রাক্ষুসে প্রজাতির জন্য প্রতি বছর বৈশ্বিক আর্থিক ক্ষতি ৪২ হাজার কোটি ডলার: আইপিবিইএস

বিশ্বজুড়ে রাক্ষুসে প্রজাতির প্রাণীর (স্থলজ ও জলজ) কারণে প্রতিবছর মানবজাতির প্রায় ৪২ হাজার ৩০০ কোটি ডলারের আর্থিক ক্ষতি হয়। এই প্রজাতির মধ্যে ডোরাকাটা জেব্রা ঝিনুক ও লায়ন ফিশের মতো সামুদ্রিক প্রাণীও রয়েছে। ইন্টারগভর্নমেন্টাল প্লাটফর্ম অন বায়োডাইভার্সিটি অ্যান্ড ইকোসিস্টেম সার্ভিসেস (আইপিবিইএস) প্রকাশিত সাম্প্রতিক একটি জরিপ প্রতিবেদনে এই তথ্য জানানো হয়েছে।

‘ইনভেসিভ এলিয়েন স্পিশিজ রিপোর্ট’ শীর্ষক প্রতিবেদনটিতে আর্থিক ক্ষতির যে পরিমাণ উল্লেখ করা হয়েছে, তার প্রায় ১০ শতাংশের জন্য দায়ী সামুদ্রিক রাক্ষুসে প্রজাতি। মিঠাপানির প্রজাতি দায়ী আরও ১৪ শতাংশ লোকসানের জন্য। তবে সাগরের রাক্ষুসে প্রজাতি নিয়ে উদ্বেগ বেশি হওয়ার বিশেষ কারণ রয়েছে। আর সেটি হলো-উপকূলীয় এলাকায় এই প্রজাতির প্রাণী একবার বসতি গড়লে সেটি নির্মূল করা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে।

আইপিবিইএসের তথ্য অনুযায়ী, আধুনিক যুগে বিশ্বজুড়ে অন্যান্য প্রজাতির অস্তিত্ব বিলীন হওয়ার পেছনে রাক্ষুসে প্রজাতির (স্থলজ ও জলজ) দায় ৬০ শতাংশ। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মানবজাতির ওপর রাক্ষুসে প্রজাতির সার্বিক প্রভাবের বড় অংশই (৮৫ শতাংশ নেতিবাচক)। অথচ এই মানুষই প্রজাতিগুলোর স্থানান্তর ও ভিন্ন পরিবেশে বসতি গড়ে তোলার সবচেয়ে বড় প্রাথমিক কারণ। আইপিবিইএস জানিয়েছে, রাক্ষুসে প্রজাতির কারণে আর্থিক ক্ষয়ক্ষতি প্রতি দশক অন্তর চারগুণ হচ্ছে।

সামুদ্রিক প্রাণবৈচিত্র্যের ভয়াবহ বিপর্যয়ের অন্যতম কারণ জেব্রা ঝিনুক

জাতিসংঘ পরিবেশ কর্মসূচির প্রধান ইঙ্গার অ্যান্ডারসন বলেন, ‘যখন রাক্ষুসে প্রজাতি এক জায়গা থেকে অন্যত্র স্থানান্তরিত হয়, তখন সেখানকার আদি বাস্তুতন্ত্র ক্ষতিগ্রস্ত হয়। জীববৈচিত্র্যের সর্বনাশের পেছনে পাঁচটি বড় কারণের একটি হলো এসব রাক্ষুসে প্রজাতি, যে সংকট বিশ্বের ওপর শক্তভাবে চেপে বসেছে। বাকি চারটি কারণ হলো ভূমি ও সাগরকেন্দ্রিক কর্মযজ্ঞের ধরনগত পরিবর্তন, মাত্রাতিরিক্ত আহরণ, জলবায়ু পরিবর্তন ও দূষণ। আমরা এই চারটি কারণ সম্পর্কে তুলনামূলক ভালো ধারণা রাখি। কিন্তু রাক্ষুসে প্রজাতি সম্পর্কে বৈশ্বিক পর্যায়ে জ্ঞানের ঘাটতি রয়েছে। এই ঘাটতি দূর করার ক্ষেত্রে আইপিবিইএসের প্রতিবেদনটি সহায়ক ভূমিকা রাখবে ।’

প্রতিবেদনে আন্তর্জাতিক সমুদ্র পরিবহন খাতের জন্য কিছু সুপারিশ তুলে ধরা হয়েছে, যার বেশিরভাগই পর্যবেক্ষণ ও প্রতিরোধভিত্তিক। ২০১৭ সালে কার্যকর হওয়া ইন্টারন্যাশনাল কনভেনশন ফর দ্য কন্ট্রোল অ্যান্ড ম্যানেজমেন্ট অব শিপস ব্যালাস্ট ওয়াটার অ্যান্ড সেডিমেন্টসেও (সংক্ষেপে ব্যালাস্ট ওয়াটার ম্যানেজমেন্ট কনভেনশন) একই কথা বলা হয়েছে। আইপিবিইএসও মনে করছে, রাক্ষুসে প্রজাতির স্থানান্তর প্রতিরোধে সবচেয়ে কার্যকর উপায় হতে পারে ‘পাথওয়ে ম্যানেজমেন্ট’।

বিশ্লেষকরা বলছেন, রাক্ষুসে প্রজাতি একবার উপকূলীয় এলাকায় বসতি গড়ে তুললে তা নিশ্চিহ্ন করার উদাহরণ খুব বেশি পাওয়া যায় না। অস্ট্রেলিয়া অবশ্য ১৯৯৯ সালে তাদের একটি হারবারে জাহাজ চলাচল বন্ধ করে এবং ছয় হাজার টন কপার সালফেট প্রয়োগ করে সেখান থেকে জেব্রা ঝিনুকের বসতি নির্মূল করতে সক্ষম হয়েছিল। তবে অস্ট্রেলিয়ার সেই হারবার ছিল প্রাকৃতিকভাবে আবদ্ধ। উন্মুক্ত উপকূলে এই ধরনের বসতি নির্মূলের ঘটনা প্রায় বিরল।

আইপিবিইএস বলছে, রাক্ষুসে প্রজাতির বিস্তার ঠেকাতে হলে জাহাজের ব্যালাস্ট ওয়াটার ব্যবস্থাপনাকে কঠোরভাবে তদারকির মধ্যে রাখতে হবে। যদিও ব্যালাস্ট ওয়াটার ব্যবস্থাপনায় আন্তর্জাতিক বিধিবিধান চালুর বৈশ্বিক সুফল পর্যালোচনার সময় এখনো আসেনি, তবে উত্তর আমেরিকার গ্রেট লেকসে এর ইতিবাচক প্রভাব এরই মধ্যে পরিলক্ষিত হয়েছে। সেখানে অভিবাসী রাক্ষুসে প্রজাতির বসতি গড়ে তোলার প্রবণতা অনেকটাই কমেছে।

রাক্ষুসে প্রজাতির স্থানান্তর প্রতিরোধে কঠোর বায়োফাউলিং ব্যবস্থাপনা অত্যন্ত জরুরি

বিশেষজ্ঞরা জানান, ১৯৫৯ থেকে ২০০৬ সালের মধ্যে কানাডা ও যুক্তরাষ্ট্রে গড়ে প্রতি সাত মাসে একটি অভিবাসী রাক্ষুসে প্রজাতির সন্ধান পাওয়া যেত। তবে দেশদুটিতে ব্যালাস্ট ওয়াটার ব্যবস্থাপনায় যথাক্রমে ২০০৬ ও ২০০৮ সালে বিধিবিধান চালুর পর নতুন বসতি স্থাপনের ঘটনা ৮৫ শতাংশ কমেছে।

আইপিবিইএস বলছে, ব্যালাস্ট ওয়াটার ব্যবস্থাপনা ছাড়াও আন্তর্জাতিক সমুদ্র পরিবহন খাতকে আরও কিছু বিষয় নিয়ে কাজ করতে হবে। সাগরে রাক্ষুসে প্রজাতির বিস্তারের প্রায় ৭০ শতাংশ ক্ষেত্রে প্রধান কারণ হলো বায়োফাউলিং (জাহাজের কাঠামোতে এসব প্রাণী আটেকে থাকে এবং জাহাজের সঙ্গে এক অঞ্চল থেকে অন্যত্র স্থানান্তরিত হয়)। বায়োফাউলিং নিয়ন্ত্রণে এখন পর্যন্ত আন্তর্জাতিক কোনো আইনি কাঠামো চালু করা সম্ভব হয়নি। অবশ্য কিছু কিছু দেশ তাদের জাতীয় আইনের মাধ্যমে এটি নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা চালাচ্ছে। উদাহরণ হিসেবে বলা যায় নিউজিল্যান্ডের কথা। দেশটির কর্তৃপক্ষ ধারণা করছে, তাদের উপকূলীয় জলসীমায় রাক্ষুসে প্রজাতির বসতি স্থাপনের পেছনে বায়োফাউলিংয়ে দায় প্রায় ৯৭ শতাংশ। এ কারণে দেশটি জাহাজের বায়োফাউলিং কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণে জাতীয়ভাবে আইন কার্যকর করেছে।

বৈশ্বিক মেরিটাইম খাতের নিয়ন্ত্রক কর্তৃপক্ষ হলো ইন্টারন্যাশনাল মেরিটাইম অর্গানাইজেশন (আইএমও)। এই খাতের সুরক্ষায় আন্তর্জাতিক বিধিবিধান চালুর দায়িত্বটিও তাদেরই। জাতিসংঘের সমুদ্রবিষয়ক সংস্থাটির রেগুলেটরি এজেন্ডাতে অবশ্য বায়োফাউলিংয়ের বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। একযুগ আগে তারা এ বিষয়ে একটি দিকনির্দেশনা প্রকাশ করেছিল, তবে তা ছিল ঐচ্ছিক। শিপিং কোম্পানিগুলো তা মানতে বাধ্য নয়। অবশ্য প্রায় এক-তৃতীয়াংশ শিপিং কোম্পানি ফাউলিং প্রতিরোধে স্বেচ্ছায় পদক্ষেপ নিচ্ছে বলে সাম্প্রতিক এক জরিপ প্রতিবেদনে জানিয়েছে লয়েড’স রেজিস্টার ও নরওয়েজিয়ান কেমিক্যাল কোম্পানি জতুন।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here