জীবনসঙ্গিনীর হাতে হাত রেখে যে তারিখে বিয়ের ম-পে পা রাখার কথা ছিল, সেদিন ব্রাজিলের সান্তোস বন্দরে জাহাজ ডকিং করাচ্ছিলেন আসল নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ফিলিপাইনের অ্যাসিস্ট্যান্ট ইঞ্জিনিয়ার আলোনা (ছদ্মনাম)। টানা ১৬ মাস প্রায় কোনো ছুটির দিন ছাড়া একই জাহাজে দায়িত্ব পালন করে চলেছেন তিনি, মাটিতে পা রাখার চেষ্টা ব্যর্থ হয়েছে তিনবার। সঙ্গী আরও ৯ নাবিকের অবস্থাও তথৈবচ। মানসিক অবসাদে ভারাক্রান্ত দেহ চলতে চায় না, নিজেদের মধ্যে রাগারাগি-বিশৃঙ্খলা বাড়ছে, মনোবল-কর্মস্পৃহা শূন্যের কোটায়। সমুদ্রমানবরা বাড়ি ফিরতে চায়।
কিন্তু কেন এ পরিণতি?
বিশ্ব বাণিজ্য ব্যবস্থার চালিকাশক্তি হলো নৌপরিবহন খাত। আমদানি-রপ্তানিতে জাহাজে মালামাল পাঠানোর চেয়ে সহজ ও সাশ্রয়ী অপর কোনো বিকল্প নেই। আন্তর্জাতিক পণ্য পরিবহনের ৮০ শতাংশই হয় সমুদ্রপথে, এ তথ্য দিয়েছে জাতিসংঘের বৈশ্বিক উন্নয়ন ও বাণিজ্যবিষয়ক সংস্থা আঙ্কটাড। কিন্তু বর্তমানে নভেল করোনাভাইরাসের সংক্রমণজনিত পরিস্থিতিতে বিভিন্ন দেশে ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞা ও চলাচলে সীমাবদ্ধতা আরোপের বিষয়টি এখন নৌপথে পণ্য পরিবহনে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। এর কারণে নাবিকরা জাহাজ থেকে নামতেও পারছেন না, নিজ দেশে ফিরতেও পারছেন না। আবার যারা ঘরে আটকা, তারাও জাহাজে আরোহণের জন্য নিকটবর্তী বন্দরে যেতে পারছেন না। প্রয়োজনীয় এন্ট্রি বা এক্সিট ভিসা সংগ্রহ করতে পারছেন না অনেক নাবিক। উপরন্তু উড়োজাহাজের বাণিজ্যিক ফ্লাইট বন্ধ থাকায় এ সমস্যা হয়ে উঠছে জটিলতর।
বিশ্বব্যাপী বাণিজ্যিক সমুদ্রযান প্রায় ৯৬ হাজার। এসব জাহাজের নাবিক সংখ্যা প্রায় ১৮ লাখ, যাদের এক-পঞ্চমাংশেরও বেশি এখন আটকা পড়ে আছে জাহাজ বা বাড়িতে। তীরে এসেও তরী থেকে নামতে পারছে না অন্তত ৪ লাখ নাবিক। কোভিড-১৯ সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কায় বিমাতাসুলভ আচরণ করছে বন্দরগুলো। অনেক দেশই নাবিক পরিবর্তন নিষিদ্ধ করেছে, পুরো প্রক্রিয়াকে অত্যন্ত কঠোর করে তুলেছে বাদবাকি রাষ্ট্রগুলো।
নিয়ম অনুযায়ী, একজন নাবিক সাগরে টানা অবস্থান করতে পারবেন সর্বোচ্চ ১১ মাস। কিন্তু অনেকেই সাগরে অবস্থান করছেন ১৬ মাসেরও বেশি সময় ধরে। এদের অনেকেই এখন বিপজ্জনকভাবে ক্লান্ত হয়ে পড়েছেন। এছাড়া অবসন্ন নাবিকদের নিয়ে জাহাজ চালানো হলে ক্যাপ্টেনদেরই ফৌজদারি অপরাধে দোষী সাব্যস্ত করা হতে পারে। মাসের পর মাস সমুদ্রযাত্রার ধকল এবং বাড়ি ফিরতে না পারার মানসিক চাপ প্রভাব ফেলতে শুরু করেছে তাদের মধ্যে। শ্রমিক ইউনিয়নগুলোর মতে, আধুনিক যুগে এসেও মধ্যযুগীয় দাসপ্রথার মতো অমানবিক আচরণের শিকার হচ্ছেন নাবিকেরা। পরিস্থিতি দিন দিন নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাচ্ছে বলে নাবিক বিদ্রোহের আশঙ্কা করছে শিপিং কোম্পানিগুলো।
সীমা পেরিয়ে যাচ্ছে ক্ষয়ক্ষতি
অতিসম্প্রতি ৯২৬ জন নাবিকের ওপর বিবিসি’র সহায়তায় একটি জরিপ চালিয়েছে নাবিকদের সবচেয়ে বড় আন্তর্জাতিক সংগঠন ইন্টারন্যাশনাল ট্রান্সপোর্ট ওয়ার্কার্স ফেডারেশন (আইটিএফ)। দেখা গেছে, অংশগ্রহণকারী ৫৯ শতাংশ নাবিকের চুক্তি বর্ধিত করা হয়েছে ক্রু চেঞ্জের ব্যবস্থা করতে না পেরে। ২৬ শতাংশ নাবিক আইনে বেঁধে দেওয়া সময়সীমার চেয়ে বেশি সময় ধরে টানা কাজ করে চলেছে, যার মধ্যে অনেকেই ১৮ মাস পার করে ফেলেছে। চুক্তির সময়সীমা পেরিয়ে গেলে আইনত যদিও কাজ বন্ধ করে দেওয়ার স্বাধীনতা রয়েছে একজন নাবিকের, সৌভাগ্যবশত কোনো জাহাজে একজন সমুদ্রমানবও এ কাজ করেনি, অন্তত ২০২০ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত। ফিলিপিনো আলোনার মতে, ‘স্থলভাগ থেকে বহুদূরে সমুদ্রের মধ্যিখানে যদি জাহাজ ডুবে যায় বা অপর কোনো দুর্ঘটনায় পতিত হয়, তা মানবজীবনকে ভয়ংকরভাবে প্রভাবিত করবে। নিজ দায়িত্বে অবহেলার ফলে যদি তা ঘটে, সেটি একজন নাবিকের জন্য চরম গ্লানিকর। তাই আমি নিজের কাজটা পছন্দ করি আর নাই করি, জাহাজকে সচল রাখতেই হবে।’
আইটিএফের জরিপে নাবিকদের জিজ্ঞেস করা হয়েছিল, দীর্ঘ সমুদ্রযাত্রাজনিত অবসাদের ফলে মানুষের জীবন, সম্পত্তি বা সামুদ্রিক পরিবেশের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ আকস্মিক দুর্ঘটনা ঘটে যাওয়ার সম্ভাবনা দশের মধ্যে কত বলে মনে করে তারা। পাঁচ বা তার বেশির পক্ষে মত দিয়েছে ৭১ শতাংশ নাবিক, ১৫ শতাংশ বলেছে এ সম্ভাবনা দশে দশ। ঠিকমতো বেতন পাচ্ছে না ৮ শতাংশ এবং যথাযথ চিকিৎসাসেবা পায়নি ৩০ শতাংশ। দাঁত ব্যথায় ডাক্তার দেখাতে পারেনি বলে প্লায়ার্স দিয়ে টেনে দাঁত তুলে ফেলেছে নাবিকেরা, গত কয়েক মাসে এমন বেশকিছু ঘটনার রেকর্ড রয়েছে হংকং শিপওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের কাছে।
রাশিয়ান নাবিক অ্যালেক্সেভ কুলিবাবার ঘটনা ফলাও করে প্রচার করেছিল আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম। মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণ বা স্ট্রোক করার পরও কোভিড-১৯ জনিত নিষেধাজ্ঞার অজুহাতে তাকে জরুরি চিকিৎসাসেবা, ইমার্জেন্সি ইভ্যাকুয়েশন কিছুই দিতে অস্বীকৃতি জানায় ইন্দোনেশিয়া। বর্তমানে তার শরীর ঠিকমতো কাজ করে না, দৈনন্দিন কাজের জন্য অপরের ওপর নির্ভর করতে হয়। অথচ সময়মতো চিকিৎসাসহায়তা পেলে এ পরিণতি এড়ানো যেত।
লজিস্টিকের গোলকধাঁধায়
যুক্তরাষ্ট্রের আটলান্টিক উপকূলের কেপ হেনরি বহির্নোঙরে অপেক্ষমাণ থাকার সময় আলোনাদের ১৯০ মিটার দীর্ঘ রক সল্ট বোঝাই বাল্ক ক্যারিয়ারে নাবিকদের মধ্যে খুশির গুঞ্জন চলছিল। তাঁদের ম্যানিং এজেন্সি শেষ পর্যন্ত বাড়ি ফেরার সব বন্দোবস্ত করে ফেলেছে। কিন্তু চীন, কোরিয়া এবং চিলিতে একই প্রক্রিয়া ব্যর্থ হতে দেখে খুব একটা আশাবাদী হতে পারেনি আলোনা। অ্যাংকরেজ থেকে বন্দরে প্রবেশের পরই খারাপ সংবাদ। সময়মতো পেপারওয়ার্ক শেষ না করায় আর ফ্লাইট বাতিলের কারণে ম্যানিলা থেকে রিপ্লেসমেন্ট ক্রু না আসায় বাড়ি ফেরা হচ্ছে না এবারও।
ক্রু চেঞ্জ প্রক্রিয়াতে এমনিতেই অনেক বেশি পেপারওয়ার্ক থাকায় পুরো ব্যাপারটি বেশ সময়সাপেক্ষ। মহামারির কারণে সাথে যোগ হয়েছে ভ্রমণজনিত নিষেধাজ্ঞা। কম ফ্লাইট চলাচল, হরহামেশা বিনা নোটিশে উড়ান বাতিলের কারণে দেশ ছাড়তে পারছে না ডাঙায় আটকে থাকা নাবিকেরা। আবার কোভিড-১৯ এর সাথে লড়াইয়ে নিত্যনতুন বিধান আরোপ করছে বন্দরগুলো। বিভিন্ন বন্দরের ব্যবস্থা আবার ভিন্ন ভিন্ন। অল্প সময়ের জন্য বন্দরে আসা জাহাজগুলোর পক্ষে সেসব নিয়মকানুন সঠিকভাবে মেনে চলাটা মুশকিলের কাজ। ম্যানিং এজেন্সিগুলো অনেক সময় ইচ্ছাকৃতভাবে পেপারওয়ার্কে দেরি করে এই আশায় যে, পরের বন্দর হয়তো সাশ্রয়ী হবে বা সেখানকার ফ্লাইট হয়তো কম মূল্যে পাওয়া যাবে। আর এসব কিছুর মাশুল দিতে হচ্ছে আলোনার মতো সিফেয়ারারদের।

নরক দর্শন
স্থলের বেশির ভাগ শ্রমিকের তুলনায় নাবিকদের মজুরি ভালো। কিন্তু বেশি পারিশ্রমিকের মূল্য চুকাতে হয় দীর্ঘ সময় ঘর-পরিবার-প্রিয়জনদের কাছ থেকে দূরে থেকে। নাবিকের চাকরি করে তরুণ থাকতে থাকতে অনেক অর্থ উপার্জন করতে চান আলোনা। এরপর কোনো ব্যবসা শুরু করবেন এই ইঞ্জিনিয়ার, যাতে আর সমুদ্রে ফিরতে না হয়। ১৬ মাস ধরে টানা সমুদ্রে থেকে মনে হয় অনন্তকাল বুঝি প্রিয়তমা হবু বধূর মুখখানি দেখা হয়নি তার, পা ফেলা হয়নি মাটির পৃথিবীতে। দীর্ঘ সময় টিনের প্রক্রিয়াজাত খাবার খেতে বাধ্য হওয়ায় শারীরিকভাবেও ভেঙে পড়ছেন তারা।
অবশ্য ব্রাজিলে পৌঁছেই সুসংবাদ। ফিলিপাইন থেকে অবশেষে রওনা হতে পেরেছে রিপ্লেসমেন্ট ক্রু। ব্রাজিলে আসার পর কোভিড টেস্টও যদি নেগেটিভ হয়, আলোনা এবং তার সঙ্গীরা শেষ পর্যন্ত বাড়ির পথ ধরতে পারবে।
সবাই বাধা সবার সাথে
মহামারির মধ্যেও বৈশ্বিক অর্থনীতিকে চালু রাখতে নিরন্তর অমানুষিক পরিশ্রম করে চলেছে নাবিকেরা। কিন্তু এটি কখনই একপক্ষীয় কোনো কাজ নয়। ১৯০টি দেশে কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়া বহুজাতিক প্রতিষ্ঠান ইউনিলিভারের কথাই ধরা যাক। ৭০টি দেশে ছড়িয়ে আছে তাদের কারখানা। তাই কোভিড-১৯ প্রাদুর্ভাবের প্রথমদিকে যখন চীন লকডাউনে ছিল, অন্য দেশে উৎপাদন চালিয়ে গেছে প্রতিষ্ঠানটি। পরে যখন ইউরোপ আর ভারত কঠোর লকডাউনে, চীনে আবার বাণিজ্য শুরু করে তারা। পরিকল্পনা বদলালেও ব্যবসা থামেনি আর শিপিং ছাড়া এর কিছুই সম্ভব হতো না। কারণ সাবান বা আইসক্রিম-যা-ই তৈরি করুন না কেন, কাঁচামাল হিসেবে যে কোকোবীজ, সয়াবিন তেল, ভ্যানিলা এবং পামতেল প্রয়োজন, তা আসে বিশে^র বিভিন্ন প্রান্ত থেকে। এই অবস্থায় যেসব নাবিক ইতোমধ্যেই বাণিজ্যিক জাহাজে দীর্ঘদিন ধরে কাজ করতে বাধ্য হচ্ছে, তাদের সিংহভাগ ধর্মঘট করে বসতে পারে। নাবিকেরা যেন নির্বিঘেœ বাড়ি ফিরতে পারে, তা নিশ্চিতে প্রয়োজনীয় সকল আইনি পদক্ষেপ নেওয়ার কথা জানিয়েছে আইটিএফ। দক্ষ নাবিকেরা আইনি উদ্যোগ নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিলে ইতিমধ্যেই মন্দায় আচ্ছন্ন বিশ্ব অর্থনীতির জন্য এ পদক্ষেপ ঘোর সংকটের সূচনা করতে পারে।
গত জুনে সমুদ্রযাত্রায় অস্বীকৃতি জানায় জার্মান মালিকানাধীন একটি ট্যাংকার। এ বিষয়ে ট্যাংকার কর্তৃপক্ষের বক্তব্য হলো, পর্যাপ্ত সংখ্যক ক্রু ও নাবিক প্রতিস্থাপনের আগ পর্যন্ত কোনোভাবেই সাগরে যাত্রা করবে না জাহাজটি। ক্লান্ত-পরিশ্রান্ত নাবিক ও ক্রু নিয়ে অনিরাপদ চলাচলের শঙ্কা দূর করতে কঠোর অবস্থান বেছে নিয়েছে ট্যাংকারটি। মেরিটাইম খাতসংশ্লিষ্টদের আশঙ্কা, সমুদ্র বাণিজ্যের সাথে যুক্ত অন্যান্য জাহাজও ট্যাংকারটিকে অনুসরণ করতে পারে।
চাই জোরালো পদক্ষেপ
ইন্টারন্যাশনাল মেরিটাইম অর্গানাইজেশনের (আইএমও) পক্ষ থেকে গত মাসে নিরাপদে জাহাজের নাবিক পরিবর্তন-সংক্রান্ত ১২ দফাসংবলিত একটি প্রটোকল প্রকাশ করা হয়। কিন্তু বিভিন্ন দেশের সরকার এসব পদক্ষেপ বাস্তবায়নে দেরি করায় বর্তমানে প্রতি সপ্তাহেই সাগরে আটকা পড়া নাবিকের সংখ্যা বাড়ছে। গত মার্চে বৈশ্বিক পণ্য সরবরাহ অক্ষুন্নে রাখার স্বার্থে শিপিং কোম্পানি এবং ইউনিয়নগুলো এক সমঝোতার মাধ্যমে ১৬ জুন পর্যন্ত নাবিক পরিবর্তনের কার্যক্রম বন্ধ রেখেছিল। কিন্তু সেটি ছিল একটি বড়, বৈশ্বিক সমস্যার স্বল্পমেয়াদি সমাধান। ইন্টারন্যাশনাল ট্রান্সপোর্ট ওয়ার্কার্স ফেডারেশনের মহাসচিব স্টিভ কটন এ প্রসঙ্গে বলেন, নাবিকদের সাগরে আটকে রাখতে ১৬ জুনের পর এ বন্দোবস্তের মেয়াদ কোনোভাবেই বাড়ানো সম্ভব নয়। তারা এরই মধ্যে চুক্তির বাইরে দীর্ঘ সময় ধরে সাগরে অবস্থান করেছেন। আমরা নাবিকদের বলব না, তাদের জাহাজে থাকতে হবে। বরং তারা যদি বের হয়ে আসতে চায়, আমরা তাদের সহায়তা করব।
ভেসে চলেছেন বাংলাদেশীরাও
সরকারি সমুদ্র পরিবহন অফিসের তথ্যানুযায়ী, বাংলাদেশের প্রায় চার হাজার নাবিক ও স্টাফ বিভিন্ন দেশের জাহাজে আটকা পড়ে আছে। আকাশপথের পরিবহন সচল না হলে অনিশ্চয়তা আরও বাড়বে তাঁদের পরিবারে। বাংলাদেশ শিপিং করপোরেশনের (বিএসসি) ৬টি জাহাজের ১৫৬ জন নাবিক, অফিসার ও স্টাফ বিভিন্ন দেশে আটকা পড়ে আছে। আকাশপথ সচল না হওয়া পর্যন্ত তাদের জাহাজে থাকার নির্দেশ দিয়েছে বিএসসি কর্তৃপক্ষ। আন্তর্জাতিকভাবে যখন দক্ষ নাবিকের সংকট দেখা দিয়েছে, তখন চুক্তি নবায়নের মাধ্যমে বাংলাদেশি অনেক নাবিক এখন সেই শূন্যস্থান পূরণ করতে পারে। কিন্তু তাদেরকেও পরিবার রেখে দূরে থেকে দীর্ঘ সমুদ্রযাত্রার ধকল সইতে হবে। যাদের অনেকেই গত ৬ মাসের বেশি সময় ধরে সমুদ্রে আছে।
বর্তমান পরিস্থিতিতে সরকারগুলোর প্রতি আহ্বান জানিয়ে সংশ্লিষ্টরা দাবি তুলেছেন, বাণিজ্যিক জাহাজগুলোর নাবিকদের জন্য ‘নিরাপদ করিডোর’ স্থাপন করা হোক। একই সঙ্গে সমুদ্রগামী নাবিকদের অর্থনীতির ‘অপরিহার্য কর্মী’ স্বীকৃতি দিয়ে সমুদ্রযানে কাজে যোগদান বা সেখান থেকে ফেরার ক্ষেত্রে মুক্তভাবে চলাচলের সুযোগ দেওয়ারও আহ্বান জানিয়েছেন তারা। পাশাপাশি দাপ্তরিক নথিপত্রকে পরিচয়ের প্রামাণিক দলিল বিবেচনায় নিয়ে বিমানবন্দরগুলোয় নাবিকদের নিরাপদ ট্রানজিট নেওয়ার সুযোগ তৈরিরও দাবি তুলেছেন আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক নৌপরিবহন বিশেষজ্ঞরা।
এক্ষেত্রে সিঙ্গাপুরকে মডেল হিসেবে দেখা যেতে পারে। ২০২০ সালের মার্চ থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত ৪০ হাজারের বেশি ক্রু চেঞ্জ হয়েছে এখানে। সকল নাবিক ২ সপ্তাহের আবশ্যিক আইসোলেশন পার করে অনুমোদিত স্বাস্থ্যকেন্দ্র থেকে কোভিড টেস্ট করিয়ে নেগেটিভ আসার পর সিঙ্গাপুরে প্রবেশ করছে। অন বোর্ড হওয়ার আগে অন্তত ৭২ ঘণ্টা বন্দরে স্থাপিত ভাসমান আইসোলেশন সেন্টারে অবস্থান করে তারা জাহাজে উঠছে। শীর্ষস্থানীয় অন্য বন্দরগুলোও এ পদ্ধতি অনুসরণ করতে চলেছে।
আশা করা যায় অচিরেই এ অমানবিক পরিস্থিতির অবসান ঘটবে, আলোনার মতো সমুদ্রমানবেরা ফিরে যাবে প্রিয়জনের কাছে।