আমাদের জাতীয় জীবনে এক অনন্য বছর ২০২১- একই সাথে এটি মুজিব জন্মশতবার্ষিকী এবং বাংলাদেশের সুবর্ণজয়ন্তীর বছর। জাতির পিতার নেতৃত্বে দীর্ঘ নয় মাসের এক রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের মধ্য দিয়ে আমরা যখন ১৯৭১ এ স্বাধীনতা অর্জন করি, ততদিনে বাংলাদেশকে এক ধ্বংসস্তূপে পরিণত করেছে পাকিস্তান বাহিনী, ভেঙে পড়েছে অর্থনীতির পরিকাঠামো। স্বাধীনতা অর্জিত হলেও বাস্তবতার নিরিখে এ রকম একটি দেশের টিকে থাকার ব্যাপারে অনেকেই ছিলেন সন্দিহান। আমাদেরকে পরিহাস করা হয়েছে তলাবিহীন ঝুড়ি বলে। সে সময় দৃঢ়হাতে সকল প্রতিকূলতা সামাল দিয়েছেন বঙ্গবন্ধু। বঙ্গবন্ধুর হাতে জন্ম নেওয়া বাংলাদেশ আজ পঞ্চাশে পড়েছে, আর এই মাহেন্দ্রক্ষণে দেশের নেতৃত্ব এখন তাঁরই সুযোগ্য কন্যা মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার হাতে। বাংলাদেশ আজ আর তলাবিহীন ঝুড়ি নয়, এশিয়ার উদীয়মান বাঘ। ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরাম (ডব্লিউইএফ) ২০১৭ সালে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে এমনটাই জানিয়েছে। এর আগে ২০১৪ সালে ফরাসি আর্থিক ও বীমা প্রতিষ্ঠান কোফেসের ১০টি উদীয়মান অর্থনীতির দেশের তালিকায় ঠাঁই পায় বাংলাদেশ। সম্প্রতি ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল এক প্রতিবেদনে লিখেছে, বাংলাদেশের অর্থনীতি এখন দক্ষিণ এশিয়ার সবচেয়ে তেজি ষাঁড়। ৫০ বছরের ব্যবধানে বাংলাদেশের অর্থনীতির ক্ষমতা বেড়েছে ২৭১ গুণ, আর মাথাপিছু আয় বেড়েছে ৩০১ গুণ। চলতি বাজারমূল্যের হিসাবে বাংলাদেশ এখন বিশে^র ৩৫তম বৃহৎ অর্থনীতি! কমপক্ষে ১৩টি খাতে বিশে^র শীর্ষ দশের তালিকায় রয়েছি আমরা। উন্নয়নশীল দেশের তকমা পেতে প্রয়োজনীয় সবগুলো সূচকেই অনেকখানি এগিয়ে রয়েছে বাংলাদেশ। সবকিছু ঠিক থাকলে ২০২৬ সালেই উন্নয়নশীল দেশ হিসেবে উত্তরণ ঘটতে যাচ্ছে বাংলাদেশের। অর্থনীতিতে গত ৫০ বছরে বাংলাদেশের এই বদলে যাওয়া নিয়েই রয়েছে বন্দরবার্তার এই সুবর্ণজয়ন্তী সংখ্যার প্রধান রচনা।
বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নের এক গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার চট্টগ্রাম বন্দর। সমুদ্রপথে হওয়া বাংলাদেশের বাণিজ্যের প্রায় ৯২ শতাংশই হয়ে থাকে চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে। তাই চট্টগ্রাম হলো বাংলাদেশের বাণিজ্যের প্রবেশদ্বার। স্বাভাবিক নিয়মেই এই ৫০ বছরে বন্দরকেও বদলে যেতে হয়েছে প্রতিনিয়ত। বাংলাদেশের অর্থনীতির সাথে তাল মেলাতে ক্রমান্বয়ে সক্ষমতা বাড়াচ্ছে বন্দর। সম্প্রসারিত হয়েছে বন্দরের ক্ষেত্র ও কার্যক্রম। বন্দর কতখানি বদলে গেছে তা সাম্প্রতিক বছরগুলোর মর্যাদাপূর্ণ লয়েডস লিস্টের বিশে^র ব্যস্ততম বন্দরের তালিকা দেখলেই বোঝা যাবে। গত এক দশকে বন্দরের অবস্থান ৩০ ধাপ এগিয়ে ৫৮-তে পৌঁছেছে। কিন্তু স্বাধীনতার পর বন্দরের শুরুটা হয়েছিল একেবারে শূন্য থেকে, পাকিস্তানি বাহিনীর ফেলে রাখা অজ¯্র মাইন এবং ধ্বংসপ্রাপ্ত জাহাজের কারণে বন্দর ছিল একেবারেই ব্যবহার অনুপযোগী। এভাবে বন্দর অব্যবহৃত পড়ে থাকলে দেশের অর্থনীতি তো ঘুরে দাঁড়াতে পারতই না, বরং দুর্ভিক্ষ ছিল আসন্ন। এখানেও বঙ্গবন্ধু দেখালেন তাঁর ক্যারিশমাটিক কূটনৈতিক প্রজ্ঞা। ১৯৭২ সালের মার্চের প্রথম সপ্তাহে তিনি সোভিয়েত ইউনিয়ন সফর করেন এবং দ্রুততম সময়ে বন্ধুরাষ্ট্রটিকে রাজি করিয়ে ফেললেন, একদম বিনা পারিশ্রমিকে বন্দরকে ধ্বংসপ্রাপ্ত জাহাজ ও মাইনমুক্ত করতে। ১৯৭২ সালের ২১ মার্চ ৯ সদস্যের একটি সোভিয়েত প্রতিনিধি দল ঢাকায় আসে এবং ৩৪ ঘণ্টা আলোচনার পর বাংলাদেশ ও সোভিয়েত ইউনিয়নের মধ্যে পরদিনই এ সংক্রান্ত একটি আনুষ্ঠানিক চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। রিয়ার এডমিরাল জুয়েনকোর নেতৃত্বে এপ্রিলের ৩ তারিখ থেকেই খুব কঠিন ও ঝুঁকিপূর্ণ পরিস্থিতিতে চট্টগ্রাম বন্দরে মাইন ও বিধ্বস্ত জাহাজ অপসারণের কাজ শুরু হয়। ধাপে ধাপে এই উদ্ধারকারী দলে আসা ৮০০ সদস্যের ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় মাত্র চার মাসে আনুষ্ঠানিকভাবে সচল হয় চট্টগ্রাম বন্দর এবং দুই বছর তিন মাসে হয় সম্পূর্ণ ব্যবহার উপযোগী। এ সময়ে তাঁরা মোট এক লাখ টন ধারণক্ষমতাসম্পন্ন ২৬টি জাহাজ উত্তোলন এবং বঙ্গোপসাগরের জলসীমায় বন্দরসংলগ্ন এক হাজার বর্গকিলোমিটার এলাকার মাইন অপসারণ করে। এত স্বল্প সময়ে এই সাফল্য ছিল অভাবিত। এটা শুধু বাংলাদেশ নয়, বরং পৃথিবীর ইতিহাসেই কোনো বন্দর থেকে এত সংখ্যক মাইন ও ধ্বংসপ্রাপ্ত জাহাজ অপসারণের এক অনবদ্য কাহিনী হয়ে আছে। বন্দর থেকে ধ্বংসপ্রাপ্ত জাহাজ ও মাইন অপসারণের আদ্যোপান্ত থাকছে এবারের বিশেষ রচনায়।
প্রিয় পাঠক, বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবার্ষিকী এবং বাংলাদেশের সুবর্ণজয়ন্তীতে সবাইকে জানাচ্ছি শুভকামনা। ৫০ বছরের অভিযাত্রায় বাংলাদেশ উন্নয়নের যে মহাসড়কে দুর্বার গতিতে এগিয়ে চলেছে, সেই গতিপ্রবাহ অব্যাহত রাখতে নিশ্চিতভাবেই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে মেরিটাইম খাত। তাই মাতৃভাষায় মেরিটাইম চর্চাকে আরও জনমুখী করার বিকল্প নেই। গত পাঁচ বছর ধরে বন্দরবার্তা সেই কাজটিই করে যাচ্ছে। আরও কলেবরে এবং বৈচিত্র্যময় আঙ্গিকে ভবিষ্যতেও বন্দরবার্তা তার পদচারণা জারি রাখবে-এই প্রত্যাশা।