শুধু স্বাস্থ্যবিধি মেনে চললেই হবে না, বন্দরে জীবনের ঝুঁকি কমাতে প্রয়োজন সর্বস্তরের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য টিকা নিশ্চিত করা

গত বছরের করোনার প্রথম ঢেউ সামলে আমরা যখন আবার ঘুরে দাঁড়িয়েছি, আমাদের অর্থনীতি যখন পুরোদমে গতিশীল হওয়ার পথে তখনই চোখ রাঙাচ্ছে করোনার দ্বিতীয় ঢেউ। প্রথম ঢেউয়ের সময় লকডাউনে যখন সারা দেশ স্থবির হয়ে পড়েছিল, তখনও সচল ছিল চট্টগ্রাম বন্দর। এবারও তার ব্যতিক্রম হওয়ার উপায় নেই। কারণ চট্টগ্রাম বন্দর হয়েই দেশের আমদানি-রপ্তানির প্রায় পুরোটা পরিচালিত হয়। কিন্তু যে হারে চট্টগ্রামে করোনার তীব্র সংক্রামক ডেলটা ভেরিয়েন্ট ছড়িয়ে পড়েছে, এখন থেকেই সর্তক না হলে দ্রুতই তা বন্দর পরিচালনায় সংকট তৈরি করবে বলে ধারণা করা যায়। আমরা যেমন এক মুহূর্তের জন্যও বন্দর বন্ধ থাকুক তা চাই না, তেমনি বন্দরে কর্মরত কেউ করোনায় আক্রান্ত হয়ে জীবনের ঝুঁকিতে পড়–ক সেটাও কাম্য নয়। ইতিমধ্যেই আমরা বেশ কয়েকজন সহকর্মীকে হারিয়েছি। এটা শুধু তাদের পরিবারই নয়, আমাদের জন্যও ছিল অপূরণীয় ক্ষতি। আমরা চাই না আর কোনো অনাকাক্সিক্ষত মৃত্যু। তাই শুধু স্বাস্থ্যবিধি মেনে চললেই হবে না, জীবনের ঝুঁকি কমাতে শিগগিরই বন্দরের সর্বস্তরের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য টিকা নিশ্চিত করতে হবে।

দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়ন কর্মকা-ের সাথে সাথে বাড়ছে দেশের সমুদ্রনির্ভর বাণিজ্যের কলেবর। তাই ব্যস্ততা বেড়েছে আমাদের দুই প্রধান সমুদ্র বন্দরেরও। বর্তমানে চট্টগ্রাম বন্দরে বছরে প্রায় ৪ হাজার জাহাজ ভিড়ে এবং মোংলা বন্দরে ২০২০-২০২১ অর্থবছরের একমাস বাকি থাকতেই বন্দরটির ইতিহাসের সর্বোচ্চ ৯১৩টি বাণিজ্যিক জাহাজ ভিড়েছে। দেশের সমুদ্র অঞ্চল ঘিরে এই যে বিপুল কর্মযজ্ঞ তা সম্পন্ন করতে কাজ করছে অনেকগুলো পক্ষ। একদিকে যেমন রয়েছে বন্দর এবং তার অংশীজনরা, অন্যদিকে রয়েছে জাহাজ মালিক, চার্টারার, নাবিক, আমদানি-রপ্তানিকারক, ইনস্যুরেন্স কোম্পানি, শিপিং এজেন্ট ইত্যাদি। স্বাভাবিকভাবেই নানা ঘটনা-দুর্ঘটনায় এসব পক্ষের মাঝে বিভিন্ন বিষয়ে বিরোধ বা দাবি উঠতে পারে। কিন্তু দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়ন অব্যাহত রাখতে সমুদ্র অঞ্চলের বহুমুখী ব্যবহার নিশ্চিত ও নির্বিঘন্নে করার বিকল্প নেই। তাই এসব বিরোধ দ্রুত নিষ্পন্ন করার জন্য রয়েছে বিশেষায়িত বিচারব্যবস্থা এবং তা পরিচালনায় প্রণীত হয়েছে ‘অ্যাডমিরালটি কোর্ট অ্যাক্ট, ২০০০’। বাংলাদেশের অ্যাডমিরালটি আদালত নিয়ে আমাদের এবারের মূল আয়োজন।

এই সময়ে পৃথিবীজুড়েই একটি গুরুত্বপূর্ণ আলোচ্য বিষয় পরিবেশ দূষণ। বায়ুম-লে ক্ষতিকর গ্যাসের পরিমাণ বছর বছর লাফিয়ে বাড়ছে, দিন দিন খারাপ হচ্ছে জলবায়ু পরিস্থিতি। এর পিছনে অন্যতম প্রধান কারণ শিল্প-কারখানা ও যানবাহন থেকে মাত্রাতিরিক্ত কার্বন নিঃসরণ। তাই কার্বন নিঃরসরণ কমিয়ে আনতে সচেষ্ট হয়েছেন বিশ্ব নেতারা। এক্ষেত্রে সমাধান রয়েছে তিনটিÑ বিদ্যুৎচালিত যন্ত্র ও যানবাহন ব্যবহার, জীবাশ্ম জ্বালানির পরিবর্তে জৈবজ্বালানির ব্যবহার এবং কার্বন ক্যাপচার অ্যান্ড স্টোরেজ (সিসিএস) পদ্ধতির প্রয়োগ ঘটানো। সম্ভাবনাময় হিসেবে বিশ^জুড়ে ইতিমধ্যেই প্রতিষ্ঠা পেয়েছে সিসিএস প্রযুক্তি। খুব প্রচলিত না হলেও যুগান্তকারী এ প্রযুক্তির প্রসারে বিশ্ব ব্যাপী বেশ কিছু মেগা প্রকল্প হাতে নেওয়া হচ্ছে। পরিবেশ রক্ষায় আগামী দিনে এটি হয়ে উঠতে পারে অন্যতম হাতিয়ার। সিসিএস নিয়ে রয়েছে বিশেষ রচনা।

জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব পড়েছে আর্কটিকেও। গত বছরের জুনে এর তামপাত্রা ৩৮ ডিগ্রি সেলসিয়াসে পৌঁছে। এটি ছিল ইতিহাসের সর্বোচ্চ। এর জন্য প্রধানত দায়ী করা হয় ব্ল্যাক কার্বনকে। গত ২২-২৬ মার্চ অনুষ্ঠিত ইন্টারন্যাশনাল মেরিটাইম অর্গানাইজেশনের (আইএমও) সাব-কমিটি অন পলিউশন প্রিভেনশন অ্যান্ড রেসপন্স (পিপিআর)-এর অষ্টম সেশনে ব্ল্যাক কার্বন নিঃসরণ কীভাবে বন্ধ করা যায়, সে বিষয়ে বিশেষ আলোকপাত করা হয়েছে। বিশেষ রচনায় এ বিষয়ে থাকছে বিস্তারিত।

প্রিয় পাঠক, আমরা চাই এদেশের মেরিটাইম চর্চাকে একটি সুদৃঢ় ভিত্তিতে দাঁড় করাতে। বৈচিত্র্যময় আঙ্গিকে, সমৃদ্ধ কলেবরে বন্দরবার্তার পথচলা বাংলাদেশের মেরিটাইম খাতের বিকাশে আরও সহায়ক হবে- সেই প্রত্যাশা।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here