অ্যান্টার্কটিকা। বিশ্বের শেষ বুনো এলাকা। যুক্তরাষ্ট্র এবং ইউরোপের যুক্ত আয়তনের সমান। রহস্য উন্মোচন করা মানুষের সবচেয়ে প্রাচীন নেশা। পৃথিবীব্যাপী বহুকালের লক্ষ অভিযানের পর সেই নেশা চরিতার্থ করতে অবশিষ্ট আছে কেবল এই একটি জায়গা। কিন্তু আমাদের খেয়াল-খুশিমতো অ্যাডভেঞ্চার আর বাণিজ্যের নেশায় আজ অস্তিত্বের সংকটে পড়েছে অ্যান্টার্কটিকা।
১২টা দেশের সরকার একত্রিত হয়ে সেই ৬০ বছর আগে একটা চুক্তি স্বাক্ষর করেছিল, যার পোশাকি নাম অ্যান্টার্কটিকা ট্রিটি। যে চুক্তির উদ্দেশ্য ছিল এই এলাকায় নির্দিষ্ট বৈজ্ঞানিক গবেষণা ছাড়া আর সব ধরনের বাণিজ্যিক অ্যাক্টিভিটি নিষিদ্ধ করা। কিন্তু তারপর সাগর-মহাসাগরে বয়ে গিয়েছে বহু পানি। যুগ বদলেছে, বাণিজ্যের বিশ্বায়ন হয়েছে। প্রবৃদ্ধি মানেই কেবল আর্থিক উন্নয়ন, অনৈতিক এবং অযৌক্তিক এ ধারণা বেশ শক্তপোক্তভাবে প্রতিষ্ঠা পেয়েছে। যদিও টেকসই প্রবৃদ্ধির ক্ষেত্রে একথা একেবারেই খাটে না। দুঃজনক হলেও বিশ্বায়নের হাত থেকে বাদ যায় নি অ্যান্টার্কটিকাও। বর্তমানে সাউদার্ন ওশেনের কেবল ৫ শতাংশ এলাকা মেরিন প্রোটেক্টেড এরিয়া হিসেবে বিবেচিত। জীববৈচিত্র্যে অত্যন্ত সমৃদ্ধ অ্যান্টার্কটিকা তাই অনেকটাই অরক্ষিত। বিশেষ করে রুক্ষ মহাদেশের সর্ব উত্তরে অবস্থিত পশ্চিম অ্যান্টার্কটিক পেনিনসুলার বায়োডাইভার্সিটি অত্যন্ত হুমকির মুখে আছে। বাণিজ্যিক ক্রিল ফিশিং, পর্যটন, গবেষণাগার প্রতিষ্ঠা এবং বৈশ্বিক উষ্ণায়নের ফলে বিলুপ্ত হতে বসেছে মেরিন ইকোলজির সূতিকাগার।
অরক্ষিত উপদ্বীপ
শুধু মেরিন ইকোসিস্টেম নয়, বৈশ্বিক খাদ্যশৃঙ্খল নিরবচ্ছিন্ন রাখতে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে চলেছে অ্যান্টার্কটিকা। শুধু কি জীববৈচিত্র্য? অকল্পনীয় শক্তিশালী, অত্যন্ত ডায়নামিক ওয়েদার অ্যান্ড অ্যাটমোসফরিক মেশিনের হৃৎপি- বলা হয় অ্যান্টার্কটিকাকে, যেগুলো গর্জনশীল চল্লিশ দ্রাঘিমায় ওঠা ঝড়গুলোয় এনার্জি তৈরি করে। যে মেশিন কোনো আণবিক বিস্ফোরণের চেয়ে অনেক বেশি শক্তির জন্ম দেয়। সৌরজগতের তৃতীয় গ্রহটির জলবায়ু এবং মহাসাগরীয় স্রোতধারা নিয়ন্ত্রণ করে সাউদার্ন ওশেন। বিশ্বের পানযোগ্য ৭০ শতাংশ পানিই বরফ হয়ে জমা আছে এ মহাদেশে।
অথচ গ্রিনহাউস অ্যাফেক্টের ফলে যে হারে তাপমাত্রা বাড়ছে, এ পরিবর্তন সবার আগে ধাক্কা দিয়েছে অ্যান্টার্কটিকাকে। গলে যাচ্ছে প্রাগৈতিহাসিক কাল থেকে জমা থাকা মূল্যবান বরফ, অনন্য প্রাণিলের বসবাসের অযোগ্য হয়ে পড়েছে দিন দিন। এ বছর ফেব্রুয়ারিতে রেকর্ড ২০ দশমিক ৭৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসে উঠেছে এখানকার তাপমাত্রা, রেকর্ডবুক চালুর পর থেকে অ্যান্টার্কটিকায় এটিই ছিল উষ্ণতম গ্রীষ্ম। সহজে গমনযোগ্য হওয়ায় চোখ ধাঁধানো প্রাকৃতিক সৌন্দর্য, বন্য প্রাণীদের অবাধ বিচরণ এবং সমৃদ্ধ ইকোসিস্টেম দেখতে প্রতি বছরই হাজার হাজার পর্যটক আসেন এখানে। ওদিকে ক্রমবর্ধমান সংখ্যায় ট্যুরিস্টদের স্কুবা গিয়ার, ফেলে আসা বর্জ্যরে কারণে মেরিন ইকোসিস্টেম ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। ২০১৯ সালে ৭৪ হাজার এর কিছু বেশি ক্রুজ শিপ ভ্রমণ প্যাকেজ পরিচালনা করেছে এ পেনিনসুলায়, দশ বছর আগেও যার সংখ্যা ছিল মাত্র ৩৩ হাজার।
অ্যান্টার্কটিক উপদ্বীপে এখন পর্যন্ত ১৮টি দেশ রিসার্চ স্টেশন নির্মাণ করেছে। ১৯টি স্থায়ী এবং ৩০টি মৌসুমি রিসার্চ স্টেশন রয়েছে এখানে। বিজ্ঞানী-গবেষকদের জন্য আধুনিক ল্যাবরেটরি, উপযুক্ত বাসস্থান, সড়ক, ফুয়েল স্টোরেজ এবং উড়োজাহাজ-হেলিকপ্টার অবতরণের জন্য রানওয়ে নির্মাণ করার ফলে এ পেনিনসুলা হয়ে উঠেছে মহাদেশের সবচেয়ে ঘনবসতিপূর্ণ এলাকা। এতে বাস্তুচ্যুত হয়েছে হাজারের বেশি প্রজাতির লাখ লাখ প্রাণী। আর ক্রিল। অ্যান্টার্কটিক ফুড চেইনের ভিত্তি ক্রিল নিল তিমি থেকে শুরু করে সকল প্রজাতির শিশু মাছ, স্কুইড, সিল, পেঙ্গুইনের প্রধান খাদ্য। সংখ্যায় লাখ লাখ, কোটি কোটি ক্রিল ঝাঁক বেঁধে চলে। ছোট চিংড়ির মতো দেখতে শেল-ফিশ ক্রিলকে বলা হয় কর্নারস্টোন ফুড ফর এভরি লিভিং থিং ইন সাউদার্ন ওশেন। মৎস্য খামারের জন্য ফিশমিল এবং ডায়েটারি সাপ্লিমেন্ট হিসেবে মানবদেহের জন্য অতি প্রয়োজনীয় ওমেগা-৩ এর সবচেয়ে সস্তা এবং প্রাকৃতিক উৎস। ২০০০ সালে যেখানে বার্ষিক মোট ৮৮ হাজার ৮০০ টন ক্রিল শিকার হয়েছিল, ২০১৯ সাল শেষে মাত্র ৯ বছরে এ সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৪ লাখ টনে। অথচ ক্রিলের বৃহত্তম চারণভূমি অ্যান্টার্কটিক পেনিনসুলা এখন দক্ষিণ সাগরের সবচেয়ে কোলাহলপূর্ণ স্থান। সমুদ্রে ভাসমান বরফের স্তর যত পাতলা হচ্ছে, সমানুপাতে ফিশিং ভেসেলের সংখ্যাও বাড়ছে। বাড়াচ্ছে মেরুর উত্তাপ, মনুষ্যসৃষ্ট বর্জ্য, শব্দ। ক্রিলের আধিক্যের কারণে নিল তিমির ব্রিডিং গ্রাউন্ড হিসেবে বহুকাল ধরে বিখ্যাত অ্যান্টার্কটিকার পানি। পৃথিবীর বৃহত্তম প্রাণীর তকমার পাশাপাশি সমুদ্রের সবচেয়ে লাভজনক শিকার হলো নিল তিমি। অথচ মানুষের জন্য লোভনীয় খাদ্য হিসেবে অবাধে চলছে অপরিণত ক্রিল শিকার। ফলে ইতিমধ্যেই বিপন্ন প্রাণীর তালিকায় নাম লেখানো নিল তিমি এখন রয়েছে গণবিলুপ্তির পথে। গত ৩০ বছরে অ্যান্টার্কটিকায় আডেলি এবং চিনস্ট্র্যাপ জাতের পেঙ্গুইনের সংখ্যা অর্ধেকের বেশি কমেছে। যার মূল কারণ অতিরিক্ত ক্রিল শিকার এবং সমুদ্রে ভাসমান বরফ কমে যাওয়া।
বাঁচাতেই হবে দক্ষিণকে
অ্যান্টার্কটিক পেনিনসুলাকে বাঁচানোর প্রধান উপায় কেবল দুটি। যেকোনো মূল্যে এখানকার বরফশীতল পানিকে সংরক্ষণ এবং ক্রিলের সুরক্ষা। বাণিজ্যিকভাবে মৎস্য আহরণ বন্ধ করে গোটা উপদ্বীপকে মেরিন প্রোটেকটেড এরিয়া (এমপিএ) ঘোষণা ও কঠোরভাবে কার্যকর করা ছাড়া অ্যান্টার্কটিকাকে রক্ষার কোনো বিকল্প নেই। শীতলতম মহাদেশের ৬ লাখ ৭০ হাজার বর্গকিলোমিটার এলাকাজুড়ে এমপিএ ঘোষণা করতে ২০১৮ সালে প্রথম প্রস্তাব উঠলেও সাউদার্ন ওশেন নিয়ন্ত্রণকারী প্রতিষ্ঠান দ্য কনজারভেশন অব অ্যান্টার্কটিক মেরিন লিভিং রিসোর্সেস এখনো এ-সংক্রান্ত কোনো নীতিমালা অনুমোদন দেয়নি। ইউরোপিয়ান ইউনিয়নভুক্ত দেশসমূহ এবং আরও ২৫ দেশের সমন্বয়ে গড়ে উঠেছে এ কমিশন। প্রস্তাবনা অনুযায়ী দুই অংশে বিভক্ত এমপিএ’র ৬০ শতাংশ জুড়ে থাকবে জেনারেল প্রোটেকশন জোন। যেখানে সামুদ্রিক প্রাণীর অভয়াঞ্চল এবং বিশেষায়িত ইকোসিস্টেম সংরক্ষণে সকল প্রকার ফিশিং নিষিদ্ধ থাকবে। অপর ৪০ শতাংশ থাকবে ক্রিল ফিশারি জোন হিসেবে, যেখানে সীমিত আকারে ক্রিল ও অন্যান্য সামুদ্রিক সম্পদ আহরণের সুযোগ থাকবে। অনুমোদনের পর পরবর্তী ৭০ বছরের জন্য বলবৎ থাকবে অ্যান্টার্কটিকার এমপিএ। এ ছাড়া পূর্ব আটলান্টিক এবং ওয়েডেল সি রক্ষায় আরও দুটি গুরুত্বপূর্ণ এমপিএ গঠনের প্রস্তাবনা কমিশনের পরবর্তী সভার আলোচ্যসূচিতে অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।