নৌপথে পানির নিচের প্রতিবন্ধকতা খালি চোখে দেখা যায় না। আবার জোয়ার-ভাটার আগাম তথ্য জানা না থাকলেও বিপাকে পড়তে হয়। নদী বা সাগরের ভৌত বৈশিষ্ট্য, পানির নিচের বিভিন্ন প্রতিবন্ধকতা ইত্যাদি চার্টের মাধ্যমে তুলে ধরাই হাইড্রোগ্রাফির কাজ। বৈশ্বিক এই চর্চার সঙ্গে প্রশংসনীয়ভাবে সম্পৃক্ত রয়েছে বাংলাদেশও।
‘হাইড্রো’ একটি গ্রিক শব্দ। এর অর্থ পানি। ‘গ্রাফ’ শব্দটিও গ্রিক; অর্থ চিত্র। অর্থাৎ পানির গভীরতা, পানির নিচে থাকা প্রতিবন্ধকতা ও পানির গতিবিধির প্রকৃত রূপ ও বৈশিষ্ট্য বিভিন্ন মাত্রায় চার্টের মাধ্যমে তুলে ধরার বিদ্যাই হলো হাইড্রোগ্রাফি। নদী, সাগর বা অন্য কোনো জলরাশির তলদেশ ও উপকূলীয় অঞ্চলের ভৌত বৈশিষ্ট্যাবলি পুঙ্খানুপুঙ্খরূপে প্রকাশ করাই এই ফলিতবিজ্ঞানের কাজ। তবে এর কার্যকারিতা কেবল নটিক্যাল চার্ট ও প্রকাশনার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। বরং সামুদ্রিক সম্পদের ব্যবহার, পরিবেশ সংরক্ষণ ও ব্যবস্থাপনা, সমুদ্রসীমা নির্ধারণ, সামুদ্রিক পরিকল্পনা, সুনামি ও জলোচ্ছ্বাস মডেলিং, উপকূলীয় এলাকার ব্যবস্থাপনা, সামুদ্রিক পর্যটন, সমুদ্র প্রতিরক্ষাসহ সমুদ্র ও সমুদ্রবিজ্ঞানের সব শাখা-প্রশাখার সঙ্গে হাইড্রোগ্রাফির বিশেষ সম্পর্ক রয়েছে। ফলে এর যথাযথ গুরুত্ব অনুধাবনের প্রয়োজনীয়তা রয়েছে।
হাইড্রোগ্রাফিক তথ্য সংগ্রহের জন্য বিভিন্ন ধরনের প্রযুক্তি ব্যবহার করা হয়। এসব তথ্যের মধ্যে রয়েছে পানির স্তর ও জোয়ার-ভাটা, পানির স্রোত, তাপমাত্রা, লবণাক্ততা ইত্যাদি। এসব তথ্য ব্যবহার করে তৈরি করা হয় নটিক্যাল চার্ট ও হাইড্রোগ্রাফিক মডেল।
হাইড্রোগ্রাফির বৈশ্বিক চর্চা
হাইড্রোগ্রাফি কেবল একটি নির্দিষ্ট অঞ্চল বা কোনো নির্দিষ্ট দেশের চর্চার বিষয় নয়। বরং বিশ্বয়নের এই যুগে বিষয়টি বৈশ্বিক হয়ে দাঁড়িয়েছে। হাইড্রোগ্রাফিক পরিষেবাগুলো প্রদানের জন্য একটি আন্তর্জাতিক বাধ্যবাধকতা বিদ্যমান। সোলাস (সেফটি অব লাইফ অ্যাট সি) কনভেনশনে স্বাক্ষরকারী সব দেশকে জাহাজের নিরাপদ নেভিগেশনের জন্য আবশ্যিকভাবে হাইড্রোগ্রাফিক পরিষেবাগুলো প্রদান করতে হয়।
প্রতিবছর ২১ জুন আন্তর্জাতিক হাইড্রোগ্রাফিক সংস্থা (আইএইচও) বিশ্ব হাইড্রোগ্রাফি দিবস উদ্যাপন করে থাকে। চলতি বছর বিশ্ব হাইড্রোগ্রাফি দিবসের প্রতিপাদ্য ছিল ‘হাইড্রোগ্রাফিতে আন্তর্জাতিক সহযোগিতার একশত বছর’। প্রতিপাদ্য থেকেই বোঝা যাচ্ছে, নৌযান চলাচলে হাইড্রোগ্রাফির গুরুত্ব বিশ্ব অনেক আগেই উপলব্ধি করেছে এবং সেই অনুযায়ী আন্তর্জাতিক উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এই দীর্ঘ সময়ে হাইড্রোগ্রাফিক সংস্থাগুলো, খাত-সংশ্লিষ্টরা এবং বিশেষজ্ঞদের সহযোগিতা ও অক্লান্ত পরিশ্রম সমুদ্রকে আরও গভীরভাবে জানার সুযোগ করে দিয়েছে।
হাইড্রোগ্রাফির চর্চার এই বৈশ্বিক উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল ১৯২১ সালে। প্রতিষ্ঠার সময় সংস্থাটির নাম ছিল আন্তর্জাতিক হাইড্রোগ্রাফিক ব্যুরো (আইএইচবি)। ১৮টি দেশ নিয়ে মোনাকোয় আইএইচবির কার্যক্রম শুরু হয়। মোনাকোর তৎকালীন প্রিন্স অ্যালবার্ট-১, যিনি একজন সমুদ্রবিজ্ঞানী ছিলেন, তার প্রস্তাবে মোনাকোতে সংস্থাটির সদর দপ্তর প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল।
বর্তমান আইএইচও নামটি ১৯৭০ সালে সদস্য দেশগুলো কর্তৃক এক অধিবেশনের মাধ্যমে অনুমোদিত হয়। আইএইচও একটি আন্তর্জাতিক সংস্থা, যা জাতিসংঘে পর্যবেক্ষকের ভূমিকা পালন করে। সব হাইড্রোগ্রাফিক জরিপ ও নটিক্যাল চার্টের তদারককারী প্রতিষ্ঠান হিসেবে সংস্থাটি জাতিসংঘ কর্তৃক স্বীকৃত। বর্তমানে আইএইচওর সদস্য সংখ্যা ৯৪।
আইএইচও আরও কিছু আন্তর্জাতিক সংস্থা, যেমন ইন্টারন্যাশনাল মেরিটাইম অর্গানাইজেশন (আইএমও), ইন্টারগভর্নমেন্টাল ওশানোগ্রাফিক কমিশন অব ইউনেস্কো (আইওসি), ইন্টারন্যাশনাল অ্যাসোসিয়েশন অব মেরিন এইডস টু নেভিগেশন অ্যান্ড লাইটহাউস অথরিটিজ (আইএএলএ), ইন্টারন্যাশনাল চেম্বার অব শিপিংসহ (আইসিএস) বহু আন্তর্জাতিক সংস্থার সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করে থাকে। ২০০১ সালের ২ জুলাই বাংলাদেশ আইএইচওর ৭০তম সদস্যপদ লাভ করে।
আধুনিক বন্দর ব্যবস্থাপনায় হাইড্রোগ্রাফি
আধুনিক যুগে যেকোনো দেশের সামগ্রিক অর্থনীতিতে সমুদ্র বাণিজ্য ও সমুদ্রবন্দরের ভূমিকা অনেক বেশি। আর একটি সমুদ্রবন্দরের সাফল্য/ব্যর্থতা কিছু কার্যকলাপ বা ঘটনার ওপর নির্ভর করে। যেমন দেশের অর্থনৈতিক খাতে অবদান, কনটেইনার হ্যান্ডলিং, কার্গো হ্যান্ডলিং, জাহাজের গড় অবস্থানকাল প্রভৃতি। সবগুলো ঘটনার সঙ্গেই নিরাপদ নৌচলাচল ওতপ্রোতভাবে জড়িত। নিরাপদ নৌচলাচলের জন্য গুরুত্বপূর্ণ চারটি বিবেচ্য বিষয় রয়েছে-
● আন্ডার কিল ক্লিয়ারেন্স ঠিক রাখা
● নৌযান চলাচলের জন্য বাধামুক্ত নৌপথ নিশ্চিত করা
● অন্য যেকোনো জলযানের সঙ্গে সংঘর্ষ প্রতিরোধ করা
● এয়ার ড্রাফট ঠিক রাখা
আন্ডার কিল ক্লিয়ারেন্স হলো জাহাজের সর্বনিম্ন তল বা কিল থেকে সমুদ্রতল পর্যন্ত গভীরতা। একটি ৯ মিটার ড্রাফটের জাহাজ চলাচলের জন্য নিশ্চয়ই পানির গভীরতা এর চেয়ে বেশি থাকতে হবে। ধরা যাক, পানির গভীরতা ১২ মিটার। এখানে ৩ মিটার হলো আন্ডার কিল ক্লিয়ারেন্স। এই ক্লিয়ারেন্স ঠিক রাখার জন্য চ্যানেলে নিয়মিত মনিটরিং সার্ভে করে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী প্রয়োজন অনুসারে ড্রেজিং করতে হয়।
নৌযান চলাচলের ক্ষেত্রে বিভিন্ন প্রতিবন্ধকতার মধ্যে রয়েছে ডুবে যাওয়া জাহাজের ধ্বংসাবশেষ (রেক), পানির নিচে বড় আকারের শিলাখ-, পানির নিচের বিভিন্ন অবজেক্টের অবস্থানগত পরিবর্তন ইত্যাদি। একটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ যে, নৌপথকে সম্পূর্ণ প্রতিবন্ধকতামুক্ত করা অনেক ক্ষেত্রেই সম্ভব হয়ে ওঠে না। যতটুকু দূরত্বের মধ্যে এই প্রতিবন্ধকতাগুলো থাকলে নৌ-চলাচল বাধাগ্রস্ত হবে না, ততটুকুই রাখার চেষ্টা করতে হবে। সুতরাং কোনো প্রতিবন্ধকতা তৈরি হলে দ্রুত তা শনাক্ত করে দূর করতে হবে। হাইড্রোগ্রাফিক জরিপের নিখুঁত ব্যবহারের মাধ্যমে সফলভাবে এই কাজটি করা হয়। অন্য জলযানের সঙ্গে সংঘর্ষ প্রতিরোধের জন্য নেভিগেশনাল এইডগুলো যথাযথ স্থানে স্থাপন করা প্রয়োজন। জরিপকৃত তথ্য-উপাত্তের ওপর ভিত্তি করে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। এয়ার ড্রাফট হলো পানির উপরিতল থেকে নৌযানের সর্বোচ্চ পয়েন্ট পর্যন্ত উচ্চতা। নৌপথের ওপর দিয়ে স্থাপিত কোনো ব্রিজ বা পাওয়ার লাইনের উচ্চতাসাপেক্ষে এয়ার ড্রাফট ক্লিয়ারেন্স নির্ভর করে। টোটাল স্টেশন যন্ত্রের সাহায্যে এই উচ্চতা মাপা যায়। যথাযথ ক্লিয়ারেন্সে থাকলে দুর্ঘটনা ঘটার সম্ভাবনা কম থাকে। এক্ষেত্রে জোয়ার-ভাটার পরিমাপ হিসাব করা প্রয়োজন। অত্যাধুনিক অটো টাইডাল স্টেশনের মাধ্যমে যেকোনো স্থান থেকে একটি পয়েন্টের টাইডাল ডেটা জানা যায়।
একটি সমুদ্রবন্দরের বিভিন্ন অনুষঙ্গ রয়েছে। যেমন নৌযান চলাচলের চ্যানেল, পোতাশ্রয়, বার্থ বা জেটি, কনটেইনার টার্মিনাল ইত্যাদি। বন্দরে জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক রাখার ক্ষেত্রে চ্যানেলের নাব্যতা ধরে রাখা অপরিহার্য। কারণ প্রয়োজনীয় গভীরতা না থাকলে একটি চ্যানেলে জাহাজ প্রবেশ করতে পারবে না। এ কারণে একটি বন্দরে সর্বোচ্চ কত ড্রাফটের জাহাজ প্রবেশ করতে পারবে, তা আগে থেকেই নির্ধারিত থাকে এবং সেই অনুযায়ী চ্যানেলের গভীরতা বজায় রাখা হয়। প্রতিটি বন্দরই একটি সর্বনিম্ন আন্ডার কিল ক্লিয়ারেন্স নির্ধারণ করে, যা মেনেই বাণিজ্যিক জাহাজ বন্দরে প্রবেশ করে।
আন্ডার কিল ক্লিয়ারেন্স কয়েকটি ফ্যাক্টর দ্বারা নির্ধারিত হয়। যেমন-
● রোল, পিচ ও হিভ-এর প্রভাবে জাহাজের ড্রাফট।
● জোয়ার/ভাটার পরিমাণ।
● সর্বশেষ হাইড্রোগ্রাফিক জরিপ অনুযায়ী গভীরতা।
● সর্বশেষ জরিপ-পরবর্তী পলি জমার হার।
● স্রোতের উচ্চতা, স্রোতের দিক, টাইডাল স্ট্রিম প্রভৃতি।
সমুদ্রবন্দর ও পোতাশ্রয়ের প্রকৃতি সবসময়ই বৈচিত্র্যময় ও গতিশীল। এর ওপর নির্ভর করেই হাইড্রোগ্রাফিক জরিপ কার্যক্রম ও পদ্ধতি নির্ধারিত হয়। প্রাথমিকভাবে একটি ঝুঁকি মূল্যায়নের মাধ্যমে এটি নির্ধারণ করা হয়।
ঝুঁকি মূল্যায়নের ক্ষেত্রে কিছু বিষয় বিবেচনা করা হয়। এগুলোর মধ্যে রয়েছে জাহাজের ধরন এবং অপারেশন (উচ্চগতি, জাহাজ চলাচলের বিধিনিষেধ)’ সমুদ্রতলের স্থিতিশীলতা, জাহাজের ড্রাফটের সঙ্গে চ্যানেলের গভীরতা ও প্রস্থের সমন্বয়, সার্ভে এলাকায় জরিপ-সংক্রান্ত সম্ভাব্য জটিলতা ও সার্ভেয়ারদের নির্দিষ্ট কাজের জন্য প্রয়োজনীয় যোগ্যতা।
একটি বন্দরের অপারেশনাল কাজ পরিচালনার জন্য হাইড্রোগ্রাফিক কার্যক্রমকে মূলত তিন ভাগে ভাগ করা যায়। যেমন-
● হাইড্রোগ্রাফিক জরিপ পরিচালনা করা ও ফলাফল নিরূপণ।
● চ্যানেল রক্ষণাবেক্ষণ কাজ।
● পরিকল্পনা, গবেষণা ও উন্নয়নমূলক কাজ।
হাইড্রোগ্রাফিক জরিপ পরিচালনা ও ফলাফল নিরূপণ: বন্দর চ্যানেল সম্পর্কে সম্যক ধারণা লাভ করতে হলে হাইড্রোগ্রাফিক জরিপ পরিচালনা করতে হয়। রাস্তায় গাড়ি চলাচল করার ক্ষেত্রে ড্রাইভারের কাছে মোটামুটি রাস্তা দৃশ্যমান থাকে, ফলে গাড়ি চলাচল করা সহজ হয়। কিন্তু নৌযান চলাচল করার ক্ষেত্রে সেটি সাধারণত হয়ে ওঠে না। নৌপথে ডুবন্ত জাহাজ থাকতে পারে, নিমজ্জিত শিলাখ- থাকতে পারে, তলদেশের গভীরতায় ভিন্নতা থাকতে পারে অথবা পলি জমে চর সৃষ্টি হতে পারে। এসব প্রতিবন্ধকতা চিহ্নিত করে তা চার্টের মাধ্যমে উপস্থাপন করা হয়। শুধু গভীরতা নয়, চার্টের মধ্যে কন্টুর (একই গভীরতা-সম্পন্ন এলাকাকে যে লাইনের মাধ্যমে আলাদা করে দেখানো হয়)-এর মাধ্যমে তলদেশের গভীরতা ও চর এলাকা সম্পর্কে ধারণা প্রদান করা হয়। কোথাও কোনো জাহাজ ডুবে গেলে (রেক) তা চার্টে দেখানো হয়। ফলে নৌযান-চালকদের পক্ষে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা সহজ হয়ে ওঠে। ডুবে যাওয়া জাহাজের ধ্বংসাবশেষ বা কোনো কনটেইনার পানিতে পড়ে গেলে তা হাইড্রোগ্রাফিক জরিপের মাধ্যমে অনুসন্ধান করে চিহ্নিত করা হয়।

চ্যানেল রক্ষণাবেক্ষণ কাজ: হাইড্রোগ্রাফিক জরিপের মাধ্যমে প্রাপ্ত তথ্য-উপাত্তকে কাজে লাগিয়ে চ্যানেলের রক্ষণাবেক্ষণের কাজ করা হয়। চ্যানেলে জাহাজ চলাচলের অনুপযোগী গভীরতা থাকলে ড্রেজিংয়ের মাধ্যমে চ্যানেলকে চলাচলের উপযোগী করা হয়। ড্রেজার কয়েক প্রকারের হতে পারে। সাকশন ড্রেজার ব্যবহার করে সমুদ্রতল থেকে পলিমাটি কিংবা বালু উত্তোলন করে নির্দিষ্ট বার্জ/বাল্কহেডে করে অথবা পাইপলাইন সংযুক্ত করে ডাম্পিং গ্রাউন্ডে ফেলা হয়। আরেক ধরনের ড্রেজার হলো ট্রেইলিং সাকশন হপার ড্রেজার। কাদা কিংবা মিহিদানার মাটি ড্রেজিং করার জন্য ব্যবহার করা হয় ওয়াটার ইনজেকশন ড্রেজার।
পরিকল্পনা, গবেষণা ও উন্নয়নমূলক কাজ: একটি চ্যানেলে নৌযান চলাচলের জন্য নেভিগেশনাল এইডস (চ্যানেল মার্কিং বয়া, রেক বয়া, ট্রানজিট পিলার) স্থাপন করা হয় পরিকল্পনামূলক কাজের অংশ হিসেবে। যুগের সঙ্গে তাল মিলিয়ে নিত্যনতুন যন্ত্রপাতি সংযুক্ত করা, জরিপ-সংশ্লিষ্টদের দক্ষতা ও মানোন্নয়নে প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা, জরিপকৃত তথ্য ও উপাত্ত নিয়ে গবেষণা করা, আধুনিক সার্ভে পদ্ধতি সম্পর্কে গবেষণা ও সংশ্লিষ্ট ক্ষেত্রে প্রয়োগ করা, বন্দরকে জরিপ-সংশ্লিষ্ট বিবিধ পরামর্শ প্রদান করা, ঘূর্ণিঝড়ের পূর্বাভাস ও ঘূর্ণিঝড় মোকাবিলা-সংক্রান্ত পরামর্শ প্রদান, মেরিন স্ট্রাকচার তৈরিতে পরামর্শ প্রদান করা, টাইডাল স্টেশন স্থাপন ইত্যাদি পরিকল্পনা, গবেষণা ও উন্নয়নমূলক কাজের আওতাভুক্ত। এ যুগে টাইডাল ডেটা সংগ্রহ ও ব্যবস্থাপনার অত্যাধুনিক পদ্ধতি উদ্ভাবিত হয়েছে। এখন ঘরে বসেই দূরে স্থাপিত কোনো টাইডাল স্টেশনের উপাত্ত সংগ্রহ করা যায় স্বয়ংক্রিয় প্রক্রিয়ায়। টাইডাল ম্যানুয়েল, স্ট্যান্ডার্ড অপারেটিং প্রসিডিউর অব ইনস্ট্রুমেন্ট, সার্ভে ম্যানুয়েল প্রভৃতি প্রকাশনা এই বিভাগ থেকে প্রকাশ করা হয়।
হাইড্রোগ্রাফিতে প্রযুক্তির ছোঁয়া
যেকোনো বন্দরের সীমানা নির্ধারণে হাইড্রোগ্রাফি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। হাইড্রোগ্রাফি চর্চার শুরুর দিকে সনাতন পদ্ধতিতে জরিপ করা হলেও আধুনিক যুগে এতে প্রযুক্তির ছোঁয়া লেগেছে। ডিফারেন্সিয়াল গ্লোবাল পজিশনিং সিস্টেম বা ডিজিপিএস ব্যবহার করে টপোগ্রাফিক্যাল সার্ভের মাধ্যমে এখন জরিপের কাজটি সম্পন্ন করা হচ্ছে। এই কাজে মূলত চার ধরনের যন্ত্রপাতি ব্যবহার করা হয়। এগুলো হলো- অবস্থান নির্ণয়ক যন্ত্র, গভীরতা মাপার যন্ত্র, মোশন সেন্সর ইকুইপমেন্ট ও টাইড গেজ ইকুইপমেন্ট।

অবস্থান নির্ণয়ক যন্ত্র: যে স্থানের উপাত্ত নেওয়া হবে, তার অবস্থান সঠিকভাবে নিরূপণের জন্য এই যন্ত্র ব্যবহার করা হয়। আধুনিক সার্ভে ব্যবস্থায় বহুল প্রচলিত পজিশনাল ইকুইপমেন্ট হলো ডিজিপিএস। স্যাটেলাইট-ভিত্তিক রেডিও নেভিগেশন সিস্টেম হলো জিপিএস। সার্ভে এলাকার কাছাকাছি স্থানে একটি রেফারেন্স স্টেশন স্থাপন করে জিপিএস সিগন্যালের পজিশনাল কারেকশনের মাধ্যমে নিখুঁত উপাত্ত দেয় ডিজিপিএস। এই যন্ত্রের মাধ্যমে প্রকৃত উপাত্ত পাওয়া যায় এবং এর অ্যাকুরেসি মিলিমিটার পর্যন্ত হয়ে থাকে।
গভীরতা পরিমাপক যন্ত্র: একখ- ধাতু সুতায় ঝুলিয়ে এবং সুতায় দাগ কেটে পানিতে নিক্ষেপ করার মাধ্যমে একসময় গভীরতা পরিমাপ করা হতো। আধুনিক বিজ্ঞানে শব্দের প্রতিধ্বনি ব্যবহারের মাধ্যমে পানির গভীরতা নির্ণয়ের পদ্ধতি আবিষ্কৃত হয়। সেই মূলনীতি কাজে লাগিয়ে প্রযুক্তিবিদরা আবিষ্কার করেছেন অত্যাধুনিক গভীরতা মাপার যন্ত্র। এক্ষেত্রে বহুল প্রচলিত ইকুইপমেন্ট হলো সিংগেল বিম ইকোসাউন্ডার। এই ধরনের ইকোসাউন্ডার মূলত ট্রান্সডিউসার থেকে নির্গত সোনার পালসের সময়ের ব্যবধান হিসাব করে গভীরতা পরিমাপ করে। ট্রান্সডিউসার এক ধরনের কনভার্টার, যা এক ধরনের শক্তি সংকেতকে অন্য ধরনের শক্তির সংকেতে রূপান্তর করে। গভীরতা পরিমাপক যন্ত্রের ক্ষেত্রে যুগান্তকারী আবিষ্কার হলো মাল্টি বিম ইকোসাউন্ডার। এই ধরনের ইকোসাউন্ডারে বিশেষভাবে ডিজাইনকৃত ট্রান্সডিউসার থাকে, যা থেকে বিস্তৃত অ্যাকাউস্টিক ফ্যান শেপড পালস নির্গত হয়। সিঙ্গেল বিমের মাধ্যমে মূলত নির্দিষ্ট পয়েন্টে পানির গভীরতা জানা যায়। অন্যদিকে মাল্টি বিমের মাধ্যমে ট্রান্সডিউসারের ডানে-বামে নির্দিষ্ট দূরত্ব পর্যন্ত গভীরতা সহজেই জানা যায়।
মোশন সেন্সর ইকুইপমেন্ট: সার্ভে কার্যক্রমে অধিকতর স্বচ্ছ ও সূক্ষ্ম উপাত্তপ্রাপ্তির লক্ষ্যে মোশন সেন্সর ইকুইপমেন্ট ব্যবহার করা হয়। অ্যাকসেলারোমিটার হলো একটি আদর্শ মোশন সেন্সর ইকুইপমেন্ট। বর্তমানে আধুনিক জরিপ কার্যক্রমে ডেটা অ্যাকুইজিশনে সর্বাধিক ব্যবহৃত যন্ত্র হলো ইনারশিয়াল মেজারমেন্ট ইউনিট বা আইএমইউ।
টাইড গেজ ইকুইপমেন্ট: সাধারণত জরিপের সময় যে গভীরতা পাওয়া যায়, তার সঙ্গে টাইডাল ডেটার সম্পৃক্ততা থাকে। প্রকৃত গভীরতা পরিমাপের জন্য টাইডাল ডেটা বিয়োজন করতে হয়। টাইডাল ডেটা পরিমাপ করার জন্য টাইড গেজ ইকুইপমেন্ট ব্যবহৃত হয়। টাইড গেজ ইকুইপমেন্ট দুই ধরনের হয়ে থাকে। অটো টাইড গেজ ব্যবহার করে স্বয়ংক্রিয়ভাবে ডেটা সংগ্রহ করা যায়। এছাড়া ম্যানুয়েল টাইড পোল/স্টাফের মাধ্যমেও টাইডাল ডেটা পাওয়া যায়।
এছাড়া হাইড্রোগ্রাফিক জরিপের ক্ষেত্রে আরও কিছু সহায়ক যন্ত্রপাতি ব্যবহার করা হয়। যেমন-
সাইড স্ক্যান সোনার: পানির নিচের বাধা-বিপত্তি সংক্রান্ত চিত্রগত উপাত্ত পাওয়ার জন্য এই যন্ত্রটি ব্যবহৃত হয়। কোনো রেক, সামুদ্রিক প্রত্ন তাত্ত্বিক কিংবা নিরাপদ নৌ-চলাচলের জন্য বিপজ্জনক বস্তু শনাক্ত করার জন্য বর্তমানে এই যন্ত্র ব্যবহার হয়।
সাব বটম প্রোফাইলার: সমুদ্রতলের নিচে সেডিমেন্ট বা পাথরের স্তর শনাক্ত করা এবং এদের বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে ধারণা লাভ করার জন্য এই যন্ত্রটি ব্যবহার হয়।
সেডিমেন্ট প্রোফাইল ইমেজিনারি: সমুদ্রতল ও এর ওপরিভাগের পানির মধ্যকার আলোকচিত্র পাওয়ার একটি আন্ডার ওয়াটার টেকনিক হলো সেডিমেন্ট প্রোফাইল ইমাজিনারি।
রিমোটলি অপারেটেড ভেহিকল (আরওভি): আন্ডারওয়াটার মেরিন স্ট্রাকচার সার্ভে, পাইপলাইন সার্ভে, জ্যাকেট ইন্সপেকশন, জাহাজের হাল ইন্সপেকশন কাজে এই যন্ত্র ব্যবহার হয়।
অ্যাকুইস্টিক ডপলার কারেন্ট প্রোফাইলার (এডিসিপি): কোনো নৌ-চ্যানেলের গভীরতা অনুযায়ী স্রোতের গতি কেমন, তা জানার জন্য এই যন্ত্রটি ব্যবহার করা হয়। স্রোতের গতি স্প্রিং টাইড, নিপ টাইডে ভিন্ন ভিন্ন হয়ে থাকে। দীর্ঘ সময় অবজারভেশন করে স্রোতের গতি সম্পর্কে সিদ্ধান্ত নেওয়া লাগে। একটি চ্যানেল থেকে কতটুকু পানি ডিসচার্জ হচ্ছে, তার পরিমাণ এই যন্ত্রটি দ্বারা নির্মাণ করা যায়।
অটোমেটিক সার্ভে বোট: ইকোসাউন্ডার, জিপিএসসংবলিত এই ধরনের বিশেষ সার্ভে বোট রিমোট দ্বারা নিয়ন্ত্রণ করা যায়। পানির অনেক গভীরে ডুবে যাওয়া জাহাজের অবস্থান শনাক্তকরণ অথবা চর এলাকায় জরিপ পরিচালনার জন্য এই বোট বিশেষভাবে উপযোগী।
ব্যাথিমেট্রিক সার্ভে ড্রোন: যেসব ক্ষেত্রে সশরীরে উপস্থিত থেকে ব্যাথিমেট্রিক সার্ভে করা সম্ভব হয়ে ওঠে না, সেখানে একটি সুন্দর সমাধান হতে পারে এই সার্ভে ডিভাইস।
লাইডার: কোনো একটি অবজেক্টকে লেজার দ্বারা প্রতিফলিত করে এবং সময়ের পরিমাপ করে দূরত্ব নির্ণয়ের পদ্ধতি হলো লাইডার (লাইট ডিটেকশন অ্যান্ড রেঞ্জিং)। সমুদ্রতলের ডিজিটাল থ্রিডি রিপ্রেজেনটেশনের ক্ষেত্রে এটি ব্যবহার করা হয়।
সাউন্ড ভেলোসিটি প্রোফাইলার: ইকো সাউন্ডার মূলত শব্দের বেগনির্ভর একটি যন্ত্র। পানিতে শব্দের বেগ সবসময় একই থাকে না। সঠিক গভীরতা নির্ণয়ের ক্ষেত্রে শব্দের প্রকৃত বেগ জানার প্রয়োজন হয়। গভীরতা অনুযায়ী শব্দের বেগ নির্ণয়ে এই যন্ত্রটি ব্যবহৃত হয়।
হাইড্রোগ্রাফি কাজে সফটওয়্যারের ব্যবহার: সনাতন হাইড্রোগ্রাফি কাজে মাঠপর্যায়ে প্রাপ্ত ডেটা ম্যানুয়েলি প্লট করে এবং টাইড রিডিউস করে প্রেজেন্টেশন করা হতো। এই কাজে কায়িক পরিশ্রম করা লাগত বেশি। এই কাজকে সহজতর করেছে সফটওয়্যার। সার্ভে প্ল্যানিং, অ্যাকুইজিশন, প্রসেসিং কাজে ব্যবহৃত কয়েকটি হাইড্রোগ্রাফি সফটওয়্যার হলো কুইনসি, হাইপ্যাক, পিডিএস। এছাড়া প্রসেসিং কাজে এইচআইপিএস ও এসআইপিএস, চার্টিং করার কাজে পিসিসি বহুল ব্যবহৃত সফটওয়্যার।
বাংলাদেশে হাইড্রোগ্রাফির চর্চা
সরকার সমুদ্র জরিপের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব বাংলাদেশ নৌবাহিনীর হাতে অর্পণ করেছে। দেশের অভ্যন্তরীণ জলসীমায় জরিপের জন্য দায়িত্বপ্রাপ্ত সংস্থা হলো বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌ-পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআইডব্লিউটিএ)। আর দেশের বিভিন্ন সমুদ্রবন্দর কর্তৃপক্ষগুলো তাদের নিজস্ব নিয়ন্ত্রণাধীন এলাকায় জরিপের জন্য দায়িত্বপ্রাপ্ত।
বাংলাদেশের অন্তর্গত সমুদ্রসীমার জরিপ কার্য বাংলাদেশ নৌবাহিনী এরই মধ্যে সম্পন্ন করেছে এবং প্রতি বছর নিরাপদ নেভিগেশনের স্বার্থে হালনাগাদ জরিপ কার্যক্রম পরিচালনা করে আসছে। বিআইডব্লিউটিএ বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ নৌপথে নিরাপদ নেভিগেশনের জন্য চার্ট প্রণয়ন করছে। এছাড়া চট্টগ্রাম, মোংলা ও পায়রা বন্দর কর্তৃপক্ষের আধুনিক জরিপ সরঞ্জাম ও প্রশিক্ষিত জনবল সমন্বিত জরিপ বিভাগ রয়েছে। বন্দর কর্তৃপক্ষ বন্দর সীমানায় নিরাপদ নেভিগেশন নিশ্চিত করার লক্ষ্যে চার্ট প্রণয়ন ছাড়াও অন্যান্য কার্যকরী ভূমিকা পালন করে আসছে। সরকার এরই মধ্যে বাংলাদেশের সব হাইড্রোগ্রাফি ও সমুদ্রবিষয়ক কর্মকা- সমন্বয়ের জন্য ২০০১ সালে ‘ন্যাশনাল হাইড্রোগ্রাফিক কমিটি’ (এনএইচসি) গঠন করে। কমিটিতে বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও সংস্থার সদস্য রয়েছে। বাংলাদেশ নৌবাহিনীর সহকারী নৌপ্রধান (অপারেশন্স) এই কমিটির সভাপতি। এনএইচসি বিভিন্ন সংস্থার মধ্যে সহযোগিতা বাড়াতে ও দেশের সমুদ্রসম্পদের সর্বোত্তম ব্যবহার নিশ্চিত করতে সক্রিয়ভাবে কাজ করে আসছে।
সমুদ্র জরিপে বাংলাদেশ নৌবাহিনী
বাংলাদেশের সামুদ্রিক জলসীমার হাইড্রোগ্রাফিক কার্যক্রম বাংলাদেশ নৌবাহিনী সম্পন্ন করে থাকে। সমুদ্র জরিপ একটি আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর কর্মকা-, যা প্রতিনিয়ত পরিবর্তিত হয়। তাই আধুনিক প্রযুক্তি উপযুক্তভাবে ব্যবহারের জন্য আন্তর্জাতিক সহযোগিতা ও সমন্বয়ের কোনো বিকল্প নেই। বাংলাদেশ নৌবাহিনী আন্তর্জাতিক হাইড্রোগ্রাফিক সংস্থাগুলোর সঙ্গে ঘনিষ্ঠ দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক গড়ে তুলেছে। বাংলাদেশ নৌবাহিনীতে হাইড্রোগ্রাফি সার্ভিসের আধুনিকায়নের সূচনা হয় ১৯৯৬ সালে; ফরাসি সরকারের সহযোগিতায়। আধুনিক সরঞ্জাম সরবরাহ ও প্রযুক্তিগত দক্ষতা সৃষ্টির লক্ষ্যে এ সহায়তা কার্যক্রম শুরু হয়েছিল, যা দ্বিতীয় ধাপে ২০০১ সালে সম্পন্ন হয়। ফরাসি সরকারের প্রযুক্তিগত সহায়তার মাধ্যমে বাংলাদেশ নৌবাহিনীর হাইড্রোগ্রাফিক সার্ভিস ডিজিটাল জরিপ শুরু করে। চট্টগ্রামস্থ বানৌজা ঈসা খানে অবস্থিত বাংলাদেশ নৌবাহিনীর হাইড্রোগ্রাফিক স্কুলটি ২০০৫ সাল থেকে ক্যাটাগরি ‘বি’ কোর্স পরিচালনার জন্য ইন্টারন্যাশনাল বোর্ড অব স্ট্যান্ডার্স অ্যান্ড কমপিট্যান্স (আইবিএসসি) দ্বারা স্বীকৃত। এটি বাংলাদেশের একমাত্র প্রতিষ্ঠান, যা হাইড্রোগ্রাফির বিষয়ে আন্তর্জাতিক মানের আনুষ্ঠানিক প্রশিক্ষণ প্রদান করে। আইএইচও সদস্য রাষ্ট্রগুলোর প্রশিক্ষণার্থীসহ দেশের বিভিন্ন সরকারি প্রতিষ্ঠানের হাইড্রোগ্রাফাররা এখান থেকে প্রশিক্ষণ নেন।
বাংলাদেশ নৌবাহিনী এরই মধ্যে আইএইচওর মানদ- অনুযায়ী পেপার ও ইলেকট্রনিক নটিক্যাল চার্ট (ইএনসি) তৈরির সক্ষমতা ও সফলতা অর্জন করেছে। বর্তমানে বাংলাদেশ নৌবাহিনী সর্বোচ্চ পেশাদারিত্বের মাধ্যমে দেশের অধিকৃত সমুদ্র অঞ্চলের নয়টি আন্তর্জাতিক সিরিজের চার্টসহ ৫৩টি নটিক্যাল চার্ট এবং ১১টি ইলেকট্রনিক নেভিগেশনাল চার্ট (ইএনসি) প্রকাশ করেছে, যা জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে ব্যাপকভাবে সমাদৃত। এসব চার্ট সমুদ্রপথে নিরাপদ চলাচলে নিয়মিত ব্যবহার হচ্ছে।
২০১০ সালে বাংলাদেশ নৌবাহিনী ও যুক্তরাজ্য হাইড্রোগ্রাফি অফিসের (ইউকেএইচও) মধ্যে একটি সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) স্বাক্ষর হয়। এর আওতায় ইউকেএইচও নৌবাহিনীর জরিপকৃত তথ্য-উপাত্ত ব্যবহার করে বাংলাদেশের সমুদ্র অঞ্চলের আন্তর্জাতিক সিরিজের পেপার চার্ট বৈশি^কভাবে বিতরণ করছে, যা দেশ-বিদেশের সব জাহাজে নিরাপদ নেভিগেশনের জন্য ব্যবহার হচ্ছে।
চট্টগ্রাম বন্দরকে সচল রাখতে হাইড্রোগ্রাফি
দেশের আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্যের সিংহদ্বার চট্টগ্রাম বন্দর। আর এই বন্দরের প্রাণ কর্ণফুলী নদী। বছরভর কর্ণফুলী নদীর দেখভালের জন্য চট্টগ্রাম বন্দরের হাইড্রোগ্রাফি বিভাগের অবদান অপরিসীম। এই নদীর সব ধরনের ব্যবহারকারীর জন্য সবসময় নদীকে নিরাপদ রাখা, নদীর উন্নয়নে যেকোনো ধরনের আগাম ধারণা লাভ এবং নদীর পরিবেশ রক্ষার প্রত্যয় নিয়ে কার্যক্রম পরিচালনা করে যাচ্ছে এই বিভাগ।
কর্ণফুলী নদীর চলন-বলন আর গতিবিধি সার্বক্ষণিক পর্যবেক্ষণ ও সে অনুযায়ী চ্যানেল সচল রাখতে আবশ্যক করণীয় নির্ধারণ করে দেয় হাইড্রোগ্রাফি বিভাগ। বন্দর হিসেবে যাত্রার প্রাথমিক সময় থেকেই এর কার্যক্রম নির্বিঘ্নে ও সচল রাখতে অপরিহার্য ভূমিকা পালন করে আসছে হাইড্রোগ্রাফিক জরিপ ও গবেষণায় পাওয়া সাগর-নদীর চারিত্র্য-বিষয়ক তথ্য-উপাত্ত। চট্টগ্রাম বন্দরে জাহাজ চলাচল নির্বিঘœ ও সুগম রাখতে হলে প্রথমে চাই নদীর নাব্যতা স্বাভাবিক রাখা। আর সারা বছর নদীর নাব্যতা ধরে রাখতে হলে হাইড্রোগ্রাফি বিভাগ পরিচালিত এসব নিয়মিত কার্যক্রম এবং সে অনুসারে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ অব্যাহত রাখার বিকল্প নেই।

চট্টগ্রাম বন্দরের হাইড্রোগ্রাফি বিভাগের কর্তব্যবিধির মধ্যে রয়েছে বন্দরের সীমানা অর্থাৎ কালুরঘাট সেতুর আড়াই কিলোমিটার উজান থেকে পতেঙ্গা লাইটহাউস পর্যন্ত ভাটিতে প্রায় ৩০ কিলোমিটার এলাকা ও পতেঙ্গা লাইটহাউস থেকে ১৩ কিলোমিটার ব্যাসার্ধের একটি বৃত্ত এঁকে পাওয়া সমুদ্র এলাকার পাশাপাশি ২০১৯ সালের সরকারি গেজেট অনুযায়ী পতেঙ্গা লাইটহাউস থেকে সাগরের দক্ষিণ দিকে ৮০ কিলোমিটার ও উত্তর দিকে ৫০ কিলোমিটার বিস্তৃত এলাকায় সারা বছর জরিপ কার্যক্রম চালু রাখা। নৌ-চ্যানেলের ছয়টি পয়েন্টে বসানো স্থায়ী অটোটাইড গেজ স্টেশন থেকে সংগৃহীত হয় ¯্রােতের প্রয়োজনীয় উপাত্ত। নদীতে জেগে ওঠা চর এলাকায় নাব্যতা ধরে রাখতে বছরভিত্তিক ইজারা দিয়ে দেওয়া হয় বালুমহালগুলো। এছাড়া তারা আরও যেসব কাজ করে, তার মধ্যে রয়েছে বন্দরসীমানায় নাব্যতা রক্ষায় মেইনটেন্যান্স ড্রেজিং পরিচালনা করা। স্লিপওয়ে এলাকায় নাব্যতা ঠিক থাকছে কিনা, তা দেখাটাও তাদের দায়িত্ব।
ব্যাথিমেট্রিক জরিপের মাধ্যমে পাওয়া তথ্য-উপাত্ত ব্যাথিমেট্রিক চার্টের মাধ্যমে প্রকাশ করে হাইড্রোগ্রাফি বিভাগ। এ বিভাগ নদীর তলদেশে নিমজ্জিত রেক ও অন্যান্য বস্তু চিহ্নিত করে। চট্টগ্রাম বন্দরের হাইড্রোগ্রাফি বিভাগের জরিপ ও ড্রেজিংয়ের কাজে আধুনিক যন্ত্রপাতি ও সফটওয়্যার ব্যবহার করা হয়। এগুলোর মধ্যে রয়েছে অবস্থান নির্ণয়ের জন্য ডিজিপিএস, নদীর গভীরতা পরিমাপের জন্য মাল্টিবিম ও সিঙ্গেল বিম ইকোসাউন্ডার, সাউন্ড ভেলোসিটি মিটার, নদীর ¯্রােতের গতিবেগ ও দিক নির্ণয়ের জন্য কারেন্ট মিটার, নদীতে নিমজ্জিত ধ্বংসাবশেষ ও বস্তুর অবস্থান নির্ণয়ের জন্য স্ক্যান সোনার, নদীর তলদেশে নিমজ্জিত বস্তুসমূহের আকার নির্ণয়ের জন্য সাব-বটম প্রোফাইলার এবং লেভেলিং সার্ভের জন্য ডিজিটাল লেভেল। এছাড়া হাইড্রোগ্রাফিক সার্ভে, ডেটা প্রসেসিং ও চার্ট প্রকাশের জন্য হাইপ্যাক, ড্রেজিংয়ের পরিমাণ নির্ধারণের জন্য ড্রেজপ্যাক, টপোগ্রাফিক সার্ভে ডেটা প্রসেসিং ও চার্ট প্রকাশের জন্য ক্যারিস জিআইএস এবং জোয়ার-ভাটার তথ্য বিশ্লেষণ ও প্রেডিকশনের জন্য জিওটাইড সফটওয়্যার ব্যবহার করা হয়।
চট্টগ্রাম বন্দরের হাইড্রোগ্রাফি বিভাগের পাঁচটি শাখা রয়েছে, যার মাধ্যমে সামগ্রিক কার্যাবলি সম্পাদন করা হয়। এগুলো হলোÑ রিভার সার্ভে সেকশন, গেজ রিডিং সেকশন, এস্টাবলিশমেন্ট সেকশন, জরিপ জাহাজ সেকশন ও ড্রেজার খনক সেকশন। হাইড্রোগ্রাফি বিভাগের প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন একজন চিফ হাইড্রোগ্রাফার। এছাড়া সিনিয়র হাইড্রোগ্রাফার, হাইড্রোগ্রাফার, সিনিয়র ড্রেজিং মাস্টার, বৈদ্যুতিক প্রকৌশলী, প্রধান প্রকৌশলী, ঊর্ধ্বতন উপসহকারী প্রকৌশলী, উপসহকারী প্রকৌশলীসহ মোট ২৬ জনের কর্মীবাহিনী রয়েছে এ বিভাগের। বর্তমানে হাইড্রোগ্রাফি বিভাগের অধীনে সার্ভে ভেসেল রয়েছে সাতটি। এছাড়া দুটি সিকিউরিটি ভেসেল ও একটি ড্রেজার রয়েছে।
কর্ণফুলীতে ড্রেজিং চ্যালেঞ্জ
চট্টগ্রাম বন্দরে জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক রাখতে প্রয়োজন কর্ণফুলী নদীর নাব্যতা ধরে রাখা। আর এর জন্য দরকার ক্যাপিটাল ও মেইনটেন্যান্স ড্রেজিং। চট্টগ্রাম বন্দরের হাইড্রোগ্রাফি বিভাগ এখন পর্যন্ত ভাটিতে যেসব ক্যাপিটাল ড্রেজিং সম্পন্ন করেছে, তার মধ্যে ১৯৮০ সালে ২১ লাখ ঘনমিটার ও ১৯৮৮ সালে ১৮ লাখ ঘনমিটার মাটি অপসারণ করা হয়। এছাড়া ২০১১ সালে আরেক দফায় ক্যাপিটাল ড্রেজিংয়ের উদ্যোগ নেওয়া হয়। অবশ্য বিভিন্ন জটিলতার কারণে সেই কাজটি এখন পর্যন্ত সম্পন্ন হয়নি।
কর্ণফুলী নদীতে ক্যাপিটাল ড্রেজিংয়ের জন্য চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ ২০১১ সালে চুক্তিবদ্ধ হয়েছিল মালয়েশিয়ান মেরিটাইম অ্যান্ড ড্রেজিং করপোরেশন নামের একটি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে। কিন্তু নদীর তলদেশের পলিথিন বর্জ্য-সংক্রান্ত জটিলতার কারণে প্রতিষ্ঠানটি কাজটি সম্পন্ন করতে পারেনি। কর্ণফুলীতে ড্রেজিংয়ের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় প্রতিবন্ধকতা হলো পলিথিনের পুরু আস্তরণ। মালয়েশিয়ার প্রতিষ্ঠানটি চীন থেকে বড় ড্রেজার এনেছিল। কিন্তু সেই ড্রেজারের কাটার ব্লেডে বারবার পলিথিন আটকে যাওয়ায় কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছিল।
কাজ আটকে যাওয়ায় বন্দর কর্তৃপক্ষ ২০১৩ সালে মালয়েশিয়ার প্রতিষ্ঠানটির সঙ্গে চুক্তিটি বাতিল করে। পরে কর্তৃপক্ষ প্রকল্পের নাম পরিবর্তন করে ফের ড্রেজিংয়ের সিদ্ধান্ত নেয়। কর্ণফুলী ক্যাপিটাল ড্রেজিং প্রকল্পের নাম পরিবর্তিত হয়ে এখন তা ‘সদরঘাট টু বাকলিয়ার চর ড্রেজিং প্রকল্প।’
চট্টগ্রাম বন্দরের হাইড্রোগ্রাফি বিভাগ সূত্র অনুযায়ী, ২০১৮ সালের মে মাসে ড্রেজিং প্রকল্প বাস্তবায়নের লক্ষ্যে বন্দর কর্তৃপক্ষ ও বাংলাদেশ নৌবাহিনীর মধ্যে একটি চুক্তি হয়। নৌবাহিনীর তদারকিতে প্রকল্পের কাজ করছে দেশি প্রতিষ্ঠান সাইফ পাওয়ারটেক লিমিটেডের সহযোগী প্রতিষ্ঠান ই-ইঞ্জিনিয়ারিং। ২০১৮ সালের ১৭ অক্টোবর শুরু করা প্রকল্প বাস্তবায়নের কাজ আগামী বছরের মে মাস নাগাদ শেষ হওয়ার কথা রয়েছে। তবে বন্দর কর্তৃপক্ষের প্রত্যাশা, আগামী জানুয়ারির মধ্যেই এ কাজ পুরোপুরি সম্পন্ন করা সম্ভব হবে।
কর্ণফুলী নদীর চট্টগ্রাম মহানগর অংশে পলিথিন বর্জ্যরে স্তূপ বড় হতে হতে কোনো কোনো স্থানে সৃষ্টি হয়েছে ২৫ ফুট পর্যন্ত আস্তরণ। এই বর্জ্য অপসারণে এখন দেশীয় প্রযুক্তিতে ড্রেজিংয়ের কাজ চলছে। দুই ধরনের ড্রেজার দিয়ে কাজ চলছে। এর মধ্যে তিনটি গ্র্যাব ড্রেজার ও ১০-১২টি সাধারণ ড্রেজার। প্রথমে গ্র্যাব ড্রেজার দিয়ে পলিথিন ও আবর্জনাগুলো তুলে আনা হচ্ছে। এরপর চলছে সাধারণ ড্রেজার দিয়ে খননকাজ।
প্রকল্পের বাস্তবায়ন কাজ ৫৯ শতাংশ শেষ হয়েছে। এই প্রকল্পের অধীনে কণফুলীর নাব্যতা রক্ষা ও চট্টগ্রাম বন্দরের জাহাজ চলাচল নির্বিঘœ রাখতে উত্তোলন করা হবে ৫১ লাখ ঘনমিটার মাটি ও আবর্জনা। এর মধ্যে ৩২ লাখ ৫০ হাজার ঘনমিটার মাটি তুলে আনা হয়েছে।
চট্টগ্রাম বন্দর সূত্র অনুযায়ী, ক্যাপিটাল ড্রেজিংয়ের জন্য প্রথমে প্রকল্প ব্যয় ধরা হয়েছিল ৩০২ কোটি টাকা। পরে তা কমে ২৯৫ কোটি টাকায় চূড়ান্ত হয়। চট্টগ্রাম বন্দর সীমানার চার কিলোমিটার দীর্ঘ এলাকায় চলছে এই ড্রেজিং। এ কাজটি সম্পন্ন হলে জাহাজ চলাচল যেমন ঝুঁকিমুক্ত হবে, তেমনি নদী থেকে তোলা মাটি ও বালিতে ভরাট হবে বড় একটি স্থান, যেখানে ভবিষ্যতে একটি লাইটারেজ জেটি নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে। এ বিষয়ে সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের কাজ করছেন বুয়েটের বিশেষজ্ঞরা।
ক্যাপিটালের পাশাপাশি কর্ণফুলীতে মেইনটেন্যান্স ড্রেজিং বা রক্ষণাবেক্ষণ খননকাজও নিয়মিত করে থাকে চট্টগ্রাম বন্দরের হাইড্রোগ্রাফি বিভাগ। প্রতিবছর জেটির সামনের অংশে ১ লাখ ১০ হাজার ঘনমিটার এবং আউটার বার ও কর্ণফুলী চ্যানেলে সাকশন ড্রেজিংয়ের মাধ্যমে ১৫ লাখ ঘনমিটার মাটি অপসারণ করা হয়। চট্টগ্রাম শহরের জলাবদ্ধতা নিরসনে কর্ণফুলীতে পতিত গুরুত্বপূর্ণ খাল যেমন চাক্তাই ও রাজাখালীর সম্মুখভাগে মেইনটেন্যান্স ড্রেজিংয়ের দায়িত্বও হাইড্রোগ্রাফি বিভাগের।
অভ্যন্তরীণ নৌপথ সুরক্ষায় বিআইডব্লিউটিএ
দেশের অভ্যন্তরীণ নৌপথে নিরাপদ নেভিগেশন নিশ্চিত করার দায়িত্ব বিআইডব্লিউটিএ’র। নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের নিয়ন্ত্রণাধীন এই সংস্থাটিতে রয়েছে হাইড্রোগ্রাফি বিভাগ। এই বিভাগের মোট জনবল সংখ্যা ২৫৪। বিভাগটির প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন একজন পরিচালক। বিআইডব্লিউটিএ’র হাইড্রোগ্রাফি বিভাগের বিভিন্ন কার্যাবলির মধ্যে রয়েছে-
● অভ্যন্তরীণ ও উপকূলীয় নৌপথের সব ধরনের হাইড্রোগ্রাফিক জরিপ ও চার্ট প্রণয়ন
● নৌপথে নিরাপদে চলাচলের স্বার্থে বয়া, বাতি ও বিকন স্থাপনের লক্ষ্যে হাইড্রোগ্রাফিক জরিপ পরিচালনা
● প্রয়োজনীয় নাব্যতা সংরক্ষণের জন্য ব্যান্ডেলিং জরিপ, উপকূলীয় জরিপ এবং প্রি ও পোস্ট-ড্রেজিং হাইড্রোগ্রাফিক জরিপ পরিচালনা
● দেশের অভ্যন্তরীণ ও উপকূলীয় এলাকায় ৫৪টি গেজ স্টেশনে রাডার সেন্সরের মাধ্যমে সার্বক্ষণিক গেজ উপাত্ত সংগ্রহ ও সংরক্ষণ
● হাইড্রোগ্রাফিক জরিপ চার্ট প্রণয়নে সংগৃহীত গেজ উপাত্তের ব্যবহার
● গেজ উপাত্ত সংগ্রহ ও বিশ্লেষণ করে বার্ষিক জোয়ার-ভাটার টাইড টেবিল প্রকাশ এবং চাহিদা মাফিক সরবরাহ/বিক্রয়
● নৌপথে বিভিন্ন স্থানের মধ্যে দূরত্ব নির্ধারণ করে তা পুস্তিকা আকারে প্রকাশ এবং তা সরকারি-বেসরকারি সংস্থার চাহিদা অনুযায়ী সরবরাহ
● সংগৃহীত গেজ উপাত্তগুলো চাহিদামাফিক বিভিন্ন গবেষণামূলক ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের কাছে সরবরাহ/বিক্রয়
● সমুদ্রসীমা নির্ধারণে বেজলাইন, একচ্ছত্র অর্থনৈতিক অঞ্চল (ইইজেড), মহীসোপান চিহ্নিতকরণের লক্ষ্যে গেজ উপাত্ত সংগ্রহ ও কো-টাইডাল চার্ট প্রণয়নে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে কারিগরি সহায়তা প্রদান।
● পরিচ্ছন্ন চার্ট প্রণয়ন, প্রকাশ ও যথাযথ সংরক্ষণ এবং চাহিদামাফিক প্রিন্ট কপি সরবরাহ ও বিক্রয়
● কৃত্রিম উপগ্রহভিত্তিক অবস্থান নির্ণয়ক ডিজিপিএস পদ্ধতিতে নিরবচ্ছিন্ন সংকেত সম্প্রচার
● ডিজিপিএসের সঙ্গে সব আনুষঙ্গিক যন্ত্রপাতি (ট্রান্সমিটার, রিসিভার, ডিজেল জেনারেটর ইত্যাদি) অফিস ও মাঠপর্যায়ে স্থাপন, মেরামত ও সংরক্ষণ
● হাইড্রোগ্রাফিক জরিপকাজে ব্যবহৃত সব যন্ত্রপাতি (ইকোসাউন্ডার, ওয়াটার লেভেল রেকর্ডার, টোটাল স্টেশন ইত্যাদি) অফিস ও মাঠপর্যায়ে স্থাপন, মেরামত ও রক্ষণাবেক্ষণ
● কর্তৃপক্ষ ব্যবহৃত সব এইচএফ এসএসবি, ভিএইচএফ সেট স্থাপন, মেরামত ও রক্ষণাবেক্ষণ
● কর্তৃপক্ষ ব্যবহৃত বিভিন্ন ধরনের ইলেকট্রনিক যন্ত্রপাতি সংগ্রহ, স্থাপন, মেরামত ও রক্ষণাবেক্ষণে কারিগরি সহায়তা প্রদান
● কর্তৃপক্ষ ব্যবহৃত সব শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ যন্ত্র ও রেফ্রিজারেটর সংগ্রহ, স্থাপন, মেরামত ও রক্ষণাবেক্ষণ
● উন্নয়নমূলক প্রকল্প গ্রহণ ও বাস্তবায়ন
● গভীর সমুদ্রবন্দর স্থাপনে নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়কে কারিগরি সহায়তা প্রদান

উপসংহার
বঙ্গোপসাগর বাংলাদেশের অর্থনৈতিক অগ্রযাত্রার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। দেশের শতকরা ৯৪ ভাগ পণ্য বঙ্গোপসাগর দিয়ে পরিবহন করা হয়। সমুদ্রসম্পদ ব্যবহারের মাধ্যমে খনিজ, কৃষি, মৎস্য, পরিবেশ ও শিল্পক্ষেত্রের উন্নয়ন এবং পরিবেশবান্ধব ও টেকসই উন্নত প্রযুক্তি উদ্ভাবন ও উৎপাদন বৃদ্ধির লক্ষ্যে গবেষণা কার্যক্রম পরিচালনার জন্য হাইড্রোগ্রাফিক জরিপ তথ্য-উপাত্ত একান্ত প্রয়োজন। সুনীল অর্থনীতির সম্ভাবনাগুলো পরিপূর্ণভাবে কাজে লাগাতে হাইড্রোগ্রাফি অত্যন্ত জোরাল ভূমিকা রাখছে। নিরাপদ নেভিগেশন ছাড়াও সামুদ্রিক পরিবেশ রক্ষা ও দেশের প্রতিরক্ষা বিষয়েও হাইড্রোগ্রাফির তথ্য-উপাত্ত বিশেষ অবদান রাখে।
জাতিসংঘের টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রাগুলোর (এসডিজি) একটি হলো ‘টেকসই উন্নয়নের জন্য মহাসাগর, সাগর ও সামুদ্রিক সম্পদ সংরক্ষণ এবং টেকসই ব্যবহার’। এ লক্ষ্যমাত্রা পূরণের জন্য সমুদ্রের জরিপকৃত তথ্য-উপাত্ত অপরিহার্য। বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক প্রণীত বদ্বীপ পরিকল্পনা ২১০০ বাস্তবায়নেও হাইড্রোগ্রাফিক তথ্য-উপাত্ত প্রয়োজন হবে। উপকূলীয় অবকাঠামো স্থাপন, স্থাপনাগুলোর পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণ, সমুদ্রবন্দরগুলোর আধুনিকায়ন ও সম্প্রসারণের জন্য হাইড্রোগ্রাফিক জরিপের বিকল্প নেই।
সমুদ্র উপকূলবর্তী দেশ হিসেবে বাংলাদেশের জলসীমা নিরাপদ রাখার জন্য হাইড্রোগ্রাফিক জরিপের দায়িত্বপ্রাপ্ত সংস্থাগুলো নিরলস প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। মিয়ানমার ও ভারতের সঙ্গে সমুদ্রসীমা নির্ধারণের পর সমুদ্রসম্পদের অনুসন্ধান ও ব্যবহার সম্পর্কিত কার্যক্রম ভবিষ্যতে আরও জোরদার হবে। ফলে সমুদ্র জরিপের প্রয়োজনীয়তাও আগামী দিনগুলোয় আরও বেশি অনুভূত হবে। সুতরাং সীমিত সম্পদের সর্বোত্তম ব্যবহার নিশ্চিত করতে এবং আমাদের সমুদ্রকে নিরাপদ ও কার্যকরভাবে পরিচালনা করতে দেশের হাইড্রোগ্রাফিক সংস্থাগুলো ও সমুদ্র ব্যবহারকারী সব সংস্থার মধ্যে সহযোগিতা ও সমন্বয় বাড়াতে হবে।