বাংলাদেশের আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্যের প্রধান প্রবেশদ্বার চট্টগ্রাম বন্দর। দেশের মোট সমুদ্র বাণিজ্যের ৯০ শতাংশের বেশি সম্পন্ন হয় এ বন্দর দিয়ে। সুতরাং দেশের অর্থনীতির চাকা সচল রাখার ক্ষেত্রে চট্টগ্রাম বন্দরের গতিশীলতা বজায় রাখা অত্যন্ত জরুরি। বন্দর কর্তৃপক্ষ সেই কাজটি বেশ দক্ষতার সঙ্গেই করে চলেছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোয় লয়েড’স লিস্টে চট্টগ্রাম বন্দরের অবস্থানের ক্রমশ উন্নতি সেটাই প্রমাণ করে। কিন্তু সেই অগ্রযাত্রায় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে করোনাজনিত নানা সংকট। বিশেষ করে বৈশ্বিক কনটেইনার সংকটের আঁচ লেগেছে চট্টগ্রাম বন্দরেও, যা প্রধানত দুভাবে বন্দরের কার্যক্রম বাধাগ্রস্ত করছে।
যখন কোনো বন্দরে কনটেইনারের সংখ্যা ধারণক্ষমতার চেয়ে বেশি হয়ে যায়, তখন তা জটের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। আর এই কনটেইনারজট বন্দরের কাজের গতিশীলতা কমায়। অন্যদিকে যখন কোনো বন্দর দিয়ে পণ্য রপ্তানির সময় পর্যাপ্ত সংখ্যক কনটেইনার পাওয়া যায় না, তখন সেই ঘাটতি রপ্তানি বাণিজ্যকে বাধাগ্রস্ত করে। কনটেইনারজট ও কনটেইনারস্বল্পতা-এ দুটোই এখন বৈশ্বিক সংকট হয়ে দাঁড়িয়েছে। আর সেই প্রভাব পড়েছে চট্টগ্রাম বন্দরের ওপর।
ভোক্তা চাহিদায় হঠাৎ উত্থানের কারণে দেশে দেশে আমদানি বেড়ে যাওয়া, শীর্ষ শিল্পোৎপাদক দেশগুলো পণ্য উৎপাদন ও সরবরাহ বাড়িয়ে দেওয়া, ই-কমার্সের জোয়ার, জাহাজের ব্ল্যাংক সেইলিং, নতুন কনটেইনার উৎপাদন কমে যাওয়াসহ আরও কিছু কারণে এই কনটেইনার সংকট তৈরি হয়েছে। এই সংকট বৈশি^ক হওয়ার কারণে বাংলাদেশের একার পক্ষে তা দূর করা সম্ভব নয়। তবে এর প্রভাব যেন দেশের আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্যের ওপর কম পড়ে, তা নিশ্চিত করতে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ এরই মধ্যে কিছু উদ্যোগ নিয়েছে।
বন্দর, কনটেইনার এবং বিশ্ব বাণিজ্য
বৈশ্বিক সাপ্লাই চেইনের একটি গুরুত্বপূর্ণ অনুষঙ্গ হলো সমুদ্রবন্দর। উৎপাদনকারীর কাছ থেকে পণ্য ব্যবহারকারীর কাছে পৌঁছে দেওয়ার ক্ষেত্রে ইন্টারমিডিয়েট পয়েন্ট হিসেবে কাজ করে বন্দর। বৈশ্বিক অর্থনীতিতেও বন্দরের গুরুত্ব অনেক। কোনো অঞ্চলের বন্দরের পণ্য হ্যান্ডলিং ১০ শতাংশ বাড়লে তা ওই অঞ্চলের জিডিপিতে ৬-২০ শতাংশ প্রবৃদ্ধি এনে দিতে পারে।
আঙ্কটাডের একটি উপাত্ত বলছে, পরিমাণের দিক থেকে বৈশ্বিক বাণিজ্যের প্রায় ৮০ শতাংশ ও মূল্যমানের দিক থেকে ৭০ শতাংশ সম্পন্ন হয় সমুদ্রপথে। ২০১৭ সালের দিকে বিশ্ব অর্থনীতির পালে জোর হাওয়া লাগতে শুরু করলে এই সমুদ্র পরিবহনের গতিও ঊর্ধ্বমুখী হয়। আর এই উত্থানে সামনে থেকে নেতৃত্ব দিয়েছে সমুদ্রবন্দরগুলো।

বিশ্ব বাণিজ্য কতটা গতিশীল থাকবে, তা অনেকটাই নির্ভর করে সমুদ্রবন্দরগুলোর কর্মদক্ষতার ওপর। এর পাশাপাশি চাহিদা, শিল্পোৎপাদন, ভোক্তাদের ব্যয় সক্ষমতা ইত্যাদি বিষয়গুলো তো রয়েছেই। বন্দরগুলো কতটা দ্রুত পণ্য বোঝাই-খালাস করতে পারছে, তার ওপর নির্ভর করে সমুদ্র পরিবহন ও বিশ^বাণিজ্য কতটা মসৃণ গতিতে এগিয়ে যাবে। এ কারণে দেশে দেশে এখন বন্দর সক্ষমতা বাড়ানোর ওপর নজর দেওয়া হচ্ছে।
এই যে বৈশি^ক বাণিজ্যে মোট পণ্যের বড় একটা অংশ পরিবহন হয় সমুদ্রপথে, তার সিংহভাগ আবার পরিবহন হয় কনটেইনারে। বিশেষ করে নন-বাল্ক কার্গোর প্রায় ৯০ শতাংশ পরিবহন হয় কনটেইনারবাহী জাহাজে। নিরাপদ ও সুবিধাজনক মাধ্যম হওয়ায় বিশে^র বড় বড় শিপিং কোম্পানিগুলো এখন ভোগ্যপণ্য পরিবহনে কনটেইনারকেই প্রাধান্য দিচ্ছে।
কনটেইনার জাহাজের ইতিহাস খুব বেশি পুরনো নয়। গত শতকের পঞ্চাশের দশকের শুরুতে প্রথম মডেলের কনটেইনার জাহাজের যাত্রা হয়। এরপর গত ছয়-সাত দশকে সমুদ্রপথে পণ্য পরিবহনে কনটেইনারের চাহিদা ও জাহাজগুলোর বহন সক্ষমতা দুটোই বেড়েছে। এই যেমন ১৯৬৮ সালের তুলনায় বর্তমানের জাহাজগুলো ১ হাজার ২০০ শতাংশ বেশি কনটেইনার পরিবহন করতে পারে। অন্যদিকে সমুদ্র পরিবহন খাতে কনটেইনারের চাহিদা এখন আকাশচুম্বী। চলতি বছর এরই মধ্যে তা সর্বোচ্চ পর্যায়ে উন্নীত হয়েছে।
বিশ্ব জুড়ে শিপিং কোম্পানি ও বন্দর কর্তৃপক্ষগুলো এই বাড়তি চাহিদা সামাল দিতে ধীরে ধীরে নিজেদের সক্ষম করে গড়ে তুলছিল। এমনই একসময়ে হানা দিল বৈশ্বিক মহামারি কোভিড-১৯। রাতারাতি পাল্টে গেল চিত্রপট। স্থবির হয়ে পড়ল বৈশ্বিক অর্থনৈতিক কর্মকা-। ধস নামল ভোক্তা চাহিদা ও শিল্পোৎপাদনে। ভেঙে পড়ল সাপ্লাই চেইন। এরপর দেখা গেল চীনের উৎপাদন তৎপরতা ও মহামারির প্রথম ঢেউ শেষে ভোক্তাচাহিদায় হঠাৎ ঊর্ধ্বগতি। বৈশ্বিক বাণিজ্যের এই দ্রুত পটপরিবর্তনের সঙ্গে ঠিক খাপ খাইয়ে নিতে পারেনি সমুদ্র পরিবহন খাত। এর সঙ্গে বিভিন্ন প্রভাবক যোগ হওয়ায় দেশে দেশে বন্দরগুলোয় দেখা দেয় কনটেইনার ও জাহাজজট। আবার চাহিদা অনুযায়ী সরবরাহ না থাকায় খালি কনটেইনারের যে স্বল্পতা দেখা দিয়েছে, তা-ও বন্দরের স্বাভাবিক কার্যক্রমকে বাধাগ্রস্ত করছে। এ দুই সংকট বৈশি^ক সাপ্লাই চেইনের জন্য বিশেষ মাথাব্যথার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
সাধারণত একটি দেশে আমদানি করা পণ্যবাহী কনটেইনার বন্দরে খালাস করে সেটি খালি ফেরত পাঠানো হয় না। সেই দেশ থেকে রপ্তানিমুখী পণ্য বোঝাই করে তবেই সেই কনটেইনার আবার জাহাজে তোলা হয়। এখন যদি কোনো দেশে আমদানির পরিমাণ হঠাৎ বেড়ে যায়, তবে সেখানে কনটেইনারের প্রবাহ বেড়ে যায়। কিন্তু সেই অনুযায়ী রপ্তানি না বাড়লে কনটেইনারগুলো সেখানে আটকে পড়ে। এতে করে একদিকে সেই দেশের বন্দরে যেমন কনটেইনারজট তৈরি হয়, অন্যদিকে অন্যান্য দেশের রপ্তানিকারকদের কনটেইনার সংকটে পড়তে হয়।
করোনাকালীন পরিস্থিতিতে সেটাই হচ্ছে। ধারণা করা হচ্ছে, কনটেইনার জট ও স্বল্পতার কারণে সমুদ্রপথে পণ্য পরিবহনের মোট বৈশি^ক সক্ষমতার ১০ শতাংশ অব্যবহৃত থাকছে।
করোনায় বন্দর কার্যক্রমে সংকট: চীন ও বৈশ্বিক প্রেক্ষাপট
সাম্প্রতিক বছরগুলোয় ভোগ্যপণ্যের বৈশ্বিক সাপ্লাই চেইনের পাওয়ার হাউস হয়ে উঠেছে চীন। বিশ্ব অর্থনীতির দ্বিতীয় বৃহত্তম এই পরাশক্তির রয়েছে বৈশ্বিক জিডিপিতে ১৬ শতাংশে হিস্যা। আর বৈশ্বিক অর্থনীতির ধসের জন্য কারণ যে নভেল করোনাভাইরাস, তার উৎপত্তি সেই চীনেই। করোনার কারণে চলতি বছর বৈশ্বিক অর্থনীতিতে ১৩-৩৩ শতাংশ সংকোচন দেখা যেতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। বিশ্ব বাণিজ্যে গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার হওয়ার কারণে চীনের অর্থনৈতিক কার্যক্রমে যেকোনো সংকট তৈরি হলে তার রেশ টানতে হয় পুরো বিশ্বকে সমুদ্র পরিবহনের ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য। চীনা সমুদ্রবন্দরগুলোর কার্যক্রমে যেকোনো প্রতিবন্ধকতা তৈরি হলে বৈশ্বিক আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্যে তার নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। সাম্প্রতিক সময়ে চীনের গুরুত্বপূর্ণ দুটি বন্দরে করোনাজনিত স্থবিরতা সেটাই চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে। গত মে মাসে শেনঝেনের ইয়ানতিয়ান পোর্টের কার্যক্রম বন্ধের কারণে সাংহাই ও হংকং বন্দরে জট লেগে যায়। এছাড়া জুনের বেশির ভাগ সময়েই চীনের গুরুত্বপূর্ণ এই এক্সপোর্ট হাবের মোট সক্ষমতার মাত্র ৩০ শতাংশ কার্যক্রম চালু ছিল। পরবর্তী সময়ে সেই জট ধীরে ধীরে কাটিয়ে উঠতে না উঠতেই নতুন করে চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে বিশ্বের তৃতীয় ব্যস্ততম কনটেইনার পোর্ট নিংবোর সংকট। একজন ডকওয়ার্কার করোনা পজিটিভ শনাক্ত হওয়ার পর ১১ আগস্ট থেকে এক সপ্তাহের জন্য বন্দরটির আংশিক কার্যক্রম বন্ধ ঘোষণা করে কর্তৃপক্ষ। এতে বন্দরটি ঘিরে এক ধরনের অনিশ্চয়তা তৈরি হয়, যা চীনের অন্য বড় বন্দরগুলোর ওপরও চাপ তৈরি করেছে। সাংহাই ও হংকংয়েও নতুন করে জট তৈরি হচ্ছে।
যুক্তরাষ্ট্রের সমুদ্রবাণিজ্যের প্রধান দুটি গেটওয়ে হলো পোর্ট অব লস অ্যাঞ্জেলেস ও পোর্ট অব লং বিচ। কোভিড-১৯ মহামারির শুরুর দিকে এই দুই বন্দরে বার্থিং স্পেসের জন্য স্যান পেড্রো বে-তে অপেক্ষারত জাহাজের সংখ্যা রেকর্ড পর্যায়ে পৌঁছায়। এখন পরিস্থিতি আবার সেদিকেই এগোচ্ছে। গত জুলাইয়ের মাঝামাঝি সময়ে এ দুই বন্দরে বার্থিংয়ের জন্য অপেক্ষারত কনটেইনার জাহাজের সংখ্যা ২০ ছাড়িয়ে যায়। জুনে এ সংখ্যা ছিল ১০।
মূলত ২০২০ সালের শেষ ও চলতি বছরের শুরুর দিকে তীব্র জট দেখতে শুরু করে যুক্তরাষ্ট্রের পশ্চিম উপকূলীয় বন্দরগুলো। এর প্রধান তিনটি কারণ হলো:
ই-কমার্সের উত্থান ও ভোগ্যপণ্যের আমদানি বৃদ্ধি
চীনের উৎপাদন কার্যক্রমে ঊর্ধ্বগতি ও চান্দ্র নববর্ষের ছুটির মধ্যেও কারখানায় উৎপাদন চালু রাখা
করোনার কারণে বন্দরে কর্মীর স্বল্পতা তৈরি হওয়া। এর ফলে মেরিন টার্মিনাল প্রডাক্টিভিটির গতি শ্লথ হয়ে পড়ে।
মহামারির প্রভাব কাটিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে ভোক্তা ব্যয় আবার চাঙ্গা হতে শুরু করেছে। বিশেষ করে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান পুনরায় খুলতে শুরু করায় সামনে এ ব্যয় আরও বাড়বে বলে আশা করা হচ্ছে। চাহিদা বেড়ে যাওয়ায় সরবরাহ বৃদ্ধিরও প্রয়োজনীয়তা দেখা দিয়েছে। এর ফলে দেশটিতে চীনা পণ্য আমদানিতে হঠাৎ করেই জোয়ার তৈরি হয়েছে। আর এই চাপ গিয়ে পড়েছে কনটেইনার পোর্টগুলোর ওপর।
করোনার কারণে কেবল চীন বা যুক্তরাষ্ট্রই নয়, বরং বন্দর কার্যক্রমে অচলাবস্থা তৈরি হয়েছে বিশ্বের প্রায় সব প্রান্তেই। গত মার্চে সিঙ্গাপুর বন্দরে ১৮ হাজার টিইইউ অথবা এর চেয়ে বেশি ধারণক্ষমতার আল্ট্রা-লার্জ কনটেইনার জাহাজের অপেক্ষমাণ থাকার সময় দাঁড়ায় পাঁচ থেকে সাত দিন, যেখানে বন্দরটিতে জাহাজের স্বাভাবিক টার্ন-অ্যারাউন্ড সময় দুদিন। মেরিন ইন্টেলিজেন্স সার্ভিস ইইসির তথ্য অনুযায়ী, জুলাইয়ে হংকং বন্দরে জাহাজের ওয়েটিং রেশিও ছিল ৬৭ শতাংশ। ওকল্যান্ড, স্যাভানাহ, সিয়াটল ও ভ্যাঙ্কুভার বন্দরেও ওয়েটিং রেশিও ছিল ৬৫ শতাংশের ওপরে।
এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের সব দেশই আকাশ ও সমুদ্রপথে পরিবহনের মাধ্যমে বহির্বিশ্বে সঙ্গে সংযুক্ত। মহামারির শুরুর দিকে এসব দেশ করোনাভাইরাস ছড়িয়ে পড়া প্রতিরোধে চলাচলে নিষেধাজ্ঞা আরওপ করে। এতে আকাশ ও সমুদ্রপথে পণ্য পরিবহনের বেশির ভাগ কার্যক্রমই স্থবির হয়ে পড়ে।
করোনার কারণে এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় দেশগুলোর সতর্কতামূলক পদক্ষেপও ছিল কঠোর। অনেক দেশেই বহিরাগতদের জন্য ১৪ দিনের কোয়ারেন্টিন বাধ্যতামূলক করা হয়। এই নিয়মের কারণে এসব দেশে পণ্যবাহী জাহাজের স্বাভাবিক কার্যক্রম ব্যাহত হয়। এই প্রতিবন্ধকতার কারণে কিছু শিপিং কোম্পানি তাদের শিডিউল ও রুট পরিবর্তন করে। আবার যারা শিডিউল অপরিবর্তিত রেখেছে, তাদের কেউ কেউ গ্রাহকদের কাছ থেকে কোয়ারেন্টিন সারচার্জ নিয়েছে। কেউ আবার কোয়ারেন্টিনজনিত বিলম্বের ক্ষতি পুষিয়ে নিতে সংশ্লিষ্ট দেশের সরকারের কাছ থেকে আর্থিক সহায়তা দাবি করেছে।
মহামারির কারণে এশিয়া-প্যাসিফিক দেশগুলোর ভোক্তাবাজারে আমূল পরিবর্তন ঘটেছে। অতিমারির শুরুর দিকে ভোক্তা চাহিদায় ধস নামলেও প্রথম প্রবাহ শেষে তা হঠাৎ বেড়ে যায়।
কোভিড-১৯ মহামারির কারণে সারা বিশ্বেই অর্থনৈতিক মন্দা নেমে এসেছে। এই মন্দার কারণে বৈশ্বিক শিল্পোৎপাদন ও ম্যানুফ্যাকচারিং কার্যক্রমে স্থবিরতা নেমে আসে। পরিবর্তন এসেছে ভোক্তা ব্যয় ও চাহিদার প্যাটার্নে। আসলে এই মহামারি ব্যবসায়িক পরিবেশেই পরিবর্তন এনেছে। এর প্রত্যক্ষ প্রভাব পড়েছে শিপিং ও লজিস্টিকস মার্কেটেও। বৈশ্বিক অর্থনীতির নিম্নগামিতায় মেরিটাইম ট্রেড ও পোর্ট ট্রাফিকও পতনমুখী হয়েছে।

জাহাজের অপেক্ষার সময় ২০১৯ সালের তুলনায় দ্বিগুণ
নভেল করোনাভাইরাসের প্রথম প্রবাহের স্থবিরতা কাটিয়ে ভোক্তা চাহিদা ফের চাঙ্গা হতে শুরু করায় পণ্য সরবরাহ ব্যবস্থায় তৈরি হয়েছে বাড়তি চাপ। সেই চাপ সামলাতে রীতিমতো হিমশিম খাওয়ার জোগাড় বৈশ্বিক শিপিং খাতের। বাণিজ্য বেড়ে যাওয়ায় বন্দরগুলোয় পণ্য ও জাহাজজটের ঘটনা বেড়েছে। চলতি বছর এখন পর্যন্ত ব্যস্ততম বন্দরগুলোর নিয়মিত চিত্র এটি। আইএইচএস মার্কিটের বিশ্লেষণ বলছে, বর্তমানে কনটেইনার জাহাজগুলোকে বার্থিংয়ের জন্য গড়ে যতটা সময় অপেক্ষা করতে হচ্ছে, ২০১৯ সালের তুলনায় তা দ্বিগুণের বেশি।
আইএইচএস মার্কিট বলছে, ভোক্তা চাহিদা বেড়ে যাওয়া, যন্ত্রপাতির সংকট ও মহামারির অন্যান্য প্রভাবের কারণেই মূলত বন্দরে জাহাজগুলোর বার্থিংয়ে বিলম্ব হচ্ছে। বিশ্ববাণিজ্যের পুনরুদ্ধারের গতি আরও ত্বরান্বিত হওয়া এবং এর ব্যাপকতা বেড়ে যাওয়ায় বন্দরের এই জটিলতা আরও কিছুদিন অব্যাহত থাকবে বলে মনে করছে প্রতিষ্ঠানটি।
আইএইচএস মার্কিটের পোর্ট পারফরম্যান্স ডাটা বলছে, চলতি বছরের মে মাসে উত্তর আমেরিকার বন্দরগুলোয় জাহাজগুলোকে গড়ে সবচেয়ে বেশি ৩৩ ঘণ্টা সময় অ্যাংকরিংয়ে কাটাতে হয়েছে, ২০১৯ সালের একই সময়ে যা ছিল মাত্র আট ঘণ্টা। পোর্ট অব লং বিচ ও লস অ্যাঞ্জেলেসের বন্দরগুলোয় বিলম্ব সবচেয়ে বেশি হয়েছে। আইএইচএস মার্কিট বলছে, উত্তর আমেরিকার এই বন্দরগুলোর মতো অবস্থা বিশ্বের প্রায় সব শীর্ষ বন্দরেরই।
সংকটের নেপথ্যে…
বৈশ্বিক রপ্তানি বাণিজ্যে চীনের একক অংশীদারত্ব ১৪ দশমিক ৭ শতাংশ, যা সর্বোচ্চ। ৮ দশমিক ১ শতাংশ অংশীদারত্ব নিয়ে দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। ২০১৯ সালে চীনের রপ্তানি বাণিজ্যের পরিমাণ ছিল ১৭ লাখ ২৩ হাজার কোটি ইউয়ান। ২০২০ সালে সেটি বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৭ লাখ ৯৩ হাজার কোটি ইউয়ানে।
২০১৯ সালের প্রথম ছয় মাসে চীনের রপ্তানি বাণিজ্যের পরিমাণ ছিল ৭ লাখ ৯৫ হাজার কোটি ইউয়ান। ২০২০ সালের প্রথমার্ধে তা কমে দাঁড়ায় ৭ লাখ ৭১ হাজার কোটি ইউয়ানে। তবে চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে চীনা রপ্তানি আগের দুই বছরের তুলনায় বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৯ লাখ ৮৫ হাজার কোটি ইউয়ান। অর্থাৎ করোনার উৎপত্তিস্থল হলেও প্রাথমিক ধাক্কা সামলে ফের চাঙ্গা হতে শুরু করেছে চীনের রপ্তানি বাণিজ্য।
করোনা প্রতিরোধে টানা ৭৬ দিন লকডাউনের বিধিনিষেধ কার্যকর রাখার পর ২০২০ সালের এপ্রিলে সংক্রমণ কিছুটা নিয়ন্ত্রণে আসায় কিছু শর্ত জুড়ে দিয়ে জনসাধারণকে বাইরে চলাচলের অনুমতি দেয় চীন। জুলাইয়ে শর্ত তুলে নিলে শিল্পকারখানা পুরোদমে উৎপাদন শুরু করে। তখনো বিশ্বর অধিকাংশ দেশ করোনাভাইরাস সংক্রমণের কঠিন সময় পার করছিল। এ সময়ে যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) ও অন্যান্য দেশে সুরক্ষা ও চিকিৎসাসামগ্রীর চাহিদা বেড়ে যায়। ফলে চীন থেকে প্রচলিত রপ্তানি পণ্যের বাইরে চিকিৎসাসামগ্রী রপ্তানির সুযোগ তৈরি হয়। এছাড়া অক্টোবরে প্রজাতন্ত্র দিবসের ছুটির আগে বড়দিনকে কেন্দ্র করে উত্তর আমেরিকার দেশগুলোর বাড়তি চাহিদা পূরণের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করে চীন। শ্লথ হয়ে আসা রপ্তানি বাণিজ্য পুনরুদ্ধারের এই সুযোগ ব্যবহারে দেশটি পুরোদমে কাজে নেমে পড়ে। চীনের রপ্তানি বাণিজ্যের অন্যতম অংশীদার যুক্তরাষ্ট্র ও ইইউভুক্ত দেশগুলোয় আগস্ট থেকে ক্রমান্বয়ে রপ্তানি অস্বাভাবিক হারে বাড়তে শুরু করে। অন্যদিকে অভ্যন্তরীণ পরিবহন সক্ষমতা কমিয়ে আনা, স্বল্প জনবলে বন্দর ও আইসিডি পরিচালনা, সংক্রমণ রোধে জাহাজের কোয়ারেন্টিন নিশ্চিত করার কারণে যুক্তরাষ্ট্র ও ইইউ দেশগুলোর বন্দরে জাহাজ ভিড়তে দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হয়েছে। এতে জাহাজজট দেখা দেয়। এছাড়া করোনার আগে যেখানে রপ্তানি করা কনটেইনারের পণ্য খালাস করে বন্দরে ফেরত আনতে এক থেকে দুদিন সময় লাগত, সেখানে এক সপ্তাহের বেশি সময় লেগেছে পণ্য আনস্টাফিংয়ে জনবল ও পরিবহন সংকটের কারণে। বিশ্বের অন্যতম প্রভাবশালী ম্যাগাজিন ফোর্বস বলছে, জাহাজজটে কনটেইনার টার্ন-অ্যারাউন্ড টাইম (আমদানিকারকের দেশে পণ্য খালাস করে আবার রপ্তানিকারক দেশে ফেরত আসার গড় সময়) ৬০ দিন থেকে বেড়ে ১০০ দিনে গিয়ে দাঁড়ায়। ফলে বিপুল পরিমাণ পণ্যবাহী কনটেইনার জাহাজে আটকে থাকায় সংকট দেখা দেয়, বেড়ে যায় কনটেইনার ভাড়া।
রপ্তানি বাণিজ্যে নিজেদের অবস্থান ধরে রাখতে এ সময় আরেকটি পন্থা অবলম্বন করে চীন। দেশটি কনটেইনার দ্রুত ফিরিয়ে আনার জন্য শিপিং লাইনগুলোকে বাড়তি ভাড়া দেওয়া শুরু করে। অর্থাৎ রপ্তানিকৃত পণ্য খালাসের পর কিছুদিন অপেক্ষা করে পণ্যভর্তি কনটেইনার চীনে ফেরত পাঠানোর চেয়ে দ্রুত খালি কনটেইনার পাঠানো অধিক লাভজনক হয়ে ওঠে। এছাড়া কিছু ক্ষেত্রে দীর্ঘ সময়ের জন্য কনটেইনার বুকিং নেয় চীন। ফলে শিপিং লাইনগুলো অধিক লাভ নিশ্চিত করতে অন্য রুটে কনটেইনার বুকিং উল্লেখযোগ্য হারে কমিয়ে দেয়। কারণ শিপিং কোম্পানিগুলো স্বাভাবিকভাবেই কনটেইনার বুকিংয়ে মুনাফা ও কৌশলগত গুরুত্বের ওপর জোর দিয়েছে। এই সময় চীনের আমদানি-রপ্তানি কনটেইনারের অনুপাত গিয়ে দাঁড়ায় ১:৩। অর্থাৎ তিন কনটেইনার পণ্য রপ্তানির বিপরীতে আমদানি হতো এক কনটেইনার পণ্য। ফলে অন্যান্য রপ্তানিকারক দেশ চাহিদা অনুযায়ী কনটেইনার বুকিং পায়নি। একদিকে লকডাউনের কারণে বিশ্বের বিভিন্ন বন্দর থেকে কনটেইনার পরিবহন বন্ধ থাকা; অন্যদিকে চীনের রপ্তানি বাণিজ্যে অংশীদারিত্ব ধরে রাখার অদমনীয় প্রবণতার কারণেই মূলত কনটেইনার সংকটের সূত্রপাত।
তবে কনটেইনারজটের জন্য চীনকে এককভাবে দায়ী করা মোটেই সমীচীন হবে না। কারণ কনটেইনার পরিবহন ব্যবস্থার দুর্বলতা আগে থেকেই ছিল। চীন সেটিকে সামনে এনেছে মাত্র। কনটেইনারজটের ক্ষেত্রে আরও বেশ কয়েকটি প্রভাবক কাজ করেছে। যেমন-

ব্ল্যাংক সেইলিং: একটি শিপিং লাইন যখন তার নিয়মিত রুটে জাহাজ চলাচল বন্ধ করে দেয়, চলাচল কমিয়ে আনে বা যাত্রাপথে রুটের কোনো একটি বা একাধিক বন্দরে নোঙর না করে ফিরে আসে, তখন সেটিকে ব্ল্যাংক সেইলিং বলে। করোনা সংক্রমণ চীন থেকে বিশে^র অন্যান্য দেশে ছড়িয়ে পড়া শুরু করলে প্রত্যাশিত পণ্য পরিবহন না হওয়ায় শিপিং কোম্পানিগুলো ব্ল্যাংক সেইলিং শুরু করে। এতে বিপাকে পড়ে পণ্য রপ্তানিকারকরা। জাহাজের ধারণক্ষমতার অত্যধিক খালি থেকে গেলে বা স্ট্রিংস (একটি শিপিং কোম্পানি নিয়মিত রুটে সপ্তাহে বা মাসে কয়বার জাহাজ পরিচালনা করবে, তার শিডিউল) কমিয়ে আনলে ব্ল্যাংক সেইলিং হয়। করোনার কারণে এই দুটিই হয়েছে। বাণিজ্যবিষয়ক পরিসংখ্যান নিয়ে কাজ করা স্ট্যাটিস্টার তথ্যমতে, করোনা সংক্রমণের শুরুর দিকে ২০২০ সালের মার্চে ইউরোপ-এশিয়া রুটে ব্ল্যাংক সেইলিং হয়েছে ২৯টি। প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে হয়েছে ৪৮টি, যা করোনা সংক্রমণ শুরুর পর থেকে এক মাসে সর্বোচ্চ। গত বছরের জানুয়ারি থেকে চলতি বছরের এপ্রিল পর্যন্ত মোট ৯১৯টি ব্ল্যাংক সেইলিং হয়েছে। মহামারির প্রাথমিক ধাক্কা কাটিয়ে বিশ্বের রপ্তানিমুখী দেশগুলো যখন বাণিজ্য পুনরুদ্ধারে তৎপর হয়ে উঠেছে, তখনো শিপিং কোম্পানিগুলো নিয়মিত রুটগুলোয় জাহাজ পরিচালনা বাড়ায়নি। ফলে জাহাজে পণ্য পরিবহনে কাক্সিক্ষত হারে স্পেস বরাদ্দ পায়নি রপ্তানিকারকরা। এ কারণে তাদের পণ্য রপ্তানিতে দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হয়েছে।
নতুন কনটেইনার উৎপাদন কমে যাওয়া: কনটেইনার সংকটের আরেকটি কারণ হিসেবে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমগুলো জানিয়েছে, গত কয়েক বছরের তুলনায় ২০২০ সালে নতুন কনটেইনার উৎপাদন কমেছে। এক বছরে ব্যবহার অনুপযোগী কনটেইনারের (স্ক্র্যাপ ঘোষিত) সংখ্যার চেয়ে উৎপাদনের পরিমাণ কম হওয়াকে সংকটের একটি কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। আলফা লাইনার, ক্লার্কসন ও আইএমএফের সূত্র উল্লেখ করে একটি পরিসংখ্যান দেওয়া হয়েছে গণমাধ্যমগুলোয়। এতে দেখা যায়, ২০১৮ সালে ২৫ লাখ কনটেইনার স্ক্র্যাপ ঘোষণা করা হয়, বিপরীতে উৎপাদন হয় ৪৪ লাখ। ২০১৯ সালে ১৪ লাখ কনটেইনার স্ক্র্যাপের বিপরীতে ২৫ লাখ নতুন কনটেইনার উৎপাদন হয়েছে। এই দুই বছরে স্ক্র্যাপ ঘোষণার তুলনায় উৎপাদনের পরিমাণ বেশি ছিল। তবে গত বছর অর্থাৎ ২০২০ সালে ৩৪ লাখ কনটেইনার স্ক্র্যাপ ঘোষণার বিপরীতে উৎপাদিত হয়েছে ২০ লাখ কনটেইনার। ফলে কনটেইনারের বৈশ্বিক বহরের আকার হ্রাস পেয়েছে। গত বছরের শেষের দিকে নতুন কনটেইনারের চাহিদা বেড়ে যাওয়ায় দামও বেড়ে যায়।

সুয়েজ খালে প্রতিবন্ধকতা: বিশ্বের অন্যতম ব্যস্ততম বাণিজ্যপথ সুয়েজ খালে চলতি বছরের মার্চে বড় ধরনের অচলাবস্থা তৈরি হয়। দানবাকার কনটেইনার জাহাজ এভার গিভেন আটকে যায় সেখানে। এর ফলে টানা ছয়দিন ব্যস্ততম এই রুটে জাহাজ চলাচল বন্ধ ছিল। এই অচলাবস্থা করোনাসৃষ্ট সংকটকে আরও প্রকট করেছে। ছয়দিন সুয়েজ খালে জাহাজ চলাচল বন্ধ থাকায় খালের দুই পাশে ৪৫০টি জাহাজ পারাপারের অপেক্ষায় ছিল। ফলে পণ্য পৌঁছাতে জাহাজগুলোর ১১ দিন পর্যন্ত বেশি সময় লেগেছে। একইভাবে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপ থেকে এশিয়ার বন্দরগুলোয় খালি কনটেইনার আসা বাধাগ্রস্ত হয়েছে। ফলে কনটেইনার সংকটের তীব্রতা বেড়েছে। পরিসংখ্যান বলছে, প্রতি ১০ কনটেইনার রপ্তানির বিপরীতে উত্তর আমেরিকা ও ইউরোপীয় দেশগুলো থেকে মাত্র চারটি কনটেইনার ফেরত এসেছে এই সময়ে। জটের কারণে কিছু শিপিং কোম্পানি তাদের ভাড়া ৪৭ শতাংশ পর্যন্ত বাড়িয়েছে। সুয়েজ খালের দুর্ঘটনা কনটেইনার প্রাপ্তির সময়কে প্রলম্বিত করেছে।
সংকটের বাইরে নয় বাংলাদেশও
তৈরি পোশাকনির্ভর রপ্তানি বাণিজ্যে বাংলাদেশের বড় ক্রেতা যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্যসহ ইইউ দেশগুলো। রপ্তানি বাণিজ্যের প্রায় শতভাগ পণ্য পরিবহন হয় চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে। কনটেইনার সংকট কিংবা কনটেইনারজট যেটিই হোক না কেন, প্রথমেই আলোচনায় আসে চট্টগ্রাম বন্দর। পণ্য আমদানি-রপ্তানির অন্যতম নিয়ন্তা হিসেবে যেকোনো সংকট সামনে থেকে সামাল দিতে হয় চট্টগ্রাম বন্দরকে।
কনটেইনার হ্যান্ডলিং সক্ষমতার ঘাটতি আর কনটেইনারজটের বিষয় দুটিকে এক করে দেখলে চলবে না। আমদানিকারকরা যখন বন্দর থেকে নির্দিষ্ট সময় পণ্যভর্তি কনটেইনার খালাস নেন না, তখন বন্দরের ইয়ার্ডে কনটেইনারের সংখ্যা দ্রুত বাড়তে থাকে। এ সংখ্যা যখন ধারণক্ষমতার কাছাকাছি চলে যায়, তখন জাহাজ থেকে কনটেইনার খালাস করে রাখার জায়গাস্বল্পতায় জটের সৃষ্টি হয়। কারণ কনটেইনার হ্যান্ডলিংয়ের যন্ত্রপাতি চলাচলের জন্য ইয়ার্ডের ৩০ শতাংশ জায়গা খালি রাখতে হয়। করোনা মহামারি শুরুর পর সাধারণ ছুটিতে গত বছরের এপ্রিলে ও চলতি বছরের জুলাইয়ে কনটেইনারজটের সৃষ্টি হয়। জট নিরসনে প্রথমে কনটেইনারের ভাড়া মওকুফ ও পরে নির্দিষ্ট সময়ে পণ্য খালাস না করলে জরিমানা আরোপের মতো পদক্ষেপ নেওয়া হলেও প্রথম দফা সাধারণ ছুটিতে কনটেইনারের জট কমানো যায়নি। পরে জট কমাতে নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের সুপারিশে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) বন্দর থেকে সব ধরনের পণ্য বেসরকারি আইসিডিতে সরিয়ে নেওয়া ও খালাসের অনুমোদন দেয় নির্দিষ্ট সময়ের জন্য। এতে পরিস্থিতির উন্নতি হয়। চলতি বছরের জুলাইয়ে পূর্ব অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে বন্দর কর্তৃপক্ষ ঈদের ছুটির আগে আমদানি-সংশ্লিষ্ট সব পক্ষকে নির্দিষ্ট সময়ে কনটেইনার খালাস নেওয়ার অনুরোধ করে চিঠি দেয়। আগাম সতকর্তা হিসেবে কর্তৃপক্ষের এমন পদক্ষেপে আমদানিকারকরা সায় দেয়নি। ফলে ২৩ জুলাই থেকে শুরু হওয়া লকডাউনে পণ্য খালাস একেবারে কমে যায়। গড়ে তিন হাজারের অধিক কনটেইনার থেকে দুই অংকের ঘরে নেমে আসে কনটেইনার খালাসের সংখ্যা। বাধ্য হয়ে পুরনো পথে হাঁটতে হয়েছে কর্তৃপক্ষকে। এনবিআরের অনুমোদনে আবারও আমদানি করা পণ্যবাহী কনটেইনার বেসরকারি আইসিডিতে নিয়ে খালাসের নির্দেশনা দেওয়া হয়। এছাড়া বন্দর কর্তৃপক্ষের ফোর্স লোডিংয়ের কারণেও বন্দরের ইয়ার্ডে কনটেইনারের সংখ্যা কমেছে।
চলতি বছরের দ্বিতীয় প্রান্তিকে কনটেইনার সংকট প্রকট হয়েছে পণ্য রপ্তানির জন্য পর্যাপ্ত কনটেইনার বুকিং না পাওয়ার কারণে। এক্ষেত্রে চীনের একচেটিয়া কনটেইনার বুকিং, ব্ল্যাংক সেইলিং ও নতুন কনটেইনারের সংখ্যা হ্রাস পাওয়াকে কারণ হিসেবে দেখা যেতে পারে। এছাড়া অধিক মুনাফার আশায় শিপিং কোম্পানিগুলো চীন-ইউরোপ ও চীন-যুক্তরাষ্ট্র রুটে অধিক সংখ্যক জাহাজ পরিচালনা করার ফলে আফ্রিকা, অস্ট্রেলিয়া ও নিউজিল্যান্ডসহ বেশকিছু দেশে বিপুল সংখ্যক কনটেইনার অলস পড়ে আছে দীর্ঘদিন, যা সংকটকে দীর্ঘায়িত করেছে।
চট্টগ্রাম বন্দর থেকে মূলত ফিডার ভেসেল (মাঝারি আকারের জাহাজ) পণ্যবাহী কনটেইনার নিয়ে ট্রান্সশিপমেন্ট বন্দরে যায়। সেখান থেকে কনটেইনার পুনরায় বড় জাহাজে বোঝাই করে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের দেশগুলোয় নিয়ে যাওয়া হয়। বাংলাদেশ থেকে রপ্তানি হওয়া ৪৪ শতাংশ পণ্য সিঙ্গাপুর বন্দর, ৩৭ শতাংশ শ্রীলংকার কলম্বো বন্দর, ১২ শতাংশ তানজুং বন্দর ও অবশিষ্ট ৭ শতাংশ পণ্য পোর্ট ক্ল্যাং হয়ে রপ্তানি হয়। চীন থেকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইইউ দেশগুলোয় পণ্য রপ্তানি বৃদ্ধি, এককভাবে চীন কর্তৃক বিপুল সংখ্যক কনটেইনার বুকিং করে রাখা ও ব্ল্যাংক সেইলিংয়ের কারণে ট্রান্সশিপমেন্ট বন্দরগুলোয় বড় জাহাজে বুকিং পেতে দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হয়েছে। এছাড়া ক্রেতা দেশের বন্দরগুলোয় জটের কারণে খালি কনটেইনার ফেরত আসতেও আগের চেয়ে বেশি সময় লাগছে।
গত বছরের নভেম্বর থেকে বাংলাদেশ থেকে রপ্তানি ও বাংলাদেশমুখী আমদানি পণ্য পরিবহনে ফিডার ভেসেল অপারেটররা সাময়িক সারচার্জ (বাড়তি ভাড়া) আরওপ করে। এর কারণ হিসেবে তারা বলেছে, কলম্বো বন্দরে বার্থিং পেতে দুদিন ও সিঙ্গাপুর বন্দরে বার্থিং পেতে পাঁচদিন পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হয়েছে, যা বড় জাহাজে কনটেইনার বোঝাইয়ের বুকিং পেতে অনিশ্চয়তার সৃষ্টি করেছে। সিঙ্গাপুরভিত্তিক শিপিং লাইন ফার শিপিং ১৫ নভেম্বর থেকে চট্টগ্রাম-কলম্বো রুটে পণ্যবাহী কনটেইনারের ওপর অতিরিক্ত ৭৫ ডলার ও খালি কনটেইনার পরিবহনে ৩৭ দশমিক ৫ ডলার সারচার্জ আরওপ করে। ট্রান্সওয়ার্ল্ড ফিডার সার্ভিসও চট্টগ্রাম-কলম্বো ও চট্টগ্রাম-পোর্ট ক্ল্যাং-সিঙ্গাপুর রুটে সারচার্জ কার্যকর করে ২০ নভেম্বর থেকে।
আগে থেকেই এশিয়ার দেশগুলো কনটেইনার সংকটে থাকলেও চলতি বছরের জুন থেকে বাংলাদেশের কনটেইনার স্বল্পতার সংকট প্রকট আকার ধারণ করে। করোনা সংকটের মধ্যে দেশের পোশাক খাত ঘুরে দাঁড়ানো শুরু করে গত বছরের জুলাই থেকে। চলতি বছরের শুরু থেকেই ক্রয়াদেশ বৃদ্ধি পাওয়ায় রপ্তানিও বেড়েছে। পণ্য পরিবহনের এই বাড়তি চাপ মোকাবেলায় চট্টগ্রাম বন্দর পুরোদমে প্রস্তুত থাকলেও কনটেইনার সংকট ও জাহাজে বুকিং না পাওয়ায় কাক্সিক্ষত লক্ষ্যমাত্রা অর্জন সম্ভব হয়নি। স্বাভাবিক সময়ে যে পরিমাণ পণ্যবাহী কনটেইনার জাহাজীকরণ হতো, এ সময় তা উল্লেখযোগ্য হারে কমে আসে। এতে রপ্তানিমুখী পণ্য হ্যান্ডলিং করা ১৯টি বেসরকারি আইসিডিতে পণ্যের স্তূপ জমে যায়। ফলে পণ্য ক্রেতার হাতে পৌঁছাতে ২০ থেকে ২৫ দিন বাড়তি সময় লেগেছে। অতিমারির সংকট কাটিয়ে ব্যবসায়ীরা যখন কিছুটা স্বস্তি বোধ করছিলেন, তখনই কনটেইনারজটের এ সংকট দুশ্চিন্তার উদ্রেক করে। ৫ জুলাই পর্যন্ত ১৪ হাজারের বেশি কনটেইনারের পণ্য আইসিডিগুলোয় জমেছিল।
৪০ ফুট দৈর্ঘ্যরে কনটেইনার সংকট
বাংলাদেশে আমদানি করা পণ্যের অধিকাংশ আসে চীন থেকে। পোশাক তৈরির কাঁচামাল, ইলেকট্রনিকস পণ্য, প্রসাধনী, ফল, মসলা, ছোট যন্ত্রপাতিসহ বেশকিছু পণ্য আমদানি হয় কনটেইনারে। শিপিং কোম্পানিগুলোর তথ্যমতে, ২০ ফুট ও ৪০ ফুট দৈর্ঘ্যরে প্রায় সমান সংখ্যক কনটেইনার ব্যবহার হয় পণ্য আমদানিতে। অন্যদিকে বাংলাদেশ থেকে ইউরোপ ও আমেরিকায় পোশাক রপ্তানিতে ৪০ ফুট দৈর্ঘ্যরে কনটেইনারকে প্রাধান্য দেন ক্রেতারা। জাহাজ ভাড়া, কনটেইনার হ্যান্ডলিং চার্জ ও অভ্যন্তরীণ পরিবহন খরচ সাশ্রয়ে ক্রেতারা এমন নির্দেশনা দিয়ে আসছেন অনেক আগে থেকেই। ফলে যে পরিমাণ ৪০ ফুট দৈর্ঘ্যরে কনটেইনার দেশে আসে, তার চেয়ে বেশি কনটেইনারের চাহিদা থাকে সবসময়। এছাড়া বিশ্বর নামিদামি পোশাকের ব্র্যান্ডগুলো পণ্য দ্রুততম সময়ে পাওয়ার জন্য যেসব জাহাজ পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠান চট্টগ্রাম থেকে বেশি সংখ্যক জাহাজ পরিচালনা করে, তাদের মাধ্যমে পণ্য পরিবহনের ওপর জোর দেয়। এতে নির্দিষ্ট কিছু প্রতিষ্ঠানের ওপর নির্ভরশীলতা তৈরি হয়েছে।
সংকট কাটাতে সচেষ্ট চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ
ওপরের আলোচনা থেকে এটা স্পষ্টতই প্রতীয়মান হয় যে, চট্টগ্রাম বন্দরে কনটেইনারজটের জন্য বন্দর কর্তৃপক্ষ দায়ী নয়। বন্দরের হ্যান্ডলিং সক্ষমতা পর্যাপ্ত না থাকায় যে এমনটি হচ্ছে, তা কিন্তু নয়। বরং বৈশ্বিক বিভিন্ন প্রভাবকের কারণেই এই সংকট তৈরি হয়েছে। নিজেদের দায় না থাকলেও চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ দেশের আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্য স্বাভাবিক রাখার স্বার্থে নিজেদের অবস্থান থেকে সম্ভাব্য সব চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।
আমদানি-রপ্তানি পণ্য হ্যান্ডলিং ও নির্দিষ্ট সময়ের জন্য সংরক্ষণ করা চট্টগ্রাম বন্দরের মূল কাজ। পণ্যের শুল্কায়ন ও ছাড়পত্র নিতে হয় কাস্টমস কর্তৃপক্ষ ও সংশ্লিষ্ট দপ্তর থেকে। এছাড়া পণ্য খালাস ও জাহাজীকরণে ফ্রেইট ফরোয়ার্ডার, সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট ও শিপিং এজেন্টদের কাজের মধ্যে সমন্বয় থাকতে হয়। রপ্তানি পণ্যের প্রায় শতভাগ কনটেইনারে বোঝাই করা হয় বেসরকারি আইসিডিগুলোয়। আইসিডি থেকে বন্দরের ইয়ার্ডে আনার পর কনটেইনার নির্দিষ্ট সময়ে জাহাজীকরণের কাজটি করে কর্তৃপক্ষ। কনটেইনার সংকট প্রকট আকার ধারণ করলে রপ্তানিকারকদের সংগঠনগুলো উদ্ভূত পরিস্থিতিতে সরকারের সহযোগিতা চায়। চট্টগ্রাম বন্দর স্বপ্রণোদিত হয়ে সংকট মোকাবেলায় সাতটি সুপারিশ বাস্তবায়নের ওপর জোর দেয়। এগুলোর মধ্যে শ্রীলংকা ও সিঙ্গাপুরের হাইকমিশনারদের প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে অনুরোধ করা, মেইন লাইন অপারেটর ও ফিডার ভেসেল অপারেটরদের মধ্যে কমন ক্যারিয়ার এগ্রিমেন্ট (সিসিএ) ও ডিরেক্ট ইন্টারচেঞ্জ (ডিআই) প্রথা চালু করা, বায়ার কর্তৃক নির্দিষ্ট শিপিং লাইন নির্ধারণ না করার অনুরোধ ও সরাসরি আমদানিকারকের দেশে জাহাজ পরিচালনার অনুরোধ করা ছিল অন্যতম। এছাড়া গত জুলাইয়ে এক জরুরি সভায় আরও কিছু গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। এগুলোর মধ্যে কলম্বোগামী ফিডার ভেসেলকে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে বার্থিং দেওয়া, মায়েরস্ক শিপিং লাইনকে চট্টগ্রাম-কলম্বো রুটে ন্যূনতম তিনটি ফিডার ভেসেল চালুর জন্য প্রিন্সিপালের সঙ্গে সমন্বয় করা ও আগ্রহী নতুন ফিডার ভেসেল অপারেটরদের অগ্রাধিকার ভিত্তিতে অনুমোদন দেওয়া অন্যতম। নির্দিষ্ট শিপিং লাইন ও আইসিডি নির্ধারণ করে না দেওয়ার জন্য পুনরায় বায়ারদের সঙ্গে আলোচনার জন্য বিজিএমইএকে অনুরোধ করে বন্দর কর্তৃপক্ষ।
জাহাজ পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠানগুলো বলছে, সংকট কাটাতে সিসিএ বাস্তবায়নে চট্টগ্রাম বন্দরের প্রস্তাব প্রশংসনীয়। এতে জাহাজে পর্যাপ্ত জায়গা থাকা সাপেক্ষে একটি শিপিং লাইনে অন্য শিপিং লাইনের কনটেইনার পরিবহনের সুযোগ তৈরি হয়। তবে ডিআই বাস্তবায়ন করা কঠিন হবে বলছে শিপিং কোম্পানিগুলো। তাদের মতে, এ প্রথা অনুযায়ী একটি প্রতিষ্ঠানের কনটেইনার অপর একটি প্রতিষ্ঠানকে ভাড়া দিলে তা কীভাবে ও কত সময়ের মধ্যে ফেরত দেওয়া হবে, সে বিষয়ে অনিশ্চয়তা থেকে যায়। ফলে নিজেদের পণ্য পরিবহন ব্যাঘাত ঘটার আশঙ্কায় ডিআইপ্রথা অনুসরণ করতে চায় না প্রতিষ্ঠানগুলো।
সহসাই সমাধান হচ্ছে না বৈশ্বিক সংকটের
জাহাজ পরিচালনাকারী ও কনটেইনার লিজিং প্রতিষ্ঠানগুলোর বরাত দিয়ে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম বলছে, কনটেইনারের এই সংকট সহসাই কাটছে না। কারণ এখনো অনেক দেশ করোনার কারণে সীমিত জনবল দিয়ে বন্দর, আইসিডি ও পণ্য পরিবহন চেইন চালু রেখেছে। এতে কনটেইনার খালাসের গতি কমেছে, পণ্য পরিবহনে সময় লাগছে এবং অসম বাণিজ্যের কারণে কনটেইনার পরিবহন বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। সেই সঙ্গে পাল্লা দিয়ে ভাড়া বাড়ছে। বাংলাদেশ থেকে জাহাজ পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠানগুলো ৫০ থেকে ৭০ শতাংশ পর্যন্ত ভাড়া বাড়িয়েছে। এছাড়া নতুন কনটেইনারের উৎপাদন আগের ছন্দে ফিরে আসতে সময় লাগবে। ফলে আগামী বছর পর্যন্ত কনটেইনারের সংকট থাকবে বলে আভাস দিচ্ছেন মেরিটাইম-সংশ্লিষ্ট এজেন্সিগুলো।
সর্বোচ্চ সেবা দিতে প্রস্তুত চট্টগ্রাম বন্দর
চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় বন্দরের কনটেইনার ও জাহাজজট পরিস্থিতিতে অনেকটাই উন্নতি হয়েছে। রটারডাম, অ্যান্টওয়ার্প, সিঙ্গাপুর ও পোর্ট ক্ল্যাংয়ের মতো বন্দরগুলো যেখানে জাহাজজটের কারণে বার্থিংয়ে ১০ দিন পর্যন্ত সময় নিচ্ছে; সেখানে আগস্টের প্রথম ১৫ দিনের পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, চট্টগ্রাম বন্দরে এখন কনটেইনারবাহী জাহাজ একদিনেই বার্থিংয়ের সুযোগ পেয়েছে। এছাড়া তিনটি শিফটে পুরোদমে হ্যান্ডলিং চালু থাকায় জাহাজের টার্নঅ্যারাউন্ড সময়ও কমে এসেছে, যা করোনাকালীন পরিস্থিতিতেও সন্তোষজনক বলছে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম।
