চলমান করোনা মহামারি বিশ্ববাণিজ্য তথা সমুদ্রবন্দরগুলোকে নানা প্রতিকূলতার মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছে। এসব প্রতিকূলতার মধ্যে অন্যতম কনটেইনার সংকট এবং কনটেইনারজট। যখন কোনো বন্দরে কনটেইনারের সংখ্যা ধারণক্ষমতার চেয়ে বেশি হয়ে যায়, তখন তা জটের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। আর এই কনটেইনারজট বন্দরের কাজের গতিশীলতা কমায়। অন্যদিকে যখন কোনো বন্দর দিয়ে পণ্য রপ্তানির সময় পর্যাপ্ত সংখ্যক কনটেইনার পাওয়া যায় না, তখন সেই ঘাটতি রপ্তানি বাণিজ্যকে বাধাগ্রস্ত করে। কনটেইনারজট ও কনটেইনারস্বল্পতা-এ দুটোই এখন বৈশ্বিক সংকট হয়ে দাঁড়িয়েছে। ২০১৯ সালের তুলনায় ২০২০ সালে বিশ্বের ব্যস্ত বন্দরগুলোয় জাহাজের অপেক্ষমাণ সময় বেড়েছে দ্বিগুণের বেশি। আর সেই প্রভাব পড়েছে চট্টগ্রাম বন্দরের ওপর।
করোনার প্রথম ঢেউ সামাল দেওয়ার পর ভোক্তা চাহিদায় হঠাৎ উত্থানের কারণে দেশে দেশে আমদানি বেড়ে যাওয়া, শীর্ষ শিল্পোৎপাদক দেশগুলো পণ্য উৎপাদন ও সরবরাহ বাড়িয়ে দেওয়া, ই-কমার্সের জোয়ার, জাহাজের ব্ল্যাংক সেইলিং, নতুন কনটেইনার উৎপাদন কমে যাওয়াসহ আরও কিছু কারণে এই কনটেইনার সংকট তৈরি হয়েছে। এই সংকট বৈশ্বিক হওয়ার কারণে বাংলাদেশের একার পক্ষে তা দূর করা সম্ভব নয়। তবে এর প্রভাব যেন দেশের আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্যের ওপর কম পড়ে, তা নিশ্চিত করতে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ এরই মধ্যে কিছু উদ্যোগ নিয়েছে।
চট্টগ্রাম বন্দর সংকট মোকাবিলায় সাতটি সুপারিশ বাস্তবায়নের ওপর জোর দেয়। এগুলোর মধ্যে শ্রীলংকা ও সিঙ্গাপুরের হাইকমিশনারদের প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে অনুরোধ করা, মেইন লাইন অপারেটর ও ফিডার ভেসেল অপারেটরদের মধ্যে কমন ক্যারিয়ার এগ্রিমেন্ট (সিসিএ) ও ডিরেক্ট ইন্টারচেঞ্জ (ডিআই) প্রথা চালু করা, বায়ার কর্তৃক নির্দিষ্ট শিপিং লাইন নির্ধারণ না করার অনুরোধ ও সরাসরি আমদানিকারকের দেশে জাহাজ পরিচালনার অনুরোধ করা ছিল অন্যতম। এছাড়া গত জুলাইয়ে এক জরুরি সভায় আরও কিছু গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। এগুলোর মধ্যে কলম্বোগামী ফিডার ভেসেলকে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে বার্থিং দেওয়া, মায়েরস্ক শিপিং লাইনকে চট্টগ্রাম-কলম্বো রুটে ন্যূনতম তিনটি ফিডার ভেসেল চালুর জন্য প্রিন্সিপালের সঙ্গে সমন্বয় করা ও আগ্রহী নতুন ফিডার ভেসেল অপারেটরদের অগ্রাধিকার ভিত্তিতে অনুমোদন দেওয়া অন্যতম। এছাড়া নির্দিষ্ট শিপিং লাইন ও আইসিডি নির্ধারণ করে না দেওয়ার জন্য পুনরায় বায়ারদের সঙ্গে আলোচনার জন্য বিজিএমইএকে অনুরোধ করে বন্দর কর্তৃপক্ষ।
চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় বন্দরের কনটেইনার ও জাহাজজট পরিস্থিতিতে অনেকটাই উন্নতি হয়েছে। বিশ্বের সেরা বন্দরগুলো যেখানে জাহাজজটের কারণে বার্থিংয়ে ১০ দিন পর্যন্ত সময় নিচ্ছে; সেখানে আগস্টের প্রথম ১৫ দিনের পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, একদিনেই চট্টগ্রাম বন্দরে কনটেইনারবাহী জাহাজ বার্থিংয়ের সুযোগ পেয়েছে। মহামারিকালে বৈশ্বিক কনটেইনার সংকট এবং এবং দেশের বাণিজ্য সুরক্ষায় চট্টগ্রাম বন্দরের উদ্যোগের বিস্তারিত রয়েছে প্রধান রচনায়।
বাংলাদেশের প্রতিবেশী ভারত এখন বৃহৎ অর্থনীতির দেশ। আর বিশ্বের জাতীয় বৃহত্তম অর্থনৈতিক পরাশক্তি চীনও আমাদের কাছের দেশ। এ দুটি দেশ থেকে আমাদের প্রয়োজনীয় পণ্যের বেশির ভাগ আমদানি হয়। চীন থেকে বছরে প্রায় এক হাজার কোটি ডলার ও ভারত থেকে ৬০০ কোটি ডলারের পণ্য আসে বাংলাদেশে। বিপরীতে জনবহুল এ দেশ দুটিতে আমাদের জন্যও রয়েছে সম্ভাবনাময় বিশাল বাজার। বাংলাদেশ সেখানে প্রচুর পণ্য রপ্তানি করতে পারে। যদিও এখন পর্যন্ত দেশ দুটি থেকে আমদানির তুলনায় রপ্তানি অনেক কম। এক্ষেত্রে অবশ্যই কিছু প্রতিবন্ধকতা রয়েছে। তবে শুল্ক বাধার চাইতে অশুল্ক বাধাই অনেক বড়। সেটা দূর করা বড় চ্যালেঞ্জ। এই চ্যালেঞ্জ উতরাতে হলে আঞ্চলিক সংযোগ উন্নত করতে হবে। বাংলাদেশ-চীন-ভারত-মিয়ানমার (বিসিআইএম) অর্থনৈতিক করিডোর সেই সুযোগটাই করে দেবে। বিসিআইএম হলো একটি আঞ্চলিক অর্থনৈতিক করিডোর, যার উদ্যোক্তা চীন। বাংলাদেশ, চীন, ভারত ও মিয়ানমার নিয়ে এই করিডোর গঠনের প্রক্রিয়া প্রায় চূড়ান্ত। এটি বাস্তবায়ন হলে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সম্ভাবনার নতুন দ্বার খুলে যাবে বলে আশা করা হচ্ছে। বিসিআইএম নিয়ে রয়েছে বিশেষ প্রতিবেদন।
প্রিয় পাঠক, আমরা চাই এ দেশের মেরিটাইম চর্চাকে একটি সুদৃঢ় ভিত্তিতে দাঁড় করাতে। বৈচিত্র্যময় আঙ্গিকে, সমৃদ্ধ কলেবরে বন্দরবার্তার পথচলা বাংলাদেশের মেরিটাইম খাতের বিকাশে আরও সহায়ক হবে-সেই প্রত্যাশা। সবাইকে শুভেচ্ছা।