টাইটানিকের মতোই সাগরের তলদেশে ঠাঁই হলো টাইটানের

আরও পাঁচটি জীবন কেড়ে নিল টাইটানিক

উত্তর আটলান্টিক মহাসাগরে পানির প্রায় চার কিলোমিটার গভীরে থাকা টাইটানিকের ধ্বংসাবশেষের কাছেই আরও কিছু ধ্বংসাবশেষের সন্ধান পাওয়া গেছে, যেগুলো সংযোগবিচ্ছিন্ন হয়ে পড়া দূরনিয়ন্ত্রিত ডুবোযান (আরওভি) টাইটানের বলে ধারণা করা হচ্ছে। এদিকে ডুবোযানটির পাঁচ অভিযাত্রীর কেউই আর বেঁচে নেই বলে ধারণা করছে অপারেটর প্রতিষ্ঠান ওশানগেট।

বৃহস্পতিবার মার্কিন কোস্ট গার্ডের বরাত দিয়ে বার্তা সংস্থা সিএনএন জানায়, কানাডীয় একটি জাহাজ থেকে পরিচালিত একটি দূরনিয়ন্ত্রিত ডিপ-সি রোবট টাইটানিকের কাছে নতুন কিছু ধ্বংসাবশেষের সন্ধান পেয়েছে। এগুলো ডুবোযান টাইটানের হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। সিএনএনের এই খবর প্রকাশের কিছু সময়ের মধ্যেই ওশানগেট এক্সপেডিশন এক বিবৃতিতে বলেছে, ‘এই মানুষগুলো ছিলেন সত্যিকারের অভিযাত্রী। নতুন কিছুর অনুসন্ধান ও সমুদ্রের সুরক্ষায় তাদের ছিল গভীর আকাঙ্ক্ষা। বিষাদময় এই সময়ে পাঁচ বিদেহী আত্মা ও তাদের পরিবারের প্রত্যেক সদস্যদের প্রতি আমাদের গভীর সমবেদনা রইল ।’

একাধিক দেশের উদ্ধারকারী দল গত কয়েকদিন ধরে ২২ ফুট দীর্ঘ টাইটানের সন্ধানে আটলান্টিকের কয়েক হাজার বর্গকিলোমিটার এলাকা চষে বেড়িয়েছে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত করুণ পরিণতিই মেনে নিতে হলো পাঁচ অভিযাত্রীকে।

টাইটানের সাপোর্ট শিপ পোলার প্রিন্স

তদন্তের ঘোষণা কানাডার: ওশানগেটের টাইটানিক দেখতে যাওয়ার অভিযান, আরওভি টাইটানের সংযোগবিচ্ছিন্ন হয়ে পড়া, টাইটানিকের প্রায় ১ হাজার ৬০০ ফুট দূরে নতুন কিছু ধ্বংসাবশেষের সন্ধান পাওয়া ও পাঁচ আরোহীর মৃত্যু-এই পুরো ঘটনাপ্রবাহ খতিয়ে দেখবে কানাডা। প্রথম কোনো দেশ হিসেবে তারা আনুষ্ঠানিকভাবে এই ঘোষণা দিল। ট্রান্সপোর্টেশন সেফটি বোর্ড অব কানাডা জানিয়েছে, মর্মান্তিক এই দুর্ঘটনার বিষয়ে আনুষ্ঠানিক তদন্ত শুরু করতে যাচ্ছে তারা।

করুণ নিয়তি: টাইটানিকের ধ্বংসাবশেষ দেখতে পাঁচ আরোহী নিয়ে ডুব দিয়েছিল আরওভি টাইটান। কানাডার নিউফাউন্ডল্যান্ডের সেন্ট জোনস থেকে অভিযানটি শুরু হয়। টাইটানকে নির্দিষ্ট গন্তবে বয়ে নিয়ে যায় পোলার প্রিন্স নামের একটি সাপোর্ট শিপ। ১৮ জুন সকালে নির্দিষ্ট অবস্থানে পৌঁছে ডুব দেয় টাইটান। সাগরের নিচে দুই ঘণ্টার যাত্রা শুরুর ১ ঘণ্টা ৪০ মিনিটের মাথায় সেটি দূরনিয়ন্ত্রণ কেন্দ্রের সঙ্গে যোগাযোগ হারিয়ে ফেলে। ডুবোযানটিতে জরুরি পরিস্থিতিতে ৯৬ ঘণ্টা পর্যন্ত অক্সিজেন সরবরাহের ব্যবস্থা ছিল।

এরপর টাইটানের খোঁজে যুক্তরাষ্ট্রের ম্যাসাচুসেটস অঙ্গরাজ্যের কেপ কোড থেকে প্রায় ৯০০ মাইল পূর্ব ও কানাডার নিউফাউন্ডল্যান্ডের সেন্ট জোনস থেকে ৪০০ মাইল দক্ষিণে প্রায় সাড়ে সাত হাজার বর্গমাইল এলাকাজুড়ে ২১ ফুট দীর্ঘ ডুবোযানটির অনুসন্ধানে অভিযান চালানো হয়। এক পর্যায়ে কানাডার একটি পি-থ্রি মেরিটাইম প্যাট্রল এয়ারক্রাফট পানির নিচ থেকে আসা এক ধরনের শব্দ শনাক্ত করে। ৩০ মিনিট অন্তর অন্তর ধাতব আঘাতের মতো সেই শব্দের উৎস জানতে সংশ্লিষ্ট এলাকায় অভিযান জোরদার করা হয়।

ওশানগেট এক্সপেডিশনের আটদিনের এই অভিযানে গিয়ে করুণ পরিণতি বরণ করে নেওয়া পাঁচ অভিযাত্রী হলেন ব্রিটিশ ধনকুবের হামিশ হারডিং, ফরাসি ডুবুরি পল-হেনরি নারজিওলেট, পাকিস্তানি বিলিওনেয়ার শাহজাদা দাউদ ও তার ছেলে সুলাইমান দাউদ এবং ওশানগেটের প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) স্টকটন রাশ। অভিযানে জনপ্রতি টিকেটমূল্য নির্ধারণ করা হয় আড়াই লাখ ডলার।

টাইটানিক ডুবে যাওয়ার স্থান

প্রাণঘাতী টাইটানিক: ১৯১২ সালের ১৫ এপ্রিল উত্তর আটলান্টিকে হিমবাহের সঙ্গে ধাক্কা লেগে ডুবে যায় সে সময়ে বিশ্বের বৃহত্তম জাহাজ টাইটানিক। ইংল্যান্ডের সাউদাম্পটন থেকে নিউইয়র্কের পথে প্রথম যাত্রাতেই এই দুর্ঘটনায় পড়ে জাহাজটি। টাইটানিকের ২ হাজার ২২৪ জন আরোহীর মধ্যে দেড় হাজারের বেশি আরোহীর সলিল সমাধি হয়েছিল সেদিন। শান্তিপূর্ণ সময়ে বিশ্বের সবচেয়ে মর্মান্তিক সমুদ্র দুর্ঘটনা বিবেচনা করা হয় একে। একশ বছরের বেশি সময় ধরে সাগরের তলদেশে পড়ে থাকা সেই টাইটানিকই পরোক্ষভাবে আরও পাঁচটি জীবন কেড়ে নিল।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here