এশিয়ার চতুর্থ বৃহত্তম অর্থনীতির দেশ দক্ষিণ কোরিয়ার রাজধানী সিউলের ৪০ কিলোমিটার দক্ষিণ-পশ্চিমে হান নদীর তীরে গড়ে উঠেছে দেশটির দ্বিতীয় বৃহত্তম বন্দর ইনচন। মূলত শিল্পাঞ্চল হওয়ায় বাণিজ্যিকভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ইনচন বন্দরকে গোটা একটি প্রদেশের মর্যাদা ও সুযোগ-সুবিধা দিয়েছে দক্ষিণ কোরিয়া। মানচিত্রে সিউল মেট্রোপলিটন এলাকায় অবস্থিত হলেও লয়েডস লিস্টে কনটেইনার বন্দর হিসেবে ৫৭তম স্থানে থাকা ইনচন বন্দরের প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ তাই কেন্দ্রীয় সরকারের হাতে।
১৮৮৩ সালে ইনচন বন্দরের আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরু। ১৯১০ সালে ইনচন যুদ্ধে জয়ের মাধ্যমে এ বন্দর দখল করে নেয় জাপান। ১৯৪৫ সালে দ্বিতীয় বিশ^যুদ্ধ শেষ হওয়া পর্যন্ত জাপানি দখলে থাকা ইনচনে এরপর ঘাঁটি গাড়ে মার্কিন নেতৃত্বাধীন মিত্রশক্তি। তিন বছর পর আনুষ্ঠানিকভাবে এ বন্দরের নিয়ন্ত্রণ কোরিয়ার হাতে তুলে দেয় যুক্তরাষ্ট্র। পরবর্তী সময়ে বিশেষ করে বিশ শতকে ব্যাপক পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে গিয়েছে ইনচন। বৈদেশিক বিনিয়োগ আকর্ষণে অবকাঠামোগত সংস্কারের পাশাপাশি কোরিয়ার প্রথম মুক্ত বাণিজ্য অঞ্চল গড়ে উঠেছে এখানে। বর্তমানে কনটেইনার, গাড়ি, নির্মাণসামগ্রী, বস্ত্র, ভারী যন্ত্র আমদানি-রপ্তানির হাব হয়ে উঠেছে ইনচন।
২০২০ সালে বার্ষিক কনটেইনার হ্যান্ডলিংয়ের পরিমাণ ৩.২৭ মিলিয়ন টিইইউ ছাড়িয়ে যাওয়া ইনচন বন্দরকে প্রশাসনিক কাজের সুবিধার্থে বেশ কয়েকটি ভাগে ভাগ করা হয়েছে। বন্দরের লক গেটের ভেতরের অংশে তুলনামূলক শান্ত পানিতে আছে মাল্টি-পারপাস পিয়ারসমৃদ্ধ ইনার পোর্ট। ৪৬ বার্থের ইনার পোর্ট ১৯৭৪ সালে কোরিয়ার প্রথম কনটেইনার পিয়ার হিসেবে কাজ শুরু করে। কনটেইনার ছাড়াও গাড়ি, শস্য, জেনারেল কার্গোও হ্যান্ডল করা হয় এখানে।
সাউথ পোর্টের তিনটি কনটেইনার বার্থে ৪ হাজার টিইইউ ধারণক্ষমতাসম্পন্ন জাহাজের পাশাপাশি বাল্ক পণ্যের জন্য চারটি জেনারেল বার্থ রয়েছে। সাউথ পোর্টে ছোট ও মাঝারি আকারের, মূলত কোস্টাল কার্গো শিপগুলোকে সেবা দেওয়া হয়। শিল্পকারখানার জন্য বিশেষায়িত করা হয়েছে ইনচনের নর্থ পোর্টকে। ১৭টি বার্থে ওঠানামা করানো কাঠ, ইস্পাত, পশুখাদ্য এখানকার প্রধান আমদানি-রপ্তানি পণ্য।
উত্তর-পূর্ব এশিয়ার সাথে সংযোগের কাজ করে ইনচন নিউ পোর্ট। সর্বাধুনিক অবকাঠামোসমৃদ্ধ একটি কনটেইনার পিয়ার ও ছয়টি বার্থের মাধ্যমে ১২ হাজার টিইইউ পর্যন্ত জাহাজকে সেবা দেওয়া হয় এখানে। ক্রুড অয়েল, রিফাইনড অয়েল এবং রাসায়নিক তরল ওঠানামা করানোর জন্য নর্থ পোর্টের অয়েল ডলফিন জেটিতে আছে ছয়টি বার্থ, যেখানে ৫ থেকে ২০০ টন ধারণক্ষমতার ট্যাংকার হ্যান্ডল করা হয়। সাউথ পোর্টের দুই ডলফিন জেটিতে আকরিক তেলের পাশাপাশি এলপিজি বহনকারী জাহাজকেও সার্ভিস দেওয়া হয়। বন্দরের এ অংশের কোল পিয়ারে কয়লা ও আকরিক তেল দুইটাই হ্যান্ডলিং হয়।
প্রথম সারির বেশির ভাগ বন্দরের মতো প্যাসেঞ্জার টার্মিনাল হিসেবেও দিন দিন জনপ্রিয় হয়ে উঠছে এ বন্দর। ইনচন ইন্টারন্যাশনাল ফেরি টার্মিনালের দুটি টার্মিনাল থেকে নয়টি শিপিং কোম্পানি উত্তর চীনের অন্তত দশটি বড় শহরে যাত্রী এবং পণ্য পারাপার করে। বেশকিছু ক্রুজ লাইনারও তাদের ভ্রমণ প্যাকেজ পরিচালনা করে এখানে, ফলে বৈশি^ক মেরিটাইম ট্যুরিজম প্ল্যাটফর্ম হিসেবে নৌ-পর্যটন খাতে ইনচনের গুরুত্ব বৃদ্ধি পাচ্ছে।
কোরিয়ার ব্যস্ততম বন্দর বুসানের ওপর চাপ কমিয়ে বন্দর হিসেবে ইনচনকে আরও শক্তিশালী করে তুলতে ব্যাপক উন্নয়ন পরিকল্পনা নিয়েছে দেশটির সরকার। আড়াই ট্রিলিয়ন কোরিয়ান ইউয়ান ব্যয়ে ২.১ মিলিয়ন টিইইউ কার্গো অ্যান্ড কনটেইনার হ্যান্ডলিং সক্ষমতার ইনচন নিউ পোর্ট স্টেজ ওয়ান ডেভেলপমেন্ট প্রজেক্টের নির্মাণকাজ প্রায় শেষ। ইনচন বন্দরের সাথে চীন এবং সিউল মেট্রোপলিটনের ট্রাফিক বৃদ্ধিতে মাইলফলক হতে যাচ্ছে এ প্রকল্প। গড়ে উঠছে ইন্টারন্যাশনাল প্যাসেঞ্জার টার্মিনাল, যেখানে ৮ বার্থে ২ লাখ ২৫ হাজার টন পর্যন্ত ডেডওয়েট টনের ক্রুজ শিপ এবং কার ক্যারিয়ার পরিচালনা করা হবে। ইয়েলো সি আঞ্চলিক বাণিজ্যকেন্দ্র হিসেবে দেশের হিন্টারল্যান্ডের সাথে সংযোগ বৃদ্ধিতেও মনোযোগ দিচ্ছে ইনচন।