এইচএমএম অধিগ্রহণ অনিশ্চিত হ্যাপাগ-লয়েডের জন্য

বাধা দেশীয় স্বার্থ সুরক্ষার নীতিগত অবস্থান

দক্ষিণ কোরিয়ার বৃহত্তম শিপিং অপারেটর এইচএমএম অধিগ্রহণে আগ্রহী হয়েছিল তাদের জার্মান প্রতিদ্বন্দ্বী হ্যাপাগ-লয়েড। তবে তাতে বাধ সেধেছে এইচএমএমের সিংহভাগ শেয়ারের মালিক দুই রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান। দেশীয় স্বার্থকে সুরক্ষা দিতে গিয়ে দ্বিতীয় রাউন্ডের নিলাম থেকে জার্মান ক্যারিয়ারটিকে বাদ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে তারা।

২০২১ সালে হুন্দাই মার্চেন্ট মেরিন থেকে এইচএমএম নাম ধারণ করা সমুদ্র পরিবহন সংস্থাটির ৭৫ শতাংশ শেয়ারহোল্ডার বিনিয়োগ ব্যাংক কোরিয়া ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক (কেডিবি) ও সমুদ্র অর্থায়ন কোম্পানি কোরিয়া ওশান বিজনেস করপোরেশন। তারা চাইছে এইচএমএমের শেয়ার বিক্রির মাধ্যমে যেন দেশীয় অর্থনীতি ও করদাতাদের স্বার্থ সুরক্ষা হয়। এর জন্য আপাতত তিনটি কোরীয় কোম্পানিকেই নিলাম প্রতিযোগিতায় অংশ নেওয়ার সুযোগ দিচ্ছে তারা। আর এতেই কপাল পুড়েছে হ্যাপাগ-লয়েডের।

চলতি বছরের শেষ নাগাদ এইচএমএম বিক্রির চুক্তি চূড়ান্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে কোরিয়া সরকারের। আপাতত ৪০ শতাংশ শেয়ার ছেড়ে দেবে কেডিবি ও কোরিয়া ওশান বিজনেস করপোরেশন। অবশ্য নিকট ভবিষ্যতে শেয়ার বিক্রির পরিমাণ ৫৮ শতাংশতে নিয়ে যাওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে তাদের।  

২০১৬ সালে দক্ষিণ কোরীয় অপারেটর হানজিন শিপিংয়ের পতনের পর এইচএমএমের ভবিষ্যৎ সুরক্ষায় উদ্যোগী হয় দেশটির সরকার। এরই অংশ হিসেবে পরিচালিত হয় সরকারি বেইলআউট কর্মসূচি, যার অধীনে ইস্যু করা হয় কনভার্টিবল বন্ড। এই বন্ডের বিপরীতেই এইচএমএমের ৭৫ শতাংশ শেয়ার সমানভাবে ভাগাভাগি করে নেয় কেডিবি ও কোরিয়া ওশান বিজনেস করপোরেশন। এর মধ্যে ৫৮ শতাংশ শেয়ার বিক্রি করে দিলে তাদের হাতে থাকবে ১৭ শতাংশ শেয়ার। এই শেয়ারও পরবর্তীতে কোনো এক সময়ে তারা ছেড়ে দেবে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।

২০১৬ সালে হানজিন শিপিংয়ের পতন কোরীয় সরকারকে বাধ্য করেছিল এইচএমএমের সুরক্ষা নিয়ে চিন্তা করতে

৪০ শতাংশ শেয়ার বিক্রির বিষয়টি চূড়ান্ত হওয়ার পর থেকেই ধারণা করা হচ্ছিল যে, কেডিবি ও কোরিয়া ওশান বিজনেস কোম্পানি তাদের স্বদেশী কোনো কনগ্লোমারেটের কাছেই এইচএমএমের নিয়ন্ত্রণ ছেড়ে দেবে। নিলাম দরপত্র আহ্বানের আগে অর্থায়নকারী প্রতিষ্ঠান দুটির বরাত দিয়ে কোরীয় গণমাধ্যমে খবর প্রকাশ হয়েছিল, সরকার চাইছে এইচএমএম এখন যে অবস্থায় আছে, তাদের সেই অবস্থান ও ব্যবসা যেন অক্ষুণ্ন থাকে।

এইচএমএমের ৪০ শতাংশ শেয়ার বিক্রির মাধ্যমে ন্যূনতম ৩৭০ কোটি ডলার সংগ্রহের পরিকল্পনা রয়েছে সরকারের। আর পরবর্তীতে ৫৮ শতাংশ শেয়ার বিক্রি হলে সব মিলিয়ে আসবে ৪৫০ কোটি ডলার।

শেয়ার বিক্রেতা দুই প্রতিষ্ঠানেরই প্রত্যাশা ছিল কোরিয়ার বৃহত্তম শিল্পগোষ্ঠীগুলোর একটি এইচএমএমে বিনিয়োগে এগিয়ে আসবে। কিন্তু তা না হওয়ায় তারা বেশ হতাশ হয়েছে। এসএম গ্রুপ অবশ্য ৩০০ কোটি ডলার পর্যন্ত দরপ্রস্তাব করেছিল। কিন্তু অন্য প্রতিষ্ঠানগুলো এর চেয়ে বেশি দর দিতে রাজি হওয়ায় শেষ পর্যন্ত তারাও পিছু হটেছে।

এইচএমএমের নিয়ন্ত্রণ কোরীয়দের হাতে রাখার যে অভিলাষ রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান দুটির রয়েছে, তা দেখে হ্যাপাগ-লয়েড বুঝে গেছে যে, এই নিলাম তাদের জন্য নয়। অবশ্য কিছু গণমাধ্যমের খবরে জানানো হয়েছে যে, নিলাম দৌড়ে থাকা একটি কোরীয় কোম্পানি হ্যাপাগ-লয়েডকে তাদের দলে টেনে যৌথ অংশীদারিত্ব গড়ে তুলতে পারে। এইচএমএমের ক্ষুদ্র শেয়ারহোল্ডাররাও জার্মান কোম্পানিটির পক্ষে রয়েছে। তাদের অভিযোগ, হ্যাপাগ-লয়েডকে নিলাম প্রক্রিয়ার বাইরে রাখার মাধ্যমে সরকার তাদের বিনিয়োগ স্বার্থ (শেয়ারহোল্ডার ভ্যালু) ক্ষুণ্ন করছে। তারা এটাও বলছে যে, হ্যাপাগ-লয়েডের মতো একটি অভিজ্ঞতাসম্পন্ন কোম্পানিকে এইচএমএমের শীর্ষ বিনিয়োগকারী হিসেবে পেলে সেটি অবশ্যই মঙ্গলজনক হতো।

অন্যদিকে কোরিয়ার সমুদ্র পরিবহন খাতের দুটি সংগঠন ফেডারেশন অব কোরিয়ান মেরিটাইম ইন্ডাস্ট্রিজ ও বুসান পোর্ট ডেভেলপমেন্ট অ্যাসোসিয়েশন এইচএমএমের শেয়ার হ্যাপাগ-লয়েড অথবা অন্য কোনো বিদেশী ক্রেতার কাছে ছেড়ে দেওয়ার বিরোধিতা করেছে। তারা বলছে, এইচএমএম কোরিয়ার জাতীয় সম্পদ। বিদেশী কারও কাছে ক্যারিয়ারটির নিয়ন্ত্রণ ছেড়ে দিলে তা জাতীয় নিরাপত্তার জন্য হুমকির কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে।

বিশ্বের অষ্টম শীর্ষ সমুদ্র পরিবহনকারী সংস্থা এইচএমএম

অবশ্য নিলামে কেবল দেশীয় তিন কোম্পানিকে অংশগ্রহণের সুযোগ দেওয়ার ক্ষেত্রেও উদ্বিঘ্ন হওয়ার মতো একটি বিষয় রয়েছে কোরিয়া সরকারের জন্য। নিলাম দৌড়ে টিকে থাকা হারিম, ডংওং বা এলএক্স হোল্ডিংস-প্রত্যেকেরই আর্থিক সক্ষমতা ও প্রয়োজনীয় মূলধন থাকা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। যদিও গণমাধ্যমের খবরে বলা হয়েছে, তিনটি কোম্পানিই নিলামের ন্যূনতম দর ৩৭০ কোটি ডলার পরিশোধ করতে প্রস্তুত রয়েছে। প্রত্যেকেই অন্যান্য বিনিয়োগকারীদের সাথে অংশীদারিত্বের ভিত্তিতে তহবিল গড়ে তুলতে চাইছে। হারিম এরই মধ্যে একটি বেসরকারি মূলধনী কোম্পানির সাথে অংশীদারিত্ব তৈরি করেছে।

উল্লেখ্য, এইচএমএম বিশ্বের অষ্টম শীর্ষ সমুদ্র পরিবহনকারী সংস্থা। আর হ্যাপাগ-লয়েড পঞ্চম। দক্ষিণ কোরিয়ার একমাত্র বৈশ্বিক কনটেইনার ক্যারিয়ার হিসেবে বাজার প্রতিযোগিতায় টিকে রয়েছে এইচএমএম।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here