ভারত ও মিয়ানমারের সঙ্গে দীর্ঘদিনের বিরোধপূর্ণ সমুদ্রসীমা আন্তর্জাতিক আদালতের রায়ে নির্ধারিত হওয়ায় বাংলাদেশ ১ লাখ ১৮ হাজার ৮১৩ বর্গকিলোমিটার সমুদ্র অঞ্চল, ২০০ নটিক্যাল মাইলের একচ্ছত্র অর্থনৈতিক অঞ্চল এবং চট্টগ্রাম উপকূল থেকে ৩৫৪ নটিক্যাল মাইল পর্যন্ত মহীসোপানে অবস্থিত সব ধরনের প্রাণিজ ও অপ্রাণিজ সম্পদের ওপর সার্বভৌমত্ব প্রতিষ্ঠার অধিকার পেয়েছে। দেশের বিস্তৃত সমুদ্র অঞ্চলে সামুদ্রিক সম্পদ আহরণের সুযোগ তৈরি হয়েছে। অর্থনৈতিক কর্মকা-ের বড় একটি অংশ বৈদেশিক বাণিজ্যের প্রায় পুরোটাই হয়ে থাকে এই সমুদ্রাঞ্চলের মাধ্যমে। একেবারে নগণ্য পরিমাণে প্রতিবেশী দেশগুলোর সাথে বৈদেশিক বাণিজ্য হয়ে থাকে স্থলবন্দরগুলোর মাধ্যমে। সমুদ্র উপকূল থেকে ২০০ নটিক্যাল মাইল অর্থনৈতিক অঞ্চলে দেশের অধিকার প্রতিষ্ঠিত হওয়ায় এ এলাকায় চলাচলকৃত আন্তর্জাতিক রুটের জাহাজগুলোর ওপর নজরদারির সুযোগ তৈরি হয়েছে। দেশের অর্থনৈতিক কর্মকা-ের পরিধি বৃদ্ধির সাথে সাথে ক্রমবর্ধমান আমদানি-রপ্তানি বৃদ্ধি পাওয়ায় বেড়েছে জাহাজ আগমনের সংখ্যা। দেশের প্রধান সমুদ্রবন্দর চট্টগ্রাম বন্দর ক্রমবর্ধমান চাহিদাকে মাথায় রেখে বহির্নোঙরের কলেবরও বৃদ্ধি করেছে। এক দশকে বহির্নোঙরের বিস্তৃতি সাড়ে ৬ গুণ বৃদ্ধি করে ৫০ নটিক্যাল মাইল করা হয়েছে। মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দরসহ দেশের নির্মাণাধীন অর্থনৈতিক অঞ্চলগুলোর ভবিষ্যৎ চাহিদা মাথায় রেখে বাড়ানো হয়েছে বহির্নোঙর এলাকা।
চট্টগ্রাম বন্দর জোয়ার-ভাটানির্ভর কর্ণফুলী নদীর পাড়ে গড়ে ওঠায় বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে আসা পণ্যবাহী বড় আকারের জাহাজ কর্ণফুলী চ্যানেলে প্রবেশ করতে পারে না। সর্বোচ্চ সাড়ে ৯ মিটার ড্রাফট ও ১৯০ মিটার দৈর্ঘ্যরে আন্তর্জাতিক রুটের অপেক্ষাকৃত ছোট জাহাজগুলোকে চলাচল করতে হয় এই চ্যানেলে। ফলে বড় জাহাজগুলোকে বন্দরের বহির্নোঙরে লাইটার জাহাজে পণ্য খালাস করতে হয়। বহির্নোঙরে কনটেইনার হ্যান্ডলিং না হলেও খোলা পণ্যের সিংহভাগ খালাস হয়। চট্টগ্রাম কাস্টমসের নির্দেশনা, নিয়ন্ত্রণ ও নজরদারিতে এসব পণ্য খালাস করে বন্দর নিয়োজিত শিপ হ্যান্ডলিং অপারেটর।
কেন শিপ হ্যান্ডলিং অপারেটর
শিপ হ্যান্ডলিং অপারেটর কেন জানতে হলে প্রথমেই জানতে হবে লাইটারিং বা নৌযান থেকে নৌযানে পণ্য স্থানান্তর কী। লাইটারিং হলো বিভিন্ন আকারের নৌযানের মধ্যকার পণ্য স্থানান্তর প্রক্রিয়া। এটি হতে পারে বড় নৌযান থেকে ছোট নৌযানে কিংবা ছোট নৌযান থেকে বড় নৌযানে পণ্য স্থানান্তর। লাইটারিংয়ের ধারণাটি প্রায় ২০০ বছরের পুরোনো। বাষ্পীয় ইঞ্জিনেচালিত বড় আকারের নৌযান যখন এক দেশ থেকে অন্য দেশে পণ্য আনা-নেওয়া করত, তখন অপেক্ষাকৃত ছোট বন্দরে প্রবেশ করতে পারত না। ফলে ছোট ছোট নৌযানে করে পণ্য খালাস করে বন্দরে নেওয়া হতো। বিশেষ করে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য, জীবজন্তু এ পদ্ধতিতে খালাস করা হতো। এছাড়া বন্দর থেকে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে পণ্য পরিবহন করতেও লাইটারিংয়ের প্রয়োজন হয়। লাইটারিংয়ের কাজটি করার জন্যই শিপ হ্যান্ডলিং অপারেটর। নিজস্ব শ্রমিক ও যন্ত্রপাতি দ্বারা পণ্য লাইটারিংয়ের কাজ করে শিপ হ্যান্ডলিং অপারেটর। চট্টগ্রাম বন্দরের বহির্নোঙরে নিবন্ধিত শিপ হ্যান্ডলিং অপারেটরা কাজ করছে।
বহির্নোঙরে শিপ হ্যান্ডলিং অপারেটর
চট্টগ্রাম বন্দরের বিশাল কর্মযজ্ঞের সাথে জড়িয়ে আছে অনেকগুলো প্রতিষ্ঠান। যাদের নিরলস পরিশ্রম অর্থনীতিকে প্রতিনিয়ত এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। বন্দরের জেটিতে বার্থ ও টার্মিনাল অপারেটরেরা কনটেইনারজাত পণ্য হ্যান্ডলিংয়ের কাজ করছে, তেমনি বহির্নোঙরে পণ্য হ্যান্ডলিংয়ের পুরোটাই করছে শিপ হ্যান্ডলিং অপারেটরা। বহির্নোঙরে পণ্য খালাসের জন্য চট্টগ্রাম বন্দরের নিয়োজিত ৩০টি শিপ হ্যান্ডলিং অপারেটর কাজ করছে। এরা পাঁচ বছর মেয়াদের জন্য বন্দর কর্তৃক নিয়োগপ্রাপ্ত হয়ে থাকে।
মাদার ভেসেল থেকে পণ্য লাইটারিংয়ের সর্বশেষ তথ্য বার্থিং মিটিংয়ে উপস্থাপন করতে হয় সংশ্লিষ্ট শিপিং এজেন্ট ও শিপ হ্যান্ডলিং অপারেটরকে। কাস্টমস ও বন্দরের ডিটিএম (অপারেশন) এবং মেরিন বিভাগ পুরো প্রক্রিয়াটি সমন্বয় করে। ডিটিএম (অপারেশন) এর দপ্তর থেকে লাইটারিংয়ে প্রাপ্য রাজস্ব প্রাপ্তির বিষয়টিও নিশ্চিত করা হয়।
কীভাবে পণ্য হ্যান্ডলিং করা হয়
বন্দরের জেটির মতো শীত, গ্রীষ্ম কিংবা বর্ষায় ২৪ ঘণ্টা হ্যান্ডলিং কার্যক্রম চলে বহির্নোঙরে। বর্ষাকালের বৈরী আবহাওয়ায় সাগর যখন উত্তাল থাকে, তখন সাময়িক বন্ধ থাকে পণ্য খালাসের কাজ। বন্দরের জেটিতে জাহাজ ভিড়িয়ে পণ্য খালাস করতে যেমন নির্দিষ্ট প্রক্রিয়া অনুসরণ করতে হয়, তেমনি বহির্নোঙরে পণ্য খালাস করতেও অনুসরণ করতে হয় নির্দিষ্ট প্রক্রিয়া। শুল্ক দিয়ে কাস্টমস ও বন্দরের নিয়মনীতি অনুযায়ী পণ্য খালাস করতে হয়। বহির্নোঙরে মূলত আমদানীকৃত খোলা পণ্য খালাস হয়ে থাকে। রপ্তানি পণ্য হ্যান্ডলিংয়ের পরিমাণ একেবারে নগণ্য। শিপিং এজেন্ট আমদানিকারকের পক্ষে জাহাজে করে পণ্য আমদানির ঘোষণা দেন। এরপর শিপিং এজেন্টের মনোনীত শিপ হ্যান্ডলিং অপারেটর পণ্য খালাসের প্রক্রিয়া শুরু করে। আমদানিকারক শিপ হ্যান্ডলিং অপারেটরকে লাইটার জাহাজ সরবরাহ করে। এজন্য আমদানিকারককে লাইটার জাহাজ নিয়ন্ত্রক সংস্থা ওয়াটার ট্রান্সপোর্ট সেলের মাধ্যমে লাইটার বরাদ্দ নিতে হয়। বহির্নোঙরে অবস্থান করা মাদার ভেসেলে পৌঁছে শিপ হ্যান্ডলিং অপারেটরের সুপারভাইজার পণ্যবাহী জাহাজের সুপারভাইজার ও ক্যাপ্টেনের সাথে যোগাযোগ করে খালাস প্রক্রিয়া শুরু করেন। আমদানিকারক ও জাহাজের সার্ভেয়ার পণ্যের জরিপকাজ শেষ করার পর শুরু হয় খালাসের কাজ। সাধারণত দুটি পদ্ধতিতে পণ্য খালাস হয়। এর মধ্যে একটি হলো কাস্টমস আউটপাস বিল অব এন্ট্রির বিপরীতে বন্দরের রিভার ডিউস পরিশোধ করে সরাসরি লাইটার জাহাজে খালাস করা। আর অন্যটি হলো কাস্টমস গ্যারান্টির বিপরীতে ‘গ্রিনবোট নোট’-এর মাধ্যমে সুনির্দিষ্ট লাইটারে পিও অনবোর্ডের তত্ত্বাবধানে জাহাজ থেকে পণ্য খালাস এবং পরবর্তীতে কাস্টমস আউটপাসের বিপরীতে ‘ব্লু বোট নোট’-এর মাধ্যমে পণ্য খালাস।

লাইটার জাহাজ নিয়ন্ত্রক সংস্থা ওয়াটার ট্রান্সপোর্ট সেলের মাধ্যমে লাইটার বরাদ্দ নিতে হয়
যেভাবে কাজ করেন শ্রমিকেরা
কাস্টমসের শুল্কায়নের আনুষ্ঠানিকতা, আমদানিকারক ও জাহাজের সার্ভেয়ারের পণ্য জরিপের পর শুরু হয় খালাস। পণ্য খালাসের শুরুতেই শ্রমিকদের গ্যাং নির্ধারণ করা হয়। গ্যাং বলতে পণ্যবাহী জাহাজের কোন ক্রেনে কত জন শ্রমিক কাজ করবে তা নির্ধারণকে বোঝায়। পণ্য ও জাহাজের আকার অনুযায়ী ৫, ৯, ১১ ১৮ জনের গ্যাং হয়ে থাকে। কাজের সুবিধার্থে গ্যাং নির্ধারণ করা হয়ে আসছে শুরু থেকেই। শ্রমিকদের কাজ তদারকিতে জাহাজের প্রতিটি হ্যাজে একজন করে ফোরম্যান থাকেন। আর পুরো খালাস কার্যক্রমটি তদারকি করেন একজন সুপারভাইজার, কাজের প্রতিবেদন তৈরিতে কাজ করেন একজন রিপোর্টারও। কার্গো পণ্যের ক্ষেত্রে শ্রমিক, ফোরম্যান ও সুপারভাইজারের পাশাপাশি কাজ করেন ট্যালি ক্লার্ক। বড় জাহাজ থেকে ছোট জাহাজে কী পরিমাণ পণ্য খালাস হচ্ছে, সেটির হিসাব রাখাই ট্যালি ক্লার্কের কাজ।
পণ্য খালাসে শিপ হ্যান্ডলিং অপারেটরদের জাহাজের যন্ত্রপাতি ব্যবহারের পাশাপাশি নিজস্ব যন্ত্রপাতির প্রয়োজন হয়। এসবের মধ্যে রয়েছে গ্রেভ, এক্সক্যাভেটর, পে-লোডারসহ অন্যান্য যন্ত্রপাতি। শিপ হ্যান্ডলিং অপারেটরদের অপারেটররাই এসব যন্ত্রপাতি পরিচালনা করেন। আর জাহাজের ক্রেন পরিচালনায় কাজ করেন উইন্সম্যান।
শ্রমিক সুরক্ষা
বহির্নোঙরে জাহাজ থেকে জাহাজে পণ্য হ্যান্ডলিং সাধারণ জেটিতে পণ্য হ্যান্ডলিংয়ের মতো সহজ বিষয় নয়। পাশাপাশি দুটি জাহাজের পণ্য হস্তান্তরে প্রতিনিয়ত সতর্ক থাকতে হয় নিয়োজিত সুপারভাইজার, রিপোর্টার, ফোরম্যান ও শ্রমিকদের। এতে প্রথমেই যে বিষয়টি সামনে আসে, সেটি হলো শ্রমিকদের সুরক্ষা। শ্রমিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিতে নির্দেশনা রয়েছে সুরক্ষা উপকরণ ব্যবহারের। এর মধ্যে রয়েছে মাস্ক, হ্যান্ড গ্লাভস, হেলমেটসহ অন্যান্য নিরাপত্তা উপকরণ।
যেসব পণ্য হ্যান্ডলিং হয়
অর্থনীতি ও দেশের চলমান উন্নয়ন কর্মকা-ের সাথে তাল মিলিয়ে গত কয়েক বছরে চট্টগ্রাম বন্দরে প্রতিনিয়ত বাড়ছে আমদানির পরিমাণ। এ বিশাল পরিমাণ পণ্য হ্যান্ডলিংয়ে প্রতিনিয়ত চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে হচ্ছে চট্টগ্রাম বন্দরকে। বিশেষ করে অবকাঠামোগত উন্নয়ন প্রকল্পের জন্য আমদানীকৃত নির্মাণসামগ্রী যেমন পাথর, রড তৈরিতে ব্যবহৃত স্ক্র্যাপ ও অন্যান্য ভারী যন্ত্রপাতি আমদানির পরিমাণ সবচেয়ে বেশি বেড়েছে। নিত্যপ্রয়োজনীয় খাদ্যদ্রব্য ও শিল্পের কাঁচামালের পাশাপাশি উন্নয়ন প্রকল্পের এ বাড়তি হ্যান্ডলিংয়ের কাজটি করছে শিপ হ্যান্ডলিং অপারেটরেরা। শুধু উন্নয়ন প্রকল্পের জন্য আনা সামগ্রীই নয়; নিয়মিতভাবে শিপ হ্যান্ডলিং অপারেটরেরা চাল, ডাল, গম, রেফশিট, চিনি, সিমেন্ট ক্লিংকার, স্ক্র্যাপ স্টিল, কয়লা ও ভারী যন্ত্রপাতি হ্যান্ডলিং করে আসছে। পদ্মা সেতু, পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের জন্য আনা ভারী যন্ত্রপাতি হ্যান্ডলিং করে নির্দিষ্ট সময় ও গন্তব্যে পৌঁছে দিতে ভূমিকা রাখছে শিপ হ্যান্ডলিং অপারেটরেরা।

কিংবা দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে নৌপথে আমদানীকৃত পণ্য সহজে ও কম খরচে পৌঁছে দেওয়ার কাজ করছে
অংশগ্রহণ আছে ওয়াটার ট্রান্সপোর্ট সেলেরও
শিপ হ্যান্ডলিং অপারেটর পণ্য বা কার্গো জাহাজ থেকে জাহাজে স্থানান্তরের কাজ করে। বড় আকারের জাহাজ থেকে পণ্য ছোট আকারের জাহাজে নেওয়াই শিপ হ্যান্ডলিং অপারেটরের কাজ। ছোট আকারের জাহাজকে বলা হয় লাইটার জাহাজ। আমদানিকারক, শিপ হ্যান্ডলিং অপারেটর আর ওয়াটার ট্রান্সপোর্ট সেলের সমন্বয়ে বহির্নোঙরে পণ্য লাইটারিং হয়ে থাকে। ওয়াটার ট্রান্সপোর্ট সেল (ডব্লিউটিসি) লাইটার জাহাজের বেসরকারি নিয়ন্ত্রক সংস্থা। ডব্লিউটিসি চট্টগ্রাম বন্দরের বহির্নোঙরে মাদার ভেসেল থেকে বন্দরের জেটি কিংবা দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে নৌপথে আমদানীকৃত পণ্য সহজে ও কম খরচে পৌঁছে দেওয়ার কাজ করছে। সমুদ্র পরিবহন অধিদপ্তরের তত্ত্বাবধানে কমিটির মাধ্যমে ডব্লিউটিসি লাইটার সরবরাহের বিষয়টি নিশ্চিত করে থাকে। লাইটার জাহাজগুলোর ধারণক্ষমতা ৮০০ থেকে ৩ হাজার মেট্রিক টন। চট্টগ্রাম বন্দরের বহির্নোঙরে লাইটার জাহাজে খালাসকৃত পণ্য সদরঘাট লাইটার জেটি ছাড়াও দেশের প্রত্যন্ত এলাকা যেমন নারায়ণগঞ্জ, ফরিদপুর (সিঅ্যান্ডবি), বরিশাল, নওয়াপাড়া, বাঘাবাড়ী, নগরবাড়ী, ঘোড়াশাল, আশুগঞ্জ, মিরপুর, ভৈরবসহ বিভিন্ন স্থানে পৌঁছে যায়।

চট্টগ্রাম বন্দরের উন্নয়ন ও অগ্রগতির সাথে তাল মিলিয়ে চলতে এবং সারা দেশে লাইটার জাহাজের মাধ্যমে পণ্য পরিবহনে শৃঙ্খলা আনতে ২০০৫ সালে বাংলাদেশ কার্গো ভেসেল ওনার্স অ্যাসোসিয়েশন (ভিসিভোয়া) ও কোস্টাল শিপ ওনার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (কোয়াব) একসাথে মিলিত হয়ে প্রতিষ্ঠা করেছে ওয়াটার ট্রান্সপোর্ট সেল বা ডব্লিউটিসি। এ সেল গঠনের মূল উদ্দেশ্য ছিল চট্টগ্রাম বন্দরের বহির্নোঙরে মাদার ভেসেল থেকে বন্দরের জেটি কিংবা দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে নৌপথে আমদানীকৃত পণ্য সহজে ও কম খরচে পৌঁছে দেওয়া এবং চট্টগ্রাম বন্দর তথা দেশের টেকসই উন্নয়নের স্বার্থে অভ্যন্তরীণ জাহাজ দ্বারা পণ্য পরিবহনের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা ও বন্ধুত্বপূর্ণ পরিবেশ সৃষ্টি করা। ডব্লিউটিসি চট্টগ্রাম বন্দরের বহির্নোঙরে মাদার ভেসেলের অবস্থানকাল কমানোর পাশাপাশি বন্দরের সুনাম বৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছে। ওয়াটার ট্রান্সপোর্ট সেল গঠনের আগে আমদানিকারক ও লাইটার মালিকদের মধ্যে প্রত্যক্ষ যোগাযোগ ছিল না। ফলে ভাড়া ও পণ্য পরিবহনে বিশৃঙ্খলা ছিল। ডব্লিউটিসি আমদানিকারক, কার্গো এজেন্ট এবং লাইটার জাহাজ মালিকসহ সংশ্লিষ্ট সকল পক্ষের মধ্যে সমন্বয়কের ভূমিকা পালন করছে। দেশের বিভিন্ন প্রান্তে আমদানিকারকের দুয়ারে পণ্য পৌঁছানোর যুক্তি সংগত ভাড়া নির্ধারণ করে দেয় ডব্লিউটিসি, ফলে অতিরিক্ত ভাড়া গ্রহণের সুযোগ নেই।
বর্তমানে ওয়াটার ট্রান্সপোর্ট সেলের অধীনে ৭৫০টির অধিক লাইটার জাহাজ চলাচল করে। যেগুলোর পরিবহন সক্ষমতা প্রায় ৯ লাখ মেট্রিক টন। ডব্লিউটিসি প্রতিষ্ঠার পর থেকে চট্টগ্রাম বন্দরে আসা মাদার ভেসেল থেকে অভ্যন্তরীণ বিভিন্ন গন্তব্যে পণ্য পরিবহনে কাজ করছে। সঠিক সময়ে মাদার ভেসেল থেকে পণ্য খালাসে লাইটার সরবরাহ করে ডব্লিউটিসি।
আমদানিকারকের পণ্য পরিবহনে নৌপথে চলাচলকারী জাহাজগুলোকে নির্দিষ্ট নিয়মকানুন মেনে চলতে হয়। বহির্নোঙর থেকে পণ্য পরিবহনে ইচ্ছুক এমন নৌযানকে পণ্য পরিবহনের আগে অবশ্যই ওয়াটার ট্রান্সপোর্ট সেলে নিবন্ধিত হতে হয়। এক্ষেত্রে সরকারি রাজস্ব পরিশোধ ও সার্ভে সার্টিফিকেট ছাড়া কোনো নৌযানকে পণ্য পরিবহনের অনুমতি দেয় না ওয়াটার ট্রান্সপোর্ট সেল। এ ছাড়া সরকারি নিষেধাজ্ঞা আছে ও রাজস্ব পরিশোধ করা হয়নি এমন পণ্য পরিবহনে লাইটার বরাদ্দ দেয় না ডব্লিউটিসি।
চট্টগ্রাম বন্দরে যেমন বহির্নোঙর থেকে জেটিতে জাহাজ ভিড়তে বার্থিং মিটিং পরিচালিত হয়, ঠিক তেমনি পণ্য পরিবহনে লাইটার জাহাজ বরাদ্দ দিতে প্রতিদিন ওয়াটার ট্রান্সপোর্ট সেলের অফিসে বার্থিং মিটিং অনুষ্ঠিত হয়। আমদানিকারকের দেওয়া লাইটার জাহাজের চাহিদার ভিত্তিতে লাইটার বরাদ্দ দেওয়া হয়। আমদানিকারকের পক্ষে কার্গো বা পণ্যের এজেন্ট ওয়াটার ট্রান্সপোর্ট সেলে চাহিদা উত্থাপন করে। শুধু লাইটার বরাদ্দ দেয় এমন নয়, লাইটার কোন গন্তব্যে যাচ্ছে তা নিয়মিত মনিটরিংও করে ওয়াটার ট্রান্সপোর্ট সেল। এছাড়া লাইটার বরাদ্দ পাওয়ার পর, আমদানিকারকের নির্দিষ্ট গন্তব্যে পণ্য খালাস পর্যন্ত যেকোনো সমস্যা বা সৃষ্ট জটিলতা মীমাংসায় কাজ করে ডব্লিউটিসি। ফলে আমদানিকারকে পণ্যের কোনো ধরনের ঝামেলা বা সমস্যায় পড়তে হয় না সঠিক সময়ে পণ্যের প্রাপ্তি নিয়ে। এছাড়া খাদ্যদ্রব্য ও কৃষিকাজে ব্যবহৃত সার পরিবহনের তথ্য সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়কে সরবরাহ করে ডব্লিউটিসি। ফলে একদিকে যেমন খাদ্যদ্রব্যের বাজার স্থিতিশীল রাখতে সহায়তা করছে, ঠিক তেমনি দেশের কৃষি উৎপাদন প্রক্রিয়া স্বাভাবিক রাখতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে ডব্লিউটিসি।

৮২৭ মেট্রিক টন হ্যান্ডলিং হয়েছে বহির্নোঙরে। শতাংশের হিসাবে এর পরিমাণ প্রায় ৮০ শতাংশ
কোথায় হয় লাইটারিং
একসময় চট্টগ্রাম বন্দরের বহির্নোঙর এলাকা ছিল উপকূল থেকে পাঁচ নটিক্যাল মাইল পর্যন্ত। বন্দরে জাহাজ আগমনের সংখ্যা বৃদ্ধি পাওয়ায় ২০১১ সালে তা বৃদ্ধি করে ৭ দশমিক ৫ নটিক্যাল মাইল করা হয়। গত কয়েক বছরের ব্যবধানে জাহাজ আসার পরিমাণ সাড়ে ৩ হাজার অতিক্রম করেছে। এছাড়া মাতারবাড়ী ঘিরে এলএনজি টার্মিনাল, জাইকার উদ্যোগে নির্মাণাধীন মাতারবাড়ী সমুদ্রবন্দর ও অর্থনৈতিক অঞ্চলগুলোর পণ্যবাহী জাহাজ ভেড়ানোর সুবিধার্থে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার অংশ হিসেবে চট্টগ্রাম বন্দরের বহির্নোঙর এলাকা ৭ নটিক্যাল মাইল থেকে বৃদ্ধি করে ৫০ নটিক্যাল মাইল করেছে কর্তৃপক্ষ। বহির্নোঙরের আওতা বাড়ানোর প্রস্তাবটি নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের অনুমোদনের পর আইন মন্ত্রণালয়ের ভেটিং শেষে রাষ্ট্রপতির আদেশক্রমে ২০১৯ সালের ২৪ জানুয়ারি বিজ্ঞপ্তি আকারে প্রকাশ হয়। ফলে কর্ণফুলীর মোহনা থেকে কুতুবদিয়া পর্যন্ত চট্টগ্রাম বন্দরের বহির্নোঙর বিস্তৃত হয়েছে। পুরো বহির্নোঙরে সারা বছর চলে পণ্য লাইটারিংয়ের কাজ। ফলে আগের চেয়ে অনেক বেশি নিরাপদে পণ্য লাইটারিং ও জাহাজ অবস্থান করতে পারে। আবহাওয়া খারাপ থাকলে পায়রা বন্দরের জাহাজও কখনো কখনো চট্টগ্রাম বন্দরের বহির্নোঙরে লাইটারিং করে।
ঘণ্টায় ৬-৭ নটিক্যাল মাইলের শক্তিশালী জোয়ারের প্রভাবে বহির্নোঙর এলাকায় চলাচল এবং নোঙর করতে সতর্কতা অবলম্বন করতে হয় জাহাজের পাইলট ও নাবিকদের। বিশেষ করে জোয়ারের সময় বহির্নোঙরের অন্য কোনো জাহাজ অতিক্রম না করা, ইঞ্জিন চালু রাখা, জরুরি প্রয়োজনে ৬ নটিক্যাল মাইল বেগে চলাচল, চ্যানেলের প্রবেশপথে অবস্থান না করা, ২ থেকে ৩ বার জোয়ারের পর নোঙরের অবস্থান যাচাই করা এবং ড্রাফট অনুযায়ী নোঙর করার নির্দেশনা রয়েছে বন্দর কর্তৃপক্ষের। দুর্ঘটনা এড়াতে পোর্ট রেডিও কন্ট্রোল থেকে জাহাজ চলাচল এবং অবস্থানে নির্দেশনা দেওয়া হয় পাইলটদের। এছাড়া মৌসুমি বায়ুর প্রভাব এবং মে থেকে অক্টোবর পর্যন্ত দ্রুত আবহাওয়া পরিবর্তনের প্রবণতা যেমন ঝড়, বৃষ্টি ও ঘূর্ণিঝড়ের কথা মাথায় রেখে চলাচল করতে হয় পাইলটদের।
পণ্য লাইটারিংয়ে বড় জাহাজ এবং লাইটার ভেসেলকে পাশাপাশি অবস্থান করতে হয়। দুই জাহাজের সার্বক্ষণিক যোগাযোগের পাশাপাশি নিরবচ্ছিন্ন লাইটারিং নিশ্চিত করতে ব্যবস্থা রাখতে হয় প্রয়োজনীয় ফেন্ডারিংয়ের (মুরিং দড়ি, পুরোনো টায়ার), যাতে জোয়ার এবং ঢেউয়ের প্রভাবে সৃষ্ট দুলুনিতে মাদার ভেসেল এবং লাইটার জাহাজের মধ্যে যেকোনো ধরনের সংঘর্ষ না ঘটে।

মনিটরিং করা হয়। কনটেইনার বা কার্গোবাহী জাহাজ যখন চট্টগ্রাম বন্দরের বহির্নোঙরে প্রবেশ করে, ঠিক তখন থেকেই
এরা ভিটিএমআইএসের নজরদারিতে চলে আসে
খোলা পণ্যের ৮০ শতাংশ হ্যান্ডলিং বহির্নোঙরে
চট্টগ্রাম বন্দর কনটেইনার হ্যান্ডলিংয়ের পরিসংখ্যানে পৃথিবীর অনেক বন্দরকে পেছনে ফেলে লয়েডস লিস্টে ৫৮তম স্থানে অবস্থান করছে। কনটেইনার হ্যান্ডলিংয়ের পরিসংখ্যান ও প্রবৃদ্ধি সবসময় আলোচিত হলেও চট্টগ্রাম বন্দর কনটেইনারের পাশাপাশি বিপুল পরিমাণ খোলা (বাল্ক ও জেনারেল) পণ্যও হ্যান্ডলিং করে, যা সামগ্রিক পণ্য হ্যান্ডলিংয়ের প্রায় অর্ধেক। আর এই খোলা পণ্য বা কার্গো হ্যান্ডলিংয়ের সিংহভাগ হয় বঙ্গোপসাগরের বিস্তৃত জলরাশিতে, জনমানুষের চোখের আড়ালে। বন্দরের জেটির মতো ক্রেনের সাহায্যে পণ্য বা কনটেইনার ওঠানামা ও ট্রাক, কাভার্ড ভ্যান কিংবা লরির চলাচল দৃশ্যত নজরে না এলেও জাহাজ থেকে জাহাজে (শিপ টু শিপ অর্থাৎ এসটিএস) খালাস হয়ে যাচ্ছে কোটি কোটি টন পণ্য।
আমরা কিছু তুলনামূলক পরিসংখ্যান দেখলেই এটি বেশ ভালোভাবে বুঝতে পারব। ২০১৭-১৮ অর্থবছরে চট্টগ্রাম বন্দরে বাল্ক ও জেনারেল পণ্য খালাস হয়েছে ৫ কোটি ৯০ লাখ ৭৭ হাজার ৭২৫ মেট্রিক টন। এর মধ্যে শুধু বহির্নোঙরে খালাস হয়েছে ৪ কোটি ৩৯ লাখ ৮৯ হাজার ৩২২ মেট্রিক টন পণ্য। একইভাবে ২০১৮-১৯ অর্থবছরে খালাস হওয়া ৬ কোটি ৪২ লাখ ৬৮ হাজার ৮৬ মেট্রিক টন পণ্যের মধ্যে ৪ কোটি ৯৯ লাখ ৫৮ হাজার ৪৫০ মেট্রিক টন এবং ২০১৯-২০ অর্থবছরে ৬ কোটি ৮৪ লাখ ৭৩ হাজার ৪১৪ মেট্রিক টন পণ্যের মধ্যে ৫ কোটি ৪২ লাখ ৫৪ হাজার ৮২৭ মেট্রিক টন হ্যান্ডলিং হয়েছে বহির্নোঙরে। শতাংশের হিসাবে এর পরিমাণ প্রায় ৮০ শতাংশ।
বহির্নোঙরে লাইটার জাহাজে পণ্য পরিবহন সড়কপথে চাপ কমাচ্ছে প্রতিনিয়ত। সকল আমদানিপণ্য চট্টগ্রাম বন্দরের জেটিতে খালাস হলে প্রতিদিন কমপক্ষে ২০-২৫ হাজার ট্রাক মহাসড়কে যোগ হতো। এ সংখ্যাই বলে দিচ্ছে বহির্নোঙরে পণ্য পরিবহন শুধু পরিবেশবান্ধবই নয়, বরং মহাসড়কে যানবাহন চলাচলকে আরও সহজ ও নিরাপদ করছে।
জাহাজ হ্যান্ডলিংয়েও এগিয়ে বহির্নোঙর
পণ্য হ্যান্ডলিংয়ের পরিসংখ্যানের মতো জাহাজ হ্যান্ডলিংয়ের পরিসংখ্যানেও বহির্নোঙরের অংশীদারিত্ব বেশি। ২০১৮-১৯ অর্থবছরের পরিসংখ্যানে দেখা যায় এ বছর চট্টগ্রাম বন্দরে খোলাপণ্যের জাহাজ এসেছে ২ হাজার ২০৪টি। এর মধ্যে শুধু বহির্নোঙরে খালাস হয়েছে ১ হাজার ৩২১টি জাহাজের পণ্য। বন্দরের নিজস্ব জেটি, বিশেষায়িত জেটি ও মুরিংয়ে খালাস হয়েছে যথাক্রমে ৪৭৯ ও ৪০৪টি জাহাজ। এরপরের অর্থবছরে (২০১৯-২০) খোলাপণ্যের জাহাজ এসেছে ২ হাজার ৩০৯টি। এর মধ্যে শুধু বহির্নোঙরে খালাস হয়েছে ১ হাজার ৪৬৪টি জাহাজের পণ্য। এছাড়া জেটিতে ৪৯১টি ও বিশেষায়িত জেটি এবং মুরিংয়ে ৩৪৭টি জাহাজের পণ্য খালাস হয়েছে। সর্বশেষ অর্থবছরের (২০১৯-২০) পরিসংখ্যান অনুযায়ী বহির্নোঙরে খোলাপণ্যের জাহাজ হ্যান্ডলিংয়ের অংশীদারিত্ব প্রায় ৬৩ শতাংশ।
নিরাপদ বহির্নোঙর
চট্টগ্রাম বন্দর চ্যানেল ও বহির্নোঙর দেশি-বিদেশি জাহাজ চলাচলের নিরাপদ গন্তব্য। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নজরদারি, নিয়মিত টহল ও বন্দর কর্তৃপক্ষের নিয়ন্ত্রণকক্ষের সাথে জাহাজের সার্বক্ষণিক যোগাযোগ অপরাধমূলক কার্যক্রমের সংখ্যা কমানোর পাশাপাশি চট্টগ্রাম বন্দরকে নিরাপদ বন্দরের পরিচিতি এনে দিয়েছে এবং একই সাথে উজ্জ্বল হয়েছে বন্দরের ভাবমূর্তি।
দেশের বহির্নোঙরে অপরাধকর্ম বাড়লে বিদেশি জাহাজের চলাচলে নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। এ নেতিবাচক প্রভাবের কারণে পণ্য পরিবহনে বাড়তি জাহাজভাড়া আরোপ হয় আর বিপাকে পড়তে হয় দেশীয় আমদানি-রপ্তানিকারকদের। সাগরে দস্যুতা প্রতিরোধে প্রতিনিয়ত কাজ করছে কোস্ট গার্ড, বাংলাদেশ নৌবাহিনী ও চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ। চট্টগ্রাম বন্দর আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা বিধিমালা আইএসপিএসের লেভেল-১ বাস্তবায়ন করছে। বহির্নোঙরে যেকোনো ধরনের দুর্ঘটনা, চুরি কিংবা দস্যুতার ঘটনা শূন্যের কোটায় নামিয়ে আনতে ভেসেল ট্রাফিক ম্যানেজমেন্ট ইনফরমেশন সিস্টেমকে (ভিটিএমআইএস) আপগ্রেড করা হয়েছে। আর নিজস্ব উদ্যোগে নজরদারির জন্য হাইস্পিড জাহাজ এবং হেলিকপ্টার কেনার বিষয়টিও পরিকল্পনায় রয়েছে। বহির্নোঙর ছাড়াও পোর্ট লিমিটের মধ্যে থাকা সব স্থাপনা, রিভার মুরিং, জেটি, টার্মিনালকে আরও বেশি নজরদারির মধ্যে আনার প্রক্রিয়া চলছে। আর নৌবাহিনী ও কোস্ট গার্ড চুরি কিংবা দস্যুতার কোনো অভিযোগ পেলে ১০ মিনিটের মধ্যে যাতে সরাসরি সাগরের ঘটনাস্থলে পৌঁছতে পারে, সেজন্য বন্দর চ্যানেলের ১৫ নম্বর ঘাটের কাছে একটি র্যাপিড রেসপন্স বার্থ স্থাপন করা হয়েছে।
ভিটিএমআইএস: সার্বক্ষণিক নজরদারি
চট্টগ্রাম বন্দরের বহির্নোঙর নিয়ে কথা বলতে গেলে এর সার্বিক পরিচালনায় যে প্রযুক্তি ব্যবহার করা হচ্ছে, সেই প্রসঙ্গে আলোকপাত করতেই হয়। নৌবাণিজ্য নিরাপদ, নির্বিঘন্নে এবং আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত করতে ২০১৪ সালে চট্টগ্রাম বন্দরে ভেসেল ট্রাফিক ম্যানেজমেন্ট ইনফরমেশন সিস্টেম (ভিটিএমআইএস) চালু করা হয়। চট্টগ্রাম বন্দর আধুনিকায়নের গুরুত্বপূর্ণ অংশ এই সিস্টেম। ভিটিএমআইএস বন্দরের সক্ষমতা এবং দক্ষতা বাড়িয়েছে বহুগুণে। বেলজিয়াম, আমেরিকা ও সিঙ্গাপুরের মতো উন্নত দেশের বন্দরে ব্যবহৃত হচ্ছে এই সিস্টেম। ভিটিএমআইএস পরিচালিত হয় আন্তর্জাতিক নৌ-সংস্থা আইএমও এবং সোলাস কনভেনশন অনুসরণ করে। আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর এই সিস্টেমের কারণে চট্টগ্রাম বন্দর চ্যানেল ও বন্দরের বহির্নোঙরে অবস্থান করা সব জাহাজের নজরদারি করতে পারছে কর্তৃপক্ষ। কনটেইনার বা কার্গোবাহী জাহাজ যখন চট্টগ্রাম বন্দরের বহির্নোঙরে প্রবেশ করে, ঠিক তখন থেকেই এরা ভিটিএমআইএসের নজরদারিতে চলে আসে। নিয়মানুযায়ী জাহাজ বহির্নোঙরে প্রবেশ করে ভিএইচএফ কমিউনিকেশনের মাধ্যমে পোর্ট রেডিও কন্ট্রোলে তাদের আগমন নিশ্চিত করে। পোর্ট রেডিও কন্ট্রোল জাহাজের প্রয়োজনীয় তথ্য যেমন ড্রাফট, আয়তন, কার্গো পরিমাণ বা কনটেইনারের পরিমাণ ইত্যাদি সংরক্ষণ করে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা ও বহির্নোঙর এলাকায় কোন অ্যাংকরেজে অবস্থান করবে তা জাহাজের ক্যাপ্টেনকে জানিয়ে দেয়।
ভিটিএমআইএসের সুবাদে একদিকে যেমন জাহাজ চলাচল বন্দরের নিয়ন্ত্রণে এসেছে, তেমনি কমেছে সংঘর্ষ, চুরি কিংবা ডাকাতির ঘটনা। বহির্নোঙরে পণ্য হ্যান্ডলিংয়ে নিষেধাজ্ঞার সময় বিশেষ করে অতিবৃষ্টি ও ঘনকুয়াশার সময়ও জাহাজের কর্মকা- কর্তৃপক্ষের নজরদারিতে এসেছে।
ভিটিএমআইএস পরিচালনায় চট্টগ্রাম বন্দরে রয়েছে দুটি কন্ট্রোল স্টেশন ও চারটি রাডার স্টেশন। একটি বন্দর ভবন কন্ট্রোল স্টেশন; অন্যটি পতেঙ্গা পয়েন্ট কন্ট্রোল স্টেশন। চারটি রাডার স্টেশনগুলো হলো পতেঙ্গা পয়েন্ট রাডার স্টেশন, গুপ্তা পয়েন্ট রাডার স্টেশন, রুবি সিমেন্ট রাডার স্টেশন ও সদরঘাট রাডার স্টেশন। সিসিটিভি ক্যামেরা, ডে-নাইট ক্যামেরা সিস্টেম, ভিএইচএফ রেডিও সিস্টেম এবং অটোমেটিক আইডেন্টিফিকেশন সিস্টেম (এআইএস) সমৃদ্ধ এই সিস্টেমের মাধ্যমে প্রতিটি জাহাজের চলাচল চিহ্নিত করা যায় কন্ট্রোল স্টেশন থেকেই। ভিটিএমআইএসের মাধ্যমে স্টেশনে বসেই বিশ্বের যেকোনো দেশ থেকে আসা জাহাজের বহির্নোঙরে প্রবেশ, জাহাজের বিস্তারিত তথ্য, গতিবিধি এবং পাশর্^বর্তী জাহাজ থেকে দূরত্ব অবলোকন করা যায়। বহির্নোঙরে জাহাজ চলাচলের উপযুক্ত সময়, দুর্ঘটনার আশঙ্কা থাকলে আগাম সতর্কতা জারি, বন্দর চ্যানেলে জাহাজ প্রবেশ ও বহির্গমন, বহির্নোঙরে পণ্য হ্যান্ডলিংয়ের সঠিক সময় সম্পর্কে তথ্য প্রদান এবং যোগাযোগের মাধ্যমে সমন্বয়ের কাজ করে ভিটিএমআইএস। একই সাথে জাহাজগুলোকেও পণ্য হ্যান্ডলিংয়ের তথ্য ও জাহাজ সঠিকভাবে নোঙর করা আছে কিনা তা নিশ্চিত করে তথ্য প্রেরণ করতে হয় নিয়ন্ত্রণকক্ষে। যেকোনো দুর্ঘটনায় ত্বরিত ও কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণের পাশাপাশি দুর্ঘটনার তদন্তে ভিটিএমআইএসএ’র অডিও ও ভিডিও রেকর্ডিং এনে দিয়েছে যুগান্তকারী সাফল্য। অনুমতি ছাড়া যেকোনো জাহাজের বন্দর চ্যানেলে প্রবেশ নিয়ন্ত্রণেও কার্যকর ভিটিএমআইএস। দুর্ঘটনা প্রশমনে গঠন করা হয়েছে বহির্নোঙর সেল (আউটার অ্যাংকরেজ সেল)। এই সেলের কাজ হচ্ছে বহির্নোঙরে যেকোনো ধরনের দুর্ঘটনা প্রশমন করতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা ও নজরদারি জোরদার করা।
ব্যাপ্তি বেড়েছে অনেক, বাড়বে আরও
দেশের উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জন ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিকে সমুন্নত রাখতে হলে চট্টগ্রাম বন্দরের উন্নয়নের কোনো বিকল্প নেই। বাণিজ্য বৃদ্ধির সুবাদে ক্রমাগত বাড়ছে পণ্য আমদানি-রপ্তানি। এছাড়া চট্টগ্রাম বন্দর ব্যবহার করে প্রতিবেশী দেশগুলোর ট্রানজিট-ট্রানশিপমেন্ট চালু হওয়ায় পণ্য হ্যান্ডলিংয়ের সম্ভাবনা আরও বাড়ছে। পণ্য হ্যান্ডলিংয়ে প্রতিনিয়ত নিজের সক্ষমতা বৃদ্ধির পাশাপাশি টার্মিনাল অপারেটর, বার্থ অপারেটর ও শিপ হ্যান্ডলিং অপারেটরদের সক্ষমতা বৃদ্ধিতে প্রত্যক্ষভাবে কাজ করছে চট্টগ্রাম বন্দর। কাক্সিক্ষত উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে চট্টগ্রাম বন্দর তার সম্ভাবনার সবটুকু কাজে লাগাতে বদ্ধপরিকর। ক্রমোন্নয়নের নিরলস প্রচেষ্টায় পাল্টে যাচ্ছে চট্টগ্রাম বন্দরের চিরচেনা চিত্র। পাল্টে যাচ্ছে দৃষ্টির আড়ালে থাকা বহির্নোঙরে পণ্য খালাসের চিত্রও। বিশে^র ব্যস্ততম বন্দরের তালিকায় অচিরেই শীর্ষসারিতে উঠে আসবে চট্টগ্রাম বন্দর, তা এখন আর স্বপ্ন নয়।
ওমর ফারুক ইমন
প্রতিবেদক, বন্দরবার্তা