সেলেস্টিয়াল নেভিগেশন বা জ্যোতির্বিজ্ঞানকে কাজে লাগিয়ে নিখুঁতভাবে সময় প্রদর্শনকারী যন্ত্রকে বলা হয় মেরিন ক্রনোমিটার।
১৭৫০ সাল পর্যন্ত ঠিক দুপুরে সূর্যের বা রাতে শুকতারার কৌণিক অবস্থান দেখে ল্যাটিচিউড মাপতেন নাবিকেরা। কিন্তু লংগিচিউড মাপতে কখনো চাঁদ, কখনো কক্ষপথে বৃহস্পতির চলনের সাথে তুলনা করে সময় বের করা হতো, যা চলন্ত জাহাজে বা মেঘলা আকাশ থাকলে বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই সঠিক হতো না।
১৫৩০ সালে প্রথমবার গোলক ত্রিকোণমিতির সাহায্যে ডাচ বিজ্ঞানী জেমা ফ্রিসিয়াস লংগিচিউড মাপার পদ্ধতি আবিষ্কার করেন। গ্রিনউইচ মিন টাইমকে (জিএমটি) শূন্য ডিগ্রি ধরে তাঁর নির্মিত ক্রনোমিটারে প্রদর্শিত সময়ের সাথে জাহাজের বর্তমান সময়ের পার্থক্য বের করা যেত। কিন্তু পৃথিবীর ঘূর্ণনের ফলে সেটিও প্রতিবার সঠিক সময় দেখাতে ব্যর্থ হয়। ১৭১৪ সালে ব্রিটেনে পাস হয় লংগিচিউড আইন, জাহাজে সঠিক সময় প্রদর্শন ও এর মাধ্যমে কার্যকরভাবে লংগিচিউড নির্ণয়ের পদ্ধতি আবিষ্কারককে সরকারিভাবে ২০ হাজার পাউন্ড পুরস্কার প্রদানের ঘোষণা দেয় ব্রিটিশ সরকার। প্রতিযোগিতায় সবার চেয়ে এগিয়ে ছিলেন ইংরেজ কাঠমিস্ত্রি এবং শখের ঘড়িনির্মাতা জন হ্যারিসন, কিন্তু দুই দশক পর বোঝা যায় তাঁর নির্মিত প্রথম তিনটি ক্রনোমিটার মডেলেও কিছুটা ত্রুটি থেকে গেছে। ১৭৬১ সালে পরিচালিত ট্রান্স-আটলান্টিক নৌযাত্রায় ব্যবহার হয় জন হ্যারিসনের চতুর্থ ক্রনোমিটার মডেল। এইচফোর নামের আকারে তুলনামূলক ছোট এই ক্রনোমিটারের ফলাফল ছিল বিস্ময়কর রকমের নির্ভুল। জ্যামাইকায় পৌঁছানোর পর দেখা গেল স্থানীয় সময়ের সাথে জাহাজের ক্রনোমিটারে প্রদর্শিত সময়ের পার্থক্য কেবল পাঁচ সেকেন্ড! পরবর্তীতে ক্রনোমিটারের পঞ্চম সংস্করণ এইচফাইভের জন্য রাজা তৃতীয় জর্জের কাছ থেকে প্রাপ্য পুরস্কার বুঝে নেন হ্যারিসন। আধুনিক জিপিএস এসে মেরিন ক্রনোমিটারের প্রয়োজনীয়তা কমিয়ে দিলেও নেভাল সার্ভিস সার্টিফিকেট পেতে হলে নাবিকদের এখনো ক্রনোমিটারের ব্যবহার শিখতে হয়। বর্তমানের বহু মূল্য সুইস ঘড়িনির্মাতারা নিরবচ্ছিন্নভাবে একেবারে সঠিক সময় পেতে ক্রনোমিটারের প্রযুক্তি অনুসরণ করে ঘড়ি নির্মাণ করছেন।