আটকা পড়ে এভারগ্রিন মেরিনের মালিকানাধীন ২০ হাজার টিইইউ কনটেইনার ধারণক্ষমতার জাহাজ এভার গিভেন। লোহিত সাগর থেকে ভূমধ্যসাগরে যাওয়ার সময় দুই লাখ টনের এই জাহাজ নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে খালটিতে আড়াআড়িভাবে আটকে যায়। নিয়ন্ত্রণ হারানোর আগে জাহাজটি প্রবল বাতাস ও ধুলিঝড়ের কবলে পড়েছিল। ফলে বন্ধ হয়ে যায় বিশ্বের অন্যতম ব্যস্ততম এই বাণিজ্যিক রুট। সুয়েজ খালের দুই প্রান্তের প্রবেশমুখে জাহাজজট তৈরি হয়, যেখানে আটকে পড়ে সাড়ে তিনশর বেশি জাহাজ। ২৪ মার্চ উদ্ধারকাজ শুরু হয়। ছয় দিন আটকে থাকার পর অবশেষে মুক্ত এভার গিভেন।

খালে আটকা পড়া থেকে মুক্ত হলেও এভার গিভেন নাটক চলেছিল আরও মাস তিনেক। সুয়েজ কর্তৃপক্ষের দাবি, জাহাজটি আটকে যাওয়ায় দৈনিক এক থেকে দেড় কোটি ডলার রাজস্ব হারাতে হয়েছে তাদের। এ ঘটনায় জাহাজটির মালিকপক্ষের কাছে মোটা অংকের ক্ষতিপূরণ দাবি করে মিশর সরকার। প্রায় তিন মাস এ নিয়ে মালিকপক্ষ, বিমা কোম্পানি ও খাল কর্তৃপক্ষের মধ্যে দর কষাকষি হয়। অবশেষ একটি চুক্তি সম্পাদিত হলে ৭ জুলাই মিশর থেকে ছাড়া পায় এভার গিভেন। ২০১৮ সালে তৈরি জাহাজটির দৈর্ঘ্য ৪০০ মিটার। সুয়েজ খাল অতিক্রমের সময় এতে ১৮ হাজার ৩০০ কনটেইনার ছিল।
গত বছরের মার্চের আর এবারের ঘটনাটি অনেকটা একই ধরনের হলেও কিছু ক্ষেত্রে পার্থক্য রয়েছে। দুটি ঘটনার স্থান ভিন্ন। গতবারেরটি সুয়েজ খালে, আর এবার যুক্তরাষ্ট্রের জলসীমায়। সবচেয়ে বড় কথা হলো, এভার গিভেন আটকে যাওয়ায় সুয়েজ খাল দিয়ে জাহাজ চলাচল বিঘ্নিত হয়েছিল, যা সাপ্লাই চেইনের ওপর মারাত্মক নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছিল। তবে এভার ফরোয়ার্ড আটকে যাওয়ার কারণে অন্যান্য জাহাজ চলাচলে কোনো সমস্যা হচ্ছে না।