২০১৯ সালের ডিসেম্বরে সর্বপ্রথম কোভিড-১৯ শনাক্ত হওয়ার পর পার হয়ে গিয়েছে এক বছরেরও অধিক সময়। এরই মধ্যে ইউরোপজুড়ে করোনার তৃতীয় ঢেউ আছড়ে পড়েছে। তবে বেশ কয়েক ধরনের টিকা বের হওয়ায় কিছুটা হলেও স্বস্তি দেখা দিয়েছে মানুষজনের মধ্যে। একমাত্র টিকার মাধ্যমেই সম্ভব কোভিড-১৯ কে পুরোপুরি নির্মূল করা। এর মধ্যেই বাংলাদেশ অগ্রাধিকারের ভিত্তিতে টিকা প্রদান শুরু করেছে। বাংলাদেশ সরকারের সময়োপযোগী ও দূরদর্শী সিদ্ধান্তে দ্রুততম সময়ে টিকা পাওয়া অবশ্যই আমাদের একটি বড় অর্জন। সেক্ষেত্রে আমাদের ভুলে গেলে চলবে না, গত বছর লকডাউনের মধ্যেও জীবনের ঝুঁকি নিয়ে বন্দরের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা বন্দর চালু রেখে দেশের অর্থনীতিকে সচল রেখেছেন। তাই সম্মুখ সারির মেরিটাইম কর্মী ও নাবিকদের সুরক্ষাকে আমাদের অগ্রাধিকার দিতে হবে। ইন্টারন্যাশনাল চেম্বার অব শিপিংও (আইসিএস) টিকা প্রদানের অপেক্ষমাণ তালিকায় নাবিক ও সম্মুখ সারির মেরিটাইম কর্মীদের অগ্রাধিকার দিতে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের সরকারগুলোর প্রতি আহ্বান জানিয়েছে।
বন্দর বলতেই আমাদের চোখে ভেসে ওঠে জাহাজ ভিড়িয়ে হরেক রকম পণ্য ওঠানো-নামানো। সেখান থেকে জাহাজে পণ্য নিয়ে দূর দেশে যাওয়া, কিংবা দূর দেশ থেকে পণ্য নিয়ে আসা। কিন্তু বর্তমান সময়ে এত সহজেই বন্দরকে সংজ্ঞায়িত করা যায় না। এখন বন্দর বলতে বহুমুখী বণ্টন ব্যবস্থার কেন্দ্রবিন্দুকে বোঝানো হয়, যেখানে হিন্টারল্যান্ড ও ফোরল্যান্ডের সাথে নৌ, সড়ক ও রেলপথের মাধ্যমে সরাসরি সংযোগ স্থাপন হয়। বন্দরকে ঘিরে গড়ে উঠেছে অর্থনৈতিক অঞ্চল, আঞ্চলিক বণ্টন কেন্দ্র ও সংরক্ষণাগার।
বন্দরের মাধ্যমেই বৈদেশিক বাণিজ্য পরিচালিত হলেও সেটি সম্পন্ন হয় বন্দরকেন্দ্রিক অনেকগুলো পক্ষের সক্রিয় অংশগ্রহণে। একটি গতিশীল বন্দর ব্যবস্থাপনায় বন্দরই একমাত্র পক্ষ নয়। পক্ষগুলোর প্রত্যেকেরই যেমন সুনির্দিষ্ট দায়িত্ব ও কাজ রয়েছে, একইভাবে কাজগুলো আবার একটি আরেকটির সাথে আন্তঃসম্পর্কিত। প্রত্যেক অংশীজন তাদের দায়িত্ব সঠিক ও সময়ানুগভাবে সম্পন্ন করলেই কেবল বন্দরের কার্যক্রম গতি পায়। বন্দর ব্যবস্থাপনা ও তার অংশীজনদের নিয়ে বিস্তারিত রয়েছে প্রধান রচনায়।
নানা প্রতিকূলতা পেরিয়ে চট্টগ্রাম বন্দর এগিয়ে চলেছে সামনের দিকে। করোনাকাল বাদ দিলে কয়েক বছর ধরে দুই অংকের প্রবৃদ্ধি হচ্ছে চট্টগ্রাম বন্দরের। ছয় বছরে কনটেইনার হ্যান্ডলিং দ্বিগুণের বেশি বাড়ার পেছনে ভূমিকা রেখেছে চট্টগ্রাম বন্দরের অব্যাহত সামর্থ্য বৃদ্ধি। প্রেক্ষিত পরিকল্পনা ২০৪১-এ নির্ধারিত অভীষ্টে পৌঁছতে হলে অর্থাৎ উন্নত দেশের কাতারে উন্নীত হতে গেলে বন্দরকে আরো বড় ভূমিকা রাখতে হবে। সেক্ষেত্রে চট্টগ্রাম বন্দরকে হতে হবে সাব-রিজিয়নাল ট্রান্সশিপমেন্ট হাব। বাংলাদেশকে যদি সাব-রিজিয়নাল হাব হিসেবে পরিণত করা যায়, তাহলে আমরা লায়াবিলিটিজকে অ্যাসেটে রূপান্তর করতে পারব। চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের নতুন চেয়ারম্যান রিয়ার এডমিরাল এম শাহজাহান বন্দরবার্তাকে দেওয়া বিশেষ সাক্ষাৎকারে এই কথাই বলেছেন।
অবস্থানগত কারণে বাংলাদেশের সামনে সুযোগ রয়েছে সাব-রিজিয়নাল হাব হওয়ার। সে লক্ষ্যে সহজে পণ্য পরিবহনের সুবিধার্থে বাংলাদেশের সাথে প্রতিবেশী নেপাল, ভুটান ও ভারতের নৌ, সড়ক, রেল ও আকাশ পথে নতুন নতুন রুট চালুসহ বিভিন্ন পরিকল্পনা গ্রহণ ও বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। উদ্বোধনের অপেক্ষায় আছে ভারত-বাংলাদেশ মৈত্রী সেতু-১। এর ফলে ভারতের ত্রিপুরা ও বাংলাদেশের চট্টগ্রামের মধ্যে সরাসরি সংযোগ স্থাপিত হবে। দেশগুলোর মধ্যে আঞ্চলিক সংযুক্তি বৃদ্ধির অনেকগুলো উদ্যোগ সরকারগুলোর শীর্ষ পর্যায়ে আলোচনাধীন। আমরা আশা করি, এই উদ্যোগুলো দ্রুত বাস্তবায়নের মাধ্যমে এই অঞ্চলের জনগণের অর্থনৈতিক উন্নয়ন ত্বরান্বিত করা সম্ভব হবে।
প্রিয় পাঠক, নতুন বন্দর অধিনায়কের নেতৃত্বে চট্টগ্রাম বন্দর করোনাকালীন প্রতিকূলতা কাটিয়ে আরো অনেক অর্জন নিয়ে আসবে বলেই আমাদের বিশ্বাস। এই ভাষার মাসে বাংলা ভাষায় মেরিটাইম চর্চার প্রসারে বন্দরবার্তা তার স্বীয় লক্ষ্য অর্জনে অঙ্গীকারবদ্ধ। ২০৪১ লক্ষ্যমাত্রা পূরণে মেরিটাইম খাত থেকে সর্বোচ্চ প্রবৃদ্ধি আনার লক্ষ্যে বিপুল সংখ্যক জনশক্তিকে মেরিটাইম বিষয়ে দক্ষ করে তুলতে মাতৃভাষায় মেরিটাইম চর্চার বিকল্প নেই। আপনাদের মূল্যবান মতামত ও অংশগ্রহণের ভিত্তিতে, বৈচিত্র্যময় আঙ্গিকে, সমৃদ্ধ কলেবরে বন্দরবার্তার পথচলা বাংলাদেশের মেরিটাইম খাতের বিকাশে আরো সহায়ক হবে।