জাহাজের হাল যখন ভাগ্যান্বেষণের অবলম্বন

রোমান ইবিমেনে ফ্রাইডে ও থ্যাংকগড ওপেমিপো ম্যাথু ইয়েইয়ে

দারিদ্র্যের দুষ্টচক্র ভেদ করে নতুন করে ভাগ্য লিখতে একটি কার্গো জাহাজের হালে চেপে অজানার উদ্দেশ্যে পাড়ি জমিয়েছিলেন চার নাইজেরিয়ান যুবক। উত্তাল সাগরের ঝুঁকিপূর্ণ যাত্রা শেষে যখন তারা স্থলভাগের দেখা পেলেন, ততদিনে একে একে কেটে গেছে ১৪দিন।

ভাগ্য তাদের বাড়ি থেকে সাড়ে তিন হাজার মাইল দূরের এমন এক দেশে নিয়ে গেছে, যে দেশের ফুটবল দল ছাড়া আর কোনো কিছু সম্পর্কেই তাদের জানা নেই। ব্রাজিল বন্দরে সেই দেশের পুলিশ বাহিনীর কাছে জায়গার নাম শুনে রীতিমতো আকাশ থেকে পড়েন রোমান ইবিমেনে ফ্রাইডে ও তার তিন সাথী। তাদের দুজন এতটাই আশাহত হন যে, ব্রাজিল সরকারের কাছে নাইজেরিয়ায় ফেরত যাওয়ার আর্জি জানান তারা।

তবে দুই বছর চাকরির জন্য দ্বারে দ্বারে ঘোরা ফ্রাইডে আবার সেই অনিশ্চিত জীবনে ফিরতে রাজি হননি। বিধবা মা এবং ছোট তিন ভাইবোনের ভবিষ্যতের কথা ভেবেই জাহাজের হালের ছয় ফুট বাই ছয় ফুট ছোট্ট জায়গাটায় চড়ে বসেছিলেন তিনি। যাত্রা শুরুর নয়দিনের মাথায় সাথে আনা সামান্য খাবার ও পানিও ফুরিয়ে গেছিলো। নিজেদের চাঙ্গা রাখতে এরপর সাগরের নোনাজল ও টুথপেস্টের দ্বারস্থ হন তারা।

বিপজ্জনক যাত্রা শেষে উদ্ধারকর্মীদের কাছে অমৃতসম পানি নিচ্ছেন ইবিমেনে ফ্রাইডে ও সঙ্গীরা

ফ্রাইডের মতোই ব্রাজিলে থেকে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন ৩৮ বছর বয়সী থ্যাংকগড ওপেমিপো ম্যাথু ইয়েইয়ে। নাইজেরিয়ার লাগোস প্রদেশে বাদাম ও পাম অয়েলের ছোট্ট একটা খামার ছিল তার। তবে চলতি বছরের শুরুতে বন্যায় সব ভেসে যাওয়ায় স্ত্রী আর ছোট ছোট দুই ছেলেমেয়েকে নিয়ে পথে বসেন ইয়েইয়ে।

বেকারত্ব ও দারিদ্র্যে জর্জরিত নাইজেরিয়ায় আর কোনো আশার আলোই দেখতে পাচ্ছিলেন না ইয়েইয়ে ও তার সফরসঙ্গীরা। জীবনকে নতুন ভাবে ঢেলে সাজাতেই তাই এই দুঃসাহসী অভিযানে নেমে পড়েন তারা।

বিপদসংকূল দীর্ঘ এই যাত্রা তাদের জন্য মোটেও সহজ ছিলো না। ঠান্ডা ইস্পাতের ছোট্ট কাঠামোয় ঠায় বসে থাকা ছাড়া করার কিছু ছিলো না। পায়ের নীচে ঘূর্ণিপাক খাচ্ছিলো আটলান্টিকের গভীর জলরাশি। পথে বেশ কবার হাঙ্গরের দেখাও পেয়েছেন তারা। কায়মনোবাক্যে পুরো যাত্রাপথ ঈশ্বরকে স্মরণ করেছেন ফ্রাইডে।

ছয় ফুট বাই ছয় ফুটের এই হাল যেন তাদের কাছে ভাগ্য পরিবর্তনের সারথি

ফ্রাইডের ঈশ্বর তাকে নিরাশ করেনি। ফাইডেকে তিনি এমন এক দেশে নিয়ে এসেছেন, অভিবাসীবান্ধব হিসেবে যে দেশের সুনাম রয়েছে। সরকারি পরিষেবা, শিক্ষা ও সামাজিক সুরক্ষা কার্যক্রমে অভিবাসীদের অধিকার নিশ্চিত করেছে ব্রাজিলের সংবিধান। কোনো অভিবাসনপ্রত্যাশী যদি প্রয়োজনীয় নথিপত্র ছাড়া ব্রাজিলে প্রবেশ করে, তাকেও অভিবাসী হওয়ার সুযোগ দেয় দেশটি।

উদ্ধারের পর ফ্রাইডে ও ইয়েইয়েকে সাও পাওলোর কাসা দো মাইগ্রান্তে নামক অভিবাসী আশ্রয়কেন্দ্রে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে তারা ইমিগ্রেশনের জন্য প্রয়োজনীয় কাগজপত্র তৈরির পাশপাশি পর্তুগিজ ভাষার ক্লাস করছেন এবং ব্রাজিলের কৃষ্টি-সংস্কৃতির সঙ্গে পরিচিত হচ্ছেন।

সম্প্রতি ওয়ার্ক পারমিট পেয়ে কাজের সন্ধান করছেন ফ্রাইডে আর ইয়েইয়ে। প্রসঙ্গত, ব্রাজিলে একজন আফ্রিকান অভিবাসীর গড় মাসিক আয় প্রায় ৫০০ ডলার। অন্যদিকে ইউরোপীয় অভিবাসীরা মাসে প্রায় ৩ হাজার ৪০০ ডলার পর্যন্ত আয় করে থাকে। অনেক অভিবাসী তাই নিজেদের ভাগ্য ফেরাতে লাতিন আমেরিকার প্রকৃতিবেষ্টিত দেশটিতে বসতি গড়ে তোলেন। ২০১৮ সাল থেকে এখন পর্যন্ত প্রায় এক লাখ অভিবাসীকে আশ্রয় দিয়েছে ব্রাজিল।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here