বঙ্গোপসাগর। এর সাথে যে শুধু বাংলার নামই জড়িয়ে আছে তা নয়। এই গাঙ্গেয় বদ্বীপের জন্ম, বাণিজ্যিক উত্থান, রাজনৈতিক পটপরিবর্তনসহ ইতিহাসের বহু গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ের সাক্ষী বঙ্গোপসাগর। মধ্যযুগে ইউরোপীয় বণিকদের সঙ্গে ভারতীয় উপমহাদেশের যে বাণিজ্যিক সংযোগ স্থাপন হয়েছিল, তাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল এই জলধির।
বঙ্গোপসাগর দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া অঞ্চলে অবস্থিত। আর এই অঞ্চলের রয়েছে দুটি গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক জোট সার্ক ও আসিয়ান। স্বাভাবিকভাবেই এই দুই জোটের কৌশলগত পরিকল্পনার বড় একটা অংশজুড়ে রয়েছে বঙ্গোপসাগর। চীনের দক্ষিণাঞ্চলীয় এবং ভারত ও বাংলাদেশের সমুদ্রবন্দরগুলোর ওপর এই সাগরের প্রভাব অপরিসীম। কলকাতা, চেন্নাই, বিশাখাপত্তনম, তুতিকোরিন, চট্টগ্রাম, মোংলা প্রভৃতি বন্দর এই সাগরের মাধ্যমে যুক্ত হয়েছে। আঞ্চলিক নিরাপত্তা ও ভূরাজনীতিরও একটা গুরুত্বপূর্ণ অংশজুড়ে রয়েছে বঙ্গোপসাগর।
বঙ্গোপসাগরের সুবিধাভোগী উপকূলবর্তী দেশগুলোর মধ্যে রয়েছে বাংলাদেশ, ভারতের পশ্চিমবঙ্গ, ওডিশা (উড়িষ্যা), অন্ধ্র প্রদেশ ও তামিলনাড়– রাজ্য, মিয়ানমার, ইন্দোনেশিয়া, শ্রীলংকা ও থাইল্যান্ড। আর স্থলবেষ্টিত দেশ ও অঞ্চলগুলোর মধ্যে রয়েছে ভুটান, নেপাল ও ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চল। বঙ্গোপসাগরের উপকূলবর্তী দেশগুলোর সম্মিলিত জিডিপি প্রায় সাড়ে ৭ লাখ কোটি ডলার। আর সুবিধাভোগী দেশগুলো জিডিপিতে যোগ করেছে ৮১ হাজার কোটি ডলারের বেশি। এই অঞ্চলের সার্কভুক্ত দেশগুলোর আন্তঃবাণিজ্য তাদের মোট আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের তুলনায় নগণ্য হলেও (মাত্র ৫ শতাংশ) আসিয়ানভুক্ত দেশগুলোর বাণিজ্য সেই তুলনায় অনেক ভালো অবস্থায় রয়েছে, ২৫ শতাংশ।
প্রাচীন গাঙ্গেয় বদ্বীপের বৈদেশিক বাণিজ্য প্রায় পুরোপুরি নির্ভর করত বঙ্গোপসাগরের ওপর। এখনো সেই নির্ভরতা এতটুকু কমেনি। দেশের মোট বৈদেশিক বাণিজ্যের ৮০ শতাংশের বেশি সম্পন্ন হয় সমুদ্রপথে। সম্প্রতি দেশের প্রধান সমুদ্রবন্দর চট্টগ্রাম বন্দর ট্রান্সশিপমেন্ট ও ট্রানজিটের যুগে প্রবেশ করায় নেপাল, ভারত ও ভুটানে পণ্য পরিবহনে বাংলাদেশের ভৌগোলিক অবস্থানগত গুরুত্ব বেড়েছে। সমুদ্র বাণিজ্যের এই ক্রমবর্ধমান গুরুত্ব সরকার বেশ ভালোভাবেই অনুধাবন করতে পারছে। এ কারণেই চট্টগ্রাম ও মোংলা বন্দরের পাশাপাশি নির্মাণ করা হয়েছে দেশের তৃতীয় সমুদ্রবন্দর পায়রা। এছাড়া কক্সবাজারের মাতারবাড়ীতে নির্মাণ করা হচ্ছে দেশের প্রথম গভীর সমুদ্রবন্দর। এ কথা বলাই যায়, সমৃদ্ধ ও আত্মনির্ভরশীল বাংলাদেশ গঠনে এক গুরুত্বপূর্ণ নিয়ামক হয়ে দাঁড়াবে বঙ্গোপসাগর। বঙ্গোপসাগর ঘিরে বাংলাদেশের সম্ভাবনা নিয়েই সাজানো হয়েছে এবারের মূল আয়োজন।
কনটেইনার পরিবহনে ভরা জোয়ার চলছে এখন। সমুদ্রপথে পণ্য পরিবহনে কনটেইনার চাহিদায় এমন লাগামছাড়া ঊর্ধ্বগতি এর আগে কখনো দেখা যায়নি। এই চাহিদা এতটাই বেড়েছে যে, দেশে দেশে কনটেইনারের ঘাটতি দেখা দিয়েছে। কনটেইনারের বুকিং পেতে সরবরাহকারীদের দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হচ্ছে। এই বাড়তি চাহিদার কারণে কনটেইনার পরিবহনের ভাড়া বেড়ে গেছে বহুগুণ। আবার ভোক্তাচাহিদা বেড়ে যাওয়ায় পণ্য পরিবহনও হচ্ছে আগের তুলনায় অনেক বেশি। এদিকে এরই মধ্যে চলতি বছর ড্রাই বাল্ক রেট গত এক দশকের মধ্যে সর্বোচ্চ অবস্থানে পৌঁছেছে। বাল্টিক এক্সচেঞ্জের প্রধান ড্রাই বাল্ক সি ফ্রেইট ইনডেক্স অন্তত এক যুগের বেশি সময়ের মধ্যে সর্বোচ্চ পয়েন্টে উন্নীত হয়েছে। গত ২৬ সেপ্টেম্বর এই সূচকের অবস্থান ছিল ৪ হাজার ৯৬২ পয়েন্টে, যা ২০০৮ সালের সেপ্টেম্বরের পর সর্বোচ্চ। প্রতি সপ্তাহেই ড্রাই বাল্ক পরিবহনে ভাড়া বাড়ছে। এই ট্রেন্ড দেখে অনেকেই আশাবাদী হয়ে উঠেছেন, তাহলে হয়তো ড্রাই বাল্ক পরিবহনে আবার ২০০৭-০৮ ফিরে আসছে। তবে বাস্তবতা হলো, এবার ড্রাই বাল্কে সুপার সাইকেল দেখতে পাওয়ার সম্ভাবনা খুবই ক্ষীণ।
২০০৭-০৮ সালের ড্রাই বাল্ক সুপার সাইকেলের মতো হোক আর না-ই হোক, ২০২১ সালটা যে কনটেইনার শিপের হতে যাচ্ছে, তা অনেকটাই পরিষ্কার। পুরো বছর শেষ হতে এখনো কয়েক মাস বাকি। এরই মধ্যে রেকর্ড ফ্রেইট রেট, রেকর্ড পরিমাণ কার্গো পরিবহন এবং রেকর্ডসংখ্যক নতুন কনটেইনারের কার্যাদেশ-এসব ঘটনাপ্রবাহ তারই প্রমাণ দিচ্ছে। সমুদ্র পরিবহনের অতিজোয়ার নিয়ে বিস্তারিত রয়েছে বিশেষ প্রতিবেদনে।
প্রিয় পাঠক, আমরা চাই এ দেশের মেরিটাইমচর্চাকে একটি সুদৃঢ় ভিত্তিতে দাঁড় করাতে। বৈচিত্র্যময় আঙ্গিকে, সমৃদ্ধ কলেবরে বন্দরবার্তার পথচলা বাংলাদেশের মেরিটাইম খাতের বিকাশে আরও সহায়ক হবে-সেই প্রত্যাশা। সবাইকে শুভেচ্ছা।