সম্প্রতি ক্যালিফোর্নিয়ার সমুদ্র তলদেশে বিষাক্ত রাসায়নিক ডিডিটির উপস্থিতি শনাক্ত করেছেন গবেষকরা। বছরের পর বছর এই বিষাক্ত রাসায়নিক সাগরের পানি ও জীববৈচিত্র্যকে দূষিত করে চলেছে, যার ফলে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে মানবস্বাস্থ্য। বিলুপ্তির ঝুঁকিতে রয়েছে বিভিন্ন প্রজাতির সামুদ্রিক জীব।
বিগত কয়েক দশক ধরেই বিশ্বের বড় বড় দেশ ও পরিবেশবাদী সংস্থাগুলো সাগর দূষণ এবং এর ক্ষতিকর প্রভাব রোধে কাজ করে চলেছে। গোটা বিশ্ব প্লাস্টিক দূষণ নিয়ে সোচ্চার হলেও রাসায়নিক পদার্থের কারণে সৃষ্ট দূষণের বিষয়টি এখনো অনেকটা আড়ালেই রয়ে গেছে। ডিডিটি (ডাইক্লোরো-ডাইফিনাইল-ট্রাইক্লোরোইথেন), পিসিবি (পলিক্লোরিনেটেড বাইফিনাইল) এবং অন্যান্য পারসিস্ট্যান্ট অরগানিক পলিউট্যান্ট (পিওপি)-এর ফলে সৃষ্ট রাসায়নিক দূষণ ধারণাতীতভাবে পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্যের ক্ষতি করছে।
চলতি বছরের মার্চে গবেষকরা আবিষ্কার করেন, ১৯৪০-এর দশকে ক্যালিফোর্নিয়া উপকূলে নিক্ষেপিত হাজার হাজার ব্যারেল নিষিদ্ধ রাসায়নিক এখনো সমুদ্রতলদেশে নিঃসৃত হচ্ছে। দীর্ঘ আশি বছর পরেও ক্ষতিকারক ডিডিটি প্রকৃতিতে বিলীন হওয়া তো দূরের কথা, এখনো আগের মতোই বিষাক্ত রয়ে গেছে। গবেষকরা আশঙ্কা করছেন, সমুদ্রতলদেশের এই দূষণ ড্রেজিং ও সামুদ্রিক ঝড়ের মাধ্যমে বিস্তৃীর্ণ এলাকায় ছড়িয়ে পড়বে। যার ফলে গোটা এলাকার সামুদ্রিক জীববৈচিত্র্য দূষিত হবে এবং সেসব প্রাণী খাদ্য হিসেবে গ্রহণ করলে মানবদেহেও দূষিত রাসায়নিক প্রবেশ করবে। একসময় কীটনাশক হিসেব কৃষিকাজে ব্যাপক পরিমাণে ডিডিটি ব্যবহৃত হতো। বন্যপ্রাণী ও মানবস্বাস্থ্যের ওপর ক্ষতিকারক প্রভাব বিস্তার করায় ১৯৭২ সালে যুক্তরাষ্ট্রে এবং ২০০১ সালে বৈশ্বিকভাবে এই রাসায়নিকটি নিষিদ্ধ করা হয়।
বিশ্বব্যাপী সাড়ে তিন লাখ রাসায়নিক উৎপাদিত হয়। পরিবেশের ওপর এসব সিন্থেটিকের প্রভাব নিরূপণ করতে প্রায় ১ লাখ ৩০ হাজার গবেষণা পরিচালিত হয়েছে। ২০২১ সালের এক বিশ্লেষণে দেখা যায়, এসব গবেষণায় উল্লেখযোগ্যহারে কেবল ৬৫টি রাসায়নিকের প্রভাব পরিলক্ষিত হয়েছে। সাড়ে তিন লাখ রাসায়নিকের ভেতর ১ লাখ ২০ হাজার রাসায়নিকের বিষয়ে কোনো ধরনের তথ্য সর্বসাধারণের জন্য উন্মুক্ত নেই। তথ্যগত এই ঘাটতির কারণে সাগরে রাসায়নিক দূষণের মাত্রা সম্পূর্ণরূপে বিশ্লেষণ করা সম্ভব হচ্ছে না। রাসায়নিক দূষণের বিষয়ে সচেতনতা এবং এর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব সম্পর্কে সুস্পষ্ট ধারণা না থাকায় প্রতিকারমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা কষ্টকর। অনেক রাসায়নিক পিওপি হিসেবে কাজ করায় দূষণের মাত্রাও বেশ ব্যাপক।
অধিকাংশ দেশ ক্ষতিকারক এসব রাসায়নিক ব্যবহারের ক্ষেত্রে বেশ কিছু বিধিনিষেধ মেনে চলে। তবে পিওপির দুইটি বৈশিষ্ট্যের কারণে এর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব এড়ানো সম্ভব হয় না। প্রথমত, পিওপি রাসায়নিকগুলো সহজে প্রকৃতিতে বিলীন হয় না বা ভেঙ্গে যায় না। যার ফলে যুগের পর যুগ সেগুলো প্রকৃতিতে অক্ষত অবস্থায় থেকে যায় এবং সমান মাত্রায় দূষণ ছড়ায়। এছাড়া ক্ষতিকারক এসব রাসায়নিক প্রাণীদেহের ফ্যাটি টিস্যুতে জমা হয়। প্রাণীর মৃত্যুর পর কোষে জমা থাকা ক্ষতিকর রাসায়নিক পুনরায় প্রকৃতিতে ছড়িয়ে পড়ে। এছাড়া অন্য কোনো প্রাণী আক্রান্ত প্রাণীকে খাদ্য হিসেবে গ্রহণ করলে তার শরীরেও দূষণ প্রবেশ করে। যার ফলে প্রাণীর মাধ্যমেও রাসায়নিক দূষণ এক স্থান থেকে অন্য স্থানে ছড়ায়।
সাম্প্রতিক বছরগুলোয় উত্তর সাগর ও প্রশান্ত মহাসাগরের নির্জন ও গভীর অংশেও রাসায়নিক দূষণ শনাক্ত হয়েছে, যার ফলে এটাই প্রতীয়মান হয় যে সাগরের কোনো অংশই বর্তমানে দূষণমুক্ত নেই। সব ধরনের পণ্য উৎপাদনে রাসায়নিকের ব্যবহার এই দূষণের অন্যতম কারণ। ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) এক গবেষণায় দেখা যায়, উত্তর-পূর্ব আটলান্টিকের ৭৫ শতাংশ, ভূমধ্যসাগরের ৮৭ ও বাল্টিক সাগরের ৯৬ শতাংশ অঞ্চল সিন্থেটিক পদার্থ ও ভারী ধাতু দ্বারা দূষিত।
ক্ষতিকারক এসব রাসায়নিক ‘এন্ডোক্রাইন ডিজরাপ্টর’ হিসেবে কাজ করে এবং সমুদ্রের পোকামাকড়, মাছ ও উভচর প্রাণীর প্রজনন এবং বিকাশকে মারাত্মকভাবে বাধাগ্রস্থ করে। একই সঙ্গে সামুদ্রিক প্রাণীর দেহে এসব রাসায়নিক জমা হয় বলে এর দ্বারা খাদ্যশৃঙ্খল ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। বিশ্বের প্রায় ৩০০ কোটি মানুষ প্রোটিনের উৎস হিসেবে সামুদ্রিক প্রাণীর ওপর নির্ভরশীল হওয়ায় এর সরাসরি প্রভাব পড়ছে মানবস্বাস্থ্যের ওপর। রাসায়নিক দূষণের কারণে অকালমৃত্যু থেকে শুরু করে মানবভ্রুণের বিকাশজনিত সমস্যা এবং প্রাপ্তবয়ষ্কদের মধ্যে হৃদরোগ ও ডিমেনশিয়া দেখা দিচ্ছে।
জাতিসংঘের তথ্যমতে, ২০৩০ সাল নাগাদ সিন্থেটিক রাসায়নিকের বিক্রি প্রায় দ্বিগুণ হবে। এরই মধ্যে রাসায়নিক উৎপাদনের পরিমাণ নিরাপদ সীমা ছাড়িয়ে গেছে। যার ফলে পরিবেশ দূষণ রোধ করা তো দূরের বিষয়, দূষণের মাত্রা নিরূপণ করাও কোনো দেশের একার পক্ষে করা সম্ভব নয়। বিশেষজ্ঞদের মতে, সমুদ্রে রাসায়নিক দূষণ রোধে তাই বিভিন্ন দেশের সরকার, শিল্প খাত এবং গ্রাহকদের সম্মিলিতভাবে কাজ করতে হবে।