পাটপণ্যে অ্যান্টি ডাম্পিং শুল্ক আরও পাঁচ বছর বাড়াতে যাচ্ছে ভারত

বাংলাদেশে উৎপাদিত পাটপণ্য রপ্তানির ওপর ২০১৭ সালের জানুয়ারিতে প্রতি টনে ১৯ ডলার থেকে ৩৫২ ডলার পর্যন্ত অ্যান্টি ডাম্পিং শুল্ক আরোপ করে ভারত। পাঁচ বছর ধরে দুই দেশের বাণিজ্য সচিব পর্যায়ের বৈঠক ছাড়াও যৌথ বাণিজ্য আলোচনায় বাংলাদেশ এ বিষয়ে আপত্তি জানিয়ে এলেও ভারত তা প্রত্যাহার করেনি। এদিকে আরোপিত অ্যান্টি ডাম্পিং শুল্ক আরও পাঁচ বছর অব্যাহত রাখার জন্য সানসেট রিভিউ শুরু করেছে ভারতের ডাইরেক্টর জেনারেল অব ট্রেড রেমিডিস (ডিজিটিআর)। বাণিজ্য মন্ত্রণালয় সূত্রে এ তথ্য জানিয়েছে দৈনিক বণিক বার্তা।

এ অ্যান্টি ডাম্পিং শুল্ক প্রত্যাহারের বিষয়ে নিজেদের পাশাপাশি অর্থ মন্ত্রণালয়কেও উদ্যোগ গ্রহণের জন্য সম্প্রতি চিঠি দিয়েছে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়। চিঠিতে বাণিজ্য মন্ত্রণালয় বলেছে, বাংলাদেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম আমদানি উৎস ও বাণিজ্য অংশীদার হচ্ছে ভারত। বাংলাদেশ স্বাধীনতার পর থেকে পাটজাত পণ্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ রপ্তানি গন্তব্য হচ্ছে ভারত। কিন্তু ২০১৭ সালে বাংলাদেশ থেকে রপ্তানিকৃত পাটজাত পণ্যের ওপর অ্যান্টি ডাম্পিং শুল্ক আরোপ করায় রপ্তানির ওপর বিরূপ প্রভাব ফেলেছে।

বাণিজ্য মন্ত্রণালয় সূত্রের বরাত দিয়ে প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০১৫ সালে ভরতের ডিজিটিআর বাংলাদেশ থেকে পাটজাত পণ্য আমদানি সংক্রান্ত অ্যান্টি ডাম্পিং শুল্ক আরোপের বিষয়ে তদন্ত শুরু করে। এরপর ২০১৬ সালে ডেফিনিটিভ অ্যান্টি ডাম্পিং শুল্ক সুপারিশ করে। এর পরিপ্রেক্ষিতে ২০১৭ সালের ৫ জানুয়ারি কাস্টমস নোটিফিকেশনের মাধ্যমে শুল্ক আরোপ করা হয়, যা একই বছরের ৩ এপ্রিল আরো সংশোধন করা হয়। এতে ভারতে পাটজাত পণ্য রপ্তানি ব্যাহত হয়।

এদিকে ভারতীয় শিল্প মালিকদের অনুরোধে ডিজিটিআর বাংলাদেশ থেকে রপ্তানিকৃত পাটপণ্যের ওপর আ্যাান্টি ডাম্পিং শুল্ক আরো পাঁচ বছর বৃদ্ধির জন্য সানসেট রিভিউ শুরু করেছে। রিভিউর অংশ হিসেবে বাংলাদেশের রপ্তানিকারকরা নির্ধারিত প্রশ্নের আলোকে জবাব পাঠিয়েছে। এ ছাড়া বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের নেতৃত্বে আন্তঃমন্ত্রণালয় প্রতিনিধি দল মৌখিক শুনানিতে অংশগ্রহণ করেছে। একই সঙ্গে পোস্ট হেয়ারিং স্টেটমেন্ট ও রিজয়েন্ডার দাখিল করা হয়েছে। সম্প্রতি নয়াদিল্লিতে অনুষ্ঠিত বাণিজ্য সচিব পর্যায়ের দ্বিপক্ষীয় বৈঠকেও বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে তুলে ধরা হয়েছে। ডিজিটিআর শিগগির তদন্তের ফলাফল প্রকাশ করবে।

বাণিজ্য মন্ত্রণালয় বলছে, ২০২০ সালের জুলাই মাসে সরকার বাংলাদেশ জুট মিল করপোরেশনের অধীনে পরিচালিত পাট ইউনিটগুলো বন্ধ করে দিতে বাধ্য হয়। এতে বাংলাদেশে পাটকলের সক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। পাট শিল্পের শ্রমিকদের চাকরি ও বেতন নিশ্চিত করা ক্রমাগত চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হচ্ছে এবং বিভিন্ন কারণে অস্তিত্ব সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে খাতটি। লাখ লাখ শ্রমিক ও কৃষকের জীবিকা বাঁচানোর লক্ষ্যে সরকার সীমিত সহায়তা দিয়ে বিপর্যস্ত খাতটিকে স্থিতিশীল করার চেষ্টা করছে। সানসেট রিভিউ বিদ্যমান অ্যান্টি ডাম্পিং শুল্কের অবসান ঘটাবে এবং বাংলাদেশের রপ্তানিকারক ও ভারতীয় উৎপাদকদের মধ্যে যোগ্যতাভিত্তিক প্রতিযোগিতার ক্ষেত্র ফিরিয়ে আনবে।

এ বিষয়ে উদ্যোগ নিতে অর্থমন্ত্রীর প্রতি আহ্বান জানিয়ে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের চিঠিতে বলা হয়, ভারতের অর্থমন্ত্রীর কাছে বাংলাদেশের অর্থনীতিতে পাটপণ্যের অবস্থান ব্যাখ্যা করে দেশটির আরোপিত অ্যান্টি ডাম্পিং শুল্ক প্রত্যাহারের অনুরোধ করা যেতে পারে। অ্যান্টি ডাম্পিং শুল্ক প্রত্যাহার করা হলে উভয় দেশের পাট খাতের সহযোগিতা ফিরে আসবে। এটি দুই দেশের বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ককে আরো শক্তিশালী করতে সহায়তা করবে।

অর্থ মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, এ বিষয়ে এখনো ভারতে চিঠি দেননি অর্থমন্ত্রী। তবে খুব শিগগির কূটনৈতিক চ্যানেলের মাধ্যমে চিঠি দেয়া হবে।

বাংলাদেশ থেকে ভারতে রপ্তানি পণ্যের মধ্যে পাটপণ্য অন্যতম। রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) তথ্য অনুযায়ী গত ২০১৯-২০ অর্থবছরে ভারতে ১ হাজার ৯৬ মিলিয়ন ডলারের পণ্য রপ্তানি করেছে বাংলাদেশ, এর মধ্যে পাট ও পাটপণ্য রপ্তানি থেকে আয় হয়েছে ১৫৭ মিলিয়ন ডলার। বাংলাদেশের পাটপণ্যের প্রায় ১২ শতাংশ রপ্তানি হয় ভারতে। অ্যান্টি ডাম্পিং আরোপ হওয়ায় ব্যাপক ক্ষতিতে পড়েন এ খাতের রপ্তানিকারকরা।

বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী ২০২০-২১ আর্থিক বছরে ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে মোট বাণিজ্যের পরিমাণ ছিল প্রায় ১০ বিলিয়ন মার্কিন ডলার, যার মধ্যে ভারতে বাংলাদেশের রপ্তানি ছিল ১ দশমিক ৩ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। বাকিটা ভারত থেকে বাংলাদেশ আমদানি করে। অর্থাৎ বাণিজ্য ঘাটতির পরিমাণ দাঁড়ায় প্রায় ৯ বিলিয়ন ডলার।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here