চীনের অন্যতম বাণিজ্যিক কেন্দ্র হচ্ছে সাংহাই। টেসলার গিগা কারখানা থেকে শুরু করে ডিজনির বিশাল রিসোর্টও আছে সেখানে। শুধু এরাই নয়, অনেক বহুজাতিক কোম্পানির দৃঢ় অবস্থান আছে চীনের বাণিজ্যিক নগরী সাংহাইয়ে। কিন্তু সম্প্রতি সাংহাইয়ে করোনাভাইরাসের প্রকোপ বেড়ে যাওয়ায় ব্যস্ত এ নগরীর ব্যবসায়িক কার্যক্রম বন্ধ হয়ে গেছে। ক্ষতির মুখে পড়ছে বহুজাতিক কোম্পানিগুলো।
চীনের সাংহাই শহরে প্রায় ২ কোটি ৩ লাখ মানুষের বসবাস। অমিক্রনের সংক্রমণ বৃদ্ধি পাওয়ায় দ্রুত নির্দেশনার মাধ্যমে বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছে সেখানে। গত সপ্তাহে আরোপিত লকডাউন সেখানকার বাসিন্দাদের পুরোপুরি ঘরে আটকে রেখেছে। খবর বিবিসির।
অর্থনৈতিক কেন্দ্রস্থল হওয়ার পাশাপাশি সেমিকন্ডাক্টর, ইলেকট্রনিকস ও গাড়ি উৎপাদনকেন্দ্র হিসেবেও পরিচিত সাংহাই। বিশ্বের ব্যস্ততম সমুদ্রবন্দরগুলোর মধ্যে সাংহাই অন্যতম।
২০১৯ সালের ডিসেম্বরে চীনে প্রথম করোনা শনাক্তের পর এটিই এখন পর্যন্ত সাংহাইয়ে আরোপিত দীর্ঘমেয়াদি লকডাউন। এ লকডাউন বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনীতির দেশ চীনে বড় ধরনের প্রভাব ফেলেছে।
চায়না ইকোনমিকস ইন্টিলিজেন্স ইউনিটের অর্থনীতিবিদ জো তিয়ানচেন বলেন, সাংহাইয়ে যে লকডাউন আরোপ করা হয়েছে, তার জেরে বৈশ্বিক সরবরাহব্যবস্থায় আবার প্রভাব পড়বে। দিন কয়েকের মধ্যেই এ প্রভাব দৃশ্যমান হবে। সরবরাহব্যবস্থায় ব্যাঘাত ঘটার কারণে বিশ্ব অর্থনীতির পাশাপাশি চীনা অর্থনীতিতেও প্রভাব পড়বে। সাংহাই ও চীনের অন্যান্য প্রদেশ একে অপরের সঙ্গে যুক্ত থাকার কারণে অন্যান্য উৎপাদনকেন্দ্রও এর প্রভাবের বাইরে থাকবে না।
লকডাউনের পরিণতিতে হোটেল-রেস্তোরাঁর ব্যবসায় ধস নামবে। পর্যটন বন্ধ। ব্যবসায়িক কার্যক্রম ও উৎপাদন তো বন্ধ আছেই। এ পরিস্থিতিতে সাংহাই প্রদেশের মোট দেশজ উৎপাদন বা জিডিপি ৩ দশমিক ৭ শতাংশ ক্ষতিগ্রস্ত হবে বলে ভবিষ্যদ্বাণী করেন জো তিয়ানচেন।
এ বছর চীনের জিডিপি প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ৫ দশমিক ৫ শতাংশ। তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, এ লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করা সম্ভব না-ও হতে পারে।
গত সপ্তাহের তথ্যানুসারে, মার্চে চীনের সেবাদানকারী ও নির্মাতা প্রতিষ্ঠানগুলোর কার্যক্রম কমে গেছে। প্রযুক্তির কেন্দ্রস্থল শেনজেন ও চীনের উত্তর পূর্বাঞ্চলীয় প্রদেশ জিলিনে গত মাসে লকডাউন আরোপের ফলে এমন প্রভাব পড়েছে।
চীনা অর্থনীতিবিদ পিইকিয়ান লিউ পিএমআইয়ের তথ্যের আলোকে বলেন, ‘উৎপাদন ও সেবা উভয় খাতই ক্ষতির মুখে পড়েছে—সাংহাইয়ে লকডাউনের আগেই এ ক্ষতির চিত্র পাওয়া গেছে। আমার মনে হয়, জিডিপি চাপের মুখে পড়ছে।’ করোনার সংক্রমণ বৃদ্ধির সঙ্গে যদি লকডাউনের মেয়াদ আবারও বাড়ানো হয়, তাহলে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা বেশ ভোগান্তিতে পড়বেন।
পিএমআই মূলত বাজার পরিস্থিতির প্রক্ষেপণ, যেখানে নতুন অর্ডার, উৎপাদন ও কর্মসংস্থান সম্পর্কে জ্যেষ্ঠ নির্বাহীদের মতামত জরিপ করা হয়।
ক্রমবর্ধমান এই লকডাউনে কীভাবে কর্মসংস্থান ধরে রাখা যায়, তা-ই এখন মূল লক্ষ্য বলে উল্লেখ করেন লিউ। বলেন, ‘আমি মনে করি, শেনজেনে তিন সপ্তাহের লকডাউন কিংবা সাংহাইয়ে এক সপ্তাহ লকডাউনের কারণে সেবা খাত কেবল চাপের সম্মুখীন হচ্ছে না, বরং শূন্য কোভিড নীতির কারণে অনিশ্চয়তার মুখে পড়ছে তারা।’
সাংহাইয়ের বেশ কিছু কোম্পানি লকডাউনে তাদের ব্যবসা বন্ধ করলেও গাড়ি নির্মাতা ও ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানগুলো স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থা বাস্তবায়ন করছে বলে জানান লিউ। তবে এ পদ্ধতি দীর্ঘমেয়াদি টেকসই ব্যবস্থা নয় বলে মনে করেন তিনি।
বিশ্বের অন্যান্য দেশ বিধিনিষেধ শিথিল করে সীমান্ত খুলে দিলেও চীনের এমন কোনো পরিকল্পনা নেই।