লোকসান, ধর্মঘট আর জাহাজশূন্য চ্যানেল, এই তিন শব্দ এখন সুদূর অতীত। এক যুগ আগে মোংলা বন্দরের যত সংবাদ গণমাধ্যমে আসত, তার বেশির ভাগ ছিল এসব নেতিবাচক শব্দে ভরা। ২০০৭-০৮ সালের পূর্ববর্তী অর্থবছরগুলোতে ক্রমাগত লোকসানের বিপরীতে ২০০৮-০৯ অর্থবছরে প্রায় তিন কোটি টাকা মুনাফা করে মোংলা বন্দর। সর্বশেষ অর্থবছরে মুনাফা ১৩০ কোটি টাকা ছাড়িয়েছে, যা এক যুগ আগের তুলনায় প্রায় ৪৩ গুণ। পাট ও পাটজাত পণ্যের রপ্তানি নির্ভরতায় গড়ে ওঠা মোংলা বন্দর দিয়ে ২০১৯ সালে পোশাক রপ্তানি শুরু হওয়া ছিল বন্দরটির জন্য গুরুত্বপূর্ণ বাঁকবদল। পদ্মা সেতু, রামপাল তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্র ও দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে অর্থনৈতিক অঞ্চল প্রতিষ্ঠার মতো উন্নয়ন প্রকল্প মোংলা বন্দরের গুরুত্ব বাড়াচ্ছে প্রতিনিয়ত। ইতিমধ্যে ভারতের ‘সেভেন সিস্টার্স’ ও নেপাল এবং ভুটানের ট্রানজিট বন্দর হিসেবে নিজের অবস্থান জানান দিয়েছে মোংলা। প্রতিষ্ঠার ৭১ বছর পূর্তি ও স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীতে এসব সুখকর সংবাদের পেছনের যাত্রা সহজ ছিল না। সরকারের সুষম উন্নয়ন পরিকল্পনা ও তা বাস্তবায়নের কারণে মোংলা অবহেলিত বন্দর থেকে দেশের আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্যের গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার হয়ে উঠেছে।
পাট রপ্তানির ওপর ভিত্তি করেই শুরু
দেশভাগের সময় পূর্ব পাকিস্তানের প্রধান রপ্তানি পণ্য ছিল পাট ও পাটজাত দ্রব্য। পূর্ব পাকিস্তানের একমাত্র সমুদ্রবন্দর চট্টগ্রাম হওয়ায় এই বন্দর দিয়ে রপ্তানি পণ্যের পুরোটাই পরিবহন করা হতো। এর অবস্থান দেশের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলে। অথচ দেশের পাট ও পাটজাত পণ্যের বেশির ভাগ উৎপাদন হতো দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে। ফলে পরিবহন ব্যয় ও সময় সাশ্রয়ে চট্টগ্রাম বন্দরের বিকল্প খুঁজতে থাকে তৎকালীন সরকার। একই সময় কোরিয়া যুদ্ধ শুরু হলে আন্তর্জাতিক বাজারে পাট ও পাটজাত দ্রব্যের চাহিদা ব্যাপক হারে বেড়ে যায়। তখন চট্টগ্রাম বন্দরের পক্ষে এককভাবে রপ্তানি পণ্য পরিবহন কঠিন হয়ে পড়ে। ফলে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের গুরুত্বের কথা চিন্তা করে তৎকালীন সরকার পূর্ব পাকিস্তানে দ্বিতীয় সমুদ্রবন্দর স্থাপনের পরিকল্পনা গ্রহণ করে। সরকারি উদ্যোগে দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের উপকূলীয় এলাকায় সম্ভাব্যতা যাচাই এবং স্থান নির্বাচনের কাজ শুরু হয়। দীর্ঘ সমীক্ষার পর খুলনা ও বাগেরহাটের মধ্যবর্তী পশুর নদীতে দেশের দ্বিতীয় সমুদ্রবন্দর স্থাপনের উপযোগী বলে প্রতিবেদন দাখিল করা হয়। এ প্রতিবেদনের ওপর ভিত্তি করে ১৯৫০ সালে ১ ডিসেম্বর মোংলা বন্দরের যাত্রা শুরু। প্রতিষ্ঠার ১০ দিন পর ১১ ডিসেম্বর ব্রিটিশ বাণিজ্য জাহাজ সিটি অব লিয়ন্স সুন্দরবনের মধ্যে পশুর নদীর জয়মনিরগোল নামক স্থানে নোঙর করে। এটাই ছিল মোংলা বন্দর প্রতিষ্ঠার পর প্রথম জাহাজ আগমন। ১৯৫১ সালের ৭ মার্চ জয়মনিরগোল থেকে ১৪ মাইল উজানে চালনা নামক স্থানে এ বন্দর স্থানান্তর হয়। সেখানে ১৯৫৪ সাল পর্যন্ত এ বন্দরের কার্যক্রম চলে। পরে স্যার ক্লাইভ অ্যাংনিস পশুর ও শিবসা নদী জরিপের জন্য আসেন। জরিপের পর তিনি প্রতিবেদনে বন্দরকে চালনা থেকে সরিয়ে মোংলায় প্রস্তাব করেন। চালনা থেকে ৯ থেকে ১০ মাইল ভাটিতে মোংলা নদী এবং পশুর নদীর সংযোগস্থলের নাম ছিল মোংলা। এখানে নদীর নাব্যতাও ছিল বেশি। সুবিস্তৃত স্থলভাগ ও বন্দর নির্মাণের উপযোগী হওয়ায় ১৯৫৪ সালের ২০ জুন বন্দরকে সরিয়ে মোংলায় নিয়ে আসা হয়।
পাট ও পাটজাত দ্রব্য, চিনি, চামড়া ও নিউজপ্রিন্টের ক্রমবর্ধমান রপ্তানি বাণিজ্যের কারণে মোংলা বন্দরকে অবকাঠামোগতভাবে সক্ষম করে তোলার পরিকল্পনা গ্রহণ করে সরকার। ১৯৬৪ সালে যুক্তরাষ্ট্রের মেসার্স ফ্রেডারিক আর হারিস নামক একটি কনসালট্যান্সি প্রতিষ্ঠানকে বন্দরের সক্ষমতা বৃদ্ধিতে সমীক্ষা পরিচালনায় নিয়োজিত করে। সমীক্ষার পর প্রতিষ্ঠানটি পশুর নদীর পূর্ব তীরে এটিকে স্থায়ী বন্দর হিসেবে গড়ে তোলা সম্ভব বলে প্রতিবেদন উপস্থাপন করে। এ সমীক্ষার প্রতিবেদনের ওপর ভিত্তি করে ১৯৬৫ সালে পাকিস্তান সরকার ২১ কোটি টাকা বরাদ্দ করে মোংলার উন্নয়নে। ১৯৬৫ থেকে ১৯৭০ সাল পর্যন্ত প্রথম পর্যায়ে প্রয়োজনীয় ভূমি হুকুমদখল, জল জরিপ এবং আনুষঙ্গিক কার্যাবলি সম্পাদন করা হয়। জমি হুকুমদখল করা হয় ২ হাজার ৫৮ একর। ১৯৬৭ সালে যুগোশ্লাভিয়ার মেসার্স উজান মিলুটোনিভিক পিম এবং মেসার্স ব্রোডোইম পেকস কোম্পানির সাথে জেটি নির্মাণে ইঞ্জিনিয়ারিং সার্ভিসেসের চুক্তি স্বাক্ষর হয়। জেটি নির্মাণে দেশটির ঋণের পরিমাণ ছিল ১৮ দশমিক ৫ মিলিয়ন মার্কিন ডলার। ১৯৭০ সাল পর্যন্ত বন্দর সম্প্রসারণের কাজ চলে।
মুক্তিযুদ্ধে মোংলা বন্দর
১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে বন্দরের সকল কার্যক্রম প্রায় বন্ধ হয়ে যায়। ২৫ মার্চের পর পাকবাহিনী মোংলা বন্দর দখল করে নিতে চাইলে সশন্ত্র বাঙালি যুবকেরা সেখানে প্রবল প্রতিরোধ গড়ে তোলে। স্বাধীনতার দাবিতে শ্রমিক-কর্মচারী-ছাত্র-জনতা সকলেই ছিল ঐক্যবদ্ধ। মার্চের ২৮-২৯ তারিখ পাক নৌবাহিনী যুদ্ধ জাহাজ থেকে একটানা শেল নিক্ষেপ করা শুরু করে। এতে বাঙালিদের অনভিজ্ঞ দুর্বল প্রতিরক্ষা ব্যূহ গুঁড়িয়ে যায়। বন্দর জনশূন্য হয়ে পড়ে। শেলের আঘাতে বন্দরের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়। পরে পাকবাহিনী বন্দর দখল করে তা চালু করার চেষ্টা চালাতে থাকে। প্রথমে বন্দর জাহাজশূন্য হয়ে পড়লেও পরে পাকিস্তানিদের ব্যাপক প্রচারণার কারণে দু-একটি জাহাজ আসতে থাকে। পাক সরকার এ বন্দর চালুর মধ্য দিয়ে দেখাতে চেয়েছিল যে, পূর্ব পাকিস্তানে সবকিছুই স্বাভাবিক। বিপুল সংখ্যক পাকসেনা বন্দর এলাকায় শক্ত ঘাঁটি গড়ে তোলে। সেখানকার পাকিস্তান নৌবাহিনীও ঘাঁটি থেকে তাদের সহায়তা করতে থাকে। আগস্টের মাঝামাঝি মুক্তিযোদ্ধারা মোংলায় গেরিলা আক্রমণ চালিয়ে বন্দরকে অকেজো করে দেয়। এটা ছিল ওই সময়কার একটা সাড়া জাগানো ঘটনা।
এর আগে জুন মাসের প্রথম দিকে ফ্রান্স থেকে পাক নৌবাহিনীর বেশ কয়েকজন বাঙালি সাবমেরিনার পালিয়ে এসে মুক্তিযুদ্ধে যোগ দেয়। তারাসহ আরও কিছু সাহসী যুবককে নিয়ে মুক্তিবাহিনীর নৌকমান্ডো ইউনিট গঠন করা হয়। তাদের ট্রেনিংয়ের ব্যবস্থা করা হয় ভারতের মুর্শিদাবাদ জেলার ভাগীরথী নদীর তীরবর্তী কোনো এক গোপন স্থানে। এ ক্যাম্পের সাংকেতিক নাম দেওয়া হয় সি-২পি। এর উদ্দেশ্য ছিল আত্মঘাতী নৌস্কোয়াড গঠন করা। তাদের প্রশিক্ষণ চলতে থাকে ভারতীয় নৌবাহিনীর সার্বক্ষণিক তত্ত্বাবধানে। প্রশিক্ষণ শেষ হওয়ার পর তাদের অপারেশন শুরু করে। এদের একটি দল আসে মোংলায়। এ দলে ছিল ৪০ জন নৌসেনা। এটা ছিল বাহিনীর দ্বিতীয় বৃহত্তম দল। দলের নেতৃত্বে ছিলেন সাবমেরিনার আহ্সানউল্লাহ। তারা ১৪ আগস্ট বন্দরে অবস্থানরত জাহাজে নৌকমান্ডোরা অভিযান চালায়। এতে ৬টি বিদেশি জাহাজ বিধ্বস্ত হয়ে ডুবে যায়। অভিযানের উদ্দেশ্য ছিল সারা বিশে^ বাংলাদেশের অস্থিতিশীল অবস্থার কথা জানিয়ে দেওয়া এবং পাক বাহিনীর মনোবলকে দুর্বল করে তোলা। এতে মোংলা বন্দর আবার অকেজো হয়ে পড়ে। বিদেশি জাহাজ আসা আবার বন্ধ হয়ে যায়। সাথে সাথে শ্রমিক-কর্মচারীরাও দলে দলে পালিয়ে যেতে থাকে। সব মিলিয়ে বন্দরে নেমে আসে এক অচলাবস্থা। দেশ স্বাধীন না হওয়া পর্যন্ত বন্দরে অচলাবস্থা ছিল।
পুনর্গঠনের শুরু বঙ্গবন্ধুর হাত ধরে
দেশ স্বাধীন হওয়ার পর বন্দর প্রায় বিধ্বস্ত। যুদ্ধের সময় সব পণ্য আগুনে পুড়ে ও লুটপাট হয়ে যায়। নির্মাণাধীন শেডগুলোও ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ডুবন্ত জাহাজ বন্দর চ্যানেলে সৃষ্টি করে প্রতিবন্ধকতা। অবাঙালি কর্মচারীরাও পলাতক। বাঙালি কর্মচারী যারা ফিরে আসছে, তারাও বিপর্যস্ত। কাজ চালানোর মতো প্রয়োজনীয় টাগ বোট, পাইলট বোট, ক্রেন এবং অন্যান্য যন্ত্রপাতি সবই প্রায় অকেজো। এমন অবস্থার মধ্যেই অতি দ্রুত বন্দরকে স্বাভাবিক করে তোলার চেষ্টা চলতে থাকে। সদ্য স্বাধীন দেশকে পুনর্গঠনের প্রয়োজনে বন্দরকে সচল করা ছিল সবচেয়ে জরুরি। সে সময় একটি প্রাথমিক জরিপ চালানো হয়। বন্দর চ্যানেলে জাহাজ চলাচলে ডুবন্ত জাহাজগুলো অন্তরায় হয়ে দাঁড়ায়। এগুলো সরিয়ে না নিলে বন্দরকে স্বাভাবিক করা যাচ্ছিল না। ক্রান্তিকালে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বন্দর রূপান্তরের কারিগর হিসেবে আবির্ভূত হন। সরকারি সফরে তিনি মস্কোতে যাওয়ার পর রুশ সরকারের সাথে বন্দর চ্যানেলকে সচল করতে সহযোগিতার আহ্বান জানান। বঙ্গন্ধুর আহ্বানেই ১৯৭২ সালের ২২ মার্চ বাংলাদেশ ও সোভিয়েত ইউনিয়ন সরকারের মধ্যে বিধ্বস্ত ও ডুবে যাওয়া জাহাজ উদ্ধারে চুক্তি স্বাক্ষর হয়। এরপর ডুবন্ত জাহাজগুলো তুলে এবং প্রয়োজনীয় সংস্কার ও যন্ত্রপাতি আমদানির মাধ্যমে বন্দরকে কর্মক্ষম করে তোলা হয়। ১৯৭৩ সালে ৭টি জেটি নির্মাণের পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়। ১৯৭৪ সালের জানুয়ারি থেকে জেটি নির্মাণের কাজ শুরু হয়। কিন্তু পুনরায় একনেকের অনুমোদনক্রমে ১৯৭৬ সালে প্রকল্প ব্যয় ১ হাজার ৩৩৮ মিলিয়ন টাকায় সংশোধন করা হয় এবং জেটি নির্মাণের নকশায়ও পরিবর্তন ও পরিবর্ধন আনা হয়। ১৯৭৭ সালে আবারও সংশোধিত ৭টি জেটি নির্মাণের পরিকল্পনা সংশোধন করে ৫টিতে নামিয়ে আনা হয়। সে সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ৫টি জেটির নির্মাণ কাজ চলতে থাকে।

১৯৭৭ সালের ১৮ জুলাই আরসিসি জেটি নির্মাণের কাজ উদ্বোধন করা হয়। মূল প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য ৯টি পরিপূরক প্রকল্পও নেওয়া হয়। এর মধ্যে হাইড্রোলিক ইনভেস্টিগেশন অ্যান্ড রিভার ট্রেনিং প্রকিউরমেন্ট অব ফাইভ লাইট টাওয়ার, রিপ্লেসমেন্ট অ্যান্ড রিনিউয়িং অ্যাডমিয়ালিটি টাইপ মুরিং বয়া, এইড টু নেভিগেশন ফর ডে অ্যান্ড নাইট শিপিং, ডেভেলপমেন্ট অব মোংলা টাউনশিপ অন্যতম।
১৯৮৩ সালের ৩ ফেব্রুয়ারি থেকে নবনির্মিত ৫টি জেটিতে সমুদ্রগামী জাহাজ নোঙর করতে শুরু করে। একই বছর ২ জুলাই একটি কনটেইনারবাহী জাহাজ জেটিতে ভেড়ে এবং ১০২টি কনটেইনারে পাটজাত দ্রব্য বোঝাই করার জন্য জেটিতে নামানো হয়।
১৯৫৪ সালে মোংলা বন্দর স্থায়ীভাবে মোংলায় এলেও পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে এ বন্দর বা চালনা পোতাশ্রয় নামে পরিচিত ছিল। দীর্ঘদিন মোংলায় অবস্থিত এ বন্দরের নাম ছিল চালনা বন্দর। পোর্ট অব চালনা অথরিটি। পরে স্থানের সঙ্গে নামের এ বৈসাদৃশ্য নিরসনকল্পে ১৯৮৭ সালের ৮ মার্চ চালনা বন্দরের স্থলে এর নতুন নামকরণ করা হয় মোংলা বন্দর। এ বন্দরের সাথে দেশের অন্যান্য স্থানের যোগাযোগের ক্ষেত্রেও আনা হয় উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন। দেশের সমগ্র অংশের সঙ্গে সুষ্ঠু যোগাযোগের ওপরই একটি বন্দরের সম্প্রসারণ ও যথাযথ বিকাশ নির্ভরশীল। প্রাকৃতিক বন্দর হিসেবে যোগাযোগের ক্ষেত্রে প্রাকৃতিক বাধার অন্ত ছিল না। এ বন্দর স্থাপনের বড় উদ্দেশ্য ছিল অর্থনৈতিকভাবে সম্ভাবনাময় করে তোলা। এ বিষয়টিকে গুরুত্ব দিয়ে নৌপথে মোংলাকে রাজধানীর কাছাকাছি নিয়ে যাওয়ার জন্য ১৯৭০-৭২ সালে মোংলা-ঘষিয়াখালী খাল কাটা হয়। প্রায় সাড়ে তিন মাইল দীর্ঘ এ খাল খনন করতে খরচ হয় সর্বমোট ৫ কোটি ৯৬ লাখ টাকা। এতে মোংলা বন্দর আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। মোংলা ঢাকা ও নারায়ণগঞ্জের দূরত্ব ২২৫ মাইল থেকে ১৭০ মাইলে নেমে আসে। স্থলপথে দেশের অন্যান্য অংশের সাথে মোংলার কোনো যোগাযোগ ছিল না। মোংলা থেকে মালামাল খুলনা নেওয়ার একমাত্র মাধ্যম ছিল নৌপথ। এতে সময় লাগত অনেক বেশি। প্রায় ৬ থেকে ৭ ঘণ্টা। শুধু সময় নয়, ছিল আরও নানা সমস্যা। এসব অসুবিধা দূর করতে এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের সাহায্যে নির্মাণ করা হয় খুলনা-মোংলা মহাসড়ক। খুলনা-মোংলা মহাসড়ক যোগাযোগের ক্ষেত্রে নতুন যুগের সূচনা করে। এখন এ পথে পণ্য পরিবহন করতে লাগছে মাত্র ১ ঘণ্টা। মালামাল ট্রাকে করে খুলনা নিয়ে সেখান থেকে সরাসরি ট্রাকে বা ট্রেনের মাধ্যমে উত্তরবঙ্গসহ দেশের যেকোনো স্থানে প্রেরণ করা যাচ্ছে। এতে খরচও পড়ছে অনেক কম।
মুখ থুবড়ে পড়া
দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের ব্যবসায়ীদের আমদানি-রপ্তানির মাধ্যমে আশির দশকের মাঝামাঝি পর্যন্ত মোংলা লাভজনক বন্দর হিসেবে পরিচিতি ছিল। এরপর থেকে ধীরে ধীরে বন্দরের অবস্থার অবনতি হতে থাকে। বিশ^বাজারে পাট ও পাটজাত পণ্যের মন্দা, দেশের পাটকলগুলো বন্ধ হয়ে যাওয়া ও রপ্তানি পণ্যে বৈচিত্র্য আসায় বন্দর দিয়ে রপ্তানি উল্লেখযোগ্য হারে কমে যায়। পরবর্তী বছরগুলোতে বিশেষ করে ৯০-এর দশক থেকে অবহেলা ও পশুর নদীর চ্যানেলে নাব্যতা কমে যাওয়ায় মোংলা বন্দরের ব্যবহার উপযোগিতা কমে যায়। এক পর্যায়ে মোংলা বন্দর প্রায় জাহাজশূন্য হয়ে পড়ে। ফলে ২০০৩-০৪ অর্থবছর থেকে ২০০৭-০৮ অর্থবছরের আগ পর্যন্ত বন্দরের লোকসানের পরিমাণ ছিল ৩৮ কোটি ৫২ লাখ টাকা।
রূপান্তর শুরু: অভিশপ্ত থেকে আশীর্বাদ
ভৌগোলিক অবস্থানগত কারণে বঙ্গোপসাগর-তীরবর্তী বাংলাদেশ এশিয়ার অন্য দেশগুলোর কাছে বেশ গুরুত্বপূর্ণ। ভারত ও মিয়ানমারের সঙ্গে সমুদ্রসীমার বিরোধ সমাধানের পর বিশাল সমুদ্রসীমার মালিকানা লাভের ফলে বঙ্গোপসাগরকেন্দ্রিক কার্যক্রম এ গুরুত্বকে আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। কারণ এ বঙ্গোপসাগরের ভূকৌশলগত সুবিধা কাজে লাগিয়ে বাংলাদেশে সমুদ্রবন্দরভিত্তিক অর্থনীতি ক্রমেই শক্তিশালী হচ্ছে। এছাড়া চট্টগ্রাম বন্দরের ওপর একক নির্ভরতা কমানো ও ক্রমবর্ধমান অর্থনীতির চাপ মোকাবিলায় এবং দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের অর্থনৈতিক উন্নয়নে ২০০৯ সালের শুরুতেই বর্তমান সরকার বিশেষ উদ্যোগ গ্রহণ করে। এ লক্ষ্যে মৃতপ্রায় মোংলা বন্দরকে কার্যক্ষম ও কর্মচঞ্চল করার লক্ষ্যে বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণ করে। বন্দরের কর্মচাঞ্চল্য বৃদ্ধির লক্ষ্যে ২০০৯ সালের জুন মাস থেকে এ বন্দরের মাধ্যমে গাড়ি আমদানি শুরু হয়। এছাড়া সংশ্লিষ্ট সংসদীয় স্থায়ী কমিটিসমূহের নির্দেশনা, বন্দর উপদেষ্টা কমিটি ও বন্দর ব্যবহারকারীদের সুপারিশ এবং নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে বন্দর ব্যবস্থাপনায় মোংলা বন্দর ধীরে ধীরে গতিশীলতা অর্জন করতে থাকে।
বন্দরের সক্ষমতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে ২০০৯ সালের জুন থেকে ২০২০ পর্যন্ত ১৮টি প্রকল্পসহ ৫০টির অধিক উন্নয়ন কার্যক্রম বাস্তবায়ন করা হয়েছে। বর্তমানে ১০টি প্রকল্প বাস্তবায়নাধীন ও তিনটি প্রকল্প অনুমোদনের প্রক্রিয়ায় আছে। মোংলা বন্দর ব্যবহারকারীদের দ্রুত ও দক্ষসেবা প্রদানে যেসব উন্নয়ন কার্যক্রম হাতে নেওয়া হয়েছে, তার মধ্যে আছে ৭০টি কনটেইনার ও কার্গো হ্যান্ডলিং যন্ত্রপাতি সংগ্রহ, ৮০ কিলোওয়াট ক্ষমতাসম্পন্ন সৌর প্যানেল স্থাপন, তিনটি কার ইয়ার্ড নির্মাণ, ১০টি বিভিন্ন ধরনের সহায়ক জলযান ক্রয়, ৬২টি বিভিন্ন ধরনের লাইটেড বয়া, দুটি রোটেটিং বিকন, ছয়টি জিআরপি লাইট টাওয়ার সংগ্রহ ও স্থাপন, একটি মোবাইল হারবার ক্রেন, একটি স্টাফিং-আনস্টাফিং শেড, একটি ওয়েব্রিজ ও মোবাইল স্ক্যানার সংগ্রহ। এছাড়া রুজভেল্ট জেটির বিভিন্ন অবকাঠামোর উন্নয়নকাজও শেষ করা হয়েছে।

চলমান ১০টি প্রকল্পের বাইরে বন্দরের অত্যাবশ্যকীয় যন্ত্রপাতি-সরঞ্জাম সংগ্রহ, পশুর চ্যানেলের ইনার বারে ড্রেজিং, সহায়ক জলযান সংগ্রহ, বর্জ্য নিঃসৃত তেল অপসারণ ব্যবস্থাপনা, বন্দরের সক্ষমতা বৃদ্ধিকরণ থেকে পিপিপির আওতায় মোংলা বন্দরের দুটি অসম্পূর্ণ জেটির নির্মাণকাজও শেষ করা হবে ২০২১ চলতি বছরের মধ্যে। চলমান এসব প্রকল্প বাস্তবায়নে ব্যয় হবে আট হাজার কোটি টাকা।
বিগত সরকারের শেষ অর্থবছরে (২০০৬-০৭) যেখানে মোংলা বন্দর ৬ কোটি ১৯ লাখ টাকা লোকসান গুনেছে, সেখানে বর্তমান সরকারের দায়িত্ব গ্রহণের পর প্রথম অর্থবছর ২০০৮-০৯ অর্থবছর থেকে মোংলা বন্দর পুনরায় লাভজনক প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছে। এরই ধারাবাহিকতায় ২০১৫-১৬ অর্থবছরে মোংলা বন্দর ৬৪ কোটি ৭৩ লাখ টাকা, ২০১৬-১৭ অর্থবছরে ৭৩ কোটি ২৫ লাখ, ২০১৭-১৮ অর্থবছরে ১০৯ কোটি ৩৩ লাখ, ২০১৮-১৯ অর্থবছরে ১৩৩ কোটি, ২০১৯-২০ অর্থবছরে ১১৭ কোটি ও সর্বশেষ অর্থবছরে ১৩০ কোটি টাকা মুনাফা অর্জন করেছে। এক সময়কার অভিশপ্ত বন্দর এখন দেশের আশীর্বাদ। আশা করা হচ্ছে, আগামী এক দশকের মধ্যে মোংলা বন্দরসহ গোটা খুলনাঞ্চল ঈর্ষণীয় অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি অর্জন করবে, যা জিডিপির (মোট দেশজ উৎপাদন) প্রবৃদ্ধিতে ২ শতাংশেরও বেশি অবদান রাখবে। ‘ডাবল ডিজিট’ প্রবৃদ্ধি অর্জনের যে স্বপ্ন দেখছে বাংলাদেশ, তা পূরণে মোংলা বন্দর হবে একটি মাইলফলক।
গুরুত্ব বাড়াবে পদ্মা সেতু
পদ্মা সেতু চালু হলে দক্ষিণের জেলাগুলোর মানুষের আর্থসামাজিক অবস্থার উন্নয়ন নিয়ে সাউথ এশিয়ান নেটওয়ার্ক অন ইকোনমিক মডেলিংয়ের (সানেম) নির্বাহী পরিচালক অর্থনীতিবিদ সেলিম রায়হান ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক বজলুল হক খন্দকার ২০১০ সালে সেতু বিভাগের জন্য পদ্মা সেতুর অর্থনৈতিক প্রভাব নিয়ে একটি সমীক্ষা করেন। সমীক্ষার তথ্য অনুযায়ী, সেতুটি দেশের মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) প্রবৃদ্ধি ১ দশমিক ২৩ শতাংশ বাড়াবে। এ সমীক্ষায় রেল সংযোগের বিষয়টি ছিল না। পরে রেল যুক্ত হয়েছে, ফলে সেতুটি আরও বেশি ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে অর্থনীতিতে। সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের মনে করেন, পদ্মা সেতুর ফলে দেড় শতাংশের বেশি প্রবৃদ্ধি বেশি হবে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ঢাকা বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় বাজার। এই বাজারের সঙ্গে সহজ যোগাযোগ দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পশ্চিমের জেলাগুলোতে অর্থনৈতিক কর্মকা- বাড়াবে। ৬ দশমিক ১৫ কিলোমিটারের পদ্মা সেতু তৈরিতে যে ৩১ হাজার কোটি টাকার বেশি ব্যয় হচ্ছে, রেল সংযোগে যে ৩৯ হাজার কোটি টাকার মতো ব্যয় হচ্ছে, সেটাও জিডিপিতে প্রভাব ফেলছে। কারণ প্রকল্পের ব্যয়ের টাকা জিডিপিতে যোগ হচ্ছে। পরোক্ষভাবে চাহিদা বেড়েছে পণ্য ও সেবার।
পদ্মা সেতুর ওপর দিয়ে প্রতিবছর কী পরিমাণে যানবাহন চলাচল করবে, তা নিয়ে ২০০৫ থেকে ২০১০ সাল পর্যন্ত কয়েকটি সমীক্ষা হয়। সমীক্ষাগুলো করে এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি) ও জাপান ইন্টারন্যাশনাল কো-অপারেশন এজেন্সি (জাইকা) এবং সেতু বিভাগের জন্য সাউথ এশিয়ান নেটওয়ার্ক অন ইকোনমিক মডেলিং (সানেম)।

এডিবির সমীক্ষায় দেখা যায়, ২০২২ সালের শুরুতে যদি পদ্মা সেতু উদ্বোধন করা হয়, তাহলে ওই বছর সেতু দিয়ে প্রতিদিন চলাচল করবে প্রায় ২৪ হাজার যানবাহন। সংখ্যাটি প্রতিবছরই বাড়বে। ২০৫০ সালে প্রায় ৬৭ হাজার যানবাহন প্রতিদিন চলবে পদ্মা সেতু দিয়ে। এ যানবাহনের উল্লেখযোগ্য একটি অংশ মোংলায় পণ্য পরিবহনকারী যানবাহন। এডিবির সমীক্ষায় আরও বলা হয়, পদ্মা সেতু হলে দক্ষিণের জেলাগুলোতে যেতে বাসের ক্ষেত্রে গড়ে দুই ঘণ্টা ও ট্রাকের ক্ষেত্রে ১০ ঘণ্টা সময় সাশ্রয় করবে। চট্টগ্রাম বন্দর থেকে আমদানি করা পণ্য রাজধানীতে নিতে ৮ থেকে ১০ ঘণ্টা সময় লাগে, সেখানে পদ্মা সেতু চালু হলে মোংলা থেকে ঢাকায় আমদানি করা পণ্য নিতে সময় লাগবে ৫ থেকে ৬ ঘণ্টা। খানজাহান আলী বিমানবন্দর, খুলনা-মোংলা রেললাইন নির্মিত হলে মোংলার সঙ্গে যোগাযোগ ব্যবস্থায় নতুন দিগন্ত উন্মোচন হবে।
এডিবির আরেক মূল্যায়ন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে সেতুটি দেশের জিডিপির হার বাড়াবে ১ দশমিক ২৩ শতাংশ, যেখানে দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের জিডিপি বাড়াবে ২ দশমিক ৩ শতাংশ পর্যন্ত। দারিদ্র্য বিমোচনের হার বাড়াবে শূন্য দশমিক ৮৪ শতাংশ। দেশের গুরুত্বপূর্ণ মোংলা ও পটুয়াখালীর পায়রার বন্দরের সাথে যোগাযোগ সহজ করবে। প্রস্তাবিত এশিয়ান হাইওয়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো পদ্মা সেতু।
আন্তর্জাতিকভাবেও মোংলা বন্দর গুরুত্বপূর্ণ
একটি আন্তর্জাতিক বন্দর হিসেবে মোংলার গুরুত্ব দিন দিন বাড়ছে। এশিয়া, মধ্যপ্রাচ্য, ইউরোপ, অস্ট্রেলিয়া, আফ্রিকা, উত্তর আমেরিকা, লাতিন আমেরিকার দেশগুলো থেকে এ বন্দরে জাহাজ আসে। বাংলাদেশের প্রায় সব নদীবন্দরের সঙ্গে মোংলার সংযুক্ত যেমন রয়েছে, তেমনি উপকূলীয় জাহাজ চুক্তির মাধ্যমে কলকাতা বন্দর এবং থাইল্যান্ডও মোংলার সঙ্গে সম্পৃক্ত রয়েছে, যা মোংলাকে আন্তর্জাতিক বন্দর হিসেবে আরও গুরুত্বপূর্ণ করে তুলেছে।
পৃথিবীর প্রায় সব বন্দরের সাথেই মোংলা বন্দরের বাণিজ্য সম্পর্ক রয়েছে। সম্প্রতি মোংলা বন্দর ঘিরে জেগেছে নতুন সম্ভাবনা। ভারত ও নেপালের সঙ্গে ট্রানজিট চুক্তির ফলে এ সম্ভাবনা আরও বেড়ে গেছে। পাশাপাশি ভুটান ও চীনের কাছেও মোংলা বন্দরের গুরুত্ব বেড়েছে। বন্দর ব্যবহারে সুযোগ দিতে সরকারের সদিচ্ছার ফলে মোংলা বন্দর দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার অন্যতম বাণিজ্য কেন্দ্রে পরিণত হবে।
মোংলায় সুবিধা বেশি
সমুদ্রপথেই বাংলাদেশের অধিকাংশ আমদানি পণ্য দেশে আসে। দেশের দুটি প্রধান সমুদ্রবন্দর চট্টগ্রাম ও মোংলার পাশাপাশি পায়রা সমুদ্রবন্দরও কার্যক্রম শুরু করেছে। রপ্তানিতে ব্যবহার হচ্ছে চট্টগ্রাম ও মোংলা সমুদ্রবন্দর। চট্টগ্রাম বন্দরই দেশের আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্যের কেন্দ্রে রয়েছে। অবস্থানগত কারণে চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে কনটেইনারে আমদানি করা পণ্য হাতে পেতে মোংলার চেয়ে তুলনামূলক বেশি সময় অপেক্ষা করতে হচ্ছে ব্যবসায়ীদের।
বন্দর ব্যবহারকারীরা বলছেন, চট্টগ্রাম সমুদ্র বন্দরের চেয়ে বিশেষ করে গাড়ি আমদানিতে মোংলা বন্দরে সুবিধা বেশি। তুলনামূলক খরচ কম, নিরাপদে গাড়ি রাখার সুবিধার কারণেই চট্টগ্রামের চেয়ে মোংলা বন্দর দিয়ে গাড়ি আনতে ব্যবসায়ীদের আগ্রহ বাড়ছে। চট্টগ্রাম বন্দর যেখানে সক্ষমতার চূড়ান্ত পর্যায়ে কাজ করছে, সেখানে মোংলা বন্দরের সক্ষমতা অব্যবহৃত রয়েছে প্রায় অর্ধেক। এছাড়া মোংলায় যাতায়াতে কম সময় লাগায় ব্যবসায়ীরা ঝুঁকছেন বন্দর ব্যবহারে।

হ্যান্ডলিং হয় যে ধরনের পণ্য
মোংলা বন্দর তিন ধরনের পণ্য হ্যান্ডলিং করে। খোলা পণ্য, কনটেইনারবাহী পণ্য ও গাড়ি। বন্দরের মোট হ্যান্ডলিংয়ের প্রায় ৯৫ ভাগই কার্গো বা খোলা পণ্য। অবশিষ্টাংশ কনটেইনারবাহী পণ্য ও গাড়ি। স্ট্র্যাটেজিক প্ল্যানিং ও ম্যানেজমেন্ট কনসালট্যান্টসের (এসপিএমসি) করা সর্বশেষ মাস্টারপ্ল্যান অনুযায়ী সমুদ্রপথে দেশের মোট আমদানিতে অংশীদারিত্ব ১৪ শতাংশ এবং রপ্তানিতে মাত্র ২ শতাংশ।
২০১৪-১৫ সালে মোট কার্গো হ্যান্ডলিংয়ের পরিমাণ ছিল ৪৫ লাখ ৩০ হাজার ২৭৯ মেট্রিক টন। সর্বশেষ অর্থবছরে এটি বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১ কোটি ১৯ লাখ ৪৪ হাজার ৬০৮ মেট্রিক টনে। পরিমাণে প্রায় আড়াই গুণ বেড়েছে সাত বছরের ব্যবধানে। ধারাবাহিকভাবে এ পরিমাণ বাড়ছে। চলতি অর্থবছরের প্রথম চার মাসে কার্গো হ্যান্ডলিং হয়েছে ৩৭ লাখ ৬৩ হাজার ৯৫৩ মেট্রিক টন। এসপিএমসির করা মাস্টারপ্ল্যান অনুযায়ী ২০৩০ সালে মোংলা বন্দরকে ৩ কোটি ৩০ লাখ এবং ২০৪০ সালে ৭ কোটি ২৪ লাখ মেট্রিক টন কার্গো হ্যান্ডলিং করতে হবে।
মোংলা বন্দরের মোট হ্যান্ডলিংয়ে কনটেইনারের অংশীদারিত্ব একেবারে কম। প্রায় ১ লাখ টিইইউ কনটেইনার হ্যান্ডলিংয়ের সক্ষমতা থাকলেও ব্যবহার হচ্ছে মাত্র তার অর্ধেক। সর্বশেষ (২০২০-২১) অর্থবছরে কনটেইনার হ্যান্ডলিং হয়েছে ৪৩ হাজার ৯৫৯ টিইইউ। পরিমাণে ৩ লাখ ৯০ হাজার ৬৯ মেট্রিক টন। ২০১৪-১৫ অর্থবছরে কনটেইনার হ্যান্ডলিংয়ের পরিমাণ ছিল ৪২ হাজার ১৩৭ টিইইউ, পরিমাণে ২ লাখ ৯২ হাজার ৩৮২ মেট্রিক টন। সর্বশেষ সাত অর্থবছরের পরিসংখ্যান অনুযায়ী এতে উল্লেখযোগ্য উন্নতি হয়নি।
চট্টগ্রাম বন্দরের রপ্তানি পণ্যের সিংহভাগ তৈরি পোশাক। আমদানিতেও পোশাক তৈরির কাঁচামাল উল্লেখযোগ্য অংশ দখল করে আছে। আইসিডিগুলোর অবস্থান ও বিদেশি ক্রেতাদের চাহিদা অনুযায়ী চট্টগ্রাম বন্দর দিয়েই বেশির ভাগ পোশাক রপ্তানি করতে হয় উদ্যোক্তাদের। ২০১৯ সালের ১৭ সেপ্টেম্বর প্রথমবারের মতো একটি ৪০ ফুট দৈর্ঘ্যরে কনটেইনারে পোশাক রপ্তানির মাধ্যমে মোংলা বন্দরও এ খাতে নাম লেখায়। এতে প্রত্যাশা অনুযায়ী উন্নতি না হলেও বন্দর কর্তৃপক্ষের প্রচেষ্টা অব্যাহত আছে। সাম্প্রতিক সময়ে পোল্যান্ডের একটি তৈরি পোশাক আমদানিকারক প্রতিষ্ঠান মোংলা বন্দর দিয়ে পোশাক আমদানির আগ্রহ প্রকাশ করে। এ পরিপ্রেক্ষিতে বন্দর কর্মকর্তাদের সাথে একাধিক ভার্চুয়াল বৈঠক করে প্রতিষ্ঠানটি। ১৯ অক্টোবর গাজীপুরের ৪টি পোশাক কারখানার ১ হাজার ৫৮৫ প্যাকেজের ২০ টন পোশাক রপ্তানির জন্য জাহাজীকরণ করা হয়। কর্তৃপক্ষ আশা করছে, সুযোগ-সুবিধা বাড়ানোর যে প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে, তাতে আগামীতে তৈরি পোশাক রপ্তানিতেও মোংলা বন্দরের হিস্যা বাড়বে।

যেখানে এগিয়ে মোংলা
চট্টগ্রাম বন্দরের অনেক পরে আমদানি করা গাড়ি খালাস কার্যক্রমে যুক্ত হলেও এখন দেশের সমুদ্রবন্দরগুলো দিয়ে খালাস হওয়া গাড়ির প্রায় অর্ধেক অংশীদারিত্ব মোংলা বন্দরের। চট্টগ্রাম ও মোংলা বন্দরে জাহাজ থেকে নামানোর পর চারদিন পর্যন্ত গাড়ি রাখার ভাড়া দিতে হয় না। এরপর প্রথম সপ্তাহ, দ্বিতীয় সপ্তাহ এবং পরবর্তী সময়ের জন্য প্রতিদিন এই তিন স্তরে টন হিসেবে ভাড়া আদায় করে বন্দরগুলো। এই তিন স্তরে চট্টগ্রাম বন্দর আদায় করে যথাক্রমে ৯৮ টাকা ৪০ পয়সা, ২৪৬ টাকা এবং ৩৯৩ টাকা করে। আর মোংলা বন্দর তিন স্তরে আদায় করে যথাক্রমে ২৮ টাকা ৩৫ পয়সা, ৮০ টাকা ৭১ পয়সা এবং ১২৯ টাকা করে। ফলে মোংলা বন্দর ব্যবহার করে লাভবান হচ্ছেন ব্যবসায়ীরা।
বাজেটে গাড়ির ওপর প্রদেয় শুল্ক, অর্থনৈতিক অবস্থা বিবেচনায় গাড়ির মূল্য হ্রাস-বৃদ্ধির ওপর গাড়ি আমদানির সংখ্যা নির্ভর করে। ২০১৪-১৫ অর্থবছরে মোংলা বন্দর দিয়ে গাড়ি খালাস হয়েছে ১১ হাজার ২১৮টি। সর্বশেষ অর্থবছরে এই সংখ্যা ছিল ১৪ হাজার ৪৭৪। সাত অর্থবছরের ব্যবধানে উল্লেখযোগ্য হারে গাড়ির সংখ্যা না বাড়লেও সংরক্ষণ ও খালাসের ব্যয় বিবেচনায় মাত্র ১২ বছরের ব্যবধানে গাড়ি খালাসে মোংলার অংশীদারিত্ব কৃতিত্বের দাবি রাখে। অংশীদারিত্ব বৃদ্ধিতে নীতিগত সহায়তা দিয়েছে নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়।

জাহাজ আগমনেও রেকর্ড মোংলা বন্দরের
কোভিড-১৯ সংক্রমণে বিশ্বজুড়ে বন্দর ব্যবস্থাপনায় ধস নামে। আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্য সংকুচিত হয়ে আসে। এমন বাস্তবতায়ও মোংলা বন্দরে জাহাজ আগমন সংখ্যা কমেনি। সর্বশেষ (২০২০-২১) অর্থবছরে মোংলা বন্দর জাহাজ হ্যান্ডলিং করেছে ৯৭০টি। এর আগের (২০১৯-২০) অর্থবছরে এ সংখ্যা ছিল ৯০৩টি। যদিও ২০১৮-১৯ অর্থবছরে তা ছিল ৯১২। কোভিডের প্রভাবে এ সংখ্যা হ্রাস পেয়েছে। তবে সাত বছরের পরিসংখ্যান অনুযায়ী ধারাবাহিকভাবে এ সংখ্যা বেড়েছে। উপকূলীয় নৌ-প্রটোকলের আওতায় মোংলা বন্দরে জাহাজ আগমন সংখ্যাও বেড়েছে। ২০১৪-১৫ অর্থবছরে ৮৬টি জাহাজের বিপরীতে সর্বশেষ অর্থবছরে এ সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ৩৩৩টিতে।
আন্তর্জাতিক মানের নিরাপত্তা
২০০৪ সাল থেকে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত আইএসপিএস কোড বাস্তবায়ন করছে মোংলা বন্দর কর্তৃপক্ষ। শুরু থেকেই নিজস্ব নিরাপত্তা বিভাগ বন্দরের আমদানি-রপ্তানি পণ্য, স্থাপনা ও কর্মকর্তা-কর্মচারীদের নিরাপত্তায় কাজ করছে। এছাড়া সুন্দরবন ঘিরে বন্দরের ১৩০ কিলোমিটার চ্যানেলে যেকোনো সন্ত্রাসী কার্যক্রম রোধে বন্দর কর্তৃপক্ষের পাশাপাশি নৌবাহিনী, কোস্ট গার্ড ও পুলিশ যৌথভাবে কাজ করছে। একজন লেফটেন্যান্ট কমান্ডার পদমর্যাদার কর্মকর্তা নিরাপত্তা বিভাগের নেতৃত্ব দিচ্ছেন। এছাড়া নিরাপত্তা বিভাগের অধীনে রয়েছে একটি ফায়ার সার্ভিস। যেটি বন্দরের যেকোনো অগ্নিদুর্ঘটনা রোধে সার্বক্ষণিক কাজ করছে।
স্টেকহোল্ডারদের সেবা দিতে যা যা রয়েছে
যন্ত্রপাতি: বন্দরের যান্ত্রিক ও বিদ্যুৎ বিভাগের অধীনে বর্তমানে ৭২টি যন্ত্রপাতির মাধ্যমে কার্গো ও কনটেইনার হ্যান্ডলিং সেবা দেওয়া হচ্ছে। এছাড়া সক্ষমতা বৃদ্ধিকরণ প্রকল্পের আওতায় আরও ৭৫টি যন্ত্রপাতি সংগ্রহ করা হচ্ছে। প্রকল্পের ৬৬টি যন্ত্রপাতি ইতিমধ্যে বন্দরে এসে পৌঁছেছে। চলতি মাসের মধ্যে অবশিষ্টগুলোও পৌঁছাবে।
জলযান: কার্গো ও কনটেইনারবাহী জাহাজকে বন্দরের জেটিতে ভিড়তে সহায়তাকারী জলযান টাগবোট রয়েছে।
ওয়ান স্টপ সার্ভিস: ব্যবহারকারীদের সুবিধার্থে ওয়ান স্টপ সার্ভিস চালু আছে বন্দরে। এতে যেসব বিভাগ সরাসরি অপারেশনাল কাজের সাথে জড়িত সবগুলোকে একটি কক্ষে একত্র করা হয়েছে। ফলে বন্দর ব্যবহারকারীদের এক বিভাগ থেকে অন্য বিভাগে তাদের কাজের স্বার্থে যেতে হচ্ছে না। তারা একই রুমে অবস্থিত বিভিন্ন বিভাগ থেকে সকল সুবিধা নিতে পারবেন। এতে সময় সাশ্রয় হচ্ছে, বাড়ছে আমদানি-রপ্তানির গতি।
স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা
সক্ষমতা বাড়াতে স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা রয়েছে কর্তৃপক্ষের। প্রকল্পের প্রয়োজন ও গুরুত্ব বিবেচনায় এসব প্রকল্প বাস্তবায়নের সময় নির্ধারণ করা হয়েছে। সর্বশেষ তথ্যানুযায়ী কর্তৃপক্ষ স্বল্পমেয়াদে ৯টি প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে। এগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো যন্ত্রপাতি ও জলযান সংগ্রহ, মাস্টারপ্ল্যান প্রণয়ন, চ্যানেলের নাব্যতা বৃদ্ধি ও ভিটিএমআইএস (ভেসেল ট্রাফিক ম্যানেজমেন্ট ইনফরমেশন সিস্টেম) স্থাপন।
মধ্যমেয়াদি পরিকল্পনার আওতায় অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে বন্দরের সুবিধাদি সম্প্রসারণ ও আধুনিকায়ন এবং পশুর চ্যানেল সংরক্ষণ ড্রেজিং। এ দুটি প্রকল্প বাস্তবায়নে ব্যয় ধরা হয়েছে ১ হাজার ৮৫০ কোটি টাকা।
এছাড়া সরকারি অর্থায়নে ১৯টি উন্নয়ন প্রকল্প দীর্ঘমেয়াদে বাস্তবায়নের পরিকল্পনা রয়েছে কর্তৃপক্ষের। এ প্রকল্পগুলো বন্দরের অবকাঠামোগত উন্নয়ন, যন্ত্রপাতি ও জলযান ক্রয় ও আধুনিক প্রযুক্তি স্থাপনে গ্রহণ করা হয়েছে। এসব প্রকল্পের মধ্যে জয়মনিরগোলে কনটেইনার, কয়লা, এলএনজি হ্যান্ডলিং জেটি এবং হারবারিয়ায় ভাসমান জেটি নির্মাণে সিঙ্গাপুরের বিনিয়োগ প্রস্তাব রয়েছে।

অমিত সম্ভাবনার হাতছানি
চট্টগ্রাম বন্দরের সাথে তুলনা করলে আমদানি-রপ্তানিতে মোংলা বন্দরের অংশীদারিত্ব বেশি নয়। অবহেলা, অসন্তোষ আর দূরদর্শিতার অভাবে ডুবতে থাকা মোংলা বন্দর এখন রূপান্তরের পর্যায়ে আছে। ২০০৭ সালেও যে প্রতিষ্ঠান লোকসান গুনেছে, ২০০৮-০৯ অর্থবছর থেকে মুনাফা অর্জনের ধারাবাহিক সর্বশেষ অর্থবছরে এসে প্রায় ১৩০ কোটি টাকা মুনাফা করেছে সেটি। এটি নির্দেশ করে মোংলার অপারেশনাল কর্মকা-ের ধারাবাহিক প্রবৃদ্ধির। দেশের মেগা প্রকল্প পদ্মা সেতু ও রেল সংযোগ মোংলাকে সংযুক্ত করবে ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের সাথে, এতে দূরত্ব কমবে, বাঁচবে সময়। অন্যদিকে বিস্তৃত নৌরুটে আগে থেকেই সংযুক্ত মোংলা বন্দর। ট্রানজিট পণ্য পরিবহনে নেপাল, ভুটান ও ভারতের সাথে চুক্তিও মোংলার জন্য আশীর্বাদ।