অবৈধ মৎস্য আহরণে খাদ্য ঘাটতিতে আফ্রিকার দেশ গিনি-বিসাউ

দীর্ঘদিন ধরে অনিয়ন্ত্রিত ও অবৈধ মৎস্য আহরণের শিকার হচ্ছে আফ্রিকার উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলীয় দেশ গিনি-বিসাউ। আইন ও নিয়মনীতির ফাঁক-ফোকর কাজে লাগিয়ে অন্যান্য দেশের মাছ ধরার ট্রলার গিনি-বিসাউর অর্থনৈতিক জলসীমায় অবৈধভাবে মাছ শিকার করছে। অবৈধ ও অনিয়ন্ত্রিত এই আহরণের ফলে আফ্রিকার অন্যতম দরিদ্র দেশটিতে দেখা দিয়েছে খাদ্য সংকট। জাতিসংঘের বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচির (ডব্লিউএফপি) ওয়ার্ল্ড ফুড প্রোগ্রামের তথ্য মতে, দীর্ঘদিন লাগাতার আমিষ ঘাটতির দরুণ দেশটির মোট জনসংখ্যার (প্রায় ১৮ লাখ) এক-চতুর্থাংশ বর্তমানে অপুষ্টিতে ভুগছে।

২০১৭ সালে ফ্রন্টিয়ার্স ইন মেরিন সায়েন্সে প্রকাশিত এক গবেষণাপত্রে জানা যায়, পশ্চিম আফ্রিকার ১ লাখ ৬ হাজার বর্গকিলোমিটার উপকূলজুড়ে গিনি-বিসাউর একচ্ছত্র অর্থনৈতিক অঞ্চল (ইইজেড) বিস্তৃত। বিস্তীর্ণ এই অঞ্চলে দেশটির প্রায় আড়াই লাখ মানুষ মৎস্য আহরণ করে। ক্ষুদ্র আকারের মৎস্য শিকারিরা গিনি-বিসাউর মোট আমিষ চাহিদার ৩৫ শতাংশের বেশি পূরণ করে থাকে। তবে সাম্প্রতিক সময়ে অবৈধ, অনিয়ন্ত্রিত ও অগোচরীভূত মৎস্য আহরণের পরিমাণ অত্যন্ত বেড়ে যাওয়ায় দেশটির মৎস্য সম্পদ ও আমিষের যোগান ঝুঁকির মুখে পড়েছে। 

ফ্রন্টিয়ার্স ইন মেরিন সায়েন্সের গবেষণা অনুযায়ী, গিনি-বিসাউয়ের মৎস্য সম্পদের বার্ষিক বাজার মূল্য ৪১ কোটি ৬০ লাখ ডলার। এর প্রায় অর্ধেক (২৬ কোটি ৭ লাখ ডলার) অবৈধ ও অগোচরীভূত উপায়ে আহরণ করা হয়। অন্যদিকে বৈধভাবে আহরিত মাছের বাজার মূল্যের মাত্র ৩১ শতাংশ (মাছ ধরার ফি ও চুক্তির মাধ্যমে) স্থানীয় অর্থনীতিতে প্রবেশ করে।

স্থানীয় জেলে মারিও বরিস ফার্নান্দেজ জানান, দুই দশক আগের তুলনায় বর্তমানে মাছের পরিমাণ অনেক কমে গেছে। বর্তমানে মাছের গুণগত মান ও পরিমাণ উভয়ই পড়তির দিকে। ২০ বছর আগে মাছ ধরার আয় দিয়েই মৌলিক চাহিদাগুলো স্বাচ্ছন্দে পূরণ করতে পারলেও ফার্নান্দেজের মতো স্থানীয় জেলেরা বর্তমানে সংসার খরচ চালাতে হিমশিম খাচ্ছেন। অন্যদিকে বৈধ উপায়ে মৎস্য আহরণ কমে যাওয়ায় স্বল্প মুনাফায় মাছ বিক্রি করছেন বিক্রেতারা। 

স্থানীয় জেলেরা জানান, যেখানে স্বল্প মাত্রায় মছ ধরার কথা, সেখানে অবৈধ মৎস্য শিকারীরা ট্রলার দিয়ে বাণিজ্যিকভাবে মাছ শিকার করছে। চাহিদা অনুযায়ী মাছ সংরক্ষণ করে বাকি মাছগুলো সমুদ্রে ফেলেও দিচ্ছে তারা। মৃত মাছ ফেলে দেওয়ায় সাগরের পানি দূষিত হওয়ার পাশাপাশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে সেখানকার বাস্তুসংস্থান।

অধিকাংশ অবৈধ মাছ শিকারি বিদেশী পতাকাবাহী জাহাজে করে মাছ শিকার করে। এদের অনেকে আবার গিনি-বিসাউয়ের পতাকাও (রিফ্ল্যাগড) বহন করে। গ্রিনপিসের ২০১৭ সালে প্রকাশিত এক প্রতিবেদন অনুযায়ী, সেই বছরের মার্চ মাসে প্রায় ১৭৭টি বাণিজ্যিক মাছ ধরা জাহাজ গিনি-বিসাউয়ের জলসীমায় কার্যক্রম পরিচালনা করেছে। যার ভেতর চীন, ফ্রান্স, স্পেন, পানামা, সেনেগাল, পর্তুগাল, গ্রিস, দক্ষিণ কোরিয়াসহ আফ্রিকার বেশ কিছু দেশের পতাকাবাহী জাহাজ ছিলো।

গিনি-বিসাউ সরকার অবৈধ মাছ শিকার নিয়ন্ত্রণে কঠোর আইন ও জরিমানা আরোপ করতে ব্যর্থ হওয়ায় এবং আইনের প্রয়োগ না থাকায় দেশটির মৎস্য সম্পদ ক্রমেই হ্রাস পাচ্ছে। আইনের প্রয়োগহীনতা ও দুর্নীতি গিনি-বিসাউতে এতটাই প্রকট যে, অবৈধ মাছ শিকারীরা অনেক সময় ঘুষ দিয়ে জরিমানা থেকে ছাড় পেয়ে যায়।

স্থানীয় মাছ শিকারী ও আইনপ্রণেতাদের মতে, কঠোর আইন প্রণয়ণ ও আইনের প্রয়োগ নিশ্চিত করা এবং আঞ্চলিক জোট গঠনের মাধ্যমে অবৈধ মাছ শিকারে লাগাম টানা সম্ভব। অন্যদিকে গিনি বিসাউয়ের পরিবেশ উপমন্ত্রীর দাবী, অবৈধ মাছ শিকারিরা অত্যাধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করায় অধিকাংশ সময় তারা সরকারের ধরা-ছোঁয়ার বাইরে থেকে যায়।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here