৯ই সেপ্টেম্বর, ২০০১। গ্রীষ্মের শেষে এক রৌদ্রকরোজ্জ্বল সকাল। অন্যসব দিনের মতোই আলস্য ভেঙ্গে একটু একটু করে কর্মচঞ্চল হয়ে উঠছিলো ম্যানহাটন। আচমকা সকালের সেই নীরবতা ভেঙ্গে দিয়ে ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টারের উত্তর টাওয়ারে (৯৩ থেকে ৯৯ তলার মধ্যে) সজোরে আঘাত হানে একটি যাত্রীবাহী বোয়িং ৭৬৭ জেট বিমান। সময় তখন সকাল ৮টা বেজে ৪৬ মিনিট।
ম্যানহাটনবাসী ঘটনার ভয়াবহতা অনুধাবন করার আগেই সকাল ৯টা ৩ মিনিটে ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টারে দ্বিতীয় দফা হামলা চালানো হয়। যাত্রীবাহী বোয়িং ৭৬৭ বিমান এবার দক্ষিণ টাওয়ারে ৭৭ থেকে ৮৫ তলার মধ্যে আঘাত হানে। মুর্হমুহু বিমান হামলায় গোটা ম্যানহাটন জুড়ে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে।
হামলার দুই ঘন্টার মধ্যে ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টারের টুইন টাওয়ার্স এবং আরও একটি ৪৭ তলা ভবন পুরোপুরি ধ্বংস হয়ে গেলে বিস্তীর্ণ এলাকা ধুলোয় ডেকে যায়। সম্ভাব্য হামলার আশঙ্কায় দিক বিদিক ছুটতে থাকে হাজার হাজার মানুষ। নিরাপত্তার খাতিরে সাবওয়ে, টানেল, ব্রিজসহ স্থলপথে যোগাযোগের সকল পথ তাৎক্ষণিকভাবে বন্ধ করে দেওয়া হয়।
ভয়াবহ সেই সময়ে ম্যানহাটনবাসী বুঝতে পারে সমুদ্রপথ ছাড়া এই দ্বীপ থেকে বেরোনোর আর কোন বিকল্প তাদের কাছে নেই। প্রায় শত বছর পর সমুদ্রপথ আবারো একমাত্র যোগাযোগের মাধ্যমে পরিণত হয়। আতঙ্কগ্রস্থ অনেকে দ্বীপ থেকে বেরোনোর জন্য নৌযান না পেয়ে সাগরেই ঝাপিয়ে পড়েন।
ম্যানহাটন থেকে প্রায় ১৮ মাইল দূরে অবস্থিত স্ট্যাটন আইল্যান্ডে নিজ অফিসে বসে প্রথম বিমান হামলার ঘটনাটি দেখেন কোস্ট গার্ডের লেফটেন্যান্ট মাইকেল ডে। সেসময় একটা কথা প্রচলিত ছিলো যে, বোয়িং ৭০৭ বিমানও যদি টুইন টাওয়ারে আঘাত করে সেটা কাটিয়ে উঠার সক্ষমতা ভবনটির রয়েছে। এছাড়া এ ধরনের দুর্ঘটনায় কোস্ট গার্ডের তেমন কিছু করার নেই বলে গোটা বিষয়টিকে প্রথমে খুব একটা আমলে নেননি তিনি। তবে কাজের ফঁকে ফাঁকে টুইন টাওয়ার থেকে বেরিয়ে আসা ধোয়ার কুন্ডলি পর্যবেক্ষণ করছিলেন ডে। দ্বিতীয় বিমানটি আঘাত হানার পর দৃশ্যপট বদলাতে শুরু করে।
ভবন দুটি ধ্বসে পড়ায় গোটা এলাকা ধুলোর চাদরে ঢেকে যায়। পুরু ধুলোর কারনে পোতাশ্রয়ের কিছুই তখন কোস্ট গার্ডের রাডারে দেখা যাচ্ছিলো না। আতঙ্কগ্রস্থ লোকজনের ব্যাটারি পার্কে জড়ো হবার খবর পেয়ে ম্যানহাটনে যাবার সিদ্ধান্ত নেন ডে। নিকটবর্তী একটি ডক থেকে স্যান্ডি হুক পাইলট অ্যাসোসিয়েশনের কয়েকজন ক্রু এবং পাইলটকে সাথে নিয়ে লোয়ার ম্যানহাটনের উদ্দেশ্যে রওনা হন তিনি। সেসময় ডে ধারণাও করেননি যে, পরবর্তী কয়েক ঘন্টায় পৃথিবীর ইতিহাসে সমুদ্রপথে পরিচালিত সবচেয়ে বড় উদ্ধার অভিযানের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হতে যাচ্ছেন তিনি।
১৮৪ ফুট দীর্ঘ পাইলট শিপ নিউ ইর্য়ক নিয়ে ডে যখন ব্যাটারি পার্কে পৌঁছান ততক্ষণে অনেকগুলো জাহাজ উদ্ধার কার্যক্রম শুরু করে দিয়েছে। সার্বিক পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করে কোস্টগার্ডের পক্ষ থেকে রেডিওতে সাহায্যবার্তা প্রচারের সিদ্ধান্ত নেন তিনি। লোয়ার ম্যানহাটনের উদ্ধারকার্যে অংশগ্রহণের জন্য আশপাশে থাকা সকল নৌযানকে গর্ভনরস আইল্যান্ডে রিপোর্ট করার আহ্বান জানানো হয়। ১৫ থেকে ২০ মিনিটের মধ্যে নানা ধরনের, নানা আকারের নৌযান পোতাশ্রয়ে জড়ো হতে থাকে।
লঞ্চ, মাছ ধরা জাহাজ, পর্যটন জাহাজ, ক্রুজ শিপসহ নানা আকারের ১৩০টির বেশি নৌযান উদ্ধারকারী নৌবহরে যুক্ত হয়। সেসঙ্গে ৩৩টি ফেরি, ৫০টি টাগবোট এবং নিউইয়র্ক পুলিশ ডিপার্টমেন্ট, নিউইয়র্ক সিটি ফায়ার ডিপার্টমেন্ট ও কোস্ট গার্ডের অসংখ্য উদ্ধারকারী জাহাজ অভিযানে যুক্ত হয়।
উদ্ধার অভিযানে অংশ নেওয়া অ্যাম্বারজ্যাক ভিয়ের ক্যাপ্টেন ভিনসেন্ট আরদোলিনো বলেন, ‘টেলিভিশনে ঘটনাটা দেখে প্রথমে আমার মনে হচ্ছিলো হয়ত কোন সিনেমার দৃশ্য দেখছি। পরে খেয়াল করে দেখলাম টুইন টাওয়ারে হামলা চালানো হয়েছে। ভয়ে আতঙ্কে দিশেহারা মানুষ যেকোন উপায়ে তখন ম্যানহাটন ছাড়তে চাচ্ছেন। কিন্তু সমুদ্রপথ ছাড়া আর কোন যাতায়াতের রাস্তা খোলা নেই। মানুষের সেই চরম বিপদের মুহুর্তে আমার পক্ষে হাত পা গুটিয়ে বসে থাকা সম্ভব হয়নি।’ টেলিভিশনে অন্যান্য নৌযানকে উদ্ধারকার্যে অংশ গ্রহণ করতে দেখে আরদোলিনোও তাতে সামিল হন।
আরদালিনোর মতো সাধারণ নাবিক এবং জেলেরাই সেদিন সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিয়েছিলো। আটকা পড়া মানুষদের উদ্ধার করে ব্রুকলিন, স্ট্যাটন আইল্যান্ড এবং নিউ জার্সিতে পৌঁছে দেন তারা। ব্যাটারি পার্ক, পোতাশ্রয়, পিয়ার ১১ ও ওয়াল স্ট্রিট টার্মিনালে উদ্ধারকারী নৌযানগুলোর চলাচল নির্বিঘ্ন করতে ডে এবং স্যান্ডি হুকের পাইলটররা সেদিন ঘন্টার পর ঘন্টা ট্রাফিক পুলিশের দায়িত্ব পালন করেন।
অংশগ্রহণকারী জাহাজগুলো সেদিন নানা নিয়ম-কানুন ভেঙ্গে উদ্ধারকার্য পরিচালনা করেন। নাবিক থেকে শুরু করে স্বেচ্ছাসেবী এবং আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকরী বাহিনীর সদস্য সবাই সেদিন মানুষের প্রাণ রক্ষাকেই সবচেয়ে বেশি প্রাধান্য দিয়েছেন। তাদের নিরলস প্রচেষ্টায় মাত্র নয় ঘন্টায় প্রায় পাঁচ লক্ষ মানুষকে উদ্ধার করা হয়।
কোস্ট গার্ড ও অন্যান্য বাহিনীর সদস্যরা আহত নাগরিকদের দ্রুত চিকিৎসা সেবা নিশ্চিত করতে নিউ জার্সি, স্ট্যাটন আইল্যান্ড এবং অন্যান্য নিকটবর্তী স্থানে অ্যাম্বুলেন্সের ব্যবস্থা করেন। ডে জানান, আহতদের সেবা দিতে এলিস আইল্যান্ড সেদিন ৪০টির বেশি অ্যাম্বুলেন্স প্রস্তুত করে রেখেছিলো। ধীরে ধীরে লোয়ার ম্যানহাটন থেকে সকল নাগরিকদের সরিযে নেওয়ার পর বিকেল সাড়ে চারটার দিকে উদ্ধারকারী নৌযানে করে নিউ জার্সি থেকে প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র এবং উদ্ধারকারী দল ম্যানহাটনের আসতে শুরু করে।
সারাদিনের ক্লান্তিকর অভিযান শেষে সেদিন সন্ধ্যায় লেফটেন্যান্ট ডে এবং স্যান্ডি হুকের পাইলটেরা যখন প্রথমবারের মতো লোয়ার ম্যানহাটনে প্রবেশ করেন চারপাশের ধ্বংসযজ্ঞ তখন তাদের হতবিহ্বল করে দেয়। ছাইয়ে ঢাকা গোটা এলাকা তাদের কাছে অচেনা মনে হয়। ডে বলেন, সেদিন দিনভর আমরা কয়েক লাখ মানুষকে উদ্ধার করেছি কিন্তু সেই ধ্বংসস্তুপে পৌঁছানোর পর যেসব হতভাগ্য মানুষ সেদিন প্রাণ হারিয়েছেন তাদের হাহাকারটাই আমাদের তাড়িয়ে বেড়াচ্ছিলো।
সময়ের পরিক্রমায় ৯/১১ হামলার ২২ বছর পেরিয়ে গেলেও দুর্বিষহ সেই দিন এখনো মার্কিনীদের বুকে রক্তক্ষণ ঘটায়। প্রতি বছর এই দিনে হাজার হাজার মানুষ টুইন টাওয়ার হামলায় নিহত ২ হাজার ৭৬৩ জনের স্মরণে রাস্তায় নেমে আসেন। তাদের জন্য প্রার্থনার আয়োজন করেন।
তবে এত বছর পেরিয়ে গেলেও সেদিনের সেই মানবিক উদ্ধার অভিযান, সাধারণ মানুষের একে অপরকে সাহায্য করার আদিম প্রবৃত্তি, কোস্ট গার্ড ও অন্যান্য আইন শৃঙ্খলা বাহিনীর নিরলস পরিশ্রম এবং সর্বোপরি সম্ভাব্য হামলার ঝুঁকি নিয়ে সাধারণ নাবিক ও জেলেদের পরিচালিত সেই দুঃসাহসী কমর্যজ্ঞ অনেকটাই প্রচারের আলোর বাইরে রয়ে গেছে।
এখনো অনেকেই জানেন না যে, সমুদ্র পথে পরিচালিত বিশ্বের সবচেয়ে বড় উদ্ধার অভিযান কোন ধরনের আনুষ্ঠানিক পরিকল্পনা এবং কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণ ছাড়া স্বতঃস্ফূর্তভাবে পরিচালিত হয়েছিলো। একই দিনে সেদিন বিশ্ববাসী ঘৃণা ও ভালোবাসার এক অনন্য নির্দশন পরিলক্ষীত করে। তবে বরাবরেই মতো সেদিনও ভালোবাসা, মানবিকতাই জয়ী হয়। মানুষের প্রতি মানুষের সেই অকৃত্রিম ভালোবাসাই হাজার বছর ধরে পৃথিবীর বুকে মানব সভ্যতাকে টিকিয়ে রেখেছে।