গত কয়েক মাস ধরে রেমিট্যান্স ও রপ্তানি আয় বাড়লেও পণ্য আমদানির ব্যয় মেটাতে গিয়ে কিছুটা চাপে পড়ে দেশের অর্থনীতি। পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে গিয়ে দাঁড়ায় যে, মাত্র কয়েকদিনের ব্যবধানে ডলারের বিপরীতে টাকার মান কয়েক দফা কমাতে হয়। এছাড়া এই চাপ থেকে উত্তোরণে বাংলাদেশকে ব্যাংক আরও বেশ কয়েকটি পদক্ষেপ নিতে হয়। এর মধ্যে ব্যাংকগুলোকে প্রয়োজনীয় ডলার সরবরাহ করার পাশাপাশি বিলাসী পণ্য আমদানি নিরুৎসাহিত করতে নির্দেশনা দেয় বাংলাদেশ ব্যাংক। এসব পদক্ষেপের কারণে ইতোমধ্যে আমদানির চাপ কমে এসেছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের হালনাগাদ প্রতিবেদনে দেখা গেছে , গত কয়েক মাস ধরে আমদানি ব্যয়ের যে ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা ছিল তা অনেকাংশে কমে এসেছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, গত ফেব্রুয়ারিতে আমদানি ব্যয় হয়েছিল ৮৩২ কোটি ৪৮ লাখ ডলার। পরের মাস মার্চে আমদানি ব্যয় হয়েছে ৭৭২ কোটি ৪৬ লাখ ডলার। অর্থাৎ আগের মাসের তুলনায় গত মাসে ৬০ কোটি ডলার কম ব্যয় হয়েছে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী গত ডিসেম্বর, জানুয়ারি ও ফেব্রুয়ারি। টানা এই তিন মাস ধরে ৮ বিলিয়ন ডলারেরও বেশি ব্যয় হয়েছে আমদানিতে। মার্চ মাসে এটি ৭ বিলিয়ন ডলারের ঘরে নেমে এসেছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য বলছে, গত মার্চ মাসে পণ্য আমদানি ব্যয় বেড়েছে আগের বছরের একই সময়ের চেয়ে ২৫ শতাংশ। যদিও আগের মাস ফেব্রুয়ারিতে আমদানি ব্যয় বেড়েছিল আগের বছরের একই সময়ের চেয়ে ৫০ শতাংশের বেশি।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য বলছে, গত জুলাই থেকে ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত ৮ মাসে সার্বিকভাবে আমদানি ব্যয় বেড়েছে ৪৬ দশমিক ৬৮ শতাংশ। সেখানে জুলাই থেকে মার্চ এই ৯ মাসে আমদানি ব্যয় বেড়েছে ৪৩ দশমিক ৮৪ শতাংশ। অর্থাৎ এক মাসের আমদানি ব্যয় কমার প্রভাবে সার্বিক আমদানি ব্যয় তিন শতাংশ কমেছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য বলছে, বছরখানেক আগে যেখানে সামগ্রিক আমদানি দায় পরিশোধ করতে হতো সাড়ে ৩ বিলিয়ন ডলার থেকে ৪ বিলিয়ন ডলার। এখন তা দ্বিগুণ হয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিসংখ্যান থেকে দেখা যায়, চলতি অর্থবছরের প্রথম মাসে যেখানে আমদানি দায় পরিশোধ করতে হয়েছে প্রায় ৫ বিলিয়ন ডলার, গত ফেব্রুয়ারিতে তা বেড়ে হয়েছে প্রায় সাড়ে ৮ বিলিয়ন ডলার।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, মহামারি করোনা পরিস্থিতির উন্নতি হওয়ার পর থেকেই দেশে আমদানি ব্যয় অস্বাভাবিক বেড়ে যায়। ২০২০ সালের মার্চে দেশে করোনার প্রাদুর্ভাব দেখা দেওয়ার আগে মাসে আমদানি খাতে গড়ে ৪ থেকে সাড়ে ৪ বিলিয়ন ডলার খরচ হতো। করোনার মধ্যে তা কমে গড়ে ৩ থেকে সাড়ে ৩ বিলিয়ন ডলারে নেমে আসে।
কিন্তু চলতি ২০২১-২২ অর্থবছরের শুরু থেকেই আমদানিতে উল্লম্ফন লক্ষ্য করা যায়। অর্থবছরের প্রথম মাস জুলাইয়ে ৫ দশমিক ১৪ বিলিয়ন ডলারের পণ্য আমদানি হয়। আগস্টে তা বেড়ে ৬ দশমিক ৫৮ বিলিয়ন ডলারে ওঠে। সেপ্টেম্বরে তা গিয়ে ঠেকে ৭ বিলিয়ন ডলারে। অক্টোবরে পণ্য আমদানিতে ব্যয় হয় ৭ দশমিক ১১ বিলিয়ন ডলার। নভেম্বরে তা বেড়ে ৭.৮৫ বিলিয়ন ডলারে উঠে। ডিসেম্বরে তা আরও বেড়ে ৮ দশমিক ৪৪ বিলিয়ন ডলারের মাইলফলক অতিক্রম করে। জানুয়ারি মাসে ৮ দশমিক ৩৩ বিলিয়ন ডলারের বিভিন্ন ধরনের পণ্য আমদানি করেছেন বাংলাদেশের ব্যবসায়ী-উদ্যোক্তারা ফেব্রুয়ারি মাসে আমদানিতে ব্যয় হয়েছে ৮ দশমিক ৩২ বিলিয়ন ডলার। মার্চ মাসে আমদানিতে ব্যয় হয়েছে ৭ দশমিক ৭২ বিলিয়ন ডলার।
ব্যাংক কর্মকর্তারা বলছেন, বাংলাদেশ ব্যাংক যে নতুন নির্দেশনা দিয়েছে, তাতে অচিরেই আমদানির চাপ আরও কমে আসবে। এদিকে ডলার সংকট কাটিয়ে উঠতে অপেক্ষাকৃত কম প্রয়োজনীয় ও বিলাসী পণ্য আমদানি নিয়ন্ত্রণে আরও কড়াকড়ি করেছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। অর্থাৎ এখন থেকে এলসি (ঋণপত্র) খুলতে নগদ মার্জিন হার বাড়িয়ে ৫০ থেকে ৭৫ শতাংশ পর্যন্ত করা হয়েছে। মঙ্গলবার(১০ মে) নেওয়া বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ এই পদক্ষেপে বিদেশ থেকে গাড়ি, টিভি, ফ্রিজ, এসির মত বিলাস পণ্য আমদানিতে এলসির মার্জিন হার তিন গুণ বাড়ানো হয়েছে। তবে জরুরি ও নিত্যপণ্য আমদানিতে মার্জিন ঋণ সংক্রান্ত আগের নির্দেশনা বহাল থাকবে। এর আগে গত ১১ এপ্রিলেই জরুরি ছাড়া অন্য পণ্য আমদানিতে একদফা কড়াকড়ি করে বাংলাদেশ ব্যাংক। তখন এলসি খোলার ক্ষেত্রে নগদ মার্জিন হার ন্যূনতম ২৫ শতাংশ সংরক্ষণের নির্দেশনা দেওয়া হয়। আগে এ হার ব্যাংক তার গ্রাহকের সঙ্গে সম্পর্কের ভিত্তিতে ঠিক করত।
ব্যাংকগুলোকে দেওয়া নতুন নির্দেশনায় বিলাসবহুল গাড়ি ও গৃহস্থালি পণ্য সামগ্রী আমদানি নিরুৎসাহিত করতে বেশি কড়াকড়ি করা হয়েছে। এসব ক্ষেত্রে সেডান কার বা এসইউভি এর মত মোটর গাড়ি এবং ইলেকট্রিক ও ইলেকট্রনিক্স হোম অ্যাপ্লায়েন্স আমদানিতে ঋণপত্র খুলতে ন্যুনতম ৭৫ শতাংশ নগদ মার্জিন সংরক্ষণ করতে বলা হয়েছে।
অপরদিকে একই সার্কুলারে জরুরি ও সুনির্দিষ্ট খাতের কিছু পণ্য ছাড়া অন্য সব পণ্যের আমদানির বিপরীতে ঋণপত্র খুলতে ন্যুনতম ৫০ শতাংশ নগদ মার্জিন সংরক্ষণ করতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।