আলেকজান্দ্রিয়া বন্দর

ভূমধ্যসাগর ও মারিউত লেকে ঘেরা মিশরের নাইল ডেল্টা অঞ্চল। এরই পশ্চিম উপকূলে অবস্থান আলেকজান্দ্রিয়া বন্দরের। মিশরের দ্বিতীয় গুরুত্বপূর্ণ শহর বলা হয় আলেকজান্দ্রিয়াকে। আর দেশটির প্রধান বন্দর হলো আলেকজান্দ্রিয়া।

আলেকজান্দ্রিয়া বন্দরে রয়েছে দুটি হারবার। পূর্ব ও পশ্চিমের হারবার দুটিকে বিভক্ত করে রেখেছে একটি ‘টি’ আকৃতির উপদ্বীপ। পূর্বের হারবারটি অগভীর; সেখানে বড় জাহাজ ভিড়তে পারে না। বাণিজ্যিক জাহাজগুলো পশ্চিমের হারবার ব্যবহার করে। এই হারবারকে সুরক্ষা দেওয়ার জন্য রয়েছে দুটি স্রোতপ্রতিরোধক বাঁধ।

আলেকজান্দ্রিয়া হলো বিশ্বের প্রাচীনতম বন্দরগুলোর একটি। সেখানে প্রথম বন্দর অবকাঠামো গড়ে তোলা হয় খ্রিস্টপূর্ব ১৯০০ সালের দিকে। তখন সেখানে রাকুতিস নামের একটি গ্রাম ছিল। মূলত উপকূলীয় এলাকা ও ফারো আইল্যান্ডে পণ্য সরবরাহের লক্ষ্যে এই বন্দরের গোড়াপত্তন করা হয়। এরপর কয়েকশ বছর ধরে বালি ও পলি জমতে জমতে বন্দরটি জাহাজ চলাচলের অনুপযুক্ত হয়ে পড়ে।

খ্রিস্টপূর্ব ৩৩১ সালের দিকে আলেকজান্ডার দ্য গ্রেট তার বাহিনীর নৌঘাঁটি হিসেবে আলেকজান্দ্রিয়া শহর গড়ে তোলেন। এ সময় তার সেনাদল বন্দরের বালি ও পলি অপসারণ করে চলাচলের উপযুক্ত করে। আলেকজান্ডারের প্রকৌশলী ডিনোক্র্যাট আলেকজান্দ্রিয়া ও ফারো আইল্যান্ডকে একটি ১ হাজার ২০০ মিটার দীর্ঘ ব্রিজ দিয়ে সংযুক্ত করেন। এর ফলে দুটি হারবার তৈরি হয়, যেগুলো বাণিজ্যিক ও সামরিক জাহাজ চলাচলের জন্য ব্যবহার করা হতো। উত্তর-পূর্বের বেসিনটি (বর্তমানে যেটি পূর্ব হারবার) ব্যবহার হতো সামরিক জাহাজ চলাচলের জন্য। আর দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলীয় বেসিন ব্যবহার করা হতো বাণিজ্যিক উদ্দেশ্যে। বর্তমানে এটিই আলেকজান্দ্রিয়ার মূল বন্দর। টলেমির আমলে ফারো আইল্যান্ডের সঙ্গে সংযোগকারী দ্বিতীয় আরেকটি ব্রিজ নির্মাণ করা হয়, যার ফলে পূর্ব হারবারটি দুটি খাঁড়িতে বিভক্ত হয়। বিখ্যাত ইতিহাসবেত্তা ও ভূগোলবিদ স্ত্রাবোর বর্ণনায় জানা যায়, আলেকজান্দ্রিয়ার দুটি হারবারের একটির অবস্থান ছিল লেক মারিউতে। আরেকটি হারবারের অবস্থান ছিল ভূমধ্যসাগরের দিকে।

মিশরে রোমান শাসনামলে আলেকজান্দ্রিয়ার পশ্চিম হারবার থেকে প্রচুর পরিমাণে খাদ্যশস্য রপ্তানি হতো। রোমান সাম্রারাজ্যের রমরমা সময়ে আলেকজান্দ্রিয়া থেকে প্রতি বছর ৮৩ হাজার টন খাদ্যশস্য রোমে পাঠানো হতো। রোমান শাসনের শেষের দিকে সেখান থেকে প্রতি বছর ২ লাখ ২০ হাজার টন খাদ্যশস্য রোমান সাম্রারাজ্যের তৎকালীন রাজধানী কনস্ট্যান্টিনোপলে (বর্তমানে তুরস্কের অন্তর্গত) পাঠানো হতো।

প্রাচীন ও মধ্যযুগে ইউরোপ ও ভারতীয় উপমহাদেশের মধ্যে বাণিজ্যিক পণ্য পরিবহনে কয়েকটি রুট ব্যবহার করা হতো। এর একটি হলো ইতালির ভেনিস থেকে ভূমধ্যসাগর হয়ে মিশরের আলেকজান্দ্রিয়া এবং পরবর্তীতে সেখান থেকে লোহিত সাগর হয়ে ভারতের পশ্চিম উপকূলের বোম্বে (বর্তমান মুম্বাই) পর্যন্ত।

অটোমান শাসক মুহাম্মদ আলী উনিশ শতকের শুরুর দিকে নীল নদের সঙ্গে সংযোগকারী একটি মিঠাপানির খাল পুনঃখননের নির্দেশ দেন। ১৮২০ সালের দিকে এই কাজ শেষ হয় এবং এর নাম হয় মাহমুদিয়াহ ক্যানেল। মুহাম্মদ আলীর আমলে আলেকজান্দ্রিয়া শিপইয়ার্ড স্থাপিত হয়। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় গ্যালিপোলি ক্যাম্পেইনে অংশগ্রহণকারী ব্রিটিশ মেডিটেরানিয়ান এক্সপেডিশনারি ফোর্স আলেকজান্দ্রিয়া পোর্টকে তাদের ঘাঁটি হিসেবে ব্যবহার করেছিল। বিশ শতকের শেষের দিকে আলেকজান্দ্রিয়া বন্দর দিয়ে সমুদ্র বাণিজ্যের পরিমাণ অনেক বেড়ে যায় এবং এর সক্ষমতা ছাড়িয়ে যায়। এর পরিপ্রেক্ষিতে ১৯৮০-এর দশকে এল-ডেখেইলাতে কনটেইনার শিপিংয়ের জন্য একটি নতুন বন্দর স্থাপিত হয়। 

বর্তমানে মিশরের মোট বৈদেশিক বাণিজ্যের ৫৫ শতাংশ সম্পন্ন হয় আলেকজান্দ্রিয়া বন্দর দিয়ে। পোর্ট অব ডেখেইলা ও ওয়েস্টার্ন পোর্ট অব আলেকজান্দ্রিয়ার পাশাপাশি শহরটিতে আরও কয়েকটি বন্দর রয়েছে। এগুলো হলো-আবু কির, সিদি ক্রের ও পুরনো ইস্টার্ন পোর্ট অব আলেকজান্দ্রিয়া, যেটি এখন আর বাণিজ্যিক কাজে ব্যবহার হয় না। সব মিলিয়ে আলেকজান্দ্রিয়া শহরে অবস্থিত বন্দরগুলো দিয়ে মিশরের মোট বৈদেশিক বাণিজ্যের ৭৫ শতাংশের বেশি সম্পন্ন হয়।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here