মেরিটাইম ট্রান্সপোর্টের বিভিন্ন অংশীজনের মধ্যে রয়েছে বন্দর, শিপিং লাইন ও বন্দর ব্যবহারকারী মার্চেন্টরা। তাদের প্রত্যেকেরই সম্পদ ও অবকাঠামো সীমিত। তা সত্ত্বেও সবারই লক্ষ্য থাকে নিজেদের অবস্থানে থেকে গ্রাহকদের সর্বোচ্চ সেবা প্রদান করা। আর তাদের এই লক্ষ্য পূরণে যে উদ্যোগ কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে, তা হলো পোর্ট কল অপটিমাইজেশন।
বৈশ্বিক বাণিজ্যে তথা পণ্য পরিবহনের একটা গুরুত্বপূর্ণ অংশজুড়ে রয়েছে সমুদ্রপথ। মেরিটাইম ট্রান্সপোর্ট একটি সুবিস্তৃত প্রক্রিয়া, যা পরিচালিত হয় সুনিয়ন্ত্রিত ও স্ব-সংগঠিত ইকোসিস্টেমের মধ্যে। আর এই ইকোসিস্টেমের উপাদান হিসেবে রয়েছে বিভিন্ন অংশীজন, যাদের নিজ নিজ কার্যক্রম সমন্বিতভাবে শিপিং খাতে প্রাণ সঞ্চার করেছে। সমুদ্রপথে পণ্য পরিবহনের শৃঙ্খলে প্রত্যেক অংশীজনের ভূমিকাই সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ। তাই এ খাতের টেকসই উন্নয়নে সবার মধ্যে পারস্পরিক মিথস্ক্রিয়ার সম্পর্ক থাকা অত্যাবশ্যকীয়। আর এই সম্পর্ক কার্যকরভাবে গড়ে তুলতে পারে পোর্ট কল অপটিমাইজেশন।
কেবল একটি পক্ষের উদ্যোগে পোর্ট কলের সর্বোচ্চ সদ্ব্যবহার সম্ভব নয়। এক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের মধ্যেই একটি যোগসূত্র গড়ে উঠতে হবে। যার যার কাছে যে তথ্য রয়েছে, তা অন্যদের সঙ্গে বিনিময় করতে পারলে তবেই সুফল মিলবে। একটি জাহাজ কখন বন্দরে নোঙর করলে যতটা দ্রুত সম্ভব সেবা নিয়ে বেরিয়ে যেতে পারবে, সেই সম্ভাব্যতা সম্পর্কে আগেভাগেই সঠিক অনুমান করতে পারলে এবং সে অনুযায়ী পরিকল্পনা সাজাতে পারলে শিপিং কোম্পানি, বন্দর কর্তৃপক্ষ ও গ্রাহক-সবারই লাভ। ডিজিটাল ডাটা শেয়ারিংয়ের অত্যাধুনিক প্রযুক্তি আমাদের সেই সুযোগ করে দিয়েছে। আর এই সুযোগ কাজে লাগাতে প্রয়োজন পোর্ট কল অপটিমাইজেশনের উদ্যোগ গ্রহণ ও তার বাস্তবায়ন।
মেরিটাইম ট্রান্সপোর্ট খাতকে সর্বোতভাবে টেকসই করে গড়ে তুলতে সাম্প্রতিক বছরগুলোয় পোর্ট কল অপটিমাইজেশনের ওপর বেশ জোর দেওয়া হয়েছে। ঠিক কোন পদ্ধতি অনুসরণ করলে এর সর্বোচ্চ সুবিধা নিশ্চিত করা যাবে কিংবা সেবাদানকারী বন্দরের সঙ্গে যাত্রারত জাহাজ এবং পূর্ব ও পরবর্তী বন্দরগুলোর যোগাযোগের মানদ- কীরূপ হবে, তা নির্ধারণের জন্য বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে এরই মধ্যে। আর এই অগ্রগতিকে কাজে লাগিয়ে পোর্ট ও টার্মিনালগুলো তাদের গ্রাহকসেবার মান আরও উন্নত করার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।
পোর্ট কল অপটিমাইজেশনের বেশকিছু সুবিধা এরই মধ্যে মিলতে শুরু করেছে। তার মধ্যে বড় একটি সুবিধা হলো প্রেডিক্টেবিলিটি বা অনুমেয়তা বৃদ্ধি, যা শিপিং কোম্পানিগুলোর শিডিউলিং ও প্ল্যানিংয়ে সহায়ক ভূমিকা রাখছে। তবে শুধু যে জাহাজগুলোই এর উপকারভোগী হচ্ছে, তা নয়। বরং বন্দর কর্তৃপক্ষগুলোও এর সুবিধা পাচ্ছে।
প্রথাগতভাবে এতদিন বন্দরগুলোয় ‘আগে আসলে আগে সেবা’ মূলনীতির ওপর ভিত্তি করে সেবা দেওয়া হলেও এখন বিভিন্ন বন্দর কর্তৃপক্ষ পূর্বপ্রতিশ্রুত সময়ে সেবাপ্রদানের নীতিতে হাঁটতে চাইছে। আর এই যুগান্তকারী পরিবর্তনের পরিকল্পনা সাজাতে বন্দর কর্তৃপক্ষগুলোর জন্য গুরুত্বপূর্ণ লাইফ লাইন হিসেবে কাজ করছে আগে থেকে অনুমান করার সক্ষমতা।
আসলে ব্যবসায়িক লক্ষ্য যা-ই হোক না কেন, পোর্ট কল অপটিমাইজেশনের সুবিধাভোগী হয় সংশ্লিষ্ট সব পক্ষই। বন্দরকেন্দ্রিক পেক্ষাপটে দেখা যায়, বিদ্যমান সম্পদ ও অবকাঠামোর সর্বোচ্চ সদ্ব্যবহারের চাপ থাকে বন্দর পরিচালনাকারীদের ওপর। আর জাহাজকেন্দ্রিক প্রেক্ষাপটে সর্বোত্তম কার্যকরভাবে একাধিক বন্দরে কাজ সম্পাদনের চাপ থাকে জাহাজগুলোর ওপর। কনটেইনার শিপিং কোম্পানিগুলো সাধারণত পোর্ট রোটেশন স্কিমের অধীনে তাদের কার্যক্রম পরিচালনা করে। আর এক্ষেত্রে একাধিক বন্দরে যেতে হয় জাহাজগুলোকে। একটি জাহাজ কেবল একটি বন্দরেই যাবে, শিপিং কোম্পানিগুলোর ব্যবসা এমন ভিত্তির ওপর গড়ে ওঠেনি। বন্দরকেন্দ্রিক বা জাহাজকেন্দ্রিক যে প্রেক্ষাপটেই হোক না কেন, পোর্ট কল অপটিমাইজেশনের গুরুত্ব অস্বীকার করার সুযোগ নেই কোনোভাবেই।
পোর্ট কল কী?
কোনো নির্দিষ্ট যাত্রাপথে একটি জাহাজকে পণ্য খালাস-বোঝাই বা জ্বালানি গ্রহণের মতো কাজের জন্য বিভিন্ন বন্দরে যাত্রাবিরতি দিতে হয়। একেই বলা হয় পোর্ট কল। শিপিং মনিটরিং, রিপোর্টিং অ্যান্ড ভেরিফিকেশন (এমআরভি) রেগুলেশনে পোর্ট কলকে সংজ্ঞায়িত করা হয়েছে এভাবে- কোনো একটি বন্দরে কার্গো জাহাজগুলোর পণ্য লোডিং অথবা আনলোডিং এবং প্যাসেঞ্জার ক্রুজশিপের যাত্রী তোলা অথবা নামানোর জন্য যাত্রাবিরতি দেওয়াটাই হলো পোর্ট কল। এটি একটি টেকনিক্যাল টার্ম যা সব অফিশিয়াল শিপিং ডকুমেন্টে ব্যবহার করা হয়।
পোর্ট কল অপটিমাইজেশন
আধুনিক মেরিটাইম ট্রান্সপোর্টে পোর্ট কল অবিচ্ছেদ্য একটি অংশে পরিণত হয়েছে। জাহাজগুলোকে যাত্রাপথে প্রয়োজনের খাতিরেই বিভিন্ন বন্দরে যাত্রাবিরতি দিতে হয়, কখনো শিডিউলের মধ্যে থেকে, আবার কখনো পরিকল্পনার বাইরে গিয়ে। আবার বন্দরগুলোকেও একই সময়ে একাধিক জাহাজকে সেবা দিতে হয়। ফলে অনেক সময় দেখা যায়, ব্যস্ত বন্দরগুলোয় জাহাজের অপেক্ষমাণ থাকার সময়টা দীর্ঘতর হচ্ছে। এই সমস্যা নিরসনে দারুণ এক সমাধান হলো পোর্ট কল অপটিমাইজেশন। এটি শিপিং কোম্পানি, টার্মিনাল ও অন্য সেবাদানকারীদের পরিবেশগত বিরূপ প্রভাব কমানো এবং সুরক্ষা ও নিরাপত্তা ব্যবস্থাপনা উন্নতকরণের সুযোগ করে দেয়।
পোর্ট কল অপটিমাইজেশন নিয়ে আলোচনার মাধ্যমে শিপিং কোম্পানি, তাদের এজেন্ট ও বন্দর কর্তৃপক্ষগুলো আসলে এমন একটি সমাধান খুঁজে পেতে চাইছে, যা থেকে সব ধরনের বাণিজ্য, প্রতিটি বন্দর ও অংশীজন সুফল পাবে।
প্রতিটি বন্দরেরই নিজস্ব কিছু কর্মপদ্ধতি ও নিয়মাচার রয়েছে। শিপিং কোম্পানিগুলোকে এসব মেনেই কার্যক্রম পরিচালনা করতে হয়। একটি শিপিং কোম্পানির প্রতিটি যাত্রার পরিকল্পনা হতে হয় স্বতন্ত্র। কারণ একটি বন্দরের সঙ্গে আরেকটির প্রতিযোগিতা থাকতে পারে। তাই প্রতিটি বন্দরকেন্দ্রিক প্রকল্পগুলো হয় স্বকীয়।
পোর্ট কল অপটিমাইজেশনের উদ্যোগ গ্রহণ ও বাস্তবায়নের প্রক্রিয়াটি কয়েকটি পর্যায়ে বিভক্ত। এগুলো হলো-
১. জাহাজমালিকদের সবচেয়ে বড় আন্তর্জাতিক সংগঠন বাল্টিক অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল মেরিটাইম কাউন্সিল (বিমকো) চুক্তি ও ইন্টারন্যাশনাল মেরিটাইম অর্গানাইজেশনের (আইএমও) রেজল্যুশনের ভিত্তিতে পোর্ট কলের চলমান বৈশ্বিক চর্চার সঙ্গে ঐকমত্য পোষণ করা;
২. এই চর্চার জন্য ন্যূনতম তথ্য সরবরাহের সুযোগের বিষয়ে একমত হওয়া;
৩. তথ্য বিনিময়-সংক্রান্ত বিদ্যমান বৈশ্বিক কার্যকর সংজ্ঞার বিষয়ে সহমত পোষণ করা;
৪. তথ্যের মালিককে পোর্ট কল ইনফরমেশন বিনিময়ের সুযোগ দেওয়া;
৫. বিদ্যমান বৈশ্বিক তথ্যের সংজ্ঞা, ফরম্যাট ও প্ল্যাটফর্মের বিষয়ে একমত হওয়া;
৬. তথ্যের মালিকের কাছে থাকা তথ্য গ্লোবাল সার্ভিসের সঙ্গে বিনিময় করা;
৭. তথ্যের গুণগত মানের নিশ্চয়তার বিষয়ে ঐকমত্যে পৌঁছানো;
৮. তথ্য বিনিময়ের জন্য প্রণোদনার ব্যবস্থা করা;
৯. আইএমও ও আইএইচওর কর্মসূচির সঙ্গে যুক্ত হওয়া।
ইন্টারন্যাশনাল টাস্কফোর্স পোর্ট কল অপটিমাইজেশন
পোর্ট কল অপটিমাইজেশন প্রক্রিয়াকে বেগবান করতে শিপিং খাতসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন অংশীজনকে নিয়ে যাত্রা হয় ইন্টারন্যাশনাল টাস্কফোর্স পোর্ট কল অপটিমাইজেশনের। মূলত পোর্ট কল ডাটা কোয়ালিটি উন্নত করা এবং ইন্টারন্যাশনাল হারবার মাস্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের সদস্যরা (আইএইচএমএ) যেন এই তথ্য খুব সহজেই পেতে পারে, সেই তাগাদা থেকেই মূলত এই টাস্কফোর্সের যাত্রা।
মনে রাখতে হবে, ইন্টারন্যাশনাল টাস্কফোর্স পোর্ট কল অপটিমাইজেশন হলো একটি নিরপেক্ষ সংস্থা। এর কাজ পরামর্শ দেওয়া। বিভিন্ন সলিউশন প্রোভাইডারকে প্রমোট করা এর কাজ নয়।

পোর্ট ম্যানেজমেন্ট ইনফরমেশন সিস্টেমস (পিএমআইএস)
সমুদ্রপথে পণ্য পরিবহন শিল্পের সুরক্ষা ও কার্যকারিতা অনেকখানি নির্ভর করে তথ্য বিনিময়ের ওপর। স্যাটেলাইট ও ইলেকট্রনিক যোগাযোগ ব্যবস্থার দ্রুত অগ্রগতির সুবাদে পোর্ট কমিউনিটি সিস্টেম আজ অনেক সমৃদ্ধ হয়েছে। সমুদ্রবন্দর কমিউনিটির অংশীজন বিভিন্ন পক্ষের মধ্যে উন্নত ইলেকট্রনিক সংযোগ গড়ে উঠেছে। এসব অংশীজনের মধ্যে রয়েছে কাস্টমস, বন্দর কর্তৃপক্ষ, কোস্ট গার্ড ও অন্যান্য সংস্থা।
এই সিস্টেমে হারবার মাস্টার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। শিপ ও শোর বেজড কার্যক্রমে একজন হারবার মাস্টার ক্রমেই তথ্য ব্যবস্থাপকের দায়িত্বে অবতীর্ণ হচ্ছেন। যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নতির ফলে এখন জাহাজের কর্মকর্তারা সহজেই পোর্ট ও টার্মিনালের ওয়েবসাইটে প্রবেশ করতে পারেন এবং ইলেকট্রনিক পদ্ধতিতে রিপোর্টিং করতে পারেন। এমনকি সমুদ্রে থাকা অবস্থাতেই বন্দরে প্রবেশের বিষয়ে পরিকল্পনা সাজানোর সুযোগ পাচ্ছেন তারা।

নটিক্যাল পোর্ট ইনফরমেশন
একটি বন্দরের কর্মদক্ষতা অনেকখানি নির্ভর করে নির্ভরযোগ্য তথ্যের ওপর। ২০০৬ সালে ইন্টারন্যাশনাল হারবার মাস্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (আইএইচএমএ) পঞ্চম কংগ্রেসের একটি কর্মশালা শেষে হারবার মাস্টারদের নির্ভরযোগ্য পোর্ট এন্ট্রি ইনফরমেশন সংগ্রহে সহায়তা করা ও একটি মানসম্পন্ন কাঠামো সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের সামনে হাজির করার লক্ষ্যে একটি প্রকল্প গ্রহণ করা হয়। ২০০৮ সালের জুলাই থেকে এই কাঠামো আইএইচএমএ’র ওয়েবসাইটে প্রদর্শিত হচ্ছে। মেরিটাইম ট্রান্সপোর্ট খাত-সংশ্লিষ্টরা এই উদ্যোগকে স্বাগতও জানিয়েছে উৎসাহের সঙ্গে। তথ্যপ্রবাহ নিশ্চিত করার লক্ষ্যে শিপিং কোম্পানি ও বন্দর পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠানগুলো মিলে একটি টাস্কফোর্স গ্রহণ করেছে এবং পোর্ট কল অপটিমাইজেশনের মাধ্যমে মাস্টার ও ইভেন্ট ডাটার সহজলভ্যতা ও গুণগত মান উন্নত করার বিষয়ে কাজ করছে। এই উদ্যোগের ফলে বন্দর, শিপিং লাইন, সেবাদাতা ও টার্মিনালগুলো যেসব সুবিধা পাচ্ছে, সেগুলোর মধ্যে রয়েছে- খরচ কমে যাওয়া, আরও বেশি পরিচ্ছন্ন পরিবেশ, নির্ভরযোগ্যতা বৃদ্ধি ও অধিক সুরক্ষা।
সমুদ্রের গভীরতা, অ্যাডমিশন পলিসি ইত্যাদি তথ্যের প্রবাহ মাস্টার ডাটার সহজলভ্যতা ও গুণগত মান বৃদ্ধি করে। এসব তথ্য ভেসেল/বার্থ কম্প্যাটিবিলিটি নিশ্চিত করে এবং কখন বন্দরে প্রবেশ ও ত্যাগ করা নিরাপদ, সেই বিষয়ে সম্যক ধারণা অর্জনে সহায়ক ভূমিকা রাখে।
এদিকে বার্থে পৌঁছানোর পরিকল্পিত সময়, কার্গো অপারেশন সম্পন্নের আনুমানিক সময় ইত্যাদি ইভেন্ট ডাটার সহজলভ্যতা ও গুণগত মান বৃদ্ধি করে। প্রকৃত সময়োপযোগী তথ্য পাইলটদের বোর্ডিংয়ের বিষয়ে পরিকল্পনা, সব ধরনের পোর্ট সার্ভিসের প্রি-প্ল্যানিং ও পরবর্তী বন্দরের বিষয়ে পরিকল্পনা সাজাতে সহায়ক ভূমিকা রাখে। মাস্টার ও ইভেন্ট ডাটা দুটোই বিদ্যমান নটিক্যাল এবং সাপ্লাই চেইন স্ট্যান্ডার্ড ও ফরম্যাট অনুযায়ী প্রস্তুত করা হয়।
টেকসই খাতের জন্য পোর্ট কল অপটিমাইজেশন
বর্তমানে বিশ্বের অনেক বন্দরেই জাহাজগুলোকে আগে আসলে আগে সেবা ভিত্তিতে সেবা দেওয়া হয়। কিন্তু এই পদ্ধতিতে বন্দরের সীমিত সম্পদের সর্বোচ্চ সদ্ব্যবহারের পাশাপাশি কার্বন নিঃসরণ কমানোর উদ্যোগ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। এই সমস্যা দূর করার জন্য পোর্ট কল অপটিমাইজেশনের চাহিদা দিন দিন বাড়ছে।
আসলে জাস্ট-ইন-টাইম শিপিংয়ের পথে যেসব সমস্যা তৈরি হয়েছে, সেগুলো দূর করার জন্য একটি জাহাজের বন্দরে প্রবেশের পরিকল্পনা ও সেই বন্দরের সেবাপ্রদানের সক্ষমতার মধ্যে সামঞ্জস্য আনা এখন সময়ের দাবি। আইএমওর এজেন্ডাতেও বিষয়টিকে অগ্রাধিকারের তালিকায় রাখা হয়েছে। এছাড়া বিশ্বজুড়ে বন্দরগুলো ডিজিটালাইজেশনের ক্ষেত্রেও অন্যতম একটি জরুরি বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে এটি।
বিশে^র সব বন্দরে জাস্ট-ইন-টাইম শিপিং চালু করাকে অন্যতম কঠিন একটি উদ্যোগ মনে করা হয়। তবে শিপিং খাতকে টেকসই করতে ও এই খাতের জনপ্রিয়তা বাড়াতে এর বিকল্প কিছু নেই। পণ্য পরিবহনে ক্যাপিটাল প্রডাক্টিভিটির সঙ্গে এনার্জি এফিশিয়েন্সির প্রত্যক্ষ সংযোগ রয়েছে। আর এই এনার্জি এফিশিয়েন্সির একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো পোর্ট কল অপটিমাইজেশন। ডিজিটাল কনটেইনার শিপিং অ্যাসোসিয়েনের (ডিসিএসএ) মতো সংস্থাগুলো তাই পোর্ট ভিজিটের প্রমিত চর্চা হিসেবে এবং জাহাজের টার্ন-অ্যারাউন্ড সময় সর্বনিম্নে রাখার জন্য পোর্ট কল অপটিমাইজেশনকে জনপ্রিয় করার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।
একটি বন্দরের কার্যক্রম সম্পন্ন করতে কোনো জাহাজের বিলম্ব হওয়ার অর্থ হলো পরবর্তী বন্দরগুলোয় দেরি হওয়া। আগের বন্দরে বিলম্বের কারণে একটি জাহাজকে পরবর্তীতে বিভিন্ন সমস্যায় পড়তে হতে পারে। যেমন-
পরবর্তী বন্দরে প্রকৃত টাইম স্লট অনুযায়ী পৌঁছানোর জন্য জাহাজটিকে স্বাভাবিকের চেয়ে দ্রুত চালাতে হবে এবং আরও বেশি জ্বালানি পোড়াতে হবে। এর ফলে রিটার্ন অন ক্যাপিটাল প্রডাক্টিভিটি ও এনার্জি এফিশিয়েন্সি কমে যাবে।
রোটেশন শিডিউলে থাকা যেকোনো একটি বন্দরে অবস্থানের সময় কমাতে হবে অথবা এড়িয়ে যেতে হবে। এর ফলে ট্রান্সপোর্ট সার্ভিসে গ্রাহকদের ভরসা হারাতে হতে পারে।
পরবর্তী বন্দরে দীর্ঘ সময় ধরে অপেক্ষমাণ থাকতে হতে পারে। এই অলস সময়ে জাহাজের সম্পদের অপটিমাইজেশন কমে যেতে পারে।
ডাটা শেয়ারিংয়ে দরকার আন্তর্জাতিক মানদ-
একেকটি শিপিং লাইনের জাহাজগুলো একাধিক বন্দরের একেকটি নেটওয়ার্কের অধীনে কার্যক্রম পরিচালনা করে। এসব বন্দরের প্রতিটির আবার রয়েছে কার্গো ও শিপ সার্ভিস প্রদানকারী পৃথক নেটওয়ার্ক। প্রায় প্রতিটি বন্দরই বিভিন্ন ধরনের উল্লেখযোগ্য সংখ্যক জাহাজকে সেবা দিয়ে থাকে। এসব জাহাজে যেসব কার্গো পরিবহন হয়, সেগুলোর মালিক হয় একাধিক। বিশেষ করে কনটেইনারবাহী জাহাজগুলোয় বিভিন্ন আমদানি-রপ্তানিকারকের পণ্য পরিবহন করা হয়। এসব কারণে পোর্ট কলের কার্যকর তথ্য ব্যবস্থাপনার জন্য প্রয়োজন আন্তর্জাতিক মানদ-। আর এই মানদ- তৈরির জন্য আবার দরকার বড়সড় বিনিয়োগ।
এই বিনিয়োগ হতে পারে দুই ধরনের- প্রযুক্তিগত ও মানবসম্পদ উন্নয়ন। বিভিন্ন ফরম্যাট ও স্ট্যান্ডার্ডের সঙ্গে সামঞ্জস্য রাখার জন্য যে তথ্য ব্যবস্থাপনা প্রয়োজন, তার জন্য চাই প্রযুক্তিগত উন্নয়ন। আর এর জন্য বিনিয়োগের কোনো বিকল্প নেই। অন্যদিকে বিভিন্ন বন্দরের চর্চাগত বিভিন্ন বিষয়ে পার্থক্য থাকতে পারে। ফলে পোর্ট কল অপটিমাইজেশনের আওতায় এসব বন্দরকে এক সুতোয় বাঁধতে গেলে সেখানে সাংস্কৃতিক কিছু পরিবর্তন আনার প্রয়োজনীয়তা দেখা দিতে পারে। তবে কেবল বিনিয়োগ করলেই তো আর চলবে না। সেখান থেকে কোনো রিটার্ন আসবে কিনা, সেই সম্ভাব্যতাও যাচাই করতে হবে। আর এক্ষেত্রে ইন্টারন্যাশনাল মেরিটাইম অর্গানাইজেশন (আইএমও), বাল্টিক অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল মেরিটাইম কাউন্সিল (বিমকো) চুক্তি বা অন্য কোনো কর্তৃপক্ষের বিধিবিধান যেন লঙ্ঘন না হয়, সেটি নিশ্চিত করতে হবে।
ইতিহাস বলে, শিপিং খাতে যেকোনো নতুন নীতি ও পদ্ধতি কার্যকর করাটা বেশ ধীরগতির একটি প্রক্রিয়া। এক্ষেত্রে বিভিন্ন বিষয়ের দিকে সতর্ক দৃষ্টি রাখতে হয়। সংশ্লিষ্ট সব অংশীজনের সহমত পাওয়ার বিষয়ও রয়েছে।
আইএইচএমএ নয়টি পর্যায়ে পোর্ট কল অপটিমাইজেশন ডেভেলপমেন্ট পরিকল্পনা উপস্থাপন করেছে। এর মাত্র প্রথম তিনটি এখন পর্যন্ত সম্পন্ন হয়েছে। সুতরাং, একটি স্ট্যান্ডার্ড পোর্ট কল অপটিমাইজেশন প্রক্রিয়া অনুসরণের চর্চার জন্য আমাদের আরও কিছুদিন অপেক্ষা করতে হবে তা বলেই দেওয়া যায়। তবে আইএমওর নিঃসরণ কমানোর লক্ষ্যমাত্রা পূরণের জন্য পোর্ট কল অপটিমাইজেশনের কোনো বিকল্প নেই। ২০৫০ সাল নাগাদ শিপিং খাতে গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরণের পরিমাণ ২০০৮ সালের মাত্রার অর্ধেকে নামিয়ে আনার প্রত্যয় ব্যক্ত করেছে আইএমও। পোর্ট কল অপটিমাইজেশনের কয়েকটি প্রাথমিক লক্ষ্যমাত্রার মধ্যে অন্যতম হলো এই নিঃসরণ কমানো। সুতরাং আইএমওর লক্ষ্যমাত্রা পূরণের জন্য হলেও ব্যাপক পরিসরে পোর্ট কল অপটিমাইজেশনের চর্চা শুরু করা দরকার।
আশার কথা, আইএমও এই উদ্যোগের বিষয়ে একেবারে নিষ্ক্রিয় হয়ে বসে নেই। বরং সংস্থাটির গ্লোবাল ইন্ডাস্ট্রি অ্যালায়েন্স এরই মধ্যে পোর্ট কল অপটিমাইজেশনের কিছু পরীক্ষা-নিরীক্ষা সম্পন্ন করেছে। এই চর্চা শুরু করলে কী ধরনের সুবিধা মিলবে, তার ডেমোনস্ট্রেশনও করেছে তারা। তবে এর সবকিছুই হয়েছে কাগজে-কলমে, ঐচ্ছিক সরকারি-বেসরকারি সহযোগিতার ভিত্তিতে। এখন যত দ্রুত এর বাস্তবিক প্রয়োগ ঘটানো যাবে, শিপিং খাতের উন্নয়ন ও বৈশ্বিক উষ্ণতা প্রতিরোধ উদ্যোগে তা তত বেশি কার্যকর ভূমিকা রাখতে সক্ষম হবে।
পোর্ট কল অপটিমাইজেশন ও বন্দরকেন্দ্রিক প্রেক্ষাপট
একটি বন্দরে যে এক সময়ে একটিই জাহাজ সেবা নিতে আসবে, তা নয়। একই সময়ে একাধিক জাহাজকে সেবা দিতে হয় একটি বন্দরকে। এমনকি একই শিপিং কোম্পানির একাধিক জাহাজও একই সময়ে কোনো একটি নির্দিষ্ট বন্দরে আসতে পারে। এ অবস্থায় বন্দর কর্তৃপক্ষকে তাদের সীমিত সম্পদের সর্বোচ্চ সদ্ব্যবহার নিয়ে চিন্তায় পড়তে হয়। গড়পড়তায় বন্দরগুলোকে বিভিন্ন ধরনের জাহাজকে সেবা দিতে হয়। এগুলোর মধ্যে রয়েছে কনটেইনার জাহাজ, ওয়েট ও ড্রাই বাল্ক, রেগুলার ও ক্রুজ-বেজড প্যাসেঞ্জার ট্রান্সপোর্ট ইত্যাদি। এসব জাহাজের ব্যবসার উদ্দেশ্যও ভিন্ন ভিন্ন। কনটেইনার জাহাজগুলোকে একই বন্দরে একাধিকবার ভ্রমণ করতে হয়। ক্রুজ জাহাজগুলো হয়তো আগে থেকেই ভ্রমণ পরিকল্পনা সাজানোর সময় পায়। রেগুলার প্যাসেঞ্জার ট্রাফিকের রুট নির্দিষ্ট থাকে বিধায় পরিকল্পনাও সেই অনুযায়ী সাজানো থাকে। আর বাল্ক শিপগুলোর চলাচল অনেকটাই নিয়ন্ত্রিত হয় বাজারদরের কারণে পণ্যের সরবরাহ ও চাহিদায় যে পরিবর্তন ঘটে, তার ওপর। সুতরাং দেখা যাচ্ছে, একেক ধরনের জাহাজের সেবা গ্রহণের চাহিদা ও প্রয়োজনীয়তা একেক রকমের। বন্দরগুলোর জন্য এই ভিন্নতা কিছুটা চ্যালেঞ্জের কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে। আর এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় বন্দরগুলোকে দুটি পরিপূরক পদক্ষেপ নিতে হয়। এগুলো হলো শেষ মুহূর্তে পরিকল্পনায় পরিবর্তন আনার মতো নমনীয় অবস্থান গ্রহণ এবং পরিকল্পনার পরিসর যতটা সম্ভব বিস্তৃত করা। আর এ দুটি পদক্ষেপের সঙ্গে পোর্ট কল অপটিমাইজেশন অঙ্গাঙ্গিকভাবে জড়িত।
মেরিটাইম ট্রান্সপোর্টের ইকোসিস্টেম-জুড়ে রয়েছে তথ্য প্রবাহে প্রবেশাধিকার ও বর্ধিত পরিসরে ডিজিটাল কানেক্টিভিটি। তবে দুঃখজনক হলেও সত্যি যে বিশ্বের অনেক বন্দরই ডিজিটালাইজেশনের ক্ষেত্রে পিছিয়ে রয়েছে। এর ফলে তারা স্মার্ট কনটেইনারের তথ্য সংগ্রহ থেকে বঞ্চিত হয়। অথচ এই স্মার্ট কনটেইনার বন্দর ব্যবস্থাপনায় সময় সাশ্রয়ে কার্যকর ভূমিকা রাখতে সক্ষম হচ্ছে।
পোর্ট কল প্রক্রিয়ায় সমন্বয় মেকানিজমের প্রমিত সংজ্ঞাকে আরও বেশি মানসম্মত করতে এরই মধ্যে উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এছাড়া সম্পৃক্ত পক্ষগুলোর মধ্যে মিথস্ক্রিয়ার আধুনিকায়নেরও উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। তবে প্রশ্ন উঠতে পারে, বিশ্বের সব বন্দর কি অভিন্ন নীতি মেনে চলবে? সন্দেহ নেই যে, বন্দরের কার্যক্রমে একটি নির্দিষ্ট ধাঁচের বিষয়ে সর্বসম্মতি অর্জনের জন্য আরও কিছুদিন অপেক্ষা করতে হবে। বিশেষ করে বিষয়টি আরও চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াবে সেসব বন্দরের জন্য, যেগুলোয় যথাযথ কোনো প্রতিক্রিয়াশীল পরিচালনা কাঠামো এখনো নেই। যেহেতু সব বন্দর একই নিয়মে পরিচালিত হয় না, সেহেতু কোনো একটি সমাধান সব বন্দরের জন্য কার্যকর না-ও হতে পারে। তবে পোর্ট কল অপটিমাইজেশনের কিছু সুবিধা সব বন্দরই ভোগ করতে পারে। কখন একটি জাহাজ বন্দরে পৌঁছাবে এবং কখন সেটি বন্দর ছেড়ে যেতে পারবে, সে বিষয়ে একটি আগাম ধারণা দিতে পারে এটি। এক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট সরকার ও সেবাদানকারী সংস্থাগুলোর মধ্যে একটি সমন্বয় গড়ে উঠতে হবে।
বন্দরের কর্মদক্ষতা বাড়ানোর জন্য একটি পরিপূরক অবস্থান গ্রহণ করতে হবে, যেখানে কোনো সুনির্দিষ্ট বন্দর পরিচালনা মডেল বিবেচনায় নেওয়া হবে না। বরং অংশীজনরা পরিস্থিতি অনুযায়ী ক্রমাগত তাদের পরিকল্পনা হালনাগাদ করবে।
জাহাজকেন্দ্রিক প্রেক্ষাপট
একটি বন্দরের বিশাল কর্মযজ্ঞের সঙ্গে বিভিন্ন অংশীজনের সংশ্লিষ্টতা থাকে। আর এসব অংশীজনের সবার সমন্বিত কার্যক্রমের কেন্দ্র হিসেবে কাজ করে বন্দর। এ কারণে বন্দর কর্তৃপক্ষের মূল লক্ষ্য থাকে নিজেদের সম্পদ ও অবকাঠামোর সর্বোচ্চ সদ্ব্যবহার নিশ্চিত করে ভ্যালু যোগ করা। আর শিপিং লাইনগুলোর লক্ষ্য থাকে তাদের বহরে থাকা জাহাজগুলোর সদ্ব্যবহারের মাধ্যমে গ্রাহকদের সেবা দেওয়া। সাধারণত শিপিং লাইনগুলো সম্ভাব্য সর্বোচ্চ গতিতে এক বন্দর থেকে অন্য বন্দরে ছুটে চলার চেষ্টা করে। এছাড়া যতটা দ্রুত সম্ভব বন্দর ত্যাগ করা যায় এবং অপেক্ষমাণ থাকার সময় যতটা কম রাখা যায়, সেই লক্ষ্যও থাকে তাদের। আর এ জন্য পোর্ট কলে সর্বোচ্চ অনুমেয়তা কাম্য থাকে তাদের। আর তাদের এই চাওয়া পূরণ করতে হলে ডিজিটালাইজেশন ও সমন্বিত তথ্য বিনিময় নিশ্চিত করতে হবে।

পরিকল্পনা হতে হবে সর্বাঙ্গিক
পোর্ট কল অপটিমাইজেশনের সর্বোচ্চ সুবিধা পেতে হলে এর পরিকল্পনা ও বাস্তবায়ন হতে হবে সময়োপযোগী ও বাস্তবসম্মত। বর্তমানে যে বন্দরকেন্দ্রিক অ্যাপ্রোচ অনুসরণ করা হচ্ছে, তাতে পূর্ণ সুফল না-ও মিলতে পারে। এর সঙ্গে জাহাজকেন্দ্রিক পেক্ষাপটও বিবেচনায় নিতে হবে। কারণ একেক ধরনের জাহাজের পোর্ট কলের চাহিদা একেক ধরনের হতে পারে। কনটেইনার শিপিং বৈশ্বিক মেরিটাইম ট্রান্সপোর্টের মাত্র এক-তৃতীয়াংশ প্রতিনিধিত্ব করে। সুতরাং কেবল কনটেইনারবাহী জাহাজকে কেন্দ্র করে পরিকল্পনা সাজালে চলবে না। বরং বাণিজ্য ও সেবার অন্য খাতগুলোকেও বিবেচনায় নিতে হবে। এক কথায়, পোর্ট কল অপটিমাইজেশনে পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে সব আঙ্গিকে চিন্তাভাবনা করে। এতে করে মেরিটাইম ট্রান্সপোর্টের অগ্রযাত্রা হবে টেকসই। আধুনিক প্রযুক্তির কল্যাণে তথ্যপ্রবাহের যে সুযোগ তৈরি হয়েছে, তার সর্বোচ্চ সদ্ব্যবহার করাই হবে বুদ্ধিমানের কাজ।