পৃথিবীর ৭০ শতাংশেরও বেশি অংশ জুড়ে রয়েছে সুনীল সাগর। বিস্তীর্ন এই জলরাশি পৃথিবীর জলবায়ু নিয়ন্ত্রণ এবং জীববৈচিত্র্যের বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে বিধায় মানবজীবনে সাগরের প্রভাব অপরিসীম। তবে মানবসৃষ্ট দূষণ, জলবায়ু পরিবর্তন ও বৈশ্বিক উষ্ণায়নের কারণে সাগর ও সামুদ্রিক বাস্তুসংস্থান বর্তমানে ঝুঁকির মুখে পড়েছে। সাগরের গুরুত্ব অনুধাবন, সাগরের দূষণ ও সংরক্ষণ সম্পর্কে সচেতনতা সৃষ্টির লক্ষ্যে জাতিসংঘ ও অন্যান্য আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো প্রতি বছর ৮ই জুন ওয়ার্ল্ড ওশানস ডে বা বিশ্ব মহাসাগর দিবস পালন করে থাকে।
ইতিহাস
১৯৯২ সালে ব্রাজিলের রিও ডি জেনেইরোতে ইউনাইটেড নেশসনস কনফারেন্স অন এনভায়রনমেন্ট অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট (ইউএনসিইডি) বা আর্থ সামিটের আয়োজন করা হয়। কানাডার ইন্টারন্যাশনাল সেন্টার ফর ওশান ডেভেলপমেন্ট (আইসিওডি) এবং ওশান ইন্সটিটিউট অফ কানাডা (ওআইসি) আর্থ সামিটে প্রথমবারের মতো ওয়ার্ল্ড ওশান ডে পালনের প্রস্তাবনা পেশ করে। ২০০৮ সালের ডিসেম্বরে জাতিসংঘের সাধারণ অধিবেশনে প্রস্তাবনাটি পাশ করে ৮ জুনকে ওয়ার্ল্ড ওশানস ডে ঘোষণা করা। জাতিসংঘের মহাসাগর বিষয়ক বিভাগ ও সমুদ্র আইন ওয়ার্ল্ড ওশান ডে সংক্রান্ত কর্মসূচির আয়োজন করে। অন্যদিকে ওয়ার্ল্ড ওশান নেটওয়ার্কের স্পনসরের দায়িত্বে রয়েছে ইউনেস্কোর ইন্টারগর্ভনমেন্টাল ওশানোগ্রাফিক কমিশন (আইওসি)।
তাৎপর্য
ওয়ার্ল্ড ওশান ডে বর্তমান সময়ে সমুদ্র, সমুদ্রের জীববৈচিত্র্য কোন কোন ঝুঁকির সম্মুখিন হচ্ছে এবং সেসব ঝুঁকি মানব জাতিকে কিভাবে প্রভাবিত করছে সে সম্পর্কে সুস্পষ্ট ধারণা লাভের সুযোগ করে দিচ্ছে। পৃথিবীর চারভাগের তিনভাগ সাগর দ্বারা আচ্ছাদিত হওয়ায় এর বুক জুড়ে রয়েছে অসংখ্য প্রাণ প্রাচুর্য্য। সাগর মানুষের খাদ্য, জ্বালানি এবং বিনোদনের অন্যতম প্রধান উৎস। পরিবেশ দূষণ, অতিরিক্ত ও অনিয়ন্ত্রিত মৎস্য আহরণ, জলবায়ুর পরিবর্তন, মাত্রাতিরিক্ত প্লাস্টিকের ব্যবহারের মতো মানুষের নানাবিধ আচরণের কারণে সাগর মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছে। সাগর সুরক্ষায় কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ এবং ভবিষ্যত প্রজন্মের জন্য সাগরের জীববৈচিত্র্যের ক্রমবিকাশ অব্যাহত রাখা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ওয়ার্ল্ড ওশান ডে মানুষকে এই বিষয়ে সচেতন করে তুলতে সাহায্য করে।
বর্তমান যুগে দোলনা থেকে শুরু করে জীবনের অন্তিম পর্যায় পর্যন্ত মানুষ প্লাস্টিক পণ্য ব্যবহার করে। সেসব প্লাস্টিক আর্বজনার শেষ আশ্রয়স্থল হয় সাগরের তলদেশ। অপচনশীল এসব পণ্য সমুদ্রের বাস্তুসংস্থানকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। সেসঙ্গে বৈশ্বিক মৎস্য মজুদের এক তৃতীয়াংশের বেশি অনিয়ন্ত্রিত উপায়ে আহরণ করা হয় বলে অনেক ধরনের মাছ ও সামুদ্রিক প্রাণী বর্তমানে বিলুপ্তির ঝুঁকিতে রয়েছে।
চলতি বছরের ওয়ার্ল্ড ওশান ডে উপলক্ষ্যে দেওয়া বার্তায় সমুদ্র সুরক্ষায় আরও বেশি পদক্ষেপ গ্রহণের আহ্বান জানান জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস। তিনি বলেন, সমুদ্রকে ভিত্তি করেই প্রাণের সঞ্চার হয়েছে। সমুদ্র আমাদের শ্বাস প্রশ্বাসের জন্য বায়ু এবং আমরা যা খাই সেই খাদ্যের যোগান দেয়। আমাদের জলবায়ু ও আবহাওয়াও সমুদ্র নিয়ন্ত্রণ করে। পৃথিবীর জীববৈচিত্র্যের সর্বশ্রেষ্ঠ আধার হলো সমুদ্র। তিনি বলেন, মানুষের উচিত সমুদ্রের সবচেয়ে কাছের বন্ধু হওয়া। তবে বর্তমানে মানুষই সমুদ্রের সবচেয়ে বড় শত্রু। বিশ্বের তাপমাত্রা বৃদ্ধি, আবহাওয়া ও সমুদ্র স্রোতের ধরন পরিবর্তন থেকে শুরু করে সমুদ্রের অম্লীকরণ ও সামুদ্রিক বাস্তুতন্ত্রের পরিবর্তনের জন্য মানুষ দায়ী। মানবসৃষ্ট জৈব ও প্লাস্টিক বর্জ্য, রাসায়নিকের ব্যবহার ও অনিয়ন্ত্রিত মৎস্য আহরণ ও সমুদ্রের অতি-শোষণের কারণে সমুদ্র ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
২০২৩ সালের প্রতিপাদ্য
‘প্ল্যানেট ওশান: টাইডস আর চেঞ্জিং’ প্রতিপাদ্য নিয়ে চলতি বছরের ওয়ার্ল্ড ওশান ডে পালিত হচ্ছে। এই প্রতিপাদ্যের লক্ষ্য হলো সমুদ্রের গুরুত্ব ও সমুদ্র সুরক্ষার প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে সচেতনতা বৃদ্ধি করা। ২০২৩ সালের প্রতিপাদ্য একক-ব্যবহারযোগ্য (সিংগেল-ইউজ) প্লাস্টিকের ব্যবহার হ্রাস, টেকসই উপায়ে সিফুড আহরণ, সমুদ্র সুরক্ষা নীতির পৃষ্ঠপোষকতায় সকলকে মিলিতভাবে কাজ করতে উদ্বুদ্ধ করছে।
উদযাপন
মানুষের কারণে সমুদ্র দূষিত হলেও এর প্রতিকারের ক্ষমতাও একমাত্র মানুষের হাতেই রয়েছে। সমুদ্র সুরক্ষায় কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণের মাধ্যমে চলতি বছরের ওয়ার্ল্ড ওশান ডে ফলপ্রসূভাবে উদযাপন করা সম্ভব। তেমন কিছু পদক্ষেপ হলো:
- দৈনন্দিন জীবনে ওয়ান টাইম প্লাস্টিকের ব্যবহার কমানো এবং এর পরিবর্তে পুনর্ব্যবহারযোগ্য ব্যাগ, বোতল, থালা, চামচ, স্ট্র ব্যবহার করা।
- টেকসই উপায়ে আহরণ করা সিফুড খাদ্য হিসেবে গ্রহণ করা।
- ওয়ার্ল্ড ওশান ডে সংক্রান্ত অনুষ্ঠাণের আয়োজন করা এবং এই ধরণের অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করা।
- সমুদ্র সৈকত পরিচ্ছন্ন সংক্রান্ত কার্যক্রমে স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে অংশগ্রহণ ও সমুদ্র সুরক্ষার গুরুত্ব সম্পর্কে সচতেনতা সৃষ্টি করা।
- ব্যবহার্য পণ্য যতটা সম্ভব রিসাইকেল করা।