দেশের দ্বিতীয় প্রধান সমুদ্রবন্দর মোংলা বন্দর। ছোট ছোট পদক্ষেপে পেরিয়ে এসেছে অনেকটা পথ; এ বছর পালিত হলো বন্দরটির ৭১তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী। মূলত পাট ও পাটজাত পণ্য রপ্তানির উদ্দেশ্যকে সামনে রেখে ১৯৫০ সালের ১ ডিসেম্বর মোংলা বন্দরের যাত্রা শুরু।
আশাবাদ নিয়ে শুরু হলেও মোংলা বন্দরকে চলতে হয়েছে অনেক প্রতিকূলতা নিয়ে। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের উদ্যোগে স্বল্প সময়ের মধ্যে যুদ্ধবিধ্বস্ত বন্দরকে সচল করে তোলা হয় এবং তিনি জেটি নির্মাণসহ প্রয়োজনীয় সংস্কার পরিকল্পনা গ্রহণ করেন। তারই ফলশ্রুতিতে আশির দশকের মাঝামাঝি পর্যন্ত মোংলা লাভজনক বন্দর হিসেবে পরিচিতি ছিল। এরপর থেকে ধীরে ধীরে বন্দরের অবস্থার অবনতি হতে থাকে। বিশ্ববাজারে পাট ও পাটজাত পণ্যের মন্দা, দেশের পাটকলগুলো বন্ধ হয়ে যাওয়া ও রপ্তানি পণ্যে বৈচিত্র্য আসায় বন্দর দিয়ে রপ্তানি উল্লেখযোগ্য হারে কমে যায়। পরবর্তী বছরগুলোতে বিশেষ করে ৯০-এর দশক থেকে অবহেলা ও পশুর নদীর চ্যানেলে নাব্যতা কমে যাওয়ায় মোংলা বন্দরের ব্যবহার উপযোগিতা কমে আসে। একপর্যায়ে মোংলা বন্দর প্রায় জাহাজশূন্য হয়ে পড়ে। ফলে ২০০৩-০৪ অর্থবছর থেকে ২০০৬-০৭ অর্থবছর পর্যন্ত বন্দরের লোকসানের পরিমাণ ছিল ৩৮ কোটি ৫২ লাখ টাকা। তবে ২০০৮ সালে বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার পর আবার ঘুরে দাঁড়িয়েছে মোংলা বন্দর। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় মৃতপ্রায় মোংলা বন্দর পেয়েছে নতুন জীবন। লোকসান, ধর্মঘট আর জাহাজশূন্য চ্যানেলÑএই তিন শব্দ এখন সুদূর অতীত। গত এক যুগে বন্দরের আয় বেড়েছে প্রায় ৪৩ গুণ। সরকারের টেকসই উন্নয়ন পরিকল্পনা ও তা বাস্তবায়নের কারণে অবহেলিত বন্দরের তকমা ছেড়ে মোংলা বন্দর দেশের আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্যের গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার হয়ে উঠছে।
বন্দরের সক্ষমতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে ২০০৯ সালের জুন থেকে ২০২০ পর্যন্ত ১৮টি প্রকল্পসহ ৫০টির অধিক উন্নয়ন কার্যক্রম বাস্তবায়ন করা হয়েছে। বর্তমানে ১০টি প্রকল্প বাস্তবায়নাধীন ও তিনটি প্রকল্প অনুমোদনের প্রক্রিয়ায় আছে। মোংলা বন্দর দিয়ে ২০১৯ সালে পোশাক রপ্তানি শুরু হওয়ার পর অল্প সময়েই পোশাক রপ্তানিতে বেশ চাহিদা বেড়েছে এ বন্দরের। পদ্মা সেতু, রামপাল তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্র ও দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে অর্থনৈতিক অঞ্চল প্রতিষ্ঠার মতো উন্নয়ন প্রকল্প মোংলা বন্দরের গুরুত্ব বাড়াচ্ছে প্রতিনিয়ত। ইতিমধ্যেই ভারতের ‘সেভেন সিস্টার্স’ ও নেপাল এবং ভুটানের ট্রানজিট বন্দর হিসেবে নিজের অবস্থান জানান দিয়েছে মোংলা। সব মিলিয়ে অমিত সম্ভাবনার হাতছানি মোংলা বন্দরের সামনে। মোংলা বন্দরের আদ্যোপান্ত নিয়ে রয়েছে এবারের মূল আয়োজন।
প্রিয় পাঠক, আরও একটি করোনাক্রান্ত বছর পার করতে যাচ্ছি আমরা, ২০২০ সালের মতো তীব্র না হলেও বছরের শুরুতে করোনার ডেল্টা ভ্যারিয়েন্ট এবং শেষদিকটায় ওমিক্রন সারা বিশ^কে আতঙ্কিত করে রেখেছে। আশার কথা, এমন প্রতিকূল অবস্থাতেও বাংলাদেশের মেরিটাইম খাত উন্নয়নের ধারা অব্যাহত রেখেছে। তবে ওমিক্রন খুব একটা শক্তিশালী না হলেও এর অতিসংক্রামক বৈশিষ্ট্য পরিস্থিতি খারাপ করে তুলতে পারে। যথাযথ স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলাই এই ভাইরাস থেকে বাঁচার সবচেয়ে বড় হাতিয়ার।
প্রিয় পাঠক, আমরা চাই এ দেশের মেরিটাইমচর্চাকে একটি সুদৃঢ় ভিত্তিতে দাঁড় করাতে। বৈচিত্র্যময় আঙ্গিকে, সমৃদ্ধ কলেবরে বন্দরবার্তার পথচলা বাংলাদেশের মেরিটাইম খাতের বিকাশে আরও সহায়ক হবেÑসেই প্রত্যাশা। বছরজুড়ে সাথে থাকার জন্য কৃতজ্ঞতা, সবাইকে নতুন বছরের শুভেচ্ছা।