দুই প্রধানমন্ত্রীর আলোচনায় গুরুত্ব পেয়েছে যোগাযোগ জ্বালানি ও পানি বণ্টন

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এবং ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি

বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কে এখন বিশেষ গুরুত্ব পাচ্ছে দ্বিপক্ষীয় ও উপআঞ্চলিক রেল, সড়ক ও কানেক্টিভিটি। এজন্য দ্বিপক্ষীয় রেল সংযোগ উন্নয়নের পাশাপাশি বাংলাদেশের রেল যোগাযোগ ব্যবস্থার সক্ষমতা বৃদ্ধি ও আধুনিকায়নে জোর দেয়া হচ্ছে বেশি। এ ছাড়া নয়াদিল্লিতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির মধ্যে অনুষ্ঠিত বৈঠকেও এবার এ বিষয়ে দ্বিপক্ষীয় সহযোগিতা বাড়ানোর বিষয়টি নিয়ে আলোচনা হয়েছে।

ভারতে চারদিনের সফর শেষে বৃহস্পতিবার (৮ সেপ্টেম্বর) দেশে ফিরেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। সফর চলাকালে দেশটির প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে তাঁর আনুষ্ঠানিক আলোচনার বিষয়বস্তু নিয়ে দুই দেশের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিক বিবৃতি প্রকাশ করা হয়েছে।

বিবৃতিতে বলা হয়, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও নরেন্দ্র মোদির বৈঠকে রাজনৈতিক ও নিরাপত্তা খাতে দ্বিপক্ষীয় সহযোগিতা, প্রতিরক্ষা, সীমান্ত ব্যবস্থাপনা, বাণিজ্য ও কানেক্টিভিটি, পানিসম্পদ, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি, উন্নয়ন সহযোগিতা, সাংস্কৃতিক ও ব্যক্তি পর্যায়ের সম্পর্কের মতো বিষয়গুলো নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়। এছাড়া পরিবেশ, জলবায়ু পরিবর্তন, সাইবার নিরাপত্তা, আইসিটি, মহাকাশ প্রযুক্তি, গ্রিন এনার্জি ও সুনীল অর্থনীতি নিয়েও পারস্পরিক সহযোগিতার বিষয়ে দুই প্রধানমন্ত্রীর মধ্যে আলোচনা হয়েছে।

আলোচনায় দুই নেতাই দ্বিপক্ষীয় ও উপআঞ্চলিক রেল, সড়ক ও অন্যান্য খাতে দ্বিপক্ষীয় ও উপআঞ্চলিক কানেক্টিভিটি গড়ে তোলার ওপর জোর দিয়েছেন বলে বিবৃতিতে উঠে আসে। এতে বলা হয়, টঙ্গী-আখাউড়া রুটে ডুয়াল গেজ রেললাইন নির্মাণ, রেলওয়ে রোলিং স্টক (ইঞ্জিন-কোচ-বগি) সরবরাহ, বাংলাদেশে রেলওয়ের সক্ষমতা বৃদ্ধি, দেশে রেলসেবার উন্নয়নে আইটি সলিউশন ভাগাভাগির মতো দ্বিপক্ষীয় উদ্যোগগুলোকে দুই পক্ষই স্বাগত জানিয়েছে। এছাড়া দুই পক্ষই এ সময় কাউনিয়া-লালমনিরহাট-মোগলহাট-গিতলদহ ও হিলি থেকে বিরামপুর পর্যন্ত রেল সংযোগ, বেনাপোল-যশোর লাইনে ট্র্যাক, সিগন্যালিং সিস্টেম ও রেলস্টেশনের আধুনিকীকরণ, বুড়িমারী-চ্যাংড়াবান্ধা পুরনো রেল সংযোগ পুনরায় চালু করা এবং সিরাজগঞ্জে কনটেইনার ডিপো নির্মাণের মতো নতুন উদ্যোগগুলোকেও স্বাগত জানিয়ে বক্তব্য রেখেছে। প্রকল্পগুলোয় দ্বিপক্ষীয় উন্নয়ন সহযোগিতার ভিত্তিতে নানা মাধ্যমে অর্থায়নের সুযোগ অনুুসন্ধানে দুই পক্ষই সম্মতি জানিয়েছে।

বিবিআইএন মোটর ভেহিকল এগ্রিমেন্ট দ্রুত বাস্তবায়নের মাধ্যমে দ্বিপক্ষীয় ও উপআঞ্চলিক কানেক্টিভিটি উন্নয়নকে ত্বরান্বিত করার বিষয়ে ঐকমত্যে পৌঁছেন দুই প্রধানমন্ত্রী। বিবৃতিতে আরো জানানো হয়, বৈঠকে ভারতের পক্ষ থেকে পশ্চিমবঙ্গের হিলি থেকে মেঘালয়ের মহেন্দ্রগঞ্জ পর্যন্ত বাংলাদেশের মধ্য দিয়ে একটি মহাসড়ক নির্মাণসহ নতুন কিছু উপআঞ্চলিক কানেক্টিভিটি প্রকল্প নির্মাণের প্রস্তাব দিয়ে এ বিষয়ে বাংলাদেশের সহায়তা কামনা করা হয়। একই সঙ্গে দেশটির পক্ষ থেকে এ-সংক্রান্ত একটি বিস্তারিত প্রকল্প প্রতিবেদন তৈরিরও প্রস্তাব দেয়া হয়। অন্যদিকে বাংলাদেশের পক্ষ থেকেও এ সময় ভারত-মিয়ানমার-থাইল্যান্ড ত্রিপক্ষীয় হাইওয়ে প্রকল্পে যুক্ত হওয়ার আগ্রহ প্রকাশ করা হয়।

বৈঠকে দুই নেতা দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য সম্প্রসারণের বিষয়টিতে সন্তোষ প্রকাশ করেন জানিয়ে বিবৃতিতে বলা হয়, এশিয়ায় এ মুহূর্তে বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় রপ্তানি গন্তব্য হয়ে উঠছে ভারত। বৈঠকে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে চাল, গম, চিনি, পেঁয়াজ, রসুন ও আদার মতো অপরিহার্য খাদ্যপণ্যের রপ্তানি অনুমেয় পর্যায়ে ধরে রাখার অনুরোধ জানানো হয়। এর জবাবে ভারতের পক্ষ থেকে বলা হয়, দেশটির সরবরাহ পরিস্থিতির ওপর ভিত্তি করে বাংলাদেশের অনুকূলেই বিষয়টি বিবেচনা করে দেখা হবে এবং এজন্য প্রয়োজনীয় সব পদক্ষেপ নেয়া হবে।

এ সময় দুই প্রধানমন্ত্রী শান্তিপূর্ণ সীমান্ত ব্যবস্থাপনার প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরে শূন্য রেখার ১৫০ গজের মধ্যে চলমান সব নির্মাণকাজ দ্রুততম সময়ের মধ্যে শেষ করার জন্য নিজ নিজ দেশের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের নির্দেশনা দেন। এছাড়া সীমান্তে মৃত্যুর ঘটনা উল্লেখযোগ্য মাত্রায় কমে আসার বিষয়টিতে দুই নেতাই সন্তোষ প্রকাশ করেন। একই সঙ্গে তারা সীমান্তে মৃত্যুর ঘটনা শূন্যে নামিয়ে আনতে দুই দেশের একযোগে কাজ করার বিষয়েও ঐকমত্যে পৌঁছেন।

কুশিয়ারা নদীর পানি বণ্টন নিয়ে বাংলাদেশের পানিসম্পদ মন্ত্রণালয় ও ভারতের জলশক্তি মন্ত্রণালয়ের মধ্যে সমঝোতা সইয়ের বিষয়টিকে দুই নেতার পক্ষ থেকে স্বাগত জানানো হয়। এ সময় ভারতের পক্ষ থেকে ফেনী নদীর পানি বণ্টন নিয়ে দ্রুত একটি অন্তর্বর্তীকালীন চুক্তি সইয়ের জন্য বাংলাদেশের প্রতি অনুরোধ জানানো হয়।

বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তিস্তা নদীর পানি বণ্টন নিয়ে চুক্তি সম্পন্নের জন্য ভারতের প্রতি আবারো অনুরোধ জানান। এ সময় দুই নেতা সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের অভিন্ন নদ-নদীগুলোর দূষণ, পরিবেশ ও যাতায়াত ব্যবস্থা নিয়ে একযোগে কাজ করার নির্দেশ দেন।

বৈঠকে জ্বালানি তেল পরিবহনের জন্য নির্মীয়মাণ বাংলাদেশ-ভারত মৈত্রী পাইপলাইনের অগ্রগতি পর্যালোচনা করা হয়। এ সময় প্রকল্পের কাজ দ্রুত শেষ হবে বলে দুই দেশের পক্ষ থেকে আশাবাদ ব্যক্ত করা হয়। এছাড়া দেশে পেট্রোলিয়াম পণ্যের চাহিদা পূরণে সহযোগিতার জন্য বাংলাদেশের পক্ষ থেকে ভারতকে অনুরোধ জানানো হয়। এ সময় দুই দেশের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের মধ্যে আলোচনা শুরুর জন্য পদক্ষেপ নিতে একমত হয়েছে ভারত।

আসাম ও মেঘালয়ের সাম্প্রতিক বন্যায় ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় এলাকাগুলোয় জ্বালানি পণ্য পরিবহনে ব্যাঘাত ঘটে। ওই সময় ভারতকে বাংলাদেশের মধ্য দিয়ে আসাম থেকে ত্রিপুরায় পেট্রোলিয়াম, জ্বালানি তেল ও লুব্রিক্যান্টস পরিবহনের সুযোগ দেয়া হয়। দুই দেশের প্রধানমন্ত্রীর বৈঠক চলাকালে সময়মতো সহযোগিতা দেয়ার জন্য ভারতের পক্ষ থেকে বাংলাদেশের প্রতি কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করা হয় বলে বিবৃতিতে জানানো হয়েছে। এছাড়া দেশটি জিটুজি ভিত্তিতে বাংলাদেশে পরিশোধিত পেট্রোলিয়াম পণ্য সরবরাহের জন্য ইন্ডিয়ান অয়েল করপোরেশন লিমিটেডকে (আইওসিএল) তালিকাভুক্ত করার বিষয়টিকেও স্বাগত জানিয়েছে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here