ব্যাপক সমালোচনা সত্তে¡ও ফুকুশিমা পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের তেজস্ক্রিয় পানি প্রশান্ত মহাসাগরে ছাড়তে শুরু করেছে জাপান। এ অবস্থায় সম্ভাব্য স্বাস্থ্যঝুঁকি এড়াতে জাপানের দশটি অঞ্চল থেকে সিফুড আমদানির ওপর নিষেধাজ্ঞারা জারি করেছে চীন, হংকং ও ম্যাকাউ। বার্তা সংস্থা রয়টার্স এ তথ্য জানিয়েছে।
২০১১ সালের মার্চে ভয়াবহ সুনামির কবলে পড়ে জাপানে। রিখটার স্কেলে ৯ মাত্রার তীব্র ভূমিকম্পে ধ্বংস হয় ফুকুশিমা দাইচি পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র। সুনামিতে ফুকুশিমার তিনটি চুল্লি প্লাবিত হয়। পরবর্তীতে সেই অঞ্চলে পারমাণবিক বিপর্যয় ঠেকাতে পাম্পের মাধ্যমে চুল্লিগুলোয় ঠান্ডা পানি প্রবাহিত করা হয়।
দুই বছর আগে তেজস্ক্রিয় পানি অপসারণ করে ফুকুশিমা দাইচি পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রকে পুরোপুরি বন্ধ করে দেওয়ার উদ্যোগ নেয় জাপান। গত মাসে এই উদ্যোগে অনুমোদন প্রদান করে জাতিসংঘের আণবিক শক্তি সংস্থা আইএইএ। এরই ধারাবাহিকতায় আজ বৃহস্পতিবার (২৪ আগস্ট) থেকে সাগরে তেজস্ক্রিয় পানি ফেলতে শুরু করেছে জাপান।
ফুকুশিমা দাইচির পরিচালনার দায়িত্বে থাকা টোকিও ইলেকট্রিক পাওয়ার কোম্পানির (টেপকো) তথ্যমতে, পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রটিতে প্রায় ১৩ লাখ টন তেজস্ক্রিয় পানি রয়েছে। প্রথম দফায় ১৭ দিনে ৭ হাজার ৮০০ ঘনমিটার পানি সাগরে ছাড়া হবে। টেপকো জানায়, এ সময় কোনো ধরনের অসঙ্গতি পরিলক্ষিত হলে তাৎক্ষণিকভাবে সাগরে পানি ফেলা বন্ধ করা হবে।
শুরু থেকেই জাপানের এই উদ্যোগের কড়া সমালোচনা করছে চীন। এক বিবৃতিতে চীনের কাস্টমস ব্যুরো জানায়, এই পানি সাগরে মিশলে সেটা জাপানের মৎস্য ও কৃষিপণ্যকে তেজস্ক্রিয় দূষণের ঝুঁকিতে ফেলবে। অন্যদিকে নিজেদের স্বার্থ রক্ষার জন্য স্থানীয় জনগোষ্ঠী তথা সমগ্র মানবজাতিকে ঝুঁকির মুখে ফেলায় জাপানের এমন আচরণকে স্বার্থপরতা হিসেবে আখ্যায়িত করেছে চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়।

হংকং, ম্যাকাউয়ের মতো প্রতিবেশী রাষ্ট্রগুলোও চীনের সুরে সুর মিলিয়ে জাপানি উদ্যোগের সমালোচনা করছে। শুধু তাই নয়, আজ থেকে জাপানি সিফুড আমদানির ওপর পৃথক পৃথক নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে দেশগুলো। অন্যদিকে দক্ষিণ কোরিয়ার প্রধানমন্ত্রী হান ডাক-সু জানান, জনসাধারণের উদ্বেগ দূর না হওয়া পর্যন্ত ফুকুশিমার মৎস্য ও খাদ্যের ওপর আমদানি নিষেধাজ্ঞা বলবৎ রাখা হবে ।
প্রসঙ্গত, জাপানি সিফুডের সবচেয়ে বড় ক্রেতা চীন। ২০২২ সালে চীনে প্রায় ৬০ কোটি ডলারের সিফুড রপ্তানি করেছে জাপান। জাপানি সিফুড আমদানিতে চীনের পরেই রয়েছে হংকং। সরকারি তথ্য অনুযায়ী, ২০২২ সালে জাপানের মোট রপ্তানিকৃত সিফুডের ৪২ শতাংশের ক্রেতা ছিলো চীন ও হংকং। এই দুটি দেশের নিষেধাজ্ঞা তাই জাপানি অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে।
জাপান সরকার শুরু থেকেই প্রতিবেশী দেশগুলোর অভিযোগ ভিত্তিহীন বলে দাবি করে আসছে। টোকিও জানায়, চীনা অভিযোগের কোনো বৈজ্ঞানিক ভিত্তি নেই। জাতিসংঘের ছাড়পত্র পাওয়ার পরই তারা তেজস্ক্রিয় পানি সাগরে ছাড়তে শুরু করেছে এবং পরিবেশের কথা মাথায় রেখে খুবই ধীর গতিতে (আনুমানিক ৩০ বছরে) গোটা প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা হবে।
এছাড়া ফুকুশিমার প্রাকৃতিক পরিবেশ, জনগোষ্ঠী ও সামুদ্রিক জীববৈচিত্র্যের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে প্রতিনিয়ত আশপাশের এলাকায় তেজস্ক্রিয় পানির প্রভাব পর্যালোচনা করবে জাপান। সপ্তাহে প্রতি রোববার প্রতিবেদনের মাধ্যমে পর্যালোচনার ফলাফল প্রকাশ করা হবে।
উল্লেখ্য, পানি ছাড়ার আগেও এর তেজস্ক্রিয়তার মাত্রা পরীক্ষা করে দেখেছে টেপকো। আজ প্রকাশিত পরীক্ষার ফলাফল প্রতিবেদন অনুযায়ী, ফুকুশিমার প্রতি লিটার পানিতে সর্বোচ্চ ৬৩ বেকেরেল (আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী তেজস্ক্রিয়তা পরিমাপের একক) ট্রিটিয়ামের উপস্থিতি পাওয়া গেছে। যেখানে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) মানদণ্ড অনুযায়ী, প্রতি লিটার সুপেয় পানির স্বাভাবিক তেজস্ক্রিয়তা সীমা ১০ হাজার বেকেরেল।
এমতাবস্থায় সিফুডের নিরাপত্তা নিশ্চিত করে চীনকে আমদানি নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়ার অনুরোধ জানিয়েছেন জাপানের শিল্পমন্ত্রী ইয়াসুতোশি নিশিমুরা।