গত দুই সপ্তাহ ধরে মূলধারার সংবাদমাধ্যমগুলোর অন্যতম শিরোনাম ছিল ইউরোপ ও উত্তর আমেরিকার অংশবিশেষের ওপর দিয়ে বয়ে যাওয়া তীব্র দাবদাহ। বিশেষ করে যুক্তরাজ্যের রেকর্ড দাবদাহ বড় ধরনের চিন্তার উদ্রেক করেছে। ওয়ার্ল্ড ওয়েদার অ্যাট্রিবিউশন গ্রুপের দাবি, প্রকৃতির এই বিরূপ আচরণের কারণ জলবায়ু পরিবর্তন। আর এই মাত্রাতিরিক্ত উষ্ণ আবহাওয়ার কারণে হুমকির মুখে পড়েছে ইউরোপ ও যুক্তরাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ অভ্যন্তরীণ নৌ-পরিবহন ব্যবস্থা।
প্রখর খরতাপে সারা বিশ্বেই গুরুত্বপূর্ণ নদী, লেক ও অভ্যন্তরীণ অন্যান্য নৌপথে পানির স্তর নেমে গেছে। এই জলপথগুলো মানুষ ও পণ্য পরিবহন এবং লাখ লাখ মানুষের প্রমোদভ্রমণের অন্যতম মাধ্যম।
খরার কারণে অভ্যন্তরীণ নৌ-চলাচল ব্যবস্থা কতটা ভেঙে পড়েছে, তার বড় একটি উদাহরণ কলোরাডো নদী। যুক্তরাষ্ট্রের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চল ও মেক্সিকোর উত্তরাঞ্চলের ওপর দিয়ে বয়ে যাওয়া এই নদীর পানির স্তর অনেকটা কমে গেছে। এর পেছনে বেশ কয়েকটি কারণ রয়েছে, যার মধ্যে জলবায়ু পরিবর্তন অন্যতম। জলবায়ু উষ্ণ হয়ে ওঠার কারণে কলোরাডো নদীর পানির প্রধান উৎস রকি পর্বতমালার হিমবাহ ঠিকমতো জমতে পারছে না। ফলে ক্রমশ পুরুত্ব হারাচ্ছে সেটি।
কলোরাডো রিভার বেসিনে পানির প্রবাহ কমে যাওয়া যুক্তরাষ্ট্রের জন্য বড় মাথাব্যাথার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই বেসিন যুক্তরাষ্ট্রের বৃহত্তম দুটি রাজার্ভার লেক মিড ও লেক পাওয়েলের পানির প্রধান উৎস। দুটি লেকের পানির স্তরই রেকর্ড সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে এসেছে। যেখানে ২০০০ সালে লেক দুটি তাদের ধারণক্ষমতার ৯৫ শতাংশ পর্যন্ত পূর্ণ হয়ে গিয়েছিল, সেখানে চলতি বছর এই হার ২৫ শতাংশে নেমেছে।
ইউরোপের দ্বিতীয় বৃহত্তম নদী দানিউবের পানির স্তরও কমতে শুরু করেছে। ভাটিতে থাকা রোমানিয়ায় নদীটির পানিপ্রবাহ উল্লেখযোগ্য পরিমাণ কমেছে। ইউরোপের অন্যতম শীর্ষ শস্য ও সূর্যমুখীর তেল রপ্তানিকারক দেশ রোমানিয়া চাষাবাদের ক্ষেত্রে আংশিকভাবে দানিউব রিভার বেসিনের ওপর নির্ভরশীল। দেশটির সরকার এরই মধ্যে সতর্ক করে দিয়েছে, খরার কারণে চলতি বছর তাদের শস্য উপাদন কম হতে পারে। কৃষিজ উৎপাদন কমে যাওয়ার পাশাপাশি দানিউবের পানির স্তর নিচে নেমে যাওয়ার বিষয়টি নৌ-পরিবহন খাতেও প্রতিবন্ধকতা তৈরি করবে।
ইউরোপের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অভ্যন্তরীণ জলপথ রাইন নদীও বৈশ্বিক উষ্ণায়নের নেতিবাচক প্রভাব টের পাচ্ছে। জার্মানিতে নদীটির পানির স্তর আশঙ্কাজনক হারে নিচে নেমে গেছে। দেশটির কাউব শহরটিকে বলা হয় রাইনকেন্দ্রিক নৌ-পরিবহনের চোকপয়েন্ট। নেভিগেশন স্বাভাবিক রাখতে সেখানে নদীটির পানির স্তর ন্যূনতম যে পর্যায়ে থাকা দরকার, বর্তমানে রয়েছে তার চেয়ে প্রায় ৯ শতাংশ কম। ইউরোপের মোট অভ্যন্তরীণ নৌ-পরিবহনের প্রায় ৮০ শতাংশ রাইন নদীর ওপর নির্ভরশীল। স্বাভাবিকভাবেই নদীটির দূরাবস্থা ইউরোপীয়দের জন্য চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।