বর্তমানে বিশ্বজুড়ে সবচেয়ে আলোড়ন সৃষ্টিকারী ঘটনা বলা যায় টাইটানিকের ধ্বংসাবশেষ দেখতে যাওয়া ডুবোযানের করুণ পরিণতি। সমুদ্র শিল্পের ইতিহাসে উজ্জ্বল একটি অধ্যায়ের অংশ হতে পারত যে ঘটনা, ভাগ্যের নির্মম পরিহাসে সেটিই মর্মান্তিকতার উদাহরণ হয়ে থাকল। বিয়োগান্তক এই ঘটনার কুশীলব হতে পারতেন জে ব্লুম ও তার ছেল শন ব্লুম। তবে শেষ পর্যন্ত নাম প্রত্যাহার করে নেওয়ায় সৌভাগ্যক্রমে প্রাণে বেঁচে গেছেন দুজনে।
ওশানগেটের টাইটানিকের ধ্বংসাবশেষ দেখতে যাওয়ার অভিযানটি ছিল বেশ ব্যয়বহুল। টিকিটমূল্যও ছিল বেশ চড়া-জনপ্রতি আড়াই লাখ ডলার। স্বাভাবিকভাবে বিত্তবানরাই এই অভিযানে অংশ নেওয়ার সুযোগ পেয়েছেন। মার্কিন বিনিয়োগকারী জে ও তার ছেলে শন তাদের অন্যতম।
কিন্তু যে দূরনিয়ন্ত্রিত ডুবোযানে (আরওভি) করে টাইটানিকের কাছে যাওয়ার ব্যবস্থা করেছিল ওশানগেট, তার ওপর ভরসা করতে পারছিলেন না শন। সিএনএনকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, ‘আমি অনেক ঝুঁকি দেখতে পাচ্ছিলাম। আমার মনে হচ্ছিল না যে, সাগরের এত গভীরে গিয়ে এটি টিকে থাকতে পারবে। শেষ পর্যন্ত আমি আমার সন্দেহের কথা বাবাকে বললাম। বাবাও শেষ পর্যন্ত আমার সঙ্গে একমত হলেন।’
নিরাপত্তা বিষয়ে যথেষ্ট আস্থা না থাকার কারণেই টাইটানিক অভিযান শুরুর কয়েক সপ্তাহ আগে নিজেদের নাম প্রত্যাহার করে নেন জে ও শন। আর তাদের ছেড়ে দেওয়া জায়গায় নাম লেখান পাকিস্তানি ধনকুবের শাহজাদা দাউদ ও তার ছেলে সুলেমান দাউদ।
সৌভাগ্যক্রমে বেঁচে থাকার এই বিষয়টিকে রীতিমতো অলৌকিক বলে মনে হচ্ছে জে ব্লুমের। তিনি বলেন, ‘সংবাদ মাধ্যম, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম কিংবা টেলিভিশন-যেখানেই চোখ রাখছি, সেখানেই টাইটানের দুর্ঘটনার খবর দেখতে পাচ্ছি। বলা যায়, দুঃসহ এক অভিজ্ঞতা তাড়িয়ে বেড়াচ্ছে আমাদের।’
ওশানগেটের প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান নির্বাহী (সিইও) স্টকটন রাশ কীভাবে লাস ভেগাসে তাদের বাড়িতে গিয়ে টাইটানিক অভিযানের টিকিট কেনার প্রস্তাব দিতে গিয়েছিলেন, সেই স্মৃতিচারণও করেন জে। তিনি বলেন, ‘আমি দুই আসনবিশিষ্ট একটি পরীক্ষামূলক উড়োজাহাজ বানিয়েছিলাম। রাশ সেই উড়োজাহাজে চড়েই আমাকে টিকিট কেনার প্রস্তাব দিতে এসেছিলেন। তিনি আমার তৈরি পরীক্ষামূলক উড়োজাহাজে চড়েছেন। বিষয়টি আমাকে তার তৈরি পরীক্ষামূলক ডুবোযানে চড়ার সিদ্ধান্ত গ্রহণে প্রভাবিত করেছিল।’
জে বলেন, ‘রাশের ঝুঁকি গ্রহণের ক্ষুধা ছিল অন্য মাত্রার। আমি একজন পাইলট। হেলিকপ্টার পাইলট হিসেবে লাইসেন্স রয়েছে আমার। আমি কখনই একটি পরীক্ষামূলক আকাশযানে উঠতে যাব না। কিন্তু রাশ নিজেই তার তৈরি পরীক্ষামূলক ডুবোযানে চড়ে বসেছিলেন।’
জে ও শন দুজনেই জানান, নিজেদের নিরাপত্তা উদ্বেগের কথা রাশকে জানিয়েছিলেন তারা। কিন্তু ওশানগেট সিইও সেই উদ্বেগ নাকচ করে দেন।

মন টানছিল না সুলেমানেরও: টাইটানিক দেখতে গিয়ে অকালে প্রাণ হারাতে হলো পাকিস্তানি ব্যবসায়ী শাহজাদা দাউদ ও তার ছেলে সুলেমান দাউদকে। তবে এই অভিযানে বেরুতে মন টানছিল না ১৯ বছর বয়সী বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থী সুলেমান দাউদের। অভিযান শুরুর কয়েকদিন আগে থেকেই বেশ উদাসীন ছিল সুলেমান। তার ফুফু ও শাহজাদা দাউদের বড়বোন আজমেহ দাউদ এনবিসি নিউজকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে এ কথা জানিয়েছেন।
আজমেহ জানান, এক আত্মীয়ের কাছে সুলেমান বলেছিলেন, এই অভিযানে যেতে খুব বেশি উৎসাহী নন তিনি। ট্রিপটি নিয়ে তিনি বেশ আতঙ্কিত অবস্থায় রয়েছেন বলেও জানিয়েছিলেন সুলেমান।
কিন্তু কয়েকটি প্রেক্ষাপট তাকে টাইটানের যাত্রী হতে প্রভাবিত করেছিল। প্রথমত, ট্রিপটির দিনক্ষণ সাজানো হয়েছিল ফাদার্স ডের উইকেন্ডে। দ্বিতীয়ত, তার বাবা শাহজাদা একশ বছরের বেশি সময় আগে ডুবে যাওয়া টাইটানিক সম্পর্কে জানতে অনেক বেশি আগ্রহী ছিলেন। এ কারণে বলা যায় বাবাকে খুশি করতে এবং ফাদার্স ডের উপহার দিতেই এই ট্রিপে রাজি হয়েছিলেন সুলেমান।
আজমেহ বলেন, ‘আমার বারবার কেবল সুলেমানের কথা মাথায় আসছে। উনিশ বছরের টগবগে এক তরুণ শ্বাস নেওয়ার জন্য ছটফট করছে-এটি কোনোমতেই মেনে নিতে পারছি না আমি।’