সাগরে বাড়ছে জলদস্যুদের দৌরাত্ম্য উদ্বিগ্ন বৈশ্বিক মেরিটাইম খাত

ছেলেবেলায় একচোখা দুর্ধর্ষ জলদস্যুর দুঃসাহসিক অভিযানে মুগ্ধ হয়নি এমন মানুষ পাওয়া ভার। বইয়ের পাতায় গুপ্তধন উদ্ধারকারী জলদস্যুদের গল্পগুলো আলো ঝলমলে বর্ণিল মনে হলেও বাস্তবতা একবারেই ভিন্ন। প্রাচীনকাল থেকেই সাগরপথে ব্যবসা-বাণিজ্য পরিচালনাকারী নাবিকদের কাছে জলদস্যু হামলা এক মূর্তিমান আতঙ্কের নাম। সময়ের পরিক্রমায় বিশ্বজুড়ে নৌ-বাণিজ্য ব্যাপক আকারে প্রসারিত হয়েছে। তবে অত্যাধুনিক নৌযান ও নিরাপত্তা ব্যবস্থা প্রয়োগ করেও জলদস্যুদের সমূলে উৎপাটন করতে হিমশিম খাচ্ছে মেরিটাইম খাত।

২০২৩ সালের শুরুতে জলদস্যু হামলার উচ্চ ঝুঁকিপ্রবণ এলাকা থেকে ভারত মহাসাগরকে অব্যাহতি দেওয়া হয়। একই বছর অক্টোবরে ইসরায়েলের সঙ্গে যুদ্ধে জড়ায় ফিলিস্তিনি স্বাধীনতাকামী সংগঠন হামাস। মধ্যপ্রাচ্যে শুরু হওয়া যুদ্ধের জেরে অস্থিতিশীল হয়ে পড়ে লোহিত সাগর ও সুয়েজ খালের মতো গুরুত্বপূর্ণ দুটি বাণিজ্যপথ। নৌপরিবহন খাতে সৃষ্ট অস্থিতিশীলতা ও শিথিল নিরাপত্তা ব্যবস্থার সুযোগে সোমালি জলদস্যুরা আবারও মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে। গত পাঁচ মাসে মাল্টার-পতাকাবাহী বাণিজ্যিক জাহাজ এমভি রুয়েন ও বাংলাদেশের পতাকাবাহী এমভি আবদুল্লাহসহ ছোট বড় অন্তত ১৪টি নৌযান ছিনতাই করেছে সোমালি দস্যুরা। জলদস্যু হামলা আচমকা বেড়ে যাওয়ায় নড়ে চড়ে বসেছে বৈশ্বিক মেরিটাইম খাত। কোনো ধরনের রক্তপাত ছাড়াই নাবিকসহ জিম্মি জাহাজগুলো উদ্ধার করা গেলেও জলদস্যুদের তৎপরতা বৃদ্ধি সংশ্লিষ্ট সকল পক্ষকে নতুন করে ভাবিয়ে তুলেছে।

দস্যুতার ইতিহাস

মানব ইতিহাসের পরতে পরতে জলদস্যুতার নজির পাওয়া যায়। প্রাচীনকালে পণ্য পরিবহন ও বাণিজ্য পরিচালনার প্রধান মাধ্যম ছিল নৌপথ। এর ফলে সাগর ও উপকূলীয় অঞ্চলে দস্যুতার পরিমাণও ছিল বেশি। খ্রিস্টপূর্ব ১৪০০ অব্দে প্রথম জলদস্যু হামলার ঘটনা নথিভুক্ত করা হয়। সে সময় এজিয়ান ও ভূমধ্যসাগরে চলাচলকারী জাহাজকে লক্ষ্য করে হামলা চালাত দস্যুরা।

প্রাচীন ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চলে সামুদ্রিক বাণিজ্য ও জলদস্যুতা ওতপ্রোতভাবে জড়িত ছিল। গ্রিক, রোমান ও কার্থাজিনিয়ানদের মতো ফিনিশিয়রাও একই সাথে বাণিজ্য ও দস্যুতার সঙ্গে যুক্ত ছিল। উত্তর দিক থেকে আগত ভাইকিং ও দক্ষিণ থেকে আগত মুররা মধ্যযুগে দস্যুবৃত্তিতে যুক্ত হয়। রেনেসাঁ ও রেনেসাঁ-পরবর্তী যুগে ইউরোপে বেশকিছু যুদ্ধের যবনিকাপাত ঘটে। সেসব যুদ্ধে অংশগ্রহণকারী জাহাজের অনেক ক্রু পরবর্তীতে কাজ হারিয়ে জলদস্যু দলে যোগ দেয়।

সে সময় জলদস্যুর প্রধান জোগানদাতা ছিল ব্যক্তিমালিকানাধীন সশস্ত্র প্রাইভেটিয়ার। পাল্টা আক্রমণ পরিচালনা, যুদ্ধবিরতিতে সংঘটিত সুনির্দিষ্ট অপরাধের ক্ষতিপূরণ আদায় ও শত্রুপক্ষকে ঘায়েল করতে এসব প্রাইভেটিয়ারদের নিয়োগ দিত সরকার। জিম্মি জাহাজ থেকে যেসব সম্পদ লুট করা হতো তার একটি বড় অংশ প্রাইভেটিয়ারের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের কাছে পৌঁছে যেত। ১৬ শতকের শেষদিকে ইংল্যান্ড-স্পেনের যুদ্ধ চলাকালীন সময়ে মেক্সিকো থেকে ক্যারিবীয়গামী ধন-সম্পদে বোঝাই স্প্যানিশ জাহাজগুলো প্রাইভেটিয়ারদের লক্ষ্য বস্তুতে পরিণত হয়। সে সময় প্রাইভেটিয়ার ও জলদস্যুদের মধ্যে পার্থক্য করাই দুরূহ হয়ে পড়ে।

১৭ শতকের মাঝামাঝি সময়ে ক্যারিবীয় অঞ্চল ও আমেরিকার উপনিবেশগুলোয় জলদস্যুদের ‘স্বর্ণযুগ’ শুরু হয়। স্যার হেনরি মর্গান, ব্ল্যাকবেয়ার্ড ও উইলিয়াম কিডের (ক্যাপ্টেন কিডের) মতো কিংবদন্তি জলদস্যুরা সে সময় সমুদ্রপথে ত্রাস সৃষ্টি করে রেখেছিল। ইউরোপের সমুদ্র-তীরবর্তী প্রতিটি দেশ এমনকি আফ্রিকার নাবিকেরাও তখন দস্যু জাহাজে এসে যুক্ত হতো। তথাকথিত স্বর্ণযুগে জনসাধারণের মনে জলদস্যুদের নিয়ে নানা জল্পনা-কল্পনা পাখা মেলতে শুরু করে। জলদস্যুদের ঘিরে সৃষ্ট উন্মাদনা এই সময় সাহিত্যে; বিশেষত রোমান্টিক ও শিশু সাহিত্যে এক নতুন ধারা শুরু করে। ১৮৮১ সালে প্রকাশিত রবার্ট লুই স্টিভেনসনের ‘ট্রেজার আইল্যান্ড’ এর সবচেয়ে বড় উদাহরণ। দেড়শ বছর পরও কালজয়ী এই উপন্যাসের হাত ধরে বিশ্বের লাখ লাখ শিশু লং জন সিলভারের সঙ্গে গুপ্তধনের সন্ধানে বেরিয়ে পড়ছে।

পরবর্তীকালে জলদস্যুতা বিশ্বের নানা প্রান্তে ছড়িয়ে যায়। তুর্কি শাসনের তেজ কমে আসায় ১৬ থেকে ১৮ শতকে ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চলে জলদস্যু হামলার ঘটনা নিত্যনৈমিত্তিক ঘটনায় পরিণত হয়। সুসংগঠিত জলদস্যু হামলা পরিচালনা করায় জলদস্যু রাষ্ট্র হিসেবে পরিচিতি লাভ করে মরক্কো, আলজিয়ার্স, তিউনিস ও ত্রিপোলি। লাগাতার নানাবিধ পদক্ষেপ গ্রহণের মাধ্যমে উনিশ শতকের গোড়ার দিকে মার্কিন, ব্রিটিশ ও ফ্রেঞ্চ বাহিনী এ সকল দস্যুরাষ্ট্রকে দমন করতে সক্ষম হয়।

সমসাময়িক প্রেক্ষাপটে দস্যুতা

সময়ের সাথে পাল্লা দিয়ে দস্যুতার ধরন বদলেছে। গত শতকের শেষভাগে জাহাজ ও বিমান ছিনতাইয়ের মাধ্যমে দস্যুতা আবারও মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে। চোরাচালান ও অবৈধ কার্যকলাপে জড়িত অপরাধী সংগঠনের সহযোগিতায় বিশ শতকের শেষ দশকে পূর্ব ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া এবং আফ্রিকার পশ্চিমাঞ্চলে সামুদ্রিক জলদস্যুতার প্রাদুর্ভাব বেড়ে যায়। অনেক সময় সরকারি কর্মকর্তাদের পৃষ্ঠপোষকতায় ছোটখাটো বন্দরগুলোয় হামলা চালাত জলদস্যুরা। লুণ্ঠিত সম্পদের একটা অংশ কর্মকর্তাদের প্রদান করা হতো। ২০০৮-০৯ সালে আফ্রিকা উপকূলে, বিশেষত সোমালিয়া উপকূলে জলদস্যু হামলার ঘটনা আশঙ্কাজনক হারে বেড়ে যায়। অত্র অঞ্চলে বিভিন্ন দেশের জাহাজ ছিনতাই হওয়ায় কয়েকটি দেশের নৌবাহিনী দস্যু দমনে হস্তক্ষেপ করতে বাধ্য হয়।

সোমালি জলদস্যুদের আখ্যান

এশিয়া থেকে ইউরোপগামী প্রতিটি জাহাজকেই এডেন উপসাগর অতিক্রম করে সুয়েজ খালে পৌঁছতে হয়। গুরুত্বপূর্ণ এই বাণিজ্যিক পথের ধার ঘেঁষেই সোমালিয়ার অবস্থান। পূর্ব আফ্রিকার ত্রিকোনাকৃতি অংশ ‘হর্ন অব আফ্রিকার’ বেশ অনেকটা জায়গাজুড়ে রয়েছে দেশটি। এর ফলে মানচিত্রের এই অংশটি ‘সোমালি উপদ্বীপ’ নামেও পরিচিত। ১৯৬০ সালে ইতালির ঔপনিবেশিক নিয়ন্ত্রণ থেকে বেরিয়ে স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে সোমালিয়া। এডেন উপসাগর, আরব সাগর ও ভারত মহাসাগর বেষ্টিত দেশটি ভৌগোলিকভাবে সুবিধাজনক অবস্থানে থাকলেও অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতার জেরে এর অর্থনীতি বরাবরই বেশ নড়বড়ে।

দীর্ঘদিন ধরে চলা গৃহযুদ্ধের পর ১৯৯১ সালে সোমালিয়ায় সামরিক শাসনের উৎখাত হয়। শাসন ব্যবস্থা মুখ থুবড়ে পড়ায় দেশটিতে তখন চরম নৈরাজ্য বিরাজ করছিল। আফ্রিকার দীর্ঘতম উপকূলসমৃদ্ধ দেশ হওয়া সত্তে¡ও সোমালিয়ায় তখন কোনো উপকূলরক্ষা বাহিনী বা কোস্ট গার্ড ছিল না। ভঙ্গুর অর্থনীতি ও সমুদ্র উপকূল রক্ষায় প্রশাসনের নীরব ভূমিকায় দেশটিতে নাশকতামূলক কার্যক্রম ক্রমেই বাড়তে থাকে। সরকারি বাহিনীর নজরদারি ও নিরাপত্তামূলক পদক্ষেপের অভাবে দেশটির জলসীমায় তখন বহিরাগতদের আনাগোনা বৃদ্ধি পায়। বিদেশি মাছ ধরা নৌকার তৎপরতা বৃদ্ধি পাওয়ায় বিপাকে পড়ে স্থানীয় জেলেরা। একদিকে অত্যাধুনিক মাছ ধরা নৌকার দৌরাত্ম্য, অন্যদিকে বিদেশি জাহাজ থেকে তেজস্ক্রিয় পদার্থ নিক্ষেপের কারণে সোমালিয়ার জলসীমায় মাছের মজুদ ক্রমেই কমতে থাকে। সোমালিয়ার আইনি শাসনের অনুপস্থিতিতে বহিঃশক্তি এতটাই মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে যে, কাছাকাছি গেলে বিদেশি মাছ ধরা নৌকাগুলো সোমালি জেলেদের লক্ষ্য করে গুলি ছুড়তে শুরু করে। জীবিকা নির্বাহের জন্য মূলত মৎস্য আহরণের ওপর নির্ভরশীল সোমালি জনগোষ্ঠী ধীরে ধীরে কাজ হারাতে থাকে। এমন অবস্থায় সোমালি জেলেরা সোমালি মেরিনস এবং ন্যাশনাল ভলান্টিয়ার কোস্ট গার্ড অব সোমালিয়া নামে দুটি সংগঠন গড়ে তোলে। আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত জেলেরা একপর্যায়ে জলদস্যুতার সঙ্গে জড়িয়ে পড়ে।

এডেন উপসাগরের একপাশে ইয়েমেন এবং অন্যপাশে সোমালিয়া, জিবুতি ও ইরিত্রিয়া অবস্থিত। সুয়েজ খালে চলাচল করতে হলে জাহাজগুলোকে অবশ্যই এডেন উপসাগর ও লোহিত সাগর অতিক্রম করতে হয়। প্রতি বছর বৈশ্বিক বাণিজ্যের আনুমানিক ১২ শতাংশ এবং বৈশ্বিক কনটেইনার শিপিংয়ের ৩০ শতাংশ সুয়েজ খাল দিয়ে পরিবাহিত হয়। যার ফলে ব্যস্ত এই পথটি জলদস্যুদের লক্ষ্য বস্তুতে পরিণত হয়। অন্যদিকে মৎস্য আহরণের চেয়ে দস্যুতায় আয়ের পরিমাণও কয়েকগুণ বেশি। এর ফলে কাজ হারানো সোমালি জেলেরা দস্যুবৃত্তিকেই পেশা হিসেবে বেছে নেয়। বিশ্বব্যাংকের হিসাব অনুযায়ী, ২০০৫ থেকে ২০১২ সালে জাহাজের ক্রুদের বন্দি করে আনুমানিক ৩৩ কোটি ৯০ লাখ থেকে ৪১ কোটি ৩০ লাখ ডলার মুক্তিপণ আদায় করে হর্ন অব আফ্রিকার জলদস্যুরা।

২০২৩ সালের নভেম্বর থেকে চলতি বছরের মার্চ মাস পর্যন্ত সোমালিয়া উপকূল থেকে অন্তত ১৪টি জাহাজ ছিনতাই হয়েছে

সোমালি জলদস্যুদের ক্রমবর্ধমান উৎপাত গোটা বিশ্বকে উদ্বিগ্ন করে তোলে। ২০১০-১১ সালে জলদস্যুদের দৌরাত্ম্যের মাত্রা ছাড়িয়ে যায়। ইন্টারন্যাশনাল মেরিটাইম অর্গানাইজেশনের (আইএমও) তথ্যমতে, ২০১০ সালে সোমালিয়দের জলদস্যুতা বছরওয়ারি ২০ শতাংশ বৃদ্ধি পায়। ২০১১ সালে ২১২টি জাহাজে হামলা চালায় সোমালি দস্যুরা। জাতিসংঘ ও আফ্রিকান ইউনিয়ন উপকূলের নিরাপত্তা বৃদ্ধিতে তৎপর হয়ে ওঠে। পাশাপাশি ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ), যুক্তরাষ্ট্র, ভারতসহ সংশ্লিষ্ট দেশগুলো অত্র অঞ্চলে সামরিক উপস্থিতি বাড়িয়ে দেয়। জলদস্যুদের দৌরাত্ম্য ঠেকাতে আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে নানা উদ্যোগ গৃহীত হয়। সোমালি জলদস্যু দমনে ২০১০ থেকে ২০২২ সাল পর্যন্ত জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে সাতটি প্রস্তাব পেশ করা হয়। প্রতিরক্ষামূলক এসব উদ্যোগের জেরে জলদস্যুদের প্রকোপ অনেকটাই স্তিমিত হয়ে আসে।

মার্কিন নৌবাহিনীর তথ্যমতে, ২০১৩ সালে সোমালি জলদস্যুরা নয়টি জাহাজে হামলা চালালেও কোনো জাহাজ ছিনতাইয়ে সফল হয়নি। জলদস্যুদের আনাগোনা কমে যাওয়ায় সোমালি উপকূলে তখন অবৈধ মৎস্য আহরণের পরিমাণ বেড়ে যায়। পরবর্তী বছরগুলোয় পুনরায় এক-দুটি জলদস্যু হামলার ঘটনা ঘটতে থাকে। ২০১৫ সালে ইরান ও থাইল্যান্ডের চারটি মাছ ধরা নৌকায় হামলা চালায় জলদস্যুরা। ২০১৭ সালের মার্চে অর্থাৎ দীর্ঘ পাঁচ বছর পর সোমালিয়া উপকূলে বৃহদাকার কোনো বাণিজ্যিক জাহাজ ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটে। তবে কোনো ধরনের মুক্তিপণ ছাড়াই আটজন শ্রীলঙ্কান ক্রুসমেত তেলবাহী জাহাজ অ্যারিস ১৩-কে ছেড়ে দেয় দস্যুরা।

জলদস্যু হামলাপ্রবণ অঞ্চলগুলো চিহ্নিত করে হাই রিস্ক এরিয়ার (এইচআরএ) তালিকা প্রকাশ করে বিমকো, ইন্টারন্যাশনাল চেম্বার অব শিপিং (আইসিএস), ইন্টারন্যাশনাল মেরিন কন্ট্রাক্টরস অ্যাসোসিয়েশন (আইএমসিএ), ইন্টারকার্গো, ইন্টারট্যাঙ্কো এবং অয়েল কোম্পানিজ ইন্টারন্যাশনাল মেরিন ফোরাম (ওসিআইএমএফ)। বিগত কয়েক বছর সোমালি জলদস্যু হামলা নিয়ন্ত্রণে থাকায় ২০২৩ সালের জানুয়ারিতে উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ এলাকার তালিকা থেকে এডেন উপসাগরসহ ভারত মহাসাগরের নাম তুলে নেওয়া হয়। এর ফলে এই অঞ্চলে নিরাপত্তা ব্যবস্থা কিছুটা হলেও শিথিল হয়।

২০১০ সালের ৫ ডিসেম্বর ২৫ জন নাবিকসহ বাংলাদেশি জাহাজ এমভি জাহান মনি ছিনতাই করে জলদস্যুরা

বার্ষিক ‘পাইরেসি অ্যান্ড আর্মড রবারি রিপোর্ট’ শীর্ষক প্রতিবেদনে ইন্টারন্যাশনাল মেরিটাইম ব্যুরো (আইএমবি) জানায়, ২০২২ সালে ১৫০টি এবং ২০২৩ সালে ১২০টি জলদস্যু হামলা হয়েছে। ২০২২ সালে দস্যুরা ৪১ নাবিক ও ক্রুকে জিম্মি করলেও ২০২৩ সালে সেটা বেড়ে ৭৩ জনে দাঁড়িয়েছে। একইভাবে ২০২২ সালে মাত্র ২ জন নাবিক ও ক্রু অপহৃত হলেও ২০২৩ সালে ১৪ জন নাবিক ও ক্রু অপহরণের শিকার হয়। এমতাবস্থায় এডেন উপসাগরে সোমালি জলদস্যুদের বিষয়ে সচেতন থাকার আহ্বান জানায় আইএমবির পাইরেসি রিপোর্টিং সেন্টার (পিআরসি)। জাহাজের সার্বিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ক্যাপ্টেনদের কঠোর সতর্কতা জারি রাখার পরামর্শ দেওয়া হয়।

এদিকে গত বছর অক্টোবরে হামাসের সঙ্গে ইসরায়েলের যুদ্ধ শুরু হয়। যুদ্ধের জেরে মধ্যপ্রাচ্য তথা লোহিত সাগর অস্থিতিশীল হয়ে পড়ে। বিভিন্ন দেশের নৌবাহিনীর নজরদারি মধ্যপ্রাচ্যে সরে যাওয়ায় সোমালি জলদস্যুরা আবারও তৎপর হয়ে ওঠে। ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন নেভাল ফোর্সের (ইইউন্যাভফোর) আটলান্টা অপারেশনের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালের নভেম্বর থেকে ২০২৪ সালের মার্চ পর্যন্ত সোমালিয়া উপকূল থেকে ১২টি মাছ ধরা নৌকা ও ২টি কার্গো জাহাজসহ অন্তত ১৪টি জাহাজ ছিনতাই হয়েছে।

গত ডিসেম্বরে ইয়েমেনি দ্বীপ সোকোত্রা থেকে ৩৮০ নটিক্যাল মাইল পূর্বে মাল্টার পতাকাবাহী বাল্ক ক্যারিয়ার এমভি রুয়েনকে জব্দ করে দস্যুরা। আহত একজন বুলগেরীয় নাবিককে ভারতীয় নৌবাহিনীর হাতে তুলে দিলেও বাকি ১৭ জন ক্রুসমেত এমভি রুয়েনকে দস্যুরা নিজেদের কব্জায় নেয়। পরবর্তীতে সোমালিয়ার আধা-স্বায়ত্তশাসিত পান্টল্যান্ড রাজ্যে জাহাজটি নোঙর করে রাখা হয়। বিমানবাহিনীর সহায়তায় জাহাজটি উদ্ধারে অভিযান পরিচালনা করে ভারতীয় নৌবাহিনী ও মেরিন কমান্ডোর বিশেষ একটি দল। ৪০ ঘণ্টাব্যাপী দীর্ঘ অভিযান শেষে কোনো ধরনের রক্তপাত বা মুক্তিপণ ছাড়াই ১৬ মার্চ এমভি রুয়েনকে মুক্ত করে ভারতীয় নৌবাহিনী। পরবর্তীতে ২৩ মার্চ আটককৃত ৩৫ জন জলদস্যুকে মুম্বাই পুলিশের কাছে সোপর্দ করা হয়। রুয়েনকে উদ্ধারের আগেই বাংলাদেশের পতাকাবাহী বাণিজ্যিক জাহাজ এমভি আবদুল্লাহকে জব্দ করে সোমালি দস্যুর দল। ভারতীয় নৌবাহিনীর ধারণামতে, এমভি আবদুল্লাহকে ছিনতাই করতে রুয়েনকে ঘাঁটি হিসেবে ব্যবহার করেছে দস্যুরা।

দস্যুতার কবলে বাংলাদেশি জাহাজ

বঙ্গোপসাগরের কোলঘেঁষা বাংলাদেশের অর্থনীতি অনেকাংশেই রপ্তানিনির্ভর। বাংলাদেশের রপ্তানি বাণিজ্যের প্রায় ৯৪ শতাংশ সমুদ্রপথে পরিবাহিত হয়। সামুদ্রিক রাষ্ট্র হিসেবে সমৃদ্ধ ইতিহাস থাকা বাংলাদেশ গত এক দশক ধরে সুনামের সঙ্গে তার জলসীমা নিরাপদ রেখে চলেছে। তবে আন্তর্জাতিক জলসীমায় এর আগেও বাংলাদেশি জাহাজ জলদস্যুদের হামলার শিকার হওয়ার ইতিহাস রয়েছে। এমভি আবদুল্লাহ ছিনতাইয়ের প্রায় ১৩ বছর আগে চট্টগ্রামের কেএসআরএম (কবির স্টিল রি-রোলিং মিলস) গ্রুপের মালিকানাধীন বাংলাদেশি পতাকাবাহী জাহাজ এমভি জাহান মনি সোমালি দস্যুদের প্রকোপে পড়েছিল।

এমভি জাহান মনি 

২০১০ সালের ৫ ডিসেম্বর প্রায় ৪১ হাজার মেট্রিক টন নিকেলের আকরিক নিয়ে আরব সাগর পাড়ি দেওয়ার সময় দস্যুদের কবলে পড়ে বাংলাদেশি পতাকাবাহী বাণিজ্যিক জাহাজ এমভি জাহান মনি। হামলার সময় জাহাজটি ভারতের লাক্ষাদ্বীপ থেকে ১৭০ নটিক্যাল মাইল দূরে অবস্থান করছিল। জলদস্যুরা প্রথমে ছোট ছোট নৌযান নিয়ে জাহান মনিকে ঘিরে ফেলে। পরবর্তীতে হুক ও মইয়ের সাহায্যে দস্যুরা জাহাজে উঠে আসে এবং অস্ত্রের মুখে নাবিক, কর্মকর্তা ও প্রধান প্রকৌশলীর স্ত্রীসহ মোট ২৬ জনকে জিম্মি করে।

ছিনতাইয়ের ছয়দিন পর জাহাজটিকে সোমালিয়া উপকূলীয় এলাকা গারাকোডের কাছে নিয়ে যাওয়া হয়। এর একদিন পর স্যাটেলাইট ফোনের মাধ্যমে মালিকপক্ষ অর্থাৎ কেএসআরএম গ্রুপের সঙ্গে যোগাযোগ করে দস্যুরা। দস্যুদের পক্ষ থেকে লিওন নামের একজন ব্যক্তি মালিকপক্ষের সঙ্গে মুক্তিপণ নিয়ে দরকষাকষি করে। শুরুতে ৯০ লাখ ডলার মুক্তিপণ দাবি করে দস্যুরা। তবে মুক্তির শর্তাবলি নিয়ে আলোচনার সময় সমস্যা আরও প্রকট হয়। একসময় পরিস্থিতি ভয়াবহ হয়ে ওঠার কথা জানান জাহান মনির ক্যাপ্টেন ফরিদ আহমেদ। ২৪ ডিসেম্বর মালিকপক্ষকে জাহাজে বিশুদ্ধ পানি ও জ¦ালানি সংকটের বিষয়ে অবগত করেন তিনি। এমন পরিস্থিতিতে পরবর্তী দুই মাস মুক্তিপণ নিয়ে আলোচনা চলে।

অবশেষে ২০১১ সালের ২২ ফেব্রুয়ারি মুক্তিপণ চূড়ান্ত করা হয়। ২৮ ফেব্রুয়ারি জাহাজের কর্মকর্তারা জলদস্যু প্রতিনিধিদের সঙ্গে জিম্মিদের মুক্তির বিষয়ে চুক্তি করেন। ১২ মার্চ দুটি জলরোধী বিশেষ স্যুটকেসে করে জাহান মনিতে মুক্তিপণের টাকা পাঠানো হয়। মুক্তিপণ পাওয়ার পর ১৩ মার্চ ভোরে অর্থাৎ দীর্ঘ ১০০ দিন পর ২৬ জন জিম্মিসহ জাহাজটিকে মুক্ত করে দেয় জলদস্যুরা। ওমান এয়ারওয়েজের ফ্লাইটে করে ২০১১ সালের ২১ মার্চ দেশে পৌঁছেন জাহান মনির নাবিকেরা। জলদস্যুতার চিরায়ত ধরন অনুসারে উভয় পক্ষই মুক্তিপণের অংক গোপন রাখে। তবে বিভিন্ন সূত্র অনুযায়ী, মুক্তিপণের জন্য ৪৬ লাখ ২০ হাজার এবং জ¦ালানি খরচ বাবদ আরও ১ লাখ ডলার প্রদান করা হয়।

এমভি আবদুল্লাহর আদ্যোপান্ত

বাংলাদেশি প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বেশি সমুদ্রগামী জাহাজ রয়েছে কবির গ্রুপের। ২০২৩ সালে ১৯০ মিটার দীর্ঘ গোল্ডেন হক জাহাজটি কেএসআরএম গ্রুপের বহরে যুক্ত হয়। গ্রুপের সহযোগী সংস্থা এস আর শিপিং লিমিটেড জাহাজটি পরিচালনা করে। কেএসআরএম গ্রুপে যুক্ত হওয়ার পর জাহাজটি এমভি আবদুল্লাহ নামে কার্যক্রম শুরু করে। কার্যক্রম শুরুর কয়েক মাসের মাথায় ২৩ জন নাবিকসহ দস্যুদের হামলার শিকার হয় বাংলাদেশি পতাকাবাহী বাণিজ্যিক জাহাজটি।

জানুয়ারির ১৬ তারিখ নাবিক ও রসদ নিয়ে চট্টগ্রাম বন্দর থেকে যাত্রা শুরু করে সাধারণ পণ্যবাহী জাহাজ এমভি আবদুল্লাহ। যাত্রাপথে শ্রীলঙ্কার হাম্বানটোটা বন্দরে বিরতি নিয়ে গন্তব্যস্থল মোজাম্বিকে পৌঁছে জাহাজটি। মোজাম্বিকের রাজধানী মাপুতো থেকে কয়লা বোঝাই করে সংযুক্ত আরব আমিরাতের উদ্দেশে রওনা দেয় এমভি আবদুল্লাহ। চলতি বছর ১২ মার্চ ভারত মহাসাগর অতিক্রমের সময় সোমালি জলদস্যুরা জাহাজটি কব্জা করে নেয়।

এমভি আবদুল্লাহর মাস্টার ক্যাপ্টেন মোহাম্মদ আব্দুর রশিদ জানান, সোমালিয়া উপকূলের ৬০০ নটিক্যাল মাইল দূর দিয়ে যাওয়ার সময় একটি মাছ ধরা নৌকা জাহাজের দিকে অগ্রসর হয়। নৌকাটি কাছাকাছি চলে এলে ব্যবধান বাড়াতে জাহাজটি বামদিকে ঘুরিয়ে দেন তিনি। তবে কয়লা বোঝাই থাকার কারণে জাহাজটি তখন ঘণ্টায় মাত্র সাড়ে ১০ নটিক্যাল মাইল বেগে চলছিল। দস্যুদের দ্রুতগামী নৌকা সহজেই ধীরগতির এমভি আবদুল্লাহর নাগাল পেয়ে যায়। নৌকাটি একদম কাছে চলে এলে জাহাজ থেকে উচ্চচাপে পানি ছিটানো হয়।

মরিয়া হয়ে ক্যাপ্টেন আব্দুর রশিদ তখন ইমার্জেন্সি বাটনের সাহায্যে যুক্তরাজ্যের মেরিটাইম ট্রেড অপারেশনের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করেন। অপর প্রান্ত থেকে সাড়া না পেয়ে ভিএইচএফের মাধ্যমে কাছাকাছি থাকা যুদ্ধজাহাজের সঙ্গে সংযোগ স্থাপনের চেষ্টা করেন তিনি। সেই প্রচেষ্টাও ব্যর্থ হওয়ায় ২০ জন নাবিককে জাহাজের সুরক্ষিত কক্ষ বা সিটাডেলে আশ্রয় গ্রহণের নির্দেশ দেন। নিয়ম অনুযায়ী সিটাডেলে যাওয়ার আগে জাহাজের ইঞ্জিন বন্ধ করতে হয়। বাকি নাবিকেরা অত্যাবশকীয় কাজগুলো সমাপ্ত করার আগেই চারজন জলদস্যু জাহাজে উঠে আসে এবং অস্ত্রের মুখে সবাইকে জিম্মি করে। পরবর্তীতে একে একে ১২ জন জলদস্যু জাহাজে ওঠে এবং এমভি আবদুল্লাহকে সম্পূর্ণরূপে নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে নেয়। জলদস্যুরা ক্যাপ্টেনকে তাদের নির্দেশনা অনুযায়ী জাহাজ চালাতে বাধ্য করেন।

জলদস্যু হামলা ঠেকাতে ২০০৮ সাল থেকে হর্ন অব আফ্রিকায় অপারেশন আটলান্টা পরিচালনা করছে ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ)। এমভি আবদুল্লাহ ছিনতাইয়ের দ্বিতীয় দিন দস্যুদের জাহাজ ছেড়ে যাওয়ার নির্দেশ দেয় অপারেশন আটলান্টার একটি যুদ্ধজাহাজ। নাবিকদের নিরাপত্তার খাতিরে ভিএফএইচের মাধ্যমে যুদ্ধজাহাজটিকে দূরে সরে যাওয়ার অনুরোধ জানায় এমভি আবদুল্লাহ। প্রায় দুইদিন পর জলদস্যুরা জাহাজটিকে সোমালিয়া উপকূলে নিয়ে যায়। সে সময় ভারতীয় নৌবাহিনীর একটি যুদ্ধজাহাজ কাছাকাছি চলে এলে সেটিকেও দূরে সরে যাওয়ার অনুরোধ জানান রশিদ। যুদ্ধজাহাজের কারণে দুই দফা নোঙর তুলে তৃতীয় দফায় উপকূল থেকে দেড় নটিক্যাল মাইল দূরে জেফলের কাছে এমভি আবদুল্লাহকে নিয়ে যায় দস্যুরা। প্রাথমিক পর্যায়ে ১২ জন দস্যু জাহাজে উঠলেও যুদ্ধজাহাজের নজরদারির কারণে পরবর্তীতে অস্ত্র ও লোকবল বাড়ানো হয়। রকেট লঞ্চার, মেশিনগান, এম-সিক্সটিনসহ নানা রকমের ভারী অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে মোট ৩৫ জন দস্যু জাহাজে সার্বক্ষণিক পাহারাদারি শুরু করে।

মুক্তির পর ইইউ নৌবাহিনীর দুইটি জাহাজের পাহারায় নিরাপদ জলসীমায় পৌঁছে এমভি আবদুল্লাহ

ছিনতাইয়ের পর থেকেই জাহাজটি উদ্ধারে তৎপর হয়ে ওঠে মালিকপক্ষ। নিরাপদে নাবিকদের মুক্ত করার লক্ষ্যে জাহাজটির যুক্তরাজ্যভিত্তিক বিমা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যোগাযোগ শুরু করে কেএসআরএম। মালিকপক্ষের পাশাপাশি বাংলাদেশের পররাষ্ট্র ও নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ও এমভি আবদুল্লাহর উদ্ধার অভিযানকে ত্বরান্বিত করতে সক্রিয় ভূমিকা পালন করে। এছাড়া জিম্মি জাহাজটির ওপর সার্বক্ষণিক নজরদারি রাখে বাংলাদেশ নৌবাহিনী। কব্জা করার নয়দিন পর মুক্তিপণ নিয়ে মালিকপক্ষের সঙ্গে আলোচনা শুরু করে দস্যুরা। বিমাকারী প্রতিষ্ঠান আলোচনায় মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা পালন করে।

মুক্তিপণের আলোচনা চলাকালীন সময়ে জিম্মিদের ওপর কোনো ধরনের অত্যাচার চালায়নি দস্যুরা। তবে সামাজিক মাধ্যমে ছবি ও ভিডিও প্রকাশ এবং পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা অব্যাহত রাখায় দস্যুদের বিরাগভাজন হন নাবিকেরা। এদিকে চট্টগ্রাম বন্দর থেকে ২৩ জন নাবিকের জন্য প্রায় তিন মাসের রশদ নিয়ে যাত্রা শুরু করেছিল এমভি আবদুল্লাহ। তবে জিম্মি অবস্থায় জাহাজের লোকবল প্রায় দ্বিগুণ হয়ে যায়। অন্যদিকে সোমালি জলদস্যুতার গতানুগতিক ধরন অনুযায়ী সহজে মুক্তির সম্ভাবনা না থাকায় খাবার ও পানীয় জল নিয়ে সংকটের আশঙ্কা দেখা দেয়। যার ফলে রেশনিং করে খাবার ও পানীয় জল ব্যবহার করতে শুরু করেন নাবিকেরা।

নাবিকদের অবাক করে দিয়ে দ্রুততম সময়ে মুক্তিপণ সংক্রান্ত দরকষাকষি চূড়ান্ত করা হয়। মুক্তিপণ প্রদানের আগে ২৩ জন নাবিকের অবস্থা যাচাই করে দেখে মালিকপক্ষ। নাবিকদের সুস্থতা নিশ্চিত করে ১৩ এপ্রিল সন্ধ্যার আগে ছোট আকারের উড়োজাহাজ থেকে তিনটি ব্যাগে করে জলদস্যুদের মুক্তিপণের অর্থ প্রদান করা হয়। এ সময় জাহাজে মোট ৬৫ জন জলদস্যু অবস্থান করছিল। মুক্তিপণ পাবার পর চারটি স্পিডবোটে করে অল্প কিছু জলদস্যু জাহাজ থেকে নেমে যায় এবং এমভি আবদুল্লাহকে নোঙর তুলে পেছনে সরে যাবার নির্দেশ দেওয়া হয়। রাতে তীর থেকে জাহাজের দিকে আলো ফেলা হলে ইঞ্জিন বন্ধের নির্দেশ আসে। সোমালিয়ার সময় অনুযায়ী ১৪ এপ্রিলের প্রথম প্রহরে পাঁচটি স্পিডবোটে করে সকল দস্যু এমভি আবদুল্লাহ ছেড়ে চলে যায়।

দস্যুদের প্রতিহত করতে রেজার ওয়ার, বৈদ্যুতিক বেড়া, জলকামান, লং রেঞ্জ অ্যাকুইসটিক ডিভাইস ব্যবহার করা হয়

মালিকপক্ষ ও নৌপরিবহন প্রতিমন্ত্রী খালিদ মাহ্মুদ চৌধুরীসহ বাংলাদেশ সরকারের আন্তরিক প্রচেষ্টায় মাত্র ৩৩ দিনের মাথায় ২৩ জন নাবিক বন্দিদশা থেকে মুক্তি লাভ করেন। তবে সমঝোতার শর্ত মেনে কেএসআরএম গ্রুপ বা বিমাকারী প্রতিষ্ঠানের কেউই মুক্তিপণের বিষয়টি স্বীকার করেনি। এদিকে সোমালিয়ার বিভিন্ন সংবাদ মাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, ৫০ লাখ ডলারের বিনিময়ে বন্দিদের ছেড়ে দেয় দস্যুরা। তবে সমঝোতা প্রক্রিয়ায় জড়িত দুই কর্মকর্তার কথায় মুক্তিপণের অংক নিয়ে বিপরীতমুখী চিত্র উঠে এসেছে। একজনের ভাষ্যমতে, এমভি আবদুল্লাহকে ছাড়িয়ে আনতে জাহান মনির চেয়ে কম অর্থ খরচ হয়েছে। এদিকে আরেক কর্মকর্তা জানান, এবার মুক্তিপণ বাবদ অধিক অর্থ ব্যয় করেছে কবির গ্রুপ।

মুক্তির পর ইইউ নৌবাহিনীর দুইটি জাহাজ এমভি আবদুল্লাহকে পাহারা দিয়ে নিরাপদ জলসীমার দিকে নিয়ে যায়। পরদিন ইইউ নৌবাহিনীর চিকিৎসকেরা নাবিকদের স্বাস্থ্য পরীক্ষা করে দেখেন। এদিকে জলদস্যুদের থেকে মুক্তির পর এমভি আবদুল্লাহর নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করা হয়। নিরাপত্তা বৃদ্ধি করতে জাহাজটির চারপাশ কাঁটাতার দিয়ে ঘিরে দেওয়া হয়। পাশাপাশি শত্রুর আক্রমণ ঠেকাতে জাহাজের ডেকে উচ্চচাপে পানি ছিটাতে সক্ষম ফায়ার হোস প্রস্তুত রাখা হয়। এছাড়া ইইউ নৌবাহিনীর একটি যুদ্ধজাহাজ বিপদসংকুল জলসীমানায় এমভি আবদুল্লাহকে পাহারা দিয়ে নিয়ে যায়। পূর্বনির্ধারিত গন্তব্যে এগোতে থাকা জাহাজটি ২২ এপ্রিল আরব আমিরাতের আল-হামারিয়া বন্দরে পৌঁছে। আল-হামারিয়া বন্দরে কয়লা খালাসের পর মিনা সাকার বন্দর থেকে চুনা পাথর বোঝাই করে চট্টগ্রামের উদ্দেশে রওনা করে এমভি আবদুল্লাহ। ক্যাপ্টেনের তথ্যমতে, মে মাসের মাঝামাঝি সময়ে জাহাজটি চট্টগ্রামের কুতুবদিয়ায় পৌঁছবে।

দস্যুতা ও অর্থনীতির মিথস্ক্রিয়া

জলদস্যু হামলায় প্রত্যক্ষভাবে দস্যু ও মালিকপক্ষ জড়িত থাকলেও এর শিকড় অনেক গভীর পর্যন্ত বিস্তৃত। প্রাচীনকাল থেকেই দস্যুতার সাথে একাধিক পক্ষের আর্থিক স্বার্থ জড়িয়ে আছে। ষোড়শ শতকে ইউরোপের সমৃদ্ধির ইতিহাসে প্রধান নিয়ামকের ভূমিকা পালন করে স্পেন, পর্তুগাল, হল্যান্ড ও ফ্রান্স। অর্থনৈতিকভাবে সেসব দেশের সাথে পাল্লা দিতে তখন দস্যুতার প্রশ্রয় দেয় ইংল্যান্ড। পাশাপাশি সমুদ্রে নৌবাণিজ্য সম্প্রসারণের ফলে রানী এলিজাবেথের হাত ধরেই দুর্বল অর্থনীতির দেশ ইংল্যান্ড বাকি সব পরাশক্তিধর দেশকে ছাড়িয়ে যায়।

তৎকালীন বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী অর্থনীতির দেশ ভারত ছিল ইউরোপের কাছে আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দু। সে সময় পৃথিবীর মোট জিডিপির ২৪ শতাংশ আসত ভারতবর্ষ থেকে। ভারতের সঙ্গে স্পেন ও পর্তুগালের ব্যবসায়িক সম্পর্ক তখন বেশ রমরমা। স্পেন ও পর্তুগালের বাণিজ্য বহরে হামলা চালিয়েই বিশ্বজয়ের সূত্রপাত করে ইংল্যান্ড। ব্যবসায়ী থেকে জলদস্যু বনে যাওয়া ফ্রান্সিস ড্রেকের মতো ব্যক্তিরা ইংল্যান্ডের এই জয়রথ এগিয়ে নিয়ে যায়। স্প্যানিশ বাণিজ্য বহরে ইতিহাসের অন্যতম বৃহত্তম দস্যু হামলা পরিচালনা করে বিশ্বের প্রথম জলদস্যু হিসেবে নাইট উপাধি পান ফ্রান্সিস।

ষোড়শ শতক পেরিয়েছে বহু আগেই। সময়ের দীর্ঘ পরিক্রমায় বিশ্বজুড়ে সভ্যতা, সার্বভৌমত্ব ও আন্তর্জাতিক আইনের ব্যাপক পরিবর্তন হয়েছে। এর সঙ্গে পাল্লা দিয়ে ফুলে ফেঁপে উঠেছে জলদস্যু অর্থনীতি। ইন্টারন্যাশনাল মেরিটাইম ব্যুরোর (আএমবি) সমীক্ষা অনুযায়ী, জলদস্যু হামলার কারণে বৈশ্বিক অর্থনীতি প্রতি বছর প্রায় ২৫ বিলিয়ন ডলার ক্ষতির মুখে পড়ে। বর্তমানে কোনো দেশ সরাসরি দস্যুবৃত্তির সঙ্গে না জড়ালেও বিমাকারী প্রতিষ্ঠান, নিরাপত্তা সামগ্রী উৎপাদন ও বিপণনকারী প্রতিষ্ঠান, নিরাপত্তা প্রদানকারী প্রতিষ্ঠান, মধ্যস্থতাকারী এবং জলদস্যুদের ওপর লগ্নিকারী ব্যক্তিসহ আরও অনেক পক্ষই জলদস্যু অর্থনীতির জটিল মিথস্ক্রিয়ায় জড়িয়ে আছে।

জীবনের ঝুঁকি নিয়ে জাহাজ ছিনতাই ও জিম্মিদের বন্দি করে রাখলেও মুক্তিপণের টাকার সবচেয়ে কম অংশ ঢোকে জলদস্যুদের পকেটে। বরং ছিনতাই অভিযান পরিচালনা করতে প্রাথমিক পর্যায়ে দস্যুদের বেশকিছু অর্থ খরচ হয়। অন্যদিকে সবসময় বাণিজ্যিক জাহাজ জিম্মি করাও সম্ভব হয় না। এর ফলে প্রতিটি দস্যু অভিযান যে সফল হবে তার কোনো নিশ্চয়তা নেই। অভিযান পরিচালনার অর্থ জোগানের জন্য দস্যুরা তাই সোমালিয়ার জনগণের দ্বারস্থ হয়। ‘জলদস্যু শেয়ারবাজারে’ আসন্ন অভিযানের শেয়ার বিক্রির মাধ্যমে তহবিল জোগাড় করা হয়।

সোমালিয়ার উপকূলীয় শহর হায়ারধিয়ারে গড়ে ওঠা পাইরেট স্টক এক্সচেঞ্জে শুরুতে ১৫টি ভিন্ন ভিন্ন কোম্পানি কার্যক্রম পরিচালনা করত। বিভিন্ন প্রতিবেদন অনুযায়ী, বর্তমানে ৭২টির বেশি জলদস্যু গ্রুপ বিনিয়োগকারীদের কাছে শেয়ার বিক্রি করে। অদ্ভুত এই শেয়ারে বাজারে টাকার পাশাপাশি একে-৪৭ রাইফেল এবং রকেটচালিত গ্রেনেডের মাধ্যমেও শেয়ার ক্রয় করা যায়। কোনো জলদস্যু অভিযান সফল হলে মুক্তিপণের একটা বিশাল অংশ এর বিনিয়োগকারীদের পকেটে যায়।

প্রতিটি সফল অভিযানে মুক্তিপণ বাবদ লাখ লাখ ডলার আদায় করে জলদস্যুরা। বর্তমানে মুক্তিপণ হিসেবে ৫০ বা ১০০ ডলারের নোট গ্রহণ করে দস্যুরা। নোট আসল না নকল সেটা নিশ্চিত হওয়ার পরই জিম্মিসমেত জাহাজকে মুক্ত করা হয়। সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন পক্ষের মধ্যে ধাপে ধাপে মুক্তিপণের অর্থ বণ্টন করা হয়। বিনিয়োগকারীরা সর্বপ্রথম মুক্তিপণের ভাগ পেয়ে থাকে। মুক্তিপণের ৩০ শতাংশ যায় মূল বিনিয়োগকারীদের কাছে। বাকি বিনিয়োগকারীরা শেয়ার অনুযায়ী মুক্তিপণের ভাগ পায়। এছাড়াও যেই এলাকায় জাহাজটি নোঙর করা হয়, সেখানকার স্থানীয় সম্প্রদায়কে মুক্তিপণের একটা অংশ দেওয়া হয়। ‘অ্যাংকরিং রাইট’ অনুযায়ী এই অর্থ পায় তারা। পরবর্তীতে বাকি অর্থ জলদস্যুদের ভেতর ভাগ করা হয়।

জলদস্যুরা সাধারণত দুটি দলে ভাগ হয়ে যেকোনো অভিযান পরিচালনা করে। একদল সাগরে বাণিজ্যিক জাহাজ খুঁজে বের করে সেটা দখল করে এবং নিরাপদে উপকূলে নিয়ে আসে। অপর দল মুক্তিপণ পাওয়ার আগ পর্যন্ত জাহাজ ও জিম্মিদের পাহারা দিয়ে রাখে। জাহাজ ছিনতাইয়ের জন্য ডিঙি নৌকা করে সাগরে অভিযান পরিচালনাকারী এবং গুলি ছুড়ে জাহাজ জিম্মি করা দস্যুরা সাধারণত অভিযানপ্রতি ৩০ থেকে ৭৫ হাজার ডলার পায়। বন্দুক ও মই নিয়ে জাহাজ দখল করলে পাওয়া যায় আরও ১০ হাজার ডলার। অন্যদিকে পাহারাদার দস্যুরা জনপ্রতি ১৫ হাজার ডলার পায়। দস্যুদের দ্বিতীয় দল নোঙর করা অবস্থায় জাহাজ ও জিম্মিদের যাবতীয় খরচ বহন করায় মুক্তিপণ পাওয়ার পর সুদসমেত সেই অর্থ তাদের ফেরত দেওয়া হয়।

অন্যদিকে জলদস্যুদের চেয়ে প্রায় ১০ গুণ বেশি অর্থ বাগিয়ে নেয় বিমা কোম্পানিগুলো। কোনো জাহাজ ছিনতাই হলে সেই জাহাজের বিমাকারী প্রতিষ্ঠান মধ্যস্থতাকারীর মাধ্যমে দ্রুত দস্যুদের সঙ্গে যোগাযোগ চালায়। দরকষাকষি চূড়ান্ত হলে মুক্তিপণের অর্থ পৌঁছানোর জন্য বেসরকারি নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে চুক্তি করে মালিকপক্ষ। অর্থ পৌঁছে দেওয়ার জন্য নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠানগুলো প্রায় এক লাখ ডলার নিয়ে থাকে। কোনো কারণে মধ্যস্থতাকারী চুক্তির শর্ত ভঙ্গ করলে মালিকপক্ষকে আইনজীবীর দ্বারস্থ হতে হয়। এমন অবস্থায় আইনজীবীর ফি বাবদ আরও প্রায় তিন লাখ ডলার ব্যয় করতে হয়। লিস্টভার্সের হিসাব অনুযায়ী, ২০১০ সালে সোমালিয়ার জলদস্যুরা ১৪ কোটি ৮০ লাখ ডলার মুক্তিপণ আদায় করে। অথচ একই বছর জাহাজ ছিনতাইয়ের ঝুঁকি এড়াতে বিমাকারী প্রতিষ্ঠানগুলোকে ১৮৫ কোটি ডলার প্রদান করে বৈশ্বিক শিপিং কোম্পানিগুলো। বিমার পাশাপাশি নিরাপত্তা সরঞ্জাম কিনতে জাহাজ পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর আরও ১৪০ কোটি ডলার খরচ হয়।

জলদস্যু দমনে আন্তর্জাতিক পদক্ষেপ

বিস্তীর্ণ সাগরে যেকোনো নৌযানকে শতভাগ নিরাপত্তা প্রদান করা প্রায় অসম্ভব। তা সত্তে¡ও আন্তর্জাতিক ও আঞ্চলিক পর্যায়ে জলদস্যু দমনে বেশকিছু পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়েছে। সময়ের সাথে সাথে প্রয়োজন অনুযায়ী সেসব উদ্যোগ হালনাগাদ করা হয়।

১৯২৭ সালে আন্তর্জাতিক আদালতের লোটাস মামলায় জলদস্যুদের ‘হোস্টিস হিউম্যানি জেনারিস’ বা সমগ্র মানব জাতির শত্রু হিসেবে সংজ্ঞায়িত করা হয়। জলদস্যুরা ফ্ল্যাগ স্টেটের সুরক্ষা থেকে বঞ্চিত হয়। এছাড়া হাই সিতে জলদস্যুতার ওপর সর্বজনীন এখতিয়ার আছে। এর ফলে সকল দেশেরই হাই সিতে দস্যু জাহাজ আটক ও জাতীয় আদালতে মামলা করার অধিকার রয়েছে। ১৯৮২ সালের জাতিসংঘের সমুদ্র বিষয়ক সনদ ‘ইউনাইটেড নেশনস কনভেনশন অন দ্য ল অব দ্য সি’ বা আনক্লস সমুদ্র আইনের সংবিধান হিসেবে পরিগণিত হয়। আনক্লসের ১০০ থেকে ১১০ ধারায় জলদস্যুতা বিষয়ক আইনগুলোকে তালিকাভুক্ত করা হয়েছে। এখন পর্যন্ত বিশ্বের ১৬৮টি দেশ আনক্লসের পক্ষভুক্ত রাষ্ট্র। ১৯৯৪ সালে আনক্লস কার্যকর হওয়ার পর সমুদ্রে আইন প্রয়োগ সহজ হয়েছে।

১৯৯০-এর দশকে আরব সাগর ও ভারত মহাসাগরে দস্যুদের দৌরাত্ম্য বেড়ে যাওয়ায় সোমালি জলদস্যুদের প্রতিহত করতে সাতটি রেজ্যুলেশন পাস করে জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদ। রেজ্যুলেশনে সোমালিয়ার জলসীমায় বিদেশি বিমান ও নৌবাহিনীকে প্রবেশ ও টহলের অনুমতি দেওয়া হয়। সেসঙ্গে ইউএস নেতৃত্বাধীন টাস্কফোর্স ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের নৌ-অপারেশন আটলান্টাকে অনুমোদন দেওয়া হয়। হর্ন অব আফ্রিকা উপকূল থেকে ভারত উপকূল পর্যন্ত বিস্তৃত উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ অঞ্চলে বর্তমানে প্রায় ২৫টি দেশের নৌবাহিনী উপস্থিত রয়েছে। যার ভেতর ভারতীয় নৌবাহিনী ও কোস্ট গার্ডের সক্রিয় উপস্থিতি উল্লেখযোগ্য। তবে গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক অঞ্চলটিতে নিরাপদ নৌ-চলাচলের জন্য এই নজরদারি অপ্রতুল।

সাম্প্রতিক সময়ে দস্যুর উৎপাত নতুন করে বেড়ে যাওয়ায় নজরদারি আরও জোরদার করছে ভারত। চলতি বছর ১ ফেব্রুয়ারি ভারতের কাছে প্রায় ৪০০ কোটি ডলারের ড্রোন ও সামরিক সরঞ্জাম বিক্রির অনুমোদন প্রদান করেছে বাইডেন প্রশাসন। মার্কিন যন্ত্রপাতিগুলো কাজে লাগিয়ে সামুদ্রিক সুরক্ষা ও নজরদারি বৃদ্ধি করবে ভারত। রাষ্ট্রের পাশাপাশি মেরিটাইম খাতের সাথে যুক্ত আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানগুলোও সম্প্রতি নিরাপত্তা সরঞ্জাম ক্রয়ে আগ্রহী হয়ে উঠেছে। রিসার্চঅ্যান্ডমার্কেট.কমের তথ্যমতে, ২০২৩ সালে মেরিটাইম সেফটি মার্কেট ১ হাজার ৯৮৫ কোটি ডলার হলেও ২০২৪ সালে সেটা ২ হাজার ১১৮ কোটি ডলারে পরিণত হবে। ৫ দশমিক ২ শতাংশ চক্রবৃদ্ধি হারে বৃদ্ধি পাওয়ায় ২০২৮ সালে সামুদ্রিক নিরাপত্তা সরঞ্জামের বাজার আড়াই হাজার কোটি ডলার ছাড়িয়ে যাবে।

জাহাজ মালিক ও শিপিং কোম্পানির করণীয়

মাঝসাগরে জলদস্যু হামলা মোকাবিলা করার চেয়ে জাহাজকে দস্যু-প্রতিরোধী করে তোলা অনেক বেশি কার্যকর। পরিবাহিত পণ্য ও নাবিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে শিপিং কোম্পানিগুলো বর্তমানে নানা পদক্ষেপ গ্রহণ করছে। আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী, বাণিজ্যিক নৌযান এবং এর নাবিকেরা আত্মরক্ষার জন্য অস্ত্র বহন করতে পারে। সেক্ষেত্রে ক্রুদের অস্ত্র চালনার প্রশিক্ষণ প্রদান করতে হয় না হয় সশস্ত্র প্রহরী নিয়োগ করতে হয়। আইএমওর নির্দেশনা অনুযায়ী, জাহাজে সশস্ত্র নিরাপত্তা ব্যবস্থা মোতায়েনের আগে জাহাজ মালিককে অবশ্যই ফ্ল্যাগ স্টেটের সঙ্গে আলোচনা করতে হয়। জাহাজ মালিক ফ্ল্যাগ স্টেটের সকল আঞ্চলিক আইন-কানুন মেনে চলতে বাধ্য থাকায় এক্ষেত্রে রাষ্ট্রের সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত।

অন্যদিকে পৃথিবীর অনেক দেশ নিজস্ব জলসীমায় সশস্ত্র পাহারা বা অস্ত্র বহনের অনুমতি প্রদান করে না। কোনো দেশের জলসীমায় প্রবেশ করতে হলে বিমা কোম্পানিগুলোকে অবশ্যই সেই দেশের আইন মেনে চলতে হয়। এক্ষেত্রে উদাহরণস্বরূপ বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্য পথ সুয়েজ খালের কথা বলা যায়। ২০১১ সালে সুয়েজ খাল অতিক্রমকারী জাহাজে সশস্ত্র প্রহরী, অস্ত্র ও গোলাবারুদ বহনের ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করে মিশরের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়। বিমা সংক্রান্ত বাধ্যবাধকতার কারণে শিপিং কোম্পানিগুলো জাহাজে প্রতিরক্ষার জন্য অস্ত্র বহনের অনুমতি প্রদান করে না। এমন অবস্থায় উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ অঞ্চল পেরুতে প্রাইভেট আর্মড সিকিউরিটি প্রফেশনালস (পিসিএএসপি) বা ভেসেল প্রটেকশন ডিটাচমেন্ট (ভিপিডি) গার্ডের সহায়তা গ্রহণ করে বাণিজ্যিক জাহাজগুলো। জলদস্যু হামলা থেকে জাহাজকে সুরক্ষা প্রদানের জন্য সাধারণত ৫ থেকে ১০ জন প্রহরী মোতায়েন করা হয়।

সশস্ত্র প্রহরী ছাড়াও আত্মরক্ষার জন্য বহুমুখী প্রতিরক্ষামূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করে জাহাজ মালিক ও শিপিং কোম্পানিগুলো। অত্যাধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে আগে থেকেই জলদস্যুপ্রবণ এলাকা শনাক্ত করা যায়। নজরদারির জন্য রাডারের পাশাপাশি আনম্যানড এরিয়াল ভেহিকলস (ইউভিএ) ব্যবহার করা হয়। বর্তমানে কৃত্রিম বৃদ্ধিমত্তা (এআই) জাহাজের নিরাপত্তা বৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। মেরিটাইম ডেটা বিশ্লেষণ করে জলদস্যুদের কার্যক্রম এবং কাজের ধরন সম্পর্কে ধারণা দেয় এআই। তবে অত্যাধুনিক প্রযুক্তি নিরাপত্তা জোরদারের পাশাপাশি জাহাজকে সাইবার হামলার ঝুঁকির মুখেও ফেলে। নেভাল ডোম ও সাইডোমের মতো কোম্পানিগুলো মেরিটাইম সাইবার সিকিউরিটি সলিউশন প্রদান করে জাহাজের যোগাযোগ ব্যবস্থাকে নিরাপদ রাখে।

জাহাজে দস্যুদের প্রবেশ ঠেকাতে বেশকিছু পদ্ধতি অবলম্বন করা হয়। এর ভেতর জাহাজের চারপাশে রেজার ওয়ার, বৈদ্যুতিক বেড়া, জলকামান প্রতিস্থাপন অন্যতম। ছোট ছোট ডিঙি থেকে মই বেয়ে দস্যুদের জাহাজে ওঠা ঠেকাতে ডেকের চারপাশে ধারালো কাঁটাতারের বেড়া দেওয়া থাকে। অনেক সময় রেজার ওয়ারের পরিবর্তে বৈদ্যুতিক তারের বেড়া দেওয়া হয়। এসব বেড়া একাধিক অংশে ভাগ করা যায় বলে জাহাজ বন্দরে ভেড়ার সময় বা পাইলট জাহাজে ওঠার সময় কোনো ধরনের অসুবিধা হয় না। বৈদ্যুতিক বেড়ার তার দিয়ে ৯ হাজার ভল্ট বিদ্যুৎ প্রবাহিত হয়। যা কাউকে প্রাণে না মারলেও মারাত্মকভাবে আহত করতে সক্ষম। এছাড়া বৈদ্যুতিক বেড়ায় অ্যালার্ম সিস্টেম সংযুক্ত থাকায় কেউ অবৈধভাবে জাহাজে আরোহণের চেষ্টা করলেই তৎক্ষণাৎ সাইরেন বেজে ওঠে এবং ফ্লাডলাইট জ¦লে। এর পাশাপাশি জাহাজ থেকে পি-ট্র্যাপ ও নেট নামিয়েও দস্যুদের অনুপ্রবেশ ঠেকানো হয়।

জলদস্যু হামলা ঠেকানোর আরেকটি কার্যকর পন্থা হলো জলকামানের ব্যবহার। ফোর্স ৫০ জলকামান ১৭৫ পিএসআই প্রেশারে প্রতি মিনিটে ২ হাজার লিটার জল ছুড়তে সক্ষম। ফোর্স ৫০ জলকামানের কার্যপরিধি ২১৩ ফুট পর্যন্ত বিস্তৃত। অন্যদিকে ইউনিফায়ার ফোর্স ৮০ প্রতি মিনিটে ১৪৫ পিএসআই প্রেশারে ৫ হাজার লিটার পানি ছুড়তে পারে। অত্যাধুনিক এই জলকামান ২৭৯ ফুট দূরের লক্ষ্য ভেদ করতে সক্ষম। জলকামানের তীব্র জলের ধারা জলদস্যুদের ডিঙিকে টালমাটাল করে তোলে, এমনকি জলের তোড়ে অনেক সময় দস্যুদের নৌকাও উল্টে যায়।

এছাড়া দস্যুদের প্রতিহত করতে অনেক শিপিং কোম্পানিই লং রেঞ্জ অ্যাকুইসটিক ডিভাইস (এলআরএডি) ব্যবহার করে। এলআরএডি হাই-ডেসিবল শব্দ উৎপন্ন করে যা মানুষের পক্ষে সহ্য করা কঠিন। জাহাজের ক্রুদের কোনো ধরনের ক্ষতি না করে প্রায় দশ হাজার ফুট দূরের অভীষ্ট লক্ষ্য বরাবর সাউন্ড বিম পাঠাতে পারে এলআরএডি। অন্যদিকে সামরিক নৌযানগুলো শত্রু মোকাবিলায় লেজার ওয়েপন সিস্টেম (এলএডব্লিউ) ব্যবহার করে। এলএডব্লিউ শক্তিশালী লেজার ব্যবহার করে ছোটখাটো নৌকা ও ড্রোন ধ্বংস করতে পারে। বর্তমানে বাণিজ্যিক নৌযানে এলএডব্লিউ ব্যবহারের আলোচনা চলছে। এতসব প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ভেস্তে গেলে জিম্মিদশা এড়াতে জাহাজের নাবিকেরা শেষ পর্যন্ত জাহাজের সুরক্ষা কক্ষ বা সিটাডেলে আশ্রয় নেয়। সাহায্যকারী জাহাজ আসার আগ পর্যন্ত নাবিকদের সুরক্ষিত রাখতে সিটাডেলে যোগাযোগ ব্যবস্থা, পর্যাপ্ত খাবার, পানি ও বিশুদ্ধ বাতাস মজুদ করা থাকে।

উপসংহার জাহাজ মালিক ও শিপিং কোম্পানির সাথে পাল্লা দিয়ে দস্যুরাও নিজেদেরকে প্রযুক্তিগতভাবে অত্যাধুনিক করে তুলছে। আন্তর্জাতিক ও আঞ্চলিক নজরদারি এড়িয়ে তারা তাদের কার্যক্রম অব্যাহত রেখেছে। এমন অবস্থায় স্যাটেলাইটের সাহায্যে জাহাজ, অত্র অঞ্চলে উপস্থিত নৌবাহিনী ও আঞ্চলিক সংস্থাগুলোর মধ্যে যোগাযোগ ও পারস্পরিক সহযোগিতা বৃদ্ধি করা একান্ত জরুরি। সমুদ্রপথে পণ্য পরিবহন নিরাপদ করতে একাধিক পক্ষ মিলিতভাবে কাজ করলে জলদস্যুতা অঙ্কুরেই বিনষ্ট হবে। এছাড়া স্বয়ংক্রিয় জাহাজের প্রচলন ও ব্যাপক ব্যবহার জলদস্যু হামলা কমিয়ে আনতে সাহায্য করবে। জিম্মি করার মতো নাবিক না পেলে দস্যুরা ধীরে ধীরে জাহাজ ছিনতাইয়ের আগ্রহ হারাবে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here