কার্বন নিঃসরণ কমানোর দাবি দিন দিন জোরালো হচ্ছে। এক্ষেত্রে বিকল্প রয়েছে তিনটি- বিদ্যুৎ চালিত যন্ত্র ও যানবাহন ব্যবহার, জীবাশ্ম জ্বালানির পরিবর্তে জৈবজ্বালানির ব্যবহার, অথবা কার্বন ক্যাপচার অ্যান্ড স্টোরেজ (সিসিএস) পদ্ধতির প্রয়োগ ঘটানো। গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরণ কমানোর ক্রমবর্ধমান চাহিদার কারণে সাম্প্রতিক বছরগুলোয় সিসিএস নিয়ে গবেষণায় গতি এসেছে।
অস্তিত্বের সংকটে আছে পৃথিবী, এ কথা অস্বীকার করার কোনো উপায় নেই। বছর বছর লাফিয়ে বাড়ছে বায়ুম-লে ক্ষতিকর গ্যাসের পরিমাণ, দিন দিন খারাপ হচ্ছে জলবায়ু পরিস্থিতি। টিকে থাকার তাড়নায় আসছে নতুন সমাধান, নয়া প্রযুক্তি। সকল উদ্ভাবনের মধ্যে আজ পর্যন্ত সবচেয়ে সম্ভাবনাময় হিসেবে বিশ্বজুড়ে ইতিমধ্যেই প্রতিষ্ঠা পেয়েছে কার্বন ক্যাপচার অ্যান্ড স্টোরেজ বা সিসিএস প্রযুক্তি। খুব প্রচলিত না হলেও যুগান্তকারী এ প্রযুক্তির প্রসারে বিশ্বব্যাপী বেশ কিছু মেগা প্রকল্প হাতে নেওয়া হচ্ছে। ব্যাপক ব্যবহার শুরু করা গেলে ধরিত্রী রক্ষায় আগামী দিনে এটি হয়ে উঠতে পারে সর্বোত্তম হাতিয়ার।
কী এই কার্বন ক্যাপচার অ্যান্ড স্টোরেজ
বেশ জটিল কৌশলবিশিষ্ট সিসিএসের পেছনের যুক্তিটা কিন্তু সহজ। গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরণ বন্ধে নানা উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে, যা বাস্তবায়িত হতে গিয়ে অপচয় হয়ে যাচ্ছে মূল্যবান সময়। অথচ ততদিনে বিপৎসীমার অনেক ওপরে চলে যাচ্ছি আমরা। পরিবেশে নতুন কার্বন যোগ হওয়া বন্ধের পাশাপাশি তাই পুরোনো কার্বন সরিয়ে যথাযথ উপায়ে সংরক্ষণ করাও সমান জরুরি।
কার্বন ক্যাপচার মূলত এমন একটি প্রযুক্তি, যেখানে জ্বালানি পোড়ানোর পর নিঃসৃত গ্যাস থেকে কার্বন ডাই-অক্সাইড ছেঁকে আলাদা করে নিয়ে কয়লা সিম, অ্যাকুইফার, ক্ষয়ে যাওয়া কিংবা খালি তেল বা গ্যাস রিজারভয়ার অথবা বৃহৎ কোনো সংরক্ষণ পাত্রে নিয়ে সমুদ্রতলদেশে বা ভূপৃষ্ঠের গভীরে পুঁতে ফেলা হয়। সংরক্ষণের জন্য কার্বন ডাই-অক্সাইড যেমন কোনো শিল্পকারখানার নিঃসরণ থেকে সংগ্রহ করা যেতে পারে, তেমনই মুক্ত বায়ুম-ল থেকেও ধরা যাচ্ছে কার্বন। জীবাশ্ম জ্বালানি দহনের ফলে উৎপন্ন এবং ইতিমধ্যেই বায়ু-লে বিরাজমান ৯০ শতাংশ কার্বন ডাই-অক্সাইড এ প্রযুক্তির মাধ্যমে কমিয়ে ফেলা সম্ভব।
সিসিএসের তিনটি পর্যায় রয়েছে-
১. কার্বন ডাই-অক্সাইড সংগ্রহ
২. সংগৃহীত কার্বন ডাই-অক্সাইড উপযুক্ত স্থানে পরিবহন
৩. পরিত্যক্ত তেল বা গ্যাস খনি অথবা গভীর সমুদ্রে ডিপ স্যালাইন অ্যাকুইফার নির্মাণ করে আহরিত কার্বন ডাই-অক্সাইডকে নিরাপদে সংরক্ষণ
কার্বন ক্যাপচার প্রযুক্তিতে বিদ্যুৎ উৎপাদন বা শিল্পকারখানা থেকে নির্গত গ্যাস থেকে প্রথমে কার্বন ডাই-অক্সাইডকে আলাদা করে নেওয়া হয়। কারখানার পরিত্যক্ত গ্যাস নিঃসরণকারী টানেলে ক্যাপচারিং যন্ত্র বসানো হলে প্রায় ৮০ শতাংশ কার্বন ডাই-অক্সাইডকে বায়ু-লে অবমুক্ত করা থেকে আটকানো যায়। সংগৃহীত কার্বন ডাই-অক্সাইড পাইপলাইনের মাধ্যমে জাহাজ বা ট্রাকে করে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া হয়। ফাঁদ পেতে কার্বন ধরা ছাড়াও শিল্প খাতে ব্যবহারের জন্য বছরে মিলিয়ন টন কার্বন ডাই-অক্সাইড রোড ট্যাংকার, জাহাজ এবং পাইপলাইনের সাহায্যে পরিবহন করা হচ্ছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র তো চার দশক ধরেই নিরাপদে কার্বন ডাই-অক্সাইড পরিবহন করে আসছে। শিল্পকারখানায় ব্যবহারযোগ্য কার্বন ডাই-অক্সাইডের সাথে কার্বন ক্যাপচারিং অ্যান্ড স্টোরেজ প্রযুক্তিতে কার্বন পরিবহনের পার্থক্যটা হলো, সাপ্লাই চেইনের শেষ প্রান্তে কোনো কারখানা থাকে না। ভূপৃষ্ঠের কয়েক কিলোমিটার গভীরে শিলাস্তরের পানিপূর্ণ ফাঁকা জায়গা অর্থাৎ কোনো অ্যাকুইফারে জমা রাখা হয় জীবের মৌলিক একক বা ‘বিল্ডিং ব্লক’ হিসেবে পরিচিত পর্যায় সারণির ষষ্ঠ মৌলটিকে।
কানাডার ক্যালগারি বিশ^বিদ্যালয়ের একদল গবেষক গ্রিনহাউস গ্যাসবন্দী ও মজুত করার আরও কার্যকর পদ্ধতি উদ্ভাবনের চেষ্টা করছেন। এ লক্ষ্যে তাঁদের ছয় বছরের একটি প্রকল্পে দেশটির প্রকৃতিবিজ্ঞান ও প্রকৌশল পরিষদ সম্প্রতি ১৬ লাখ ডলারের তহবিল দিয়েছে। কার্বন ক্যাপচার, ইউটিলাইজেশন অ্যান্ড স্টোরেজ অর্থাৎ সিসিইউএস নিয়ে ইউরোপীয় ইউনিয়নসহ বিশে^র ২৪টি দেশ একসঙ্গে কাজ করছে। যার মূল উদ্দেশ্য, পরিবেশ থেকে কার্বন কমিয়ে ক্লিন এনার্জি উদ্ভাবন। আমাদের প্রতিবেশী দেশ ভারতও এ উদ্যোগের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার।
শিপিংয়ে সিসিএসের ভূমিকা
গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরণের অন্যতম কারিগর হিসেবে বহুকাল ধরেই শিপিং খাতকে দায়ী করা হয়েছে। অতি প্রয়োজনীয় এই ইন্ডাস্ট্রি থেকে কার্বন ফুটপ্রিন্ট কমাতে তাই কয়েক বছর ধরে জোরেশোরে বিভিন্ন উদ্যোগ গ্রহণ ও বাস্তবায়ন শুরু করেছে শিপিংয়ের অভিভাবক সংস্থা আইএমও। ২০০৮ সালের তুলনায় কার্বন নিঃসরণ অন্তত ৫০ শতাংশ কমাতে বিভিন্ন পদক্ষেপ নিচ্ছে এর সদস্য দেশগুলো। প্রচলিত পেট্রোকেমিক্যালের পরিবর্তে বিকল্প জ্বালানি, তুলনামূলক ধীরে জাহাজ চালনা করছে বেশির ভাগ জাহাজ মালিক সংস্থা। কিন্তু শিপিংকে ডিকার্বনাইজ করতে সবচেয়ে কার্যকর পদ্ধতি হিসেবে কার্বন স্টোরেজের পক্ষেই মত দিয়েছেন বিশ্লেষকরা। সম্প্রতি জাপান শিপ টেকনোলজি রিসার্চ অ্যাসোসিয়েশন এবং নিপ্পন ফাউন্ডেশন পরিচালিত এক যৌথ গবেষণায় দেখা গেছে, জাহাজ থেকে কার্বন নিঃসরণ ৮৫ থেকে ৯০ শতাংশ পর্যন্ত কমাতে পারে অনবোর্ড ক্যাপচার সিস্টেম। অবশ্য ফাঁদ পেতে ধরা সেই কার্বনের ওজন মোট ফুয়েলের চেয়ে প্রায় চার গুণ ভারী হবে বলে গন্তব্যে পৌঁছাতে হলে জাহাজে আরও বেশি প্রপালশন তথা জ্বালানি প্রয়োজন হবে।
অবশ্য এভাবে কার্বন ডাই-অক্সাইডের হাত থেকে অনেকখানি মুক্ত হওয়া গেলেও অন্যান্য গ্রিনহাউস গ্যাস নিয়ে ঝুঁকি থেকে যায়। লোডিং এবং ব্যবহারের আগে রাসায়নিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে ফুয়েল থেকে সালফার এবং নাইট্রেট আলাদা করা হলে আইএমও নির্ধারিত ৫০ শতাংশ কম গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরণের লক্ষ্যমাত্রা পূরণ অনেকখানি সহজ হয়ে যাবে।
পরিবেশ এবং বায়ুম-মলে ইতিমধ্যেই জমে থাকা ক্ষতিকর এবং উষ্ণায়ন ঘটানো গ্যাস সংগ্রহ করে পৃথিবীকে ডিকার্বনাইজ করার যুগান্তকারী প্রযুক্তি নিয়ে বৈশ্বিক নৌপরিবহন শিল্পে বেশকিছু প্রকল্প চলমান আছে। এনওয়াইকে, সভকমফ্লোট, নুটসেন ওএএস, আর্ডমোর এবং ডেইউ শিপবিল্ডিং অ্যান্ড মেরিন ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের মতো বৃহৎ শিপিং কোম্পানি একত্রে গড়ে তুলেছে মেরিটাইম ডেভেলপমেন্ট সেন্টার। ‘ডিকার্বনআইস’ নামক
প্রকল্পের অধীনে অনবোর্ড কার্বন ক্যাপচার অ্যান্ড স্টোরেজ প্রযুক্তির উন্নয়নে কাজ করছে সংস্থাটি। ২০১৯ সালের অক্টোবরে যাত্রা করা প্রকল্পটির লক্ষ্য এর সম্ভাব্যতা যাচাই এবং আইএমওর অনুমোদনপ্রাপ্তির লক্ষ্যে পেপারওয়ার্ক প্রক্রিয়া শুরু করা। মূলত নবনির্মিত জাহাজে এ প্রযুক্তি বসানো নিয়ে কাজ করবে ডিকার্বনআইস। তবে বর্তমানে চলমান জাহাজসমূহে রেট্রোফিটিং পদ্ধতি অনুসরণ করে ক্যাপচার সিস্টেম ইনস্টল করা যায় কিনা, সেটিও যাচাই করবে এ প্রকল্প।
মিৎসুবিশির নেতৃত্বে জাহাজে কার্বন ক্যাপচার প্রযুক্তি নিয়ে কাজ শুরুর ঘোষণা দিয়েছে কে লাইন এবং ক্লাসএনকে। মেরিটাইম খাত থেকে ডিকার্বনাইজেশনে লক্ষণীয় পরিবর্তন আনতে শীঘ্রই এ প্রযুক্তির পরীক্ষামূলক ব্যবহার শুরু করতে যাচ্ছে জাপানি টেকনোলজি টাইকুন প্রতিষ্ঠানটি। কার্বন ডাই-অক্সাইড গ্যাস নিঃসরণ অন্তত ৯০ শতাংশ কমাতে সক্ষম মিৎসুবিশির এই প্রযুক্তি জাহাজের এগজস্ট পাইপ থেকে ধরে ফেলা কার্বন দিয়ে নতুন ফুয়েল উৎপাদনের কাঁচামালও তৈরি করতে সক্ষম হবে। মূলত অনশোর পাওয়ার প্ল্যান্টে কর্মক্ষম কার্বন ডাই-অক্সাইড ক্যাপচার সিস্টেমকে মেরিন পরিবেশে তথা অনবোর্ড জাহাজে ব্যবহার উপযোগী করে তুলছে মিৎসুবিশি। দুই বছরের গবেষণা, উন্নয়ন এবং পরীক্ষামূলক পরিচালন শেষে ২০২১ সালের মাঝামাঝি সময়ে কে লাইনের মালিকানাধীন জাহাজে টেস্ট ইউনিট স্থাপনের মাধ্যমে পুরো প্রযুক্তিটি সাধারণের মধ্যে ব্যবহারের উপযোগী হয়ে উঠবে, আশাবাদ মিৎসুবিশি কর্তৃপক্ষের।
শিপিং ইন্ডাস্ট্রিতে কার্বন ক্যাপচার প্রযুক্তি নিয়ে কাজ করতে বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় অয়েল অ্যান্ড গ্যাস কোম্পানিগুলোর জোট দ্য অয়েল অ্যান্ড গ্যাস ইনিশিয়েটিভের (ওজিসিআই) সাথে যুক্ত হয়েছে ট্যাংকার প্রতিষ্ঠান স্টেনা বাল্ক। স্টেনা বাল্কের ইনফ্রাস্ট্রাকচার, শিপিং রিসোর্স, নেভাল ইঞ্জিনিয়ারিং জ্ঞান ব্যবহার করে কার্বন ডাই-অক্সাইড মজুত ও হ্যান্ডল প্রকল্পে অর্থায়ন করবে ওজিসিআই। এর আগে স্টেনা বাল্কের সাথে একত্রে হেভি-ডিউটি ট্রাক ব্যবহার করে পৃথকভাবে অনবোর্ড কার্বন ক্যাপচারের সফল পরীক্ষা চালিয়েছিল সংস্থার প্রভাবশালী সদস্য প্রতিষ্ঠান আরামকো।
সবচেয়ে কার্যকর ও যোগ্যতম কার্বন ক্যাপচার ইউনিট উদ্ভাবন ও ইনস্টলেশন প্রকল্পে ১০০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার অনুদান প্রদানের ঘোষণা দিয়েছেন স্পেসএক্স ও টেসলার মতো বিখ্যাত প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের শীর্ষ ব্যক্তিত্ব এলন মাস্ক।

আছে মুদ্রার অপর পিঠও
কার্বন স্টোরেজ প্রযুক্তির সুবিধা অনেক। এমনকি অনেক বিশেষজ্ঞের মতে, আকরিক জ্বালানি থেকে সৌর বা বায়ুবিদ্যুতের মতো নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে পরিবর্তনের চাইতে ব্যয়সাশ্রয়ী হবে এ প্রযুক্তি। কিন্তু যেমনটা মিৎসুবিশি হিসাব করেছে, প্রতিটি ভেরি লার্জ কনটেইনার ক্যারিয়ারে (ভিএলসিসি) কার্বন ক্যাপচার সিস্টেম বসাতে আপাতত খরচ পড়বে গড়ে ৪৫ মিলিয়ন মার্কিন ডলার। জাহাজ নির্মাণ ব্যয় বেড়ে যাওয়াটাই একমাত্র সমস্যা না। সংগৃহীত বিপুল পরিমাণ কার্বন এবং এর ওজন সামলানোটাও একটা চ্যালেঞ্জ। ভূমিতে যে পদ্ধতিতে কার্বন ট্রিটমেন্ট করা হচ্ছে, মোটামুটি সে সিস্টেমই অনবোর্ড জাহাজের জন্য ধরে রাখছে মিৎসুবিশির কার্বন ক্যাপচার প্রকল্প। যন্ত্রসহ সংগৃহীত কার্বনের ওজন হবে ৪ হাজার ৫০০ টনের বেশি বা ভেসেলের মোট ডেড ওয়েট টনের প্রায় ২ শতাংশ। একটি গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার হলো, কার্বন ক্যাপচার সিস্টেম কিন্তু এখনো শতভাগ কার্যকর কোনো ব্যবস্থা না। সবচেয়ে উন্নত সিস্টেমের ক্যাপচার রেট এখনো ৮৬ থেকে ৯০ শতাংশ। নিশ্চিতভাবেই আগামীতে এর কর্মক্ষমতা আরও বাড়বে। তবে শূন্য কার্বন নিঃসরণ আশা করে জাহাজে এটি ইনস্টল করলে এই মুহূর্তে আশাহত হতে হবে।
তলদেশে মজুত করা কার্বন ডাই-অক্সাইড কোনোভাবে লিক করে সমুদ্রে অবমুক্ত হয়ে গেলে ঠিক কী ঘটে, তা জানতে বিজ্ঞানীরা গবেষণা চালাচ্ছেন ইতালির কাছে এয়োলিয়ান দ্বীপপুঞ্জে। অগ্ন্যুৎপাতের ফলে সৃষ্ট এই দ্বীপমালার নিচে বিশাল পরিমাণ প্রাকৃতিক কার্বন ডাই-অক্সাইড জমা রয়েছে। ফলে গবেষণার জন্য এই জায়গাটিকে আদর্শ বলা চলে। সমুদ্রবিজ্ঞানী সিনসিয়া দে ভিটর বলেন, ‘এখানকার জীবজগৎ দীর্ঘকাল ধরে এই পরিবেশের সঙ্গে
নিজেদের মানিয়ে নিয়েছে। এখানে কার্বন ডাই-অক্সাইড প্রায়ই প্রাকৃতিক কারণে বেরিয়ে পড়ে। ফলে অন্যান্য এলাকার তুলনায় এখানে পিএইচ-এর মাত্রা কম।’
অফশোরে তেল ও জ্বালানির ভরপুর মজুত আছে উত্তর সাগরে। এখানকার তলদেশ থেকে তেল উত্তোলনের পর সেখানে বহু বছর ধরে কার্বন ডাই-অক্সাইড মজুত করেছে নরওয়ে। বর্তমানে উদ্ভাবিত নতুন প্রযুক্তির মাধ্যমে লিকের ঝুঁকি ও তার সম্ভাব্য প্রভাব আগেভাগেই নির্ণয় করা সম্ভব।
ভারমুক্ত হবে পৃথিবী
আইএমওর নির্দেশনা অনুযায়ী বাণিজ্যিক জাহাজে ভেরি লো সালফার ফুয়েল বাধ্যতামূলক ব্যবহার শুরু হয়েছে। জনপ্রিয় হয়ে উঠছে এলএনজি। বায়োফুয়েল, ইলেকট্রো ফুয়েলের মতো অপ্রচলিত জ্বালানিচালিত জাহাজ দাপিয়ে বেড়াচ্ছে সাগরে। এসব ফুয়েলের প্রাপ্যতা ও ব্যবহার বাড়ছে প্রতিদিন। ফলে আগামী দিনে এসব প্রযুক্তির কল্যাণে শিপিংয়ে গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরণ হবে আগের চেয়ে অনেক কম। স্থলে বহু আগে থেকে প্রচলিত কার্বন ক্যাপচার অ্যান্ড স্টোরেজ প্রযুক্তিকে যথাযথভাবে পরিবর্তন করে জাহাজে ব্যবহার শুরু করা গেলে আর কুড়ি বছর নাগাদ কার্বন নিউট্রাল তো বটেই, কার্বন নেগেটিভ হয়ে উঠতে যাচ্ছে শিপিং ইন্ডাস্ট্রি, এ আশাবাদ এখন আর দূর কল্পনা নয়।

সাম্প্রতিক বছরগুলোয় অস্বাভাবিকভাবে উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে উত্তর মেরু। গত বছরের জুনে তো আর্কটিক সার্কেলের উত্তরাঞ্চলের তাপমাত্রা ৩৮ ডিগ্রি সেলসিয়াসে উন্নীত হয়, যা ইতিহাসের সর্বোচ্চ। এর জন্য প্রধানত দায়ী করা হয় ব্ল্যাক কার্বনকে। গত ২২-২৬ মার্চ অনুষ্ঠিত ইন্টারন্যাশনাল মেরিটাইম অর্গানাইজেশনের (আইএমও) সাব-কমিটি অন পলিউশন প্রিভেনশন অ্যান্ড রেসপন্স (পিপিআর)-এর অষ্টম সেশনে ব্ল্যাক কার্বন নিঃসরণ কীভাবে বন্ধ করা যায়, সে বিষয়ে বিশেষ আলোকপাত করা হয়েছে।
উত্তর মেরুর তাপমাত্রার অস্বাভাবিক পরিবর্তনের নেপথ্যে রয়েছে এইচএফও (হেভি ফুয়েল অয়েল)-চালিত জাহাজগুলো থেকে নির্গত ব্ল্যাক কার্বন। বরফ অথবা হিমের সংস্পর্শে মারাত্মক দূষণকারী এই ব্ল্যাক কার্বনের উষ্ণায়ন ক্ষমতা ৭ থেকে ১০ গুণ বেড়ে যায়। ফলে বরফ গলার হারও বেড়ে যায়। বরফ গলে গিয়ে নিচের পানি বা ভূপৃষ্ঠ বেরিয়ে পড়ে। ভূপৃষ্ঠ এবং পানি বরফের থেকে গাঢ় রংয়ের হওয়ায়, তুলনামূলকভাবে কম তাপ প্রতিফলন করে। সূর্যের তাপ শোষিত হওয়ায় তাপমাত্রাও বেড়ে যায়।
ব্ল্যাক কার্বনের আরও কিছু উৎস থাকলেও আর্কটিক অঞ্চলের উষ্ণায়নের জন্য এইচএফও-চালিত জাহাজগুলোই প্রধানত দায়ী। মোট ব্ল্যাক কার্বনের ২ শতাংশের উৎস এসব জাহাজ। বাকি উৎসগুলোর অবস্থান বায়ুম-লের অনেক ওপরের স্তরে এবং সেগুলোর বরফের সংস্পর্শে আসার সম্ভাবনা খুব কম।
উত্তর মেরুর জলপথে চলাচলকারী জাহাজগুলোয় জ্বালানি হিসেবে এইচএফও ব্যবহার ও ব্যবহারের জন্য তা পরিবহনের কারণে পরিবেশগত যে ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে, তা প্রশমনের লক্ষ্যে একটি দিকনির্দেশনা প্রস্তুত করেছে একটি করেসপন্ডেন্স গ্রুপ। অষ্টম সেশনে সাব-কমিটি সেই খসড়া নিয়েই পর্যালোচনা করেছে।
এই খসড়া দিকনির্দেশনার মূল লক্ষ্য হলো জাহাজ থেকে দূষণ নিয়ন্ত্রণে মারপোল কনভেনশনে স্বাক্ষরকারী সব দেশের প্রশাসনকে সহায়তা করা। বিশেষ করে, যাদের উপকূল রেখার সঙ্গে উত্তর মেরুর জলসীমার সংযোগ রয়েছে। এসব দেশ যেন এইচএফও-সংশ্লিষ্ট ঝুঁকি মোকাবিলায় জাতীয় পর্যায়ের উদ্যোগ নিতে পারে, সেই বিষয়ে সহায়ক দিকনির্দেশনা উপস্থাপনই এই খসড়ার মূল উদ্দেশ্য। দূষণ কমাতে শিপিং অপারেটরদেরও বড় একটা ভূমিকা রয়েছে। এইচএফও ব্যবহারকারী ও পরিবহনকারী যেসব জাহাজ আর্কটিক সি-রুট ব্যবহারের পরিকল্পনা করছে, সেগুলো থেকে নিঃসরণ ঝুঁকি কীভাবে কমানো যায়, তার কিছু সুপারিশও রয়েছে এই গাইডলাইনে।
সাব-কমিটি জানিয়েছে, জুনে আইএমওর মেরিন এনভায়রনমেন্ট প্রটেকশন কমিটির (এমইপিসি) যে সেশন হওয়ার কথা রয়েছে (এমইপিসি ৭৬), সেখানে মারপোল অ্যানেক্স ১-এর অনুমোদিত খসড়া সংশোধনী গৃহীত হবে বলে আশা করা হচ্ছে। এটি কার্যকর হলে ২০২৪ সালের ১ জুলাই থেকে আর্কটিক অঞ্চলের জলপথে জাহাজগুলোর এইচএফও ব্যবহার ও পরিবহনে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা সম্ভব হবে।
পর্যালোচনা শেষে পিপিআর খসড়া গাইডলাইনের প্রাসঙ্গিক অন্যান্য অংশ সংশ্লিষ্ট সাব-কমিটিগুলোর কাছে পাঠানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এর মধ্যে নেভিগেশনাল ও যোগাযোগ-সংক্রান্ত বিষয় পর্যালোচনার জন্য সাব-কমিটি অন নেভিগেশন, কমিউনিকেশনস অ্যান্ড সার্চ অ্যান্ড রেসকিউ (এনসিএসআর), জ্বালানি ট্যাংকের অবস্থান-সংক্রান্ত উদ্বেগের বিষয়টি পর্যালোচনার জন্য সাব-কমিটি অন শিপ ডিজাইন অ্যান্ড কনস্ট্রাকশন (এসডিসি) এবং ট্রেনিং ও অন-বোর্ড ফ্যামিলিয়ারাইজেশন-সংশ্লিষ্ট সেকশন পর্যালোচনার জন্য সাব-কমিটি অন হিউম্যান এলিমেন্ট, ট্রেনিং অ্যান্ড ওয়াচকিপিং (এইচটিডব্লিউ)-এর কাছে খসড়াটি পাঠানো হয়েছে।
আগামী বছর পিপিআর সাব-কমিটির পরবর্তী সেশন অনুষ্ঠিত হবে। সেখানে একটি ড্রাফটিং গ্রুপকে দায়িত্ব দেয়া হবে খসড়া গাইডলাইনটি চূড়ান্ত করার জন্য। পরে সেই চূড়ান্ত গাইডলাইন এমইপিসি বরাবর অনুমোদনের জন্য পাঠানো হবে।
ব্ল্যাক কার্বন নিঃসরণ সীমিত রাখার লক্ষ্যে আইএমও অনেক দিন ধরেই চেষ্টা চালিয়ে আসছে। এই নিঃসরণের পরিমাণ হিসাবে রাখা ও তা রিপোর্ট করার প্রমিত প্রক্রিয়া নিয়ে কাজ করছে তারা। এ বিষয়ে ভলান্টারি মেজারমেন্ট স্টাডির জন্য এরই মধ্যে একটি রিপোর্টিং প্রোটোকল প্রাথমিকভাবে প্রস্তুত করা হয়েছে। এখন একটি প্রমিত প্রোটোকল তৈরির লক্ষ্যে সাব-কমিটি ব্ল্যাক কার্বন পরিমাপ নিয়ে আরও গবেষণা চালানোর জন্য আইএমওর সদস্য দেশগুলোর সরকার ও আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর প্রতি আহ্বান জানিয়েছে। এই প্রমিত প্রোটোকল প্রণয়ন করা গেলে ব্ল্যাক কার্বন নিঃসরণের তথ্য আরও নিখুঁতভাবে সংরক্ষণ করা যাবে এবং তা সাব-কমিটির পরবর্তী সেশনে উপস্থাপন করা সম্ভব হবে।
কানাডার উদ্যোগে সম্প্রতি মেরিন ইঞ্জিন থেকে নিঃসৃত ব্ল্যাক কার্বনের জন্য একটি স্ট্যান্ডারাইজড স্যাম্পলিং, কনডিশনিং ও মেজারমেন্ট প্রোটোকল প্রণয়নের লক্ষ্যে একটি আন্তর্জাতিক টেকনিক্যাল ওয়ার্কিং গ্রুপ (টিডব্লিউজি) গঠন করা হয়েছে। সাব-কমিটি এই উদ্যোগকে সাধুবাদ জানিয়েছে।
এদিকে ব্ল্যাক কার্বন নিঃসরণের মাত্রা নিয়ে সম্প্রতি একটি যৌথ গবেষণা চালিয়েছে ফিনল্যান্ড ও জার্মানি। এই গবেষণার চূড়ান্ত ফলাফল আইএমওর কাছে জমা দিয়েছিল তারা। সাব-কমিটির বৈঠকে এই ফলাফল পর্যালোচনা করা হয়েছে। এই গবেষণায় দেখা গেছে, যেসব জ্বালানিতে অধিক হারে অ্যারোমেটিক কম্পাউন্ড থাকে, সেসব জ্বালানি ব্ল্যাক কার্বন নিঃসরণে সরাসরি ভূমিকা রাখতে পারে। তবে এক্ষেত্রে চূড়ান্ত উপসংহারে পৌঁছাতে হলে সংশ্লিষ্ট আরও কয়েকটি ফ্যাক্টর বিবেচনায় নিতে হবে।
বৈঠক শেষে সাব-কমিটির পক্ষ থেকে বলা হয়, ব্ল্যাক কার্বন নিঃসরণ কমাতে শিপিং লাইনগুলোকেও এগিয়ে আসতে হবে। এক্ষেত্রে তারা বাধ্যতামূলক নিয়মাবলির বাইরেও ঐচ্ছিকভাবে কিছু দিকনির্দেশনা অনুসরণ করতে পারে।
এক নজরে সাব-কমিটি গৃহীত কর্মপরিকল্পনা-
জাহাজ থেকে নির্গত ব্ল্যাক কার্বন নিঃসরণের প্রভাব থেকে আর্কটিক অঞ্চলকে যথাসম্ভব মুক্ত রাখতে নিয়ন্ত্রণমূলক পদক্ষেপের বিষয়ে চূড়ান্ত দিকনির্দেশনা প্রস্তুত করা। এক্ষেত্রে পিপিআর ৬-এর সুপারিশকৃত পদক্ষেপগুলো বিবেচনায় নেওয়া হবে।
ব্ল্যাক কার্বনের মাত্রা পরিমাপের জন্য সুপারিশকৃত যেসব পদ্ধতি রয়েছে (যেমন এফএসএন, পিএএস ও এলআইআই), সেগুলোর বিষয়ে আরও পর্যালোচনা করা।
স্যাম্পলিং, কন্ডিশনিং ও মেজারমেন্টের জন্য একটি প্রমিত প্রোটোকল প্রস্তুত করা।
আগামী বছরে অনুষ্ঠেয় এমইপিসির ৭৯তম সেশনে একটি প্রতিবেদন উপস্থাপন করা।
ব্যালাস্ট ওয়াটার কম্পায়েন্স মনিটরিং ডিভাইসের ভেরিফিকেশনের জন্য মানদ- প্রণয়ন করা।
আইএমওর বায়োফাউলিং গাইডলাইন পর্যালোচনা করা।
মাছ ধরার বিভিন্ন সরঞ্জাম সাগরে পড়ে যাওয়া অথবা সেগুলো নিক্ষেপ ও তা তদারকি করা।