দীর্ঘ ৬০ বছর সমুদ্র গবেষণায় অনন্য অবদান রাখার পর কর্মযাত্রার ইতি টানছে স্ক্রিপস ইনস্টিটিউট অব ওশানোগ্রাফির ফ্লোটিং ইনস্ট্রুমেন্ট প্লাটফর্ম (ফ্লিপ)। সমুদ্র গবেষণার ক্ষেত্রে এই ধরনের গবেষণা জাহাজ আর দ্বিতীয়টি নেই। জাহাজ বলা হলেও কারিগরিভাবে এটি একটি ভাসমান প্ল্যাটফর্ম হিসেবেই গবেষণা কার্যক্রম পরিচালনা করত।
ক্যালিফোর্নিয়ার সান ডিয়াগোভিত্তিক স্ক্রিপস ইনস্টিটিউট অব ওশানোগ্রাফি মহাসাগর ও ভূবিজ্ঞান বিষয়ক বিশ্বের প্রাচীন ও বৃহত্তম গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে অন্যতম। সংক্ষেপে স্ক্রিপস নামে পরিচিত প্রতিষ্ঠানটি গভীর সাগরে বিভিন্ন ধরনের শব্দের উৎপত্তি, বিস্তার ও প্রভাব সম্পর্কে সুস্পষ্ট ধারণা লাভের উদ্দেশ্যে ১৯৬২ সালে ফ্লোটিং ইনস্ট্রুমেন্ট প্লাটফর্মটি (ফ্লিপ) নির্মাণ করে।
দীর্ঘ ছয় দশকে ভূ-পদার্থবিদ্যা, আবহাওয়াবিদ্যা, সমুদ্রবিজ্ঞানসহ বিভিন্ন বিষয় নিয়ে শতাধিক গবেষণা করেছে সম্পন্ন ফ্লিপ। ফ্লিপে বসে স্ক্রিপসের গবেষকরা যেমন সাবমেরিনের ব্যবহারের জন্য শব্দ তরঙ্গের প্রসারণবিষয়ক গবেষণা করেছেন, তেমনি গভীর সাগরে স্তন্যপায়ী প্রাণীদের (যেমন তিমি) আওয়াজ এবং অনুজীবদের মৃদু আওয়াজের ডপলার ইফেক্ট বিষয়ক গবেষণাও পরিচালনা করেছেন।
৩৫৫ ফুট (১০৮ মিটার) দীর্ঘ গবেষণা প্লাটফর্মটি এমনভাবে তৈরি করা হয়েছে, যাতে এটি গভীর সাগরের উত্তাল ঢেউয়ের ভেতরও নিজের স্থিতিশীলতা ধরে রাখতে পারে। শুরুতে এটি জাহাজের মতোই আনুভূমিকভাবে চলাচল করে। নির্দিষ্ট গন্তব্যে পৌঁছনোর পর এটিকে সুনিয়ন্ত্রিত পদ্ধতিতে ৯০ ডিগ্রি কোণে পেছনের অংশটি সমুদ্রে নিমজ্জিত করা হয়। এর ফলে ফ্লিপের ৩০০ ফুট লম্বা লেজসদৃশ অংশটি সমুদ্রে ডুবে যায় এবং বাকি ৫৫ ফুট (১৭ মিটার) পানির ওপর উলম্ব অবস্থায় ভাসমান অবস্থায় থাকে। উল্টানো বা ফ্লিপিং প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে ২০ থেকে ৩০ মিনিট সময় লাগে।

ফ্লিপের ভাসমান ৫৫ ফুট অংশটিতে বসেই গবেষণা কার্যক্রম পরিচালনা করা হয়। প্লাটফর্মটিতে ডপলার সোনার, হাইড্রোফোন, সেন্সরের পাশাপাশি তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণের জন্য দুইটি গবেষণাগার রয়েছে। গবেষণা শেষে যখন প্লাটফর্মটিকে পুনরায় জাহাজের মতো ভাসানো দরকার হয়, তখন ডুবে থাকা অংশের ব্যালাস্ট ট্যাংকগুলোয় সংকুচিত বাতাস পাম্প করে ক্রুরা একে পুনরায় উল্লম্ব থেকে অনুভূমিক অবস্থায় নিয়ে আসে।
নির্দিষ্ট লক্ষ্যে পৌঁছনোর পর উলম্ব অবস্থায় প্লাটফর্মটিকে হয় স্রোতের ওপর ভাসিয়ে রাখা হতো, না হয় নোঙ্গরের সাহায্যে সাগরের তলদেশের সঙ্গে আটকে রাখা হতো। তবে এটি এমনভাবে নকশা করা হয়েছিল, যাতে করে স্রোতে ভাসমান অবস্থায়তেও এর স্থিতিস্থাপকতায় কোনো প্রভাব পড়ত না। সাগরে ২০ ফুট উঁচু উত্তাল ঢেউ থাকলেও প্ল্যাটফর্মটি মাত্র শূন্য দশমিক ৫ ইঞ্চি (১ দশমিক ৩ সেন্টিমিটার) ওঠানামা করে। স্ক্রিপসের সমুদ্রবিজ্ঞানী জন হিল্ডারব্র্যান্ড বলেন, ‘ফ্লিপে মাঝ সাগরে বসে কাজ করার সময়ও মনে হতো আমরা স্থলভাগেই রয়েছি। উত্তাল সাগরে এই ধরনের অনুভূতি আসলেই অসাধারণ।’
উল্লম্ব বা খাড়াভাবে অবস্থানকালে ফ্লিপে একসঙ্গে ১১ জন গবেষক ও ৫ জন ক্রু কাজ করতে পারতো। গবেষণা জাহাজটিতে ১৬ জন মানুষের এক মাসের রসদ মজুদ করা যেত। এর ফলে স্ক্রিপসের বিভিন্ন দেশের বিজ্ঞানীরা অন্তত ৩০ দিন গভীর সাগরে নিশ্ছিদ্র মনোযোগে গবেষণা করার সুযোগ পেতেন।
সুদীর্ঘ সময় কার্যক্ষম থাকলেও বর্তমানে ফ্লিপকে স্ক্র্যাপইয়ার্ডে নিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে স্ক্রিপস। তবে অনন্য গবেষণা জাহাজটির স্মৃতি ধরে রাখতে স্ক্র্যাপইয়ার্ডে নেওয়ার আগে এর একটি বুম সংরক্ষণ করা হবে।