দরিদ্র দেশগুলোর জন্য সমুদ্র নজরদারি সহজ করেছে প্রযুক্তিগত অগ্রগামিতা

ভূপৃষ্ঠে সাগর-মহাসাগরের হিস্যা ৭০ শতাংশের বেশি। সুনীল জলরাশির ভৌগলিক বিশালত্বের পাশাপাশি সমুদ্র শিল্পের ব্যপ্তিও অনেক বেশি। এ কারণে সামুদ্রিক জগতের কোথায় কি হচ্ছে না হচ্ছে, সে সম্পর্কে সম্পূর্ণরূপে ওয়াকিবহাল হওয়া যেকোনো দেশের পক্ষেই অনেক কঠিন একটি বিষয়। তবে সম্পূর্ণ না হলেও সমুদ্র ও জাতীয় নিরাপত্তার স্বার্থে উপকূলীয় দেশগুলোকে সামুদ্রিক যেকোনো ঘটনাবলীর বিষয়ে বেশ কিছু মৌলিক তথ্য জানতে হয়। একে বলা হয় মেরিটাইম ডোমেইন অ্যাওয়ারনেস (এমডিএ)।

ধনী দেশগুলো অনেকটা সামরিক ধাঁচে সামুদ্রিক নজরদারি কার্যক্রম পরিচালনা করতে পারে। তবে দরীদ্র দেশগুলোর পক্ষে, বিশেষ করে ভারত-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের অনেক দেশের পক্ষেই এমনটা করা সম্ভব হয় না। আশার কথা হলো, ধীরে ধীরে এসব দেশের জন্যও এমডিএ নাগালের মধ্যে চলে আসছে। আর এক্ষেত্রে আশীর্বাদ হয়ে দাঁড়াচ্ছে নতুন নতুন সব প্রযুক্তি। এগুলো তথ্যের উন্মুক্ত প্রবাহে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে, যেসব তথ্য কাজে লাগিয়ে ভারত-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের দেশগুলো তাদের সমুদ্র নজরদারি সক্ষমতা বাড়াতে পারছে।

সুনীল অর্থনীতির জোয়ারে সাম্প্রতিক কয়েক দশকে অনেক দেশ সাগরের বিস্তীর্ণ এলাকা পর্যন্ত তাদের সার্বভৌম নিয়ন্ত্রণ এবং জলজ ও সমুদ্রতলের সম্পদের ওপর একচ্ছত্র অধিকার আদায় করে নিয়েছে অথবা দাবি জানিয়েছে। ভারত-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের অনেক দ্বীপ রাষ্ট্রেরই এখন তাদের মূল ভূখণ্ডের চেয়ে সামুদ্রিক সীমার আয়তন কয়েকগুণ বেশি। উদাহরণ হিসেবে বলা যায় মালদ্বীপের কথা। দক্ষিণ এশীয় এই দ্বীপরাষ্ট্রটির মোট ভৌগলিক আয়তনের ৯৯ শতাংশই সমুদ্র। কিছু দেশ এরই মধ্যে নিজেদের ‘ব্লু কন্টিনেন্ট’ হিসেবে পরিচয় দিতে শুরু করেছে।

তবে মানচিত্রে সমুদ্রের নির্দিষ্ট অংশ পর্যন্ত নিজেদের সার্বভৌমত্বের সীমারেখা আঁকানো যতটা সহজ, বাস্তবে পুরোটা অঞ্চলে আইনের শাসন নিশ্চিত করা ততটাই কঠিন। কারণ যেকোনো ক্ষেত্রেই সুশাসন প্রতিষ্ঠার পূর্বশর্ত হলো সেটি সম্পর্কে ভালোভাবে জানা। সমুদ্র খাতের জন্যও এ কথা সমানভাবে প্রযোজ্য। তবে ভূমি থেকে শত শত মাইল দূরে কী ঘটছে, অনেক দেশের পক্ষেই তা জানা সম্ভব হয় না। এসব দেশের জন্য সামুদ্রিক রাজত্ব প্রতিষ্ঠা কেবল কাগজে কলমেই সীমাবদ্ধ। বাস্তবে সার্বভৌমত্বের মনচিত্রে থাকা সাগরের বেশিরভাগ অংশই তাদের নিয়ন্ত্রণের বাইরে থেকে যায়।

সুলভ স্যাটেলাইটভিত্তিক তথ্য প্রবাহ সমুদ্র নজরদারিতে ইতিবাচক ভূমিকা রাখছে

অস্ট্রেলিয়ার মতো ধনী দেশগুলো অনেকদিন ধরেই জাহাজ অথবা এয়ারক্রাফটের মাধ্যমে, বিশালাকার সামরিক স্যাটেলাইট থেকে অথবা জাহাজের অটোমেটিক আইডেন্টিফিকেশন সিস্টেমের (এআইএস) মতো স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থা থেকে তথ্য সংগ্রহ করে আসছে। এসব ব্যবস্থার অনেকগুলো থেকেই বঞ্চিত দরিদ্র দেশগুলো।

তবে প্রযুক্তির বহুমুখী বিপ্লবের ফলে এমডিএ এসব দেশের নাগালে চলে আসছে। এসব প্রযুক্তির মধ্যে রয়েছে অসামরিক স্যাটেলাইটভিত্তিক তথ্যের মুক্তপ্রবাহ, স্বল্পব্যয়ের বাণিজ্যিক ড্রোন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ইত্যাদি। পৃথিবীর নিম্নতর কক্ষপথে ঘূর্ণায়মান স্বল্পব্যয়ের বাণিজ্যিক ও অন্যান্য অসামরিক স্যাটেলাইটের কল্যাণে সাগরের সিংহভাগ অংশ নিয়মিত পর্যবেক্ষণের অধীনে এসেছে। এসব স্যাটেলাইট সাগরে চলাচলকারী জাহাজ শনাক্ত করার জন্য অপটিক্যাল অবজারভেশন, রেডিও অথবা রাডারের মাধ্যমে জাহাজের বেতার তরঙ্গ শনাক্তকরণ, প্রতিফলিত লাইট শনাক্তকারী স্ক্যানিং রাডার ভিআইআইআরএস ইত্যাদি প্রযুক্তি ব্যবহার করে।

বর্তমানে ওয়েবভিত্তিক অনেক প্লাটফর্ম রয়েছে, যেখান থেকে ভারত-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের দেশগুলো বিনামূল্যে অথবা খুব কম খরচে স্যাটেলাইটভিত্তিক ও এআইএস ডেটা সংগ্রহ করতে পারছে। এর ফলে কোনো জাহাজ তাদের এআইএস সিস্টেম বন্ধ করে রাখলে অথবা সেগুলোয় কোনো কারসাজি করলে তা সহজেই শনাক্ত করা সম্ভব হচ্ছে।

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক অনেক ডেটা সোর্স এখন সমুদ্র নজরদারির কাজটি সহজ করে দিয়েছে। এমনই একটি সোর্স হলো স্কাইলাইট সিস্টেম। যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠান এর উদ্যোক্তা। এটি জাহাজের চালচলন পর্যবেক্ষণ করে সেটির কার্যক্রম ও উদ্দেশ্য সম্পর্কে আগাম ধারণা দিতে পারে। যেমন সাগরে থাকা একটি ভেসেলের উদ্দেশ্য কি-মাছ ধরা না জলদস্যুতা, সেটি সম্পর্কে প্রাথমিক ধারণা দিতে পারে এআই প্লাটফর্মটি। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ এই তথ্য কাজে লাগিয়ে বিশদ তদন্ত পরিচালনা করতে পারে।

স্যাটেলাইটনির্ভর ফোনের ব্যবহার ক্রাউড-সোর্স এমডিএতে বড় অবদান রাখতে পারে

তথ্য সংগ্রহের আরেকটি কার্যকর ব্যবস্থা হলো ক্রাউড-সোর্স এমডিএ, যেখানে সামুদ্রিক আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলোর জন্য চোখ ও কান হিসেবে কাজ করেন সমুদ্র ব্যবহারকারী অংশীজনরা। কিছু ক্ষেত্রে এই পদ্ধতির কার্যপ্রক্রিয়া খুবই সরল। উদাহরণ হিসেবে বলা যায় মালদ্বীপের কথা। সমুদ্র নিরাপত্তা বাড়ানোর জন্য দেশটির সরকার সমুদ্রগামী মাছ ধরা ট্রলারগুলোকে বিনামূল্যে স্যাটেলাইটনির্ভর ফোন সরবরাহ করেছিল। এর ফলে দুটি সুবিধা হলো। প্রথমত, ট্রলারগুলো নিজেরা কোনো বিপদে পড়লে তাৎক্ষণিকভাবে সেটি উদ্ধারকারী কর্তৃপক্ষকে জানাতে পারছে। আর দ্বিতীয়ত, বিদেশী কোনো ট্রলার অবৈধভাবে অনুপ্রবেশ করলে সেটিও আইন প্রয়োগকারী কর্তৃপক্ষকে জানানো সম্ভব হচ্ছে। এতে করে দেশটির সামুদ্রিক মৎস্যসম্পদের সুরক্ষাও নিশ্চিত হচ্ছে।

ক্রাউড-সোর্স এমডিএর একটি মজার উদাহরণ হলো ফিলিপাইনের ‘সিওয়াচ’ অ্যাপ। এটি অনেকটা মূল ভূখণ্ডের ক্রাউড সোর্সিং অ্যাপ ‘সিটিজেন’-এর আদলে তৈরি করা। এই অ্যাপের মাধ্যমে ফিলিপাইনের নাগরিকরা তাদের চোখের সামনে যেকোনো ট্রাফিক দুর্ঘটনা ও অপরাধ দেখতে পেলে আইন প্রয়োগকারী সংস্থাকে তা জানাতে পারেন। সিওয়াচ অ্যাপের কার্যপ্রণালীও অনেকটা একই ধরনের। অবৈধ মৎস্য আহরণ অথবা অন্য কোনো অনৈতিক কার্যক্রম দেখতে পেলে জেলেরা মোবাইল ফোনে তোলা ছবি ও সংশ্লিষ্ট অন্যান্য তথ্য এই অ্যাপে প্রদানের মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে অবহিত করতে পারেন।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here