আন্তর্জাতিক জলসীমায় সামুদ্রিক জীববৈচিত্র্যের সুরক্ষায় একটি নীতিমালা প্রণয়নের লক্ষ্যে নিউইয়র্কে বৈঠকে বসেছিলেন জাতিসংঘের সদস্য ১৬৮টি দেশের কূটনীতিকরা। তবে দুই সপ্তাহের এই বৈঠক কোনো চুক্তি ছাড়াই শেষ হয়েছে। এর ফলে দীর্ঘদিন ধরে চলমান উদ্যোগ ফের মুখ থুবড়ে পড়ল। পরিবেশবাদীরা বলছেন, সমুদ্রকে সুরক্ষিত রাখার স্বার্থে একটি নীতিমালা প্রণয়নের সুবর্ণ সুযোগ ছিল এবার। কিন্তু শেষ পর্যন্ত সেটি হাতছাড়া হলো।
অবশ্য জাতিসংঘের এই অধিবেশনে সভাপতিত্বকারী রেনা লি দাবি করেন, বৈঠকে বেশ অগ্রগতি হয়েছে। কিন্তু চূড়ান্ত ফল পেতে আরও কিছুটা সময় লাগবে। লি জাতিসংঘে সিঙ্গাপুরের মহাসাগর ও সমুদ্র আইনবিষয়ক রাষ্ট্রদূত এবং দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রীর বিশেষ প্রতিনিধি হিসেবে কর্মরত।
সভাপতি যে অগ্রগতির দাবি করছেন, সেটি কেমন? সংশ্লিষ্ট সূত্র অনুযায়ী, কোনো চুক্তি না হলেও অধিবেশনে চারটি বিষয়ের ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়েছে। সেগুলো হলো- সমুদ্রে সংরক্ষিত এলাকা স্থাপন, পরিবেশগত প্রভাবের মূল্যায়নের উন্নতি করা, উন্নয়নশীল দেশগুলোকে তহবিল সহায়তা প্রদান ও সক্ষমতা বৃদ্ধিতে সহায়তা করা এবং সামুদ্রিক সম্পদের জিনগত বৈশিষ্ট্যের তথ্য বিনিময় করা।
১৫-২৬ আগস্ট পর্যন্ত অনুষ্ঠিত অধিবেশনটি ছিল ইন্টারগভর্নমেন্টাল কনফারেন্সের পঞ্চম সেশন। গত মার্চে নিউইয়র্কে জাতিসংঘের সদরদপ্তরে এ বিষয়ে চতুর্থ দফার আলোচনা হয়েছিল, যেখানে অভিন্ন আইন প্রণয়নের ক্ষেত্রে সদস্য দেশগুলোর মধ্যে কিছু বিষয়ে ঐকমত্য ও আন্তরিকতা দেখা গিয়েছিল, যা আগের বৈঠকগুলোয় দৃশ্যমান ছিল না। মার্চের বৈঠকেই প্রথমবারের মতো জাতিসংঘের অধীনে একটি কার্যকর হাই সিজ ট্রিটি প্রণয়নের বিষয়ে আশার আলো দেখা যায়। আশা করা হচ্ছিল, পঞ্চম দফার বৈঠকে সেই অগ্রগতির ধারাবাহিকতায় একটি চুক্তি চূড়ান্ত হবে। কিন্তু তা আর হলো না।
বিশ্বের সাগর-মহাসাগরগুলোর দুই-তৃতীয়াংশ আন্তর্জাতিক জলসীমার অন্তর্ভুক্ত। জাতিসংঘের আলোচনায় উপকূল থেকে ৩২০ কিলোমিটার বা ২০০ মাইল-পরবর্তী সমুদ্রাংশকে হাই সিজ বিবেচনা করা হচ্ছে। এই অংশে সব দেশেরই মৎস্য আহরণ, জাহাজ চলাচল ও গবেষণা পরিচালনা করার অধিকার রয়েছে। হাই সিজের মাত্র ১ দশমিক ২ শতাংশ সুরক্ষিত।
একটি দেশ তার নিজস্ব সমুদ্রসীমার সম্পদ ব্যবহারের পাশাপাশি এর সুরক্ষারও ব্যবস্থা নেয়। কিন্তু যেহেতু আন্তর্জাতিক জলসীমার কোনো একক মালিকানা নেই, সেহেতু এর জীববৈচিত্র্য রক্ষার দায়িত্বও এককভাবে কোনো দেশের ওপর বর্তায় না। এ কারণে প্রায় সময়ই আন্তর্জাতিক জলসীমার পরিবেশগত সুরক্ষার বিষয়টি উপেক্ষিত থেকে যায়। কেবল আন্তর্জাতিক আইনই পারে এই সুরক্ষা নিশ্চিত করতে।
পরিবেশবাদীরা বলছেন, আন্তর্জাতিক জলসীমার বাস্তুতন্ত্র নিয়ে পর্যাপ্ত তথ্য-উপাত্ত সবসময় তুলে ধরা হয় না। এ কারণে এই অংশের জীববৈচিত্র্য কী অবস্থায় রয়েছে, সেই বিষয়েও সঠিক তথ্য জানা যায় না। তাদের আশঙ্কা, এমন পরিস্থিতিও তৈরি হতে পারে যে, কোনো একটি প্রজাতি আবিষ্কারের আগেই তাদের অস্তিত্ব হুমকির মুখে পড়ে গেছে।
কোনো জরুরি পরিস্থিতি তৈরি না হলে চলতি বছর এ বিষয়ে আর কোনো বৈঠক হবে না। সবকিছু ঠিকঠাক থাকলে আগামী বছর জাতিসংঘের এই উদ্যোগ নিয়ে ফের আলোচনায় বসবেন বিশ্বনেতারা।