২০২০ সালে এশিয়াজুড়ে জাহাজে ডাকাতি বা চুরির ঘটনা বেশ বেড়েছে। দ্য রিজিয়নাল কো-অপারেশন এগ্রিমেন্ট অন কমব্যাটিং পাইরেসি অ্যান্ড আর্মড রোবারি অ্যাগেইনস্ট শিপস ইন এশিয়া (রিক্যাপ) তাদের বার্ষিক প্রতিবেদনে জানিয়েছে, সদ্যসমাপ্ত বছরে এ অঞ্চলে মোট ৯৫টি চুরি বা ডাকাতির ঘটনা ঘটেছে। এর আগের বছর অর্থাৎ ২০১৯ সালে ঘটেছিল ৮৩টি।
রিক্যাপের প্রতিবেদন অনুযায়ী, বাংলাদেশ, ভারত, ফিলিপাইন, ভিয়েতনাম, দক্ষিণ চীন সাগর এবং সিঙ্গাপুর প্রণালিসহ এশিয়া অঞ্চলজুড়ে চুরি বা ডাকাতির ওই ঘটনাগুলো সংঘটিত হয়েছে, যার অধিকাংশই জাহাজ থেকে সরঞ্জাম বা মালামাল চুরিসংক্রান্ত। রিক্যাপ জানিয়েছে, তিন-চতুর্থাংশ ক্ষেত্রে দেখা গেছে, অপরাধীরা সশস্ত্র ছিল না এবং জাহাজের নাবিকরাও ক্ষতিগ্রস্ত হয়নি। দুষ্কৃতিকারীদের উপস্থিতি নাবিকরা টের পাওয়ার পরই তারা জাহাজ ছেড়ে পালিয়ে যায়। এর মধ্যে একটি ডাকাতির ঘটনায় নাবিকদের অপহরণ করা হয়।
সিঙ্গাপুর প্রণালি ধরে পূর্বমুখী চলাচলরত জাহাজগুলো এখনো বড় উদ্বেগের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। এখানে ডাকাতির ঘটনা ১০ শতাংশ বেড়ে ৩৪টিতে দাঁড়িয়েছে। এর মধ্যে ৩০টি ঘটেছে পূর্বমুখী ভেসেলগুলোয়। এছাড়া ছোটখাটো চুরির ঘটনা বেড়ে দ্বিগুণ হয়েছে ভারত, ফিলিপাইন, ভিয়েতনাম ও দক্ষিণ চীন সাগরে। বাংলাদেশে এ জাতীয় ঘটনা ঘটেছে পাঁচটি, যদিও আগের বছর এ জাতীয় কিছু ঘটেনি।
রিক্যাপ আইএসসির নির্বাহী পরিচালক মাসাফুমি কুরোকি এ প্রসঙ্গে বলেন, গত দু’বছর ধরে এশিয়াজুড়ে জাহাজে ডাকাতি বা চুরির ঘটনা বেড়ে যাওয়ার অর্থ হচ্ছে মেরিটাইম পরিবহনগুলোর নিরাপত্তা ও নাবিকদের রক্ষায় আমাদের আরো কিছু করা প্রয়োজন। সতর্ক প্রহরা, আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলোর টহল জোরদার এবং সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর মধ্যে সহযোগিতার পাশাপাশি অপরাধীদের গ্রেপ্তার ও আইনের আওতায় নিয়ে এলে এ ধরনের তৎপরতা রোধ করা সম্ভব হবে।
টিকা প্রদানের অপেক্ষমাণ তালিকায় নাবিক ও সম্মুখসারির মেরিটাইম কর্মীদের অগ্রাধিকার দিতে বিশে^র বিভিন্ন দেশের সরকারগুলোর প্রতি আহ্বান জানিয়েছে ইন্টারন্যাশনাল চেম্বার অব শিপিং (আইসিএস)। সংস্থাটি জানিয়েছে, এর ব্যতিক্রম হলে মহামারির মধ্যে নাবিকরা যে চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছিল, আবারো তার পুনরাবৃত্তি ঘটবে।
বৈশ্বিক বাজারে টিকা সরবরাহ শুরু হওয়ায় আইসিএস চাইছে সরকারগুলো যেন টিকা প্রদানের ক্ষেত্রে বৈশ্বিক সরবরাহ শৃঙ্খলে নাবিকদের ভূমিকাকে অগ্রাধিকার দেয়। খাদ্যপণ্যের পাশাপাশি সিরিঞ্জ, পিপিইর মতো চিকিৎসাসামগ্রী সরবরাহে সুস্থ ও ভাইরাসের সংক্রমণ থেকে মুক্ত নাবিকদের ভূমিকাকে গুরুত্বের সঙ্গে দেখছে সংস্থাটি। আইসিএসের মহাসচিব গাই প্লাটেন বলেন, ‘বিশ্বব্যাপী টিকাসহ পিপিই পরিবহনের দায়িত্বে থাকা কর্মীদের টিকা প্রদান অন্যতম প্রাধিকার হিসেবে দেখা দরকার। সরকারগুলোর উচিত মেরিটাইম খাতের কর্মীদের সম্মুখসারির কর্মী হিসেবে বিবেচনা করে দ্রুততম সময়ের মধ্যে তাদেরকে টিকা প্রদান করা। তারা যেন কোনোভাবেই অপেক্ষমাণ তালিকার পেছনে না থাকে।’
বিশ্বের ৪০টিরও বেশি দেশ এরই মধ্যে মেরিটাইম কর্মীদের গুরুত্বপূর্ণ কর্মী হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে। তবে আইসিএস বলছে, অধিকাংশ বন্দরসমৃদ্ধ দেশ এখনো নাবিকদের স্বীকৃতিদানে পিছিয়ে আছে। টিকা বিতরণ কার্যক্রমে নাবিকদের গুরুত্ব না দিলে বর্তমানে তারা যে মানবিক সংকটের মুখোমুখি তা আরো ভয়াবহ হয়ে উঠবে।
বৈশ্বিক অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ পিলার হচ্ছে মেরিটাইম শিল্প। খাদ্য ও জ্বালানির মতো প্রয়োজনীয় পণ্যের সরবরাহ শৃঙ্খলে মেরিনাররা অগ্রণী ভূমিকা রাখে। তবে টিকাদান প্রক্রিয়ায় দুটি ডোজ প্রয়োজন হওয়ায় এবং দুটি ডোজের মধ্যবর্তী সময় তিন থেকে চার সপ্তাহ হওয়ায় নাবিক ও সম্মুখসারির মেরিটাইম কর্মীদের জন্য তা বাস্তবায়ন এক গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
সাফল্যের সাথে মোংলা বন্দর কর্তৃপক্ষের দায়িত্ব পালনের পর ৩১ জানুয়ারি চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান হিসেবে যোগ দিয়েছেন রিয়ার এডমিরাল এম শাহজাহান, এনপিপি, বিসিজিএমএস, এনডিসি, পিএসসি, বিএন। তার আগে ছিলেন বাংলাদেশ কোস্ট গার্ডের উপমহাপরিচালক ও চট্টগ্রাম বন্দরের সদস্যের (হারবার) দায়িত্বে। জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের ব্লু-ইকোনমি সেলের সদস্য হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছেন তিনি।
রিয়ার এডমিরাল এম শাহজাহান কর্মজীবন শুরু করেন ১৯৮৪ সালের ২৪ জুলাই বাংলাদেশ নৌবাহিনীতে ক্যাডেট হিসেবে যোগদানের মধ্য দিয়ে। ১৯৮৭ সালের ১ জানুয়ারি তিনি কমিশনপ্রাপ্ত হন। এরপর দায়িত্ব পালন করেছেন নৌবাহিনীর বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে। জাতিসংঘ মিশনের অধীনে তিনি সিয়েরা লিওনে সামরিক পর্যবেক্ষক দলের টিম লিডার এবং হাইতিতে ব্যানকন-২ এ শান্তিরক্ষী কর্মকর্তা হিসেবে কাজ করেছেন। বাংলাদেশের বন্দর, ব্লু-ইকোনমিসহ সার্বিক মেরিটাইম খাত নিয়ে সম্প্রতি কথা বলেছেন বন্দরবার্তার সাথে।
একসময় চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের সদস্য (হারবার) হিসেবে দায়িত্ব পালনের পর মোংলা বন্দর কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যানের দায়িত্ব সামলেছেন। সেখান থেকে আবার চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যানের দায়িত্বে। নতুন দায়িত্বকে কীভাবে দেখছেন?
এর আগেও আমি চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের সদস্য (হারবার) হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছি। চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে এই অভিজ্ঞতার গুরুত্ব অমূল্য। এই অভিজ্ঞতা ও জ্ঞান চেয়ারম্যানের দায়িত্ব নির্বিগ্নে পালনের ক্ষেত্রে সহায়ক ভূমিকা পালন করবে বলে আমি বিশ্বাস করি।
সদস্য (হারবার) থাকাকালে নির্দিষ্ট একটি ক্ষেত্র নিয়ে দায়িত্ব পালন করেছি। এখন বন্দরের সামগ্রিক উন্নয়ন নিয়ে আমাকে পরিকল্পনা করতে হবে। অর্থাৎ চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্বটা অনেক বেশি। সেখানে দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক কর্মকা-ের কথা চিন্তা করতে হবে ও তা চাঙ্গা রাখতে সবসময় আপ্রাণ চেষ্টা করতে হবে। কারণ বন্দরের মাধ্যমেই পুরো মেরিটাইম বাণিজ্য চলে এবং মেরিটাইম ট্রান্সপোর্টেশন হচ্ছে আমাদের অর্থনীতির চালিকাশক্তি। আমদানি ও রপ্তানিকারকদের তাদের কার্যক্রম পরিচালনার জন্য বন্দরের মাধ্যমে যেতে হয়। পণ্য গন্তব্যে পৌঁছাতে একটা দিনের বিলম্বের জন্য আমদানি ও রপ্তানিকারকদের অনেক ক্ষতির সম্মুখীন হতে হয়। রপ্তানিকারকদের ক্ষেত্রে রপ্তানি পণ্য নির্দিষ্ট সময়ে নির্দিষ্ট বন্দরে ডেলিভারি না হলে রপ্তানি বাতিল হওয়ার ঝুঁকি থাকে। অনেক ক্ষেত্রে এমনটা হয়েছেও। তাই রপ্তানি পণ্য নির্দিষ্ট সময়ে জাহাজীকরণের ব্যাপারে বন্দরকে সবসময় সচেষ্ট থাকতে হয়।
বিশ্বব্যাপীই অর্থনৈতিক উন্নয়নে বন্দরের গুরুত্ব বাড়ছে। সিঙ্গাপুর ও চীনের মতো দেশ বন্দরকেন্দ্রিক উন্নয়ন পরিকল্পনার সুবাদে অভাবনীয় অর্থনৈতিক সাফল্য পেয়েছে। বাংলাদেশেও সরকার বন্দরকেন্দ্রিক বিভিন্ন পরিকল্পনা গ্রহণ ও তা বাস্তবায়ন করছে। আগামী দিনের বাংলাদেশের জন্য নিরাপদ একটি বন্দর খাত গড়ে তুলতে আমাদের অগ্রাধিকার কী?
সমুদ্রবন্দর হচ্ছে অর্থনীতির বাতিঘর। দেশের আমদানি-রপ্তানির ক্ষেত্রে মূল ভূমিকাটাই পালন করতে হয় বন্দরকে। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকে বন্দরের সামর্থ্য বৃদ্ধি এবং কাজের পরিধি সম্প্রসারণের লক্ষ্যে বহুমাত্রিক প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়েছে। জাতীয় প্রবৃদ্ধি অর্জনেরও অন্যতম নিয়ামক হয়ে উঠেছে বন্দরের এই আধুনিকায়ন ও সামর্থ্য বৃদ্ধি।
২০৪১ সালে উন্নত দেশ হওয়ার লক্ষ্য সামনে রেখে উন্নয়নমুখী বিপুল কর্মযজ্ঞ চালু রয়েছে সারা দেশে। এগুলো করার সময় লক্ষ্য রাখা হচ্ছে বন্দরের সাথে সহজ ও সাবলীল যোগাযোগ প্রতিষ্ঠার বিষয়টিও। পণ্য উৎপাদন ব্যয়ের সাথে পরিবহন ব্যয় যুক্ত হয়েই নির্ধারিত হয় পণ্যের দাম। ফলে পরিবহন ব্যয় বাড়লে স্বাভাবিকভাবেই পণ্যের দামও বাড়বে। তার প্রভাব পড়বে বাজারের ওপর। এ কারণে উৎপাদিত পণ্য নির্বিঘেœ এবং স্বল্পতম সময়ে রপ্তানি করা এবং অন্যদিকে আমদানি পণ্য হিন্টারল্যান্ডে পৌঁছে দেওয়ার কাজটি সুষ্ঠুভাবে করতে পারাটাই এ মুহূর্তে আমাদের বড় চ্যালেঞ্জ। সরকারের পরিকল্পনা উৎপাদন কেন্দ্রগুলো উপকূলীয় বন্দরগুলোর কাছাকাছি স্থাপন করা। এ লক্ষ্যে উপকূলীয় অঞ্চলে বেশ কয়েকটি নতুন বন্দর ও টার্মিনাল নির্মাণের কাজ চলছে। পাশাপাশি এখন আমাদের আরো যে কাজটি করতে হবে, তা হচ্ছে নিকট এবং দূরবর্তী শিল্পাঞ্চল বা উৎপাদনকেন্দ্রের সাথে বন্দরের মজবুত যোগাযোগ অবকাঠামো গড়ে তোলা। রপ্তানিতে প্রতিযোগিতাসক্ষমতা ধরে রাখতে হলে পণ্যের গুণগত মানের পাশাপাশি লিড টাইম কমিয়ে আনা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এজন্য শক্তিশালী যোগাযোগ অবকাঠামো এবং দক্ষ বন্দরের কোনো বিকল্প নেই। সিঙ্গাপুর একটি বন্দরনির্ভর দেশ, দক্ষতাই যাকে তুলে দিয়েছে সাফল্যের শীর্ষে। আমদানি পণ্য দক্ষতার সাথে খালাস এবং দ্রুততার সাথে হিন্টারল্যান্ডে পাঠানো কিংবা রপ্তানি পণ্য দক্ষ ব্যবস্থাপনায় দ্রুততম সময়ে জাহাজে তুলে দেওয়ার কার্যক্রমে সামান্য দুর্বলতা থাকলেও পরোক্ষভাবে তার নেতিবাচক প্রভাব পড়বে দেশের অর্থনীতিতে। সরকারের সুবিবেচনাপ্রসূত সিদ্ধান্তে এসব ঝুঁকি উত্তরণে এ মুহূর্তে কাজ করে যাচ্ছি আমরা। এ মুহূর্তেও চলমান রয়েছে অনেকগুলো প্রকল্প, যার লক্ষ্য বন্দর অবকাঠামোর আধুনিকায়ন এবং এর কাজের পরিধির আরো সম্প্রসারণ।
আমাদের অর্থনীতি দিন দিন বড় হচ্ছে। সেই সাথে বাড়ছে চট্টগ্রাম বন্দরের কনটেইনার হ্যান্ডলিং চাহিদাও। ক্রমবর্ধমান এ চাহিদার সাথে তাল মেলাতে বন্দরকেন্দ্রিক পরিকল্পনা কী?
করোনাকাল বাদ দিলে কয়েক বছর ধরে দুই অংকের প্রবৃদ্ধি হচ্ছে চট্টগ্রাম বন্দরের। ছয় বছরে কনটেইনার হ্যান্ডলিং দ্বিগুণের বেশি বাড়ার পেছনে ভূমিকা রেখেছে চট্টগ্রাম বন্দরের অব্যাহত সামর্থ্য বৃদ্ধি। কার্গো পরিবহন খাতে ছন্দ ফিরিয়ে আনা, শুল্ককাঠামোর প্রতিবন্ধকতা কাটিয়ে ওঠার কারণে এই অর্জন সম্ভব হয়েছে।
প্রেক্ষিত পরিকল্পনা ২০৪১-এ নির্ধারিত অভীষ্টে পৌঁছতে হলে অর্থাৎ ২০৪১ সালে উন্নত দেশের কাতারে উন্নীত হতে গেলে আমাদের বন্দরকে আরো বড় ভূমিকা রাখতে হবে। অভীষ্টে পৌঁছতে ২০৩১ সাল নাগাদ ৯ শতাংশ এবং ২০৪১ সাল নাগাদ ৯ দশমিক ৯ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জন করতে হবে আমাদের। আমদানি-রপ্তানিই হবে এক্ষেত্রে প্রধান নিয়ামক। ২০৩১ সাল নাগাদ আমদানিতে ১২ দশমিক শূন্য ৫ ও রপ্তানিতে ১১ দশমিক ৬৫ শতাংশ প্রবৃদ্ধি হবে। ২০৪১ সালে আমদানি প্রবৃদ্ধি হবে ১০ শতাংশ ও রপ্তানি প্রবৃদ্ধি ১১ শতাংশ। বিদ্যমান বন্দর সুবিধায় আমদানি-রপ্তানির এ বিপুল চাপ সামাল দেওয়া যাবে না। সে কারণেই বিদ্যমান বন্দরের সক্ষমতা বাড়ানো হচ্ছে।
বন্দরের ইকুইপমেন্ট বহরে নতুন নতুন যন্ত্রপাতি যুক্ত করার পাশাপাশি পতেঙ্গা উপকূলে ৯০৭ একর জমির ওপর বে-টার্মিনাল নির্মাণ করছে চট্টগ্রাম বন্দর। ২০২১ সালের জুনের মধ্যে টার্মিনালটির নির্মাণকাজ শেষ হবে। এখানে ১৯০ মিটারের চেয়ে বড় এবং সাড়ে ৯ মিটারের বেশি ড্রাফটের জাহাজ ভিড়তে পারবে। ৫ হাজার টিইইউ ক্ষমতাসম্পন্ন মাদার ভেসেলও নোঙর করতে পারবে এখানে। মাতারবাড়ীতে গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মাণের কাজও শুরু হয়েছে। ২০২৫ সালে বন্দরটি কার্যক্রমে আসবে। মোংলা ও পায়রা বন্দরের অবকাঠামো সমৃদ্ধির কাজ চলছে। এছাড়া আমাদের অন্যতম অগ্রাধিকার বে-টার্মিনাল তো আছেই। সব মিলিয়ে বলা যায় আগামী দিনের চাহিদা পূরণে আমরা সঠিক পথেই এগোচ্ছি।
বন্দরকেন্দ্রিক উন্নয়নে সরকারের এই যে বিপুল কর্মযজ্ঞ চলছে অর্থাৎ বিদ্যমান বন্দরগুলোর সক্ষমতা বাড়ানো হচ্ছে, একই সাথে গভীর সমুদ্রবন্দরও নির্মাণ করা হচ্ছে। এসবের চূড়ান্ত লক্ষ্য কী?
মাননীয় প্রধানমন্ত্রী যেমনটা বলেছেন, ২০৪১ সালের মধ্যে আমরা উন্নত দেশের কাতারে পৌঁছতে চাই। উন্নত দেশের কাতারে পৌঁছানোর পথে আমরা চট্টগ্রাম বন্দরকে সাব-রিজিয়নাল ট্রান্সশিপমেন্ট হাব হিসেবে দেখতে চাই। বাংলাদেশকে যদি সাব-রিজিয়নাল হাব হিসেবে ঘোষণা করা যায়, তাহলে আমরা লায়াবিলিটিজকে অ্যাসেটে রূপান্তর করতে পারব। সবসময়ই আমি এটা বলে থাকি।
এখন প্রশ্ন হলো কোন কোন বন্দর সাব-রিজিয়নাল ট্রান্সশিপমেন্ট হাব হিসেবে আমাদের বন্দরকে ব্যবহার করবে এবং কেনইবা ব্যবহার করবে? মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দর চালু হলে চট্টগ্রাম, মোংলা ও পায়রা বন্দর একে ফিডার পোর্ট হিসেবে ব্যবহার করবে। আমাদের পাশর্^বর্তী দেশ ভারতের কলকাতা (বর্তমানে শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় বন্দর), হলদিয়া, বিশাখাপত্তনম, কাকিনাড়া ও আন্দামান-নিকবরের অর্থাৎ বঙ্গোপসাগর বেল্টের বন্দরগুলো এটি ব্যবহার করতে পারবে। আমাদের আরেক প্রতিবেশী মিয়ানমারের আকিয়াব, ইয়াঙ্গুন এবং থাইল্যান্ডের ফুকেটসহ আরো দুই-একটি ছোট বন্দরও এটি ব্যবহার করতে পারবে। অর্থাৎ এ বন্দরগুলো হবে মাতারবাড়ীকেন্দ্রিক। এখন প্রশ্ন হচ্ছে কেন তারা মাতারবাড়ী ব্যবহার করবে? কারণ এই অঞ্চলের বন্দরগুলোর মধ্যে মাতারবাড়ীর ড্রাফট সবচেয়ে বেশি। ১৮ মিটার ড্রাফট হওয়ায় ১০ হাজার টিইইউ কনটেইনার ধারণক্ষমতার জাহাজ ভিড়তে পারবে এখানে।
বর্তমানে সিঙ্গাপুরকে আমরা ট্রান্সশিপমেন্ট হাব হিসেবে ব্যবহার করি। বাংলাদেশ, ভারত, মিয়ানমার সবাই সিঙ্গাপুরকেই ট্রান্সশিপমেন্ট হাব হিসেবে ব্যবহার করে। কলম্বো বা তানজাং পেলেপাস থেকেও আমরা পণ্য আনি। এসব বন্দর থেকে একটি জাহাজে ১ হাজার ২০০ থেকে ১ হাজার ৮০০ টিইইউ কনটেইনার আনা হয়। এর পরিবর্তে ১০ হাজার টিইইউ কনটেইনার আনা গেলে ৪০ থেকে ৫০ শতাংশ ফ্রেইট কমে যাবে। ব্যবসায়ীরা তখন এমনিতেই মাতারবাড়ী বন্দরকে বেছে নেবেন। কারণ, খরচ সাশ্রয়ের পাশাপাশি পণ্যের ডেলিভারিও তারা দ্রুত পাবেন। সুতরাং এই বন্দর হবে ট্রান্সশিপমেন্ট হাবের সার্ভিস পোর্ট এবং আমরা সেই আশা করতেই পারি। এজন্য মাননীয় প্রধানমন্ত্রী আমাদের সুনীল অর্থনীতিকে, আমাদের মেরিটাইম সেক্টরকে ঢেলে সাজানোর যে মহাকর্মযজ্ঞ নিয়েছেন এবং তার যে ভিশন, তা বাস্তবায়ন করতে পারলে আমরা আমাদের অভীষ্ট লক্ষ্য, অর্থাৎ ২০৪১ সালের মধ্যে উন্নত বিশে^র কাতারে পৌঁছে যাব। তখন সেটা আর স্বপ্ন থাকবে না, বাস্তবে রূপায়িত হবে।
বিশ্বে ল্যান্ডলর্ড পোর্ট মডেল একটি পরীক্ষিত মডেল, যেখানে প্রতিষ্ঠিত কর্তৃপক্ষের পাশাপাশি বন্দর কার্যক্রম পরিচালনায় একটি বড় ধরনের ভূমিকা পালন করে বেসরকারি খাত। বিশ্বের বহু দেশে সাফল্যের উদাহরণ তৈরি করেছে এই মডেল। বাংলাদেশে বন্দর খাতের উন্নয়নে বেসরকারি খাতের অংশগ্রহণ উদ্বুদ্ধ করতে ঠিক কী জাতীয় পরিকল্পনা রয়েছে কর্তৃপক্ষের?
ল্যান্ডলর্ড পোর্ট মডেলে বন্দরসেবা প্রদান কার্যক্রম পরিচালনার দায়িত্বে থাকে বেসরকারি খাত, যারা নিজেরাই তাদের প্রয়োজনীয় উপরিকাঠামো, যেমন টার্মিনালে কার্গো হ্যান্ডলিং ইকুইপমেন্ট সংগ্রহ, ব্যবহার ও সংরক্ষণের কাজ করে। আমদানি-রপ্তানির ক্রমবর্ধমান চাহিদা সামাল দিতে বাংলাদেশ সরকারও ল্যান্ডলর্ড পোর্ট মডেল বাস্তবায়নের বিষয়টি গুরুত্বসহকারে বিবেচনা করছে। অনুরূপ এক সিদ্ধান্ত নিয়ে ভারত সরকারও কিছুদিন আগে রাষ্ট্রায়ত্ত ১২টি বন্দরের মধ্যে ১১টি আরো দক্ষতার সাথে পরিচালনার স্বার্থে দায়িত্বভার ছেড়ে দিয়েছে বেসরকারি খাতের হাতে। বিশ্বব্যাংকও সম্প্রতি তাদের এক প্রতিবেদনে এ ধারণার প্রতি সমর্থন ব্যক্ত করে বলেছে, বেসরকারি খাতের অংশগ্রহণ বাড়িয়ে এখনই এবং অদূর ভবিষ্যতে বাংলাদেশ ও তার দক্ষিণ এশীয় প্রতিবেশীরা বিপুল পরিমাণ লাভবান হতে পারে। বৈশি^ক বাজার থেকে বড় সাফল্য ঘরে তুলতে পারে।
সপ্তম পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনায় বন্দর খাতের বিকাশ এবং সমুদ্র সম্ভাবনা কাজে লাগাতে এ খাতে বেসরকারি বিনিয়োগ আকর্ষণের কথা বলা হয়। অষ্টম পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনায়ও খাতটিতে বেসরকারি বিনিয়োগের কথা জোর দিয়ে বলা হয়েছে। এক্ষেত্রে সুনির্দিষ্ট কোন কোন খাতে বেসরকারি বিনিয়োগ তুলনামূলক লাভজনক হবে বলে মনে করেন? পাশাপাশি সপ্তম পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনায় নির্ধারিত লক্ষ্যগুলো অর্জনের বিষয়টি কীভাবে মূল্যায়লন করবেন? অষ্টম পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনার নির্ধারিত লক্ষ্যগুলো অর্জনের বিষয়েইবা কী ভাবছেন?
প্রথমত অবকাঠামো খাত উন্নয়নের বিপুল বিনিয়োগের সুযোগ রয়েছে এখানে। আমদানি-রপ্তানি গতিশীল করতে বন্দর অবকাঠামো সম্প্রসারণ করা যেমন জরুরি, তেমনি এর অবকাঠামো সামার্থ্য বাড়ানো, যেমন আরো বেশি অটোমেশনের মাধ্যমে বন্দরের দক্ষতা বৃদ্ধি, বৈশি^ক বিধানের সাথে সঙ্গতি রেখে তাকে আরো পরিবেশবান্ধব করে তোলা ইত্যাদিও জরুরি। আমাদের মূল কাজ কার্গো আনা-নেওয়ায় স্বাচ্ছন্দ্য নিশ্চিত করা। এসব খাতে বেসরকারি বিনিয়োগ স্বভাবতই লাভজনক হবে। নীতিমালা প্রণয়ন ও অন্যান্য সমর্থন নিশ্চিত করবে সরকার। বস্তুত আমাদের এখানে প্রায় প্রতিটি খাতেই বেসরকারি বিনিয়োগের ব্যাপক সম্ভাবনা রয়েছে।
পরিবহন এবং লজিস্টিক খাতেও দক্ষতা ও গতিশীলতা সূচনার ব্যাপক সুযোগ রয়েছে। অভিজ্ঞ কোম্পানির সাথে যৌথ উদ্যোগ গ্রহণ একটি চমৎকার বিকল্প হতে পারে এক্ষেত্রে। বহুজাতিক কোম্পানিগুলোর সাথে বাণিজ্যের ক্ষেত্রে এখানকার সড়ক এবং রেলের ফ্রেইট পরিবহন কোম্পানিগুলো অভ্যন্তরীণ শিপিং লাইনগুলোর সাথে অংশীদারিত্ব গড়ে তুলতে পারে। ঢাকা ও চট্টগ্রামের মধ্যে নতুন ধরনের বার্জ-সার্ভিস চালু করা সম্ভব হলে সড়কপথে ট্রাকযোগে কার্গো পরিবহনের ওপর চাপ কমবে। ফলে নৌপথের ব্যবহার বাড়লে লজিস্টিক পরিস্থিতির উন্নতি ঘটবে। এ মুহূর্তে অর্থনৈতিক অগ্রযাত্রার এক ঐতিহাসিক সন্ধিক্ষণে রয়েছি আমরা। আমাদের বন্দর, রেল, সড়ক ও নৌপরিবহন সেবাসহ প্রতিটি খাতের অব্যাহত উন্নয়ন নিশ্চিত করা আবশ্যক। আগামী দিনের ‘এশিয়ান টাইগার’ হয়ে ওঠার পথে দেশকে এগিয়ে নিতে আমাদের বেসরকারি খাতও বিনিয়োগের জন্য প্রস্তুত। আমরা, বিশেষত ভাবছি কাস্টমস, অবকাঠামো, লজিস্টিক সেবা প্রদানকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে প্রতিযোগিতা বৃদ্ধি এবং কনটেইনার ট্র্যাকিং ও ট্রেসিং খাতের উন্নয়নের কথা।
সপ্তম পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনায় নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে চট্টগ্রাম বন্দরের সাফল্যের স্বীকৃতি সরকারের তরফ থেকেই দেওয়া হয়েছে। সপ্তম পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনার মূল্যায়নেই বলা হয়েছে, চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ তাদের লক্ষ্যমাত্রা পুরোপুরি অর্জন করেছে। অর্জনের দিক দিয়ে কোথাও কোথাও লক্ষ্যমাত্রাকেও ছাড়িয়ে গেছে। অষ্টম পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনায় বাংলাদেশের অর্থনীতির প্রতিযোগিতাসক্ষমতা বাড়াতে বন্দরের দক্ষতা আরো বৃদ্ধির ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর সুদক্ষ দিকনির্দেশনায় আমরা সেটা অর্জন করতে পারব বলে আশাবাদী।
বন্দর নিজেই এক ধরনের লজিস্টিক প্ল্যাটফর্ম, যার কার্যক্রম সুষ্ঠুভাবে চালাতে গেলে অনেকগুলো অংশীজনের সক্রিয় অংশগ্রহণ অপরিহার্য। বন্দর এবং অংশীজনদের মধ্যকার অতি প্রয়োজনীয় এই সমন্বয় প্রতিষ্ঠার কাজটি করছেন কীভাবে?
বন্দর শুধু তখনই তার সেরাটা দিতে পারে যখন তার সাথে সংশ্লিষ্ট প্রতিটি অংশীজন এতে পূর্ণাঙ্গ সমন্বয়ের মাধ্যমে তাদের দায়িত্বটুকু পালন করছেন। বিষয়টি রিলে রেসের মতো। একজন তার দৌড় শেষ করে আপনার হাতে ব্যাটন তুলে দেওয়ার পরই কেবল শুরু হতে পারে আপনার দৌড়। বিজয়ের লক্ষ্যে একাগ্রতা, সমন্বিত প্রয়াস ও সর্বোচ্চ অংশগ্রহণ ছাড়া সাফল্য এখানে অনিশ্চিত। মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ নির্দেশনার ভিত্তিতে ২৪/৭ বন্দর চালু কার্যক্রম আরো জোরদার করা হয়েছে। ঘড়ির কাঁটা ধরে দেশের ‘নীলমণি’ এ বন্দরটিকে সদাপ্রস্তুত রাখতে চাইলে প্রতিটি অংশীজনের অনিবার্য অংশগ্রহণের বিকল্প নেই। ছুটির দিনে সরকারি-বেসরকারি অফিস খোলা রাখার চর্চাটি এখনো জোরালো হতে পারেনি কাজের সব ক্ষেত্রে। আমদানিকারকরা সময়মতো কনটেইনার ডেলিভারি না নেওয়ার কারণে বন্দরে জট বাড়ছে। দুর্বলতা রয়েছে, তবে এগুলো কাটিয়ে ওঠার লক্ষ্যে বাংলাদেশ মান নিয়ন্ত্রণ সংস্থা, বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি কমিশন এবং কোয়ারানটাইন বিভাগের মতো জরুরি অফিসগুলো ২৪ ঘণ্টা খোলা রাখার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। ২৪/৭ সফল করতে বন্দর কর্তৃপক্ষ, কাস্টম অফিস, বিএসটিআই, কোয়ারানটাইন অধিদপ্তর, ব্যাংক এবং অন্যান্য অংশীজনের মধ্যে সমন্বয় আরো বাড়াতে হবে। কার্যক্রম সফল করতে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর সুনির্দিষ্ট নির্দেশনা রয়েছে তিন শিফটে কাজ চালু রাখার। গুরুত্বপূর্ণ অংশীজন হিসেবে ন্যাশনাল বোর্ড অব রেভিনিউ (এনবিআর) ইতোমধ্যেই তাদের ৯৪ জন সহকারী রেভিনিউ কর্মকর্তা এবং ৯ জন সহকারী কমিশনারকে চট্টগ্রামে প্রেরণ করেছেন। অনুরূপ গতিশীলতা দেখা যাচ্ছে অন্যান্য অংশীজনদের মধ্যেও। পাশাপাশি বন্দর জনশক্তির দক্ষতা বৃদ্ধি ও কার্যক্রমে গতিশীলতা আনার লক্ষ্যে মধ্যম এবং দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা রয়েছে কর্তৃপক্ষের। কাস্টম হাউস, সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট, ফ্রেইট ফরোয়ার্ডারসহ সকল অংশীজনকে ২৪ ঘণ্টা তিন শিফটে কাজ করতে হবে।
উন্নত বিশ্বের অধিকাংশ বন্দরে কাস্টমসের আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করা হয় বন্দর চত্বরের বাইরে, কিন্তু চট্টগ্রাম বন্দরের ক্ষেত্রে তা ভিন্নরূপ। বন্দরের ভেতর কাস্টমস ডেলিভারি এবং পরীক্ষণ কার্যক্রমের কারণে বন্দরের স্বাভাবিক গতিশীলতা ক্ষুণœ হচ্ছে। এ অবস্থা উত্তরণের লক্ষ্যে কী ধরনের পরিকল্পনা রয়েছে আপনার?
বন্দর এলাকা থেকে এফসিএল কার্গোর আনস্টাফিং কিংবা দ্রুত ডেলিভারি নিশ্চিত করতে অফ-ডক সুবিধা বিনির্মাণের ওপর জোর দিয়েছে সরকার। এগুলো হতে পারে বেসরকারি কনটেইনার ফ্রেইট স্টেশন (সিএফএস) কিংবা ইনল্যান্ড কনটেইনার ডিপো (আইসিডি)। বর্তমানে ১৭টি বেসরকারি আইসিডি রয়েছে চট্টগ্রাম বন্দরের কাছাকাছি। এসব স্থাপনায় কাস্টমস আনুষ্ঠানিকতার পাশাপাশি রাখা হয় স্বল্প-ঝুঁকির আমদানি পণ্য এবং খালি হওয়া কনটেইনার। তারা ৩৭টি পণ্যের আনস্টাফিং এবং ডেলিভারি দিতে পারে। চট্টগ্রাম বন্দরের ওপর বর্তমান চাপ কমাতে আরো অন্তত ১২-১৩টি বেসরকারি আইসিডি গড়ে তোলার কথা ভাবা হচ্ছে। বন্দরের জট কমাতে বেসরকারি খাতে আরো আইসিডি এবং আইসিটি (ইনল্যান্ড কনটেইনার টার্মিনাল) নির্মাণের অনুমোদন দিতে যাচ্ছে সরকার। ঢাকা ও তার আশপাশের আইসিটিগুলো নৌপথে ঢাকা থেকে চট্টগ্রামে পণ্য পৌঁছে দেওয়ার কাজ করছে। চট্টগ্রাম বন্দরের সাপ্লাই চেইনের ওপর চাপ কমাতে ও তাকে আরো গতিশীল করতে আন্তরিক প্রতিশ্রুতিবদ্ধ রয়েছে সরকার। আমি নিশ্চিত, যে আমাদের সম্মিলিত এসব প্রয়াসে সামনের দিনগুলোতে ব্যবসায়ের খরচও আশাতীত পরিমাণে কমে যাবে।
চট্টগ্রাম বন্দরের চেয়ারম্যান হিসেবে যোগদানের আগে আপনি মোংলা বন্দরের দায়িত্ব পালন করেছেন। সাম্প্রতিক সময়ে আমরা মোংলা বন্দরকে কর্মচঞ্চল এক বন্দর হিসেবে দেখছি। বন্দরটির প্রতি ব্যবহারকারীদের এ আগ্রহের কারণ কী?
করোনা মহামারির মধ্যে মোংলা বন্দর কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যানের দায়িত্ব দেওয়া হয় আমাকে। মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর কাছে আমি কৃতজ্ঞ যে দুর্যোগকালীন সময়ে আমার ওপর আস্থা রেখে মোংলা বন্দর পরিচালনার গুরু দায়িত্ব তিনি আমাকে দিয়েছিলেন। আমি উনার এই আস্থার সম্মান রাখার চেষ্টা করেছি। চট্টগ্রাম বন্দরের সদস্য (হারবার) হিসেবে আমার যে অভিজ্ঞতা ছিল সেটা আমি মোংলা বন্দরে কাজে লাগিয়েছি।
আপনারা জানেন, দীর্ঘদিন যাবৎ মোংলা বন্দর একটি লোকসানি বন্দর। ৭০ বছরের পুরনো মৃতপ্রায় বন্দরটিকে জাগিয়ে তোলা ছিল আমার জন্য বিরাট একটা চ্যালেঞ্জ। দায়িত্ব নেওয়ার পর দেখলাম বন্দরে ঠিকমতো জাহাজ আসে না। এর কারণ অনুসন্ধান করে প্রথমেই যে সমস্যাটা দেখলাম তা হলো নাব্যতা সংকট। বন্দরের ব্যবস্থাপনাও বেশ দুর্বল ছিল। দেখা গেল, একই জায়গা থেকে অ্যাপ্রাইজিং হচ্ছে, ডেলিভারি হচ্ছে আবার পরীক্ষাও হচ্ছে। এতে বন্দরের উৎপাদনশীলতা কমে যাচ্ছে। এসব সমস্যা চিহ্নিত করার পর একটি আন্তর্জাতিক বন্দর যেভাবে পরিচালিত হয়, মোংলা বন্দরের ক্ষেত্রেও তা চালু করলাম। অ্যাপ্রাইজিং, এক্সামিনেশন, ডেলিভারি, রপ্তানি ও স্টাফিং-আনস্টাফিংয়ের জন্য আলাদা আলাদা ইয়ার্ড করা হলো। এতে বন্দরের কার্যক্রম একটা শৃঙ্খলায় চলে এল এবং বন্দরের উৎপাদনশীলতা বেড়ে গেল।
আরেকটা কাজ যেটা করলাম তা হলো আউটার বারে ক্যাপিটাল ড্রেজিং নির্ধারিত সময়ের এক মাস আগেই শেষ করে ফেললাম। ফলে হারবার এলাকার নাব্যতা বেড়ে গেল। আমাদের ওয়েবসাইট ও আন্তর্জাতিক নেটওয়ার্ককে কাজে লাগিয়ে সবাইকে আমরা বোঝাতে সক্ষম হলাম যে, বন্দরে সাড়ে ৯ মিটার থেকে ১০ মিটার ড্রাফটের জাহাজ আনা সম্ভব এবং মোংলা বন্দর ব্যবহারের আহ্বান জানালাম। চট্টগ্রাম বন্দরের চেয়েও মোংলা বন্দরের ট্যারিফ যে অনেক কম, সেটাও আমরা তুলে ধরলাম। এতে দেখা গেল এক মাসে ১৩০টির মতো জাহাজ চলে এসেছে। আগে যেখানে বছরে ৫০টি জাহাজ আসত না।
জেটির পাশেও নাব্যতা কম ছিল এবং ৭ থেকে সাড়ে ৭ মিটারের বেশি ড্রাফটের জাহাজ আসতে পারত না। এরপর মেইনটেন্যান্স ড্রেজিংয়ের আওতায় বন্দরের নিজস্ব সক্ষমতায় আমরা জেটি হেডে ড্রেজিং করলাম। এর মধ্য দিয়ে ৮ থেকে সাড়ে ৮ মিটারের জাহাজ জেটি হেডে আনার চেষ্টা করলাম এবং তাতে আমরা সফলও হলাম।
মোংলা বন্দর কর্তৃপক্ষ বর্তমানে আমদানি ও রপ্তানিকারকদের সাথে বৈঠক ও যোগাযোগের মাধ্যমে বন্দরের নাব্যতা বৃদ্ধিসহ সক্ষমতা বৃদ্ধির বিষয়টি তুলে ধরছে। অবকাঠামো উন্নয়নসহ বিভিন্ন ধরনের সংস্কার এনে বন্দরে পণ্য ডেলিভারি ও জাহাজীকরণ কাজে আমূল পরিবর্তন এনে বন্দরকে গতিশীল করা হয়েছে। এর ফলে দ্রুততম সময়ে পণ্য খালাস করা সম্ভব হচ্ছে। পণ্যের নিরাপত্তার জন্য বন্দরের স্থাপনাসমূহকে সিসিটিভির আওতায় আনা হয়েছে। বন্দরে নতুন নতুন কনটেইনার ও কার্গো হ্যান্ডলিং যন্ত্রপাতিও সংযোজন করা হয়েছে। বন্দরের ট্রাফিক, মেকানিক্যাল ও মেরিন বিভাগের কর্মকা-কে ঢেলে সাজানো হয়েছে। বন্দরের ব্যবস্থাপনায় আমূল পরিবর্তন আনার পাশাপাশি বন্দরের কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের জবাবদিহির আওতায় আনা হয়েছে। এসবের ফলে ব্যবহারকারীরা মোংলা বন্দর ব্যবহারে আগের চেয়ে অনেক বেশি স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করছেন।
আরেকটি বিষয় এখানে উল্লেখ করার মতো এবং তা হলো খাদ্যসামগ্রী ও গাড়ি আমদানির জন্য মোংলা বন্দর খুবই উপযোগী। ৪০ শতাংশ খাদ্যপণ্য এবং গাড়ি মোংলা বন্দর দিয়ে আমদানির জন্য সরকার একটি এসআরও জারি করেছে। আমরা এটাকে প্রচারের কাজে ব্যবহার করলাম। খাদ্যদ্রব্যের জাহাজকে অগ্রাধিকার দিতে থাকলাম। গাড়িবাহী জাহাজগুলোর ফ্রেইট কমিয়ে দিলাম। ফলে যেসব শিপিং এজেন্ট ও ফ্রেইট ফরোয়ার্ডাররা আগে মোংলা বন্দরের প্রতি অনীহা প্রকাশ করতেন, তারাও এখন বন্দরটি ব্যবহার করছেন এবং জাহাজের সংখ্যা বেড়ে গেছে। মোংলা বন্দরের শেডগুলো এখন গাড়িতে ভরা থাকে। এই গাড়ির কারণে মোংলা বন্দরের রাজস্বও বেড়ে গেছে।
বন্দরের ইনার বারের ড্রেজিংয়ের কাজও শুরু হয়েছে। এটা শেষ হলে জেটিতে ৯-১০ মিটার ড্রাফটের জাহাজ ভিড়তে পারবে। এছাড়া সেতু চালু হলে সড়কপথে ঢাকা ও উত্তরবঙ্গের সাথে মোংলা বন্দরের দূরত্ব সবচেয়ে কম হবে এবং পদ্মা সেতুর ওপর দিয়ে পণ্যবাহী গাড়ি নেপাল, ভুটানসহ আমাদের পার্শ্ববর্তী দেশে চলে যাবে। মোংলা বন্দরের গুরুত্ব তখন অন্য মাত্রায় পৌঁছে যাবে। তবে এক্ষেত্রে চ্যালেঞ্জ হলো বন্দরের যে নাব্যতা আমরা তৈরি করেছি সেটি ধরে রাখা। এজন্য নিয়মিত মেইনটেন্যান্স ড্রেজিং করতে হবে।
জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের ব্লু-ইকোনমি সেলের সদস্য হিসেবে অর্থনীতির নতুন এই ফ্রন্টটি নিয়ে কাজ করেছেন আপনি। নৌসদর দপ্তরের পরিচালক (ব্লু-ইকোনমি) থাকাকালেও খাতটি নিয়ে কাজ করার সুযোগ হয়েছে আপনার। ব্লু-ইকোনমিতে বাংলাদেশের সম্ভাবনা এবং তা কাজে লাগাতে আমাদের প্রস্তুতি সম্পর্কে কিছু বলুন।
মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দূরদর্শী নেতৃত্বে ২০১২ সালে মিয়ানমার ও ২০১৪ সালে ভারতের সাথে সমুদ্রসীমা-সংক্রান্ত বিরোধ শান্তিপূর্ণভাবে নিষ্পত্তির মধ্য দিয়ে বঙ্গোপসাগরের ১ লাখ ১৮ হাজার ৮১৩ বর্গকিলোমিটারজুড়ে বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। এর মধ্য দিয়ে সামদ্রিক মৎস্য আহরণ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ, শিপিং, মেরিন পর্যটনকেন্দ্রিক অর্থনৈতিক সম্ভাবনার নতুন দুয়ার উন্মোচিত হয়েছে। সঠিক গবেষণা ও দক্ষ মানবসম্পদ সৃষ্টির মাধ্যমে অমূল্য এ সম্পদ আহরণ করতে হবে। এ লক্ষ্যে কাজও শুরু হয়েছে। গভীর সমুদ্রে মৎস্যসম্পদের জরিপে আরভি মীন সন্ধানী ২০১৬ সালেই বাংলাদেশে এসেছে এবং জরিপকাজ চলছে। চলছে গভীর সমুদ্রে তেল-গ্যাস অনুসন্ধানের কাজও। সমুদ্রগামী জাহাজ শিল্পেও একটা জাগরণ তৈরি হয়েছে। বাংলাদেশ শিপিং করপোরেশনের পাশাপাশি বেসরকারি উদ্যোক্তারাও এ খাতে বড় বিনিয়োগ নিয়ে এগিয়ে আসছে। জাহাজ আমদানিতে সরকারের নীতিসহায়তা এক্ষেত্রে বিশেষ ভূমিকা রাখছে। সমুদ্রগামী জাহাজের বহর শক্তিশালী হলে পণ্য পরিবহন বাবদ জাহাজভাড়ার উল্লেখযোগ্য অংশ দেশে রাখা সম্ভব হবে, যা অর্থনীতিতে বাড়তি শক্তি জোগাবে।
বন্দরবার্তাকে সময় দেওয়ার জন্য আপনাকে অশেষ ধন্যবাদ
বন্দরবার্তাকেও ধন্যবাদ। শুরু থেকেই আপনারা বন্দরবার্তাকে একটি সময়োপযোগী ও মানসম্মত কনটেন্টসমৃদ্ধ প্রকাশনা হিসেবে এগিয়ে নিয়েছেন। প্রকাশের ধারাবাহিকতা বজায় রেখে বন্দরবার্তা বাংলাদেশের মেরিটাইম খাতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখবে বলেই আমার বিশ্বাস।
অব্যাহতভাবে বরফ গলতে থাকায় জাহাজ চলাচলের জন্য উন্মুক্ত হয়ে পড়ছে আর্কটিক। এই সুযোগে অধিক সংখ্যক জাহাজ এর জলপথ পাড়ি দিচ্ছে। পাড়ি দেওয়ার সময় এসব জাহাজ জলবায়ুর উষ্ণতার জন্য দায়ী বিভিন্ন উপাদান ছড়িয়ে দিচ্ছে আর্কটিকের পরিবেশে। ফলে তা আর্কটিক ও তার বাস্তুতন্ত্রের জন্য আরও বিপর্যয় বয়ে আনছে।
বরফাচ্ছাদিত অঞ্চলটির সাইবেরিয়ার উপকূল বরাবর ব্যস্ততম লেনটি দিয়ে ২০১৬ থেকে ২০১৯ সাল পর্যন্ত জাহাজ চলাচল ৫৮ শতাংশ বেড়েছে। নরওয়ের নর্ড ইউনির্ভাসিটির সেন্টার ফর হাই নর্থ লজিস্টিকসের গবেষকদের সংগৃহীত উপাত্ত বলছে, গত বছর নর্দান সি রুট দিয়ে বিভিন্ন ধরনের জাহাজ সাকল্যে ২ হাজার ৬৯৪টি যাত্রা করেছে।
এই পথে বাণিজ্য পরিচালিত করছে মূলত রাশিয়া, চীন ও কানাডার পণ্য উৎপাদকরা। আর্কটিকের জলপথ দিয়ে আকরিক লোহা, তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) ও অন্যান্য জ্বালানি পাঠাচ্ছে তারা।
কোভিড-১৯ মহামারি বিশ্বব্যাপী জাহাজ চলাচলের গতি কমিয়ে আনলেও আর্কটিক দিয়ে জাহাজের চলাচলে রাশ টানতে পারেনি। বরং ২০২০ সালের প্রথমার্ধে জলপথটি দিয়ে জাহাজগুলো ৯৩৫টি যাত্রা সম্পন্ন করেছে। যদিও পূর্ববর্তী বছরের একই সময়ে অর্থাৎ জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত যেখানে ৮৫৫টি যাত্রা সম্পন্ন করেছিল জাহাজগুলো।
আর্কটিকে জল মাড়িয়ে জাহাজ চলাচলের এই যে উল্লম্ফন, তাতে চাপ বাড়ছে পরিবেশের ওপর। বৃহদাকারের এইসব জাহাজ জ্বালানি পোড়ানোর মাধ্যমে জলবায়ুকে উষ্ণ করার জন্য দায়ী কার্বন ডাই-অক্সাইড ও ব্ল্যাক সুট (জ্বালানি অসম্পূর্ণ দহনের ফলে সৃষ্ট কালো দ্রব্য) পরিবেশে ছেড়ে দিচ্ছে। এসবে সুট আশপাশের বরফগুলোকে ঢেকে দিচ্ছে এবং সূর্য্যরশ্মি প্রতিবিম্বিত হয়ে বায়ুমণ্ডলে ফিরে আসার পরিবর্তে সুটগুলোতে আটকে থাকছে, যা এই অঞ্চলের উষ্ণতা বৃদ্ধিতে গতি সঞ্চার করছে।
এমনিতেই গত তিন দশকে বিশ্বের অন্যান্য অঞ্চল যতটা উষ্ণ হয়েছে, আর্কটিক উষ্ণ হয়েছে অন্তত তার দ্বিগুণ। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এই অঞ্চলের উষ্ণতা বেড়ে যাওয়ার সাথে তাল মিলিয়ে সরকারগুলো আর্কটিকের জলপথ জাহাজ চলাচলের জন্য খুলে দেওয়ার তোড়জোড়ে গতি এনেছে।
ক্লিন আর্কটিক অ্যালায়েন্সের প্রধান উপদেষ্টা সিয়ান প্রায়র যেমনটা বলছিলেন-আর্কটিকের বরফের পরিমাণ কমে যাওয়া এবং একই সাথে এই পথে জাহাজ চলাচল বেড়ে যাওয়াটা উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। ইতিমধ্যেই আমরা সেটা ঘটতে দেখছি।
নর্দান সি রুট দিয়ে চলাচলকারী জাহাজের মধ্যে সংখ্যায় সবচেয়ে বেশি এলএনজি ট্যাংকার। ২০১৯ সালে কেবল এ ধরনের জাহাজই ২ লাখ ৩৯ হাজার টন জ্বালানি পুড়িয়েছে। ২০১৭ সালেও যেখানে এলএনজি ট্যাংকারগুলো পুড়িয়েছিল মাত্র ছয় হাজার টন জ্বালানি। তথ্যটি দিয়েছে অলাভজনক প্রতিষ্ঠান ইন্টারন্যাশনাল কাউন্সিল অন ক্লিন ট্রান্সপোর্টেশন (আইসিসিটি)।
বরফ গলায় রেকর্ড
নর্দান সি রুট এই অঞ্চলের সবচেয়ে ব্যস্ততম জলপথ। শিপিং বিশেষজ্ঞদের হিসাব বলছে, জলপথটি ইউরোপ ও এশিয়ার মধ্যে চলাচলকারী কার্গো জাহাজের সময় অন্ততপক্ষে ১০ দিন কমিয়ে দিয়েছে। আফ্রিকা হয়ে চলাচল করলে কার্গো জাহাজকে যে দূরত্ব পাড়ি দিতে হয়, এই পথে গেলে দূরত্ব তার চেয়ে ছয় হাজার নটিক্যাল মাইল কমে আসে। আর সুয়েজ খালের চেয়ে দূরত্ব কমে ২ হাজার ৭০০ নটিক্যাল মাইল।
স্বল্প দূরত্বের কারণে ২০১৯ সালে আর্কটিকের জলপথ দিয়ে বিভিন্ন জাহাজ সর্বমোট ২ হাজার ৬৯৪টি যাত্রা সম্পন্ন করেছে। ২০১৮ সালে যেখানে এ পথে ২ হাজার ২২, ২০১৭ সালে ১ হাজার ৯০৮ ও ২০১৬ সালে ১ হাজার ৭০৫টি যাত্রা সম্পন্ন হয়েছিল। প্রতি বছর ২০০ থেকে ৩০০টি জাহাজ এই সংখ্যক যাত্রা করেছে।
চলতি বছরের পরিবেশটা একটু অন্যরকম। রাশিয়ার উত্তরাঞ্চলে এ বছর অস্বাভাবিক গরমের কারণে সাইবেরিয়ার বরফখ- আগেভাগেই গলতে শুরু করেছে। বিজ্ঞানীদের ভাষায়, জলবায়ু পরিবর্তনের সাথে সম্পর্কিত এই তাপদাহ জুলাইয়ের শেষ ভাগে এসে নর্দান সি রুট উন্মুক্ত করে দিয়েছে। তবে এলাকাটিতে বরফ গলার পুরোপুরি হিসাব এখনো করে ওঠা যায়নি। গ্রীষ্মকালীন তাপ বরফের স্তরকে আরো সংকুচিত করে আনবে। তখন জাহাজ চলাচলও আরো বেড়ে যাবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
অঞ্চলটির জলপথে জাহাজ চলাচলের সংখ্যার হিসাবে গত বছর ব্যস্ততম মাস ছিল সেপ্টেম্বর। শিপিং ইন্টেলিজেন্স প্লাটফর্ম মেরিটাইম ট্রাফিকের তথ্যমতে, মাসটিতে নর্দান সি রুট অতিক্রম করেছিল মোট ৩৪টি জাহাজ। আগের বছরের একই মাসে যেখানে ২৯টি জাহাজ রুটটি পাড়ি দেয়।
তবে নর্দান সি রুটের বাইরেও জাহাজ চলাচল বাড়তে শুরু করেছে। আন্তঃসরকার সংস্থা আর্কটিক কাউন্সিল ওয়ার্কিং গ্রুপের গবেষণা বলছে, ২০১৯ সালে আর্কটিক অঞ্চলে প্রবেশ করেছে মোট ১ হাজার ৬২৮টি জাহাজ। ২০১৩ সালের তুলনায় এ সংখ্যা ২৫ শতাংশ বেশি।
নর্ড ইউনিভার্সিটির সেন্টার ফর হাই নর্থ লজিস্টিকসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক কিয়েল স্টকভিক বলছিলেন, কয়েক বছর ধরেই আমরা আর্কটিকে জাহাজ চলাচল বাড়তে দেখছি। বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেল ও খনিজ কার্গোর চাহিদা থাকা পর্যন্ত এই প্রবণতা অব্যাহত থাকবে।
স্টকভিকের মতে, বিশেষভাবে বললে, আর্কটিকে জ্বালানি ও খনিজ-সংশ্লিষ্ট প্রকল্প উন্নয়নের ম্ধ্যামে রাশিয়া এই অঞ্চল দিয়ে পরিচালিত বাণিজ্যের নেতৃত্ব দিচ্ছে। রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন ২০২৫ সাল নাগাদ নর্দান সি রুট দিয়ে বার্ষিক আট কোটি টন কার্গো পরিবহনের লক্ষ্য নির্ধারণ করেছেন, বর্তমানে পরিবাহিত কার্গোর যা প্রায় দ্বিগুণ।
দুই মেরুর দুই রকমের গল্প
জাহাজ চলাচলের কারণে আর্কটিকে জলে জ্বালানি ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কাও করছেন পরিবেশবাদীরা। এমনটা হলে বৈরী পরিবেশের কারণে তেল সরানোর কাজ কঠিন হয়ে পড়বে এবং নিঃসরিত জ্বালানি তেল অঞ্চলটির সংবেদনশীল বাস্তুতন্ত্রের ওপর বিরূপ প্রভাব ফেলবে।
এ ধরনের নজির যে একেবারে নেই তা নয়। ১৯৮৯ সালে এক্সন ভালদেজ ট্যাংকার থেকে দক্ষিণ আলাস্কায় অপরিশোধিত জ্বালানি তেল ছড়িয়ে পড়ে এবং ১ হাজার ৩০০ মাইল উপকূলজুড়ে মাসব্যাপী তা থেকে যায়। এতে বিপুল সংখ্যক সামুদ্রিক প্রাণী ও উদ্ভিদ মারা পড়ে।
দুর্ঘটনাটিকে এখন পর্যন্ত মানবসৃষ্ট সবচেয়ে ভয়াবহ পরিবেশগত বিপর্যয় হিসেবে বিবেচনা করা হয়, শেষ পর্যন্ত যা এই অঞ্চলে ডাবল-হাল জাহাজের বিধান তৈরিতে বাধ্য করে।
অ্যান্টার্টিকার জলসীমার সুরক্ষায় রয়েছে কঠোর নিয়ন্ত্রমূলক ব্যবস্থা। দক্ষিণের বিক্ষুব্ধ জলপথে কোনো ধরনের কার্গো চলাচল না করা সত্ত্বেও ২০১১ সালে সেখানে হেভি-গ্রেড জ্বালানি নিষিদ্ধ করা হয়েছে। কিন্তু আর্কটিকের ক্ষেত্রে হয়েছে ঠিক এর উল্টোটা। এই অঞ্চলে জাহাজ চলাচল-সংক্রান্ত যে নিয়ম-কানুন তা একদমই ঢিলেঢালা।
উভয় মেরুর জলপথই নিয়ন্ত্রিত হয় ইন্টারন্যাশনাল মেরিটাইম অর্গানাইজেশনের (আইএমও) পোলার কোড অনুযায়ী। কোডে আর্কটিক অঞ্চল দিয়ে চলাচলকারী জাহাজকে হেভি ফুয়েল অয়েল (এইচএফও) পরিবহনে নিরুৎসাহিত করা হয়। আইএমও এখন চেষ্টা করছে ২০২৪ সালের মধ্যে আর্কটিক অঞ্চল দিয়ে চলাচলকারী জাহাজে এইচএফও পরিবহন ও ব্যবহার দুটোই পুরোপুরি বন্ধ করতে। পরিবেশগত সম্ভাব্য বিরূপ প্রভাব থেকে আর্কটিক অঞ্চলকে বাঁচাতেই এই উদ্যোগ বলে জানান আইএমওর মুখপাত্র।
তবে এর কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন পরিবেশবাদীরা। তাদের যুক্তি, আইএমওর সদস্য দেশগুলো যে খসড়া আইন নিয়ে আলোচনা করছে তাতে আর্কটিক উপকূলবর্তী দেশগুলোর পতাকাবাহী জাহাজকে ২০২৯ সাল পর্যন্ত ছাড় দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। আইনের বড় ধরনের এই ফাঁকফোকর নীতিমালাটিকে কার্যত অর্থহীন করে তুলবে বলে মনে করেন ক্লিন আর্কটিকের উপদেষ্টা সিয়ান প্রায়র।
পরিবেশবাদী এই কর্মী বলেন, উল্লেখযোগ্য সংখ্যক, সুনির্দিষ্ট করে বললে আর্কটিকে চলাচলকারী প্রায় তিন-চতুর্থাংশ জাহাজকে ২০২৯ সালের ১ জুলাই পর্যন্ত কোনো ধরনের নিষেধাজ্ঞার কবলে পড়তে হবে না। বর্তমান খসড়াটি চূড়ান্ত রূপ পেলে এখনকার মতোই নির্বি কার্যক্রম চালিয়ে যেতে পারবে তারা।
এ ধরনের সুযোগ প্রস্তাবিত নীতিমালার উদ্দেশ্যকে নস্যাৎ করবে কিনা?-এই প্রশ্নের উত্তরে আইএমওর মুখপাত্র কেবল বলেন, সংশ্লিষ্ট ফোরামে আলোচনার পর আইএমওর সদস্য দেশগুলোই এই সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
খসড়ায় যত ফাঁকফোকর
আর্কটিকে চলাচলকারী জাহাজে এইচএফওর ব্যবহার বন্ধ-সংক্রান্ত খসড়াটি কার্যকর হবে ২০২৪ সালের ১ জুলাই থেকে। তবে আর্কটিক অঞ্চলের দেশগুলো এই বিধিবিধান থেকে ২০২৯ সালের ১ জুলাই পর্যন্ত অব্যাহত পাবে। এটা আরো অধিক সংখ্যক জাহাজকে এইচএফও ব্যবহারে উৎসাহিত করবে এবং আর্কটিকের পানি দূষণ চলতেই থাকবে। আর্কটিক রক্ষায় এতদিন পর্যন্ত অপেক্ষা করার সুযোগ নেই বলে মনে করছেন পরিবেশবাদীরা।
অলাভজনক প্রতিষ্ঠান ইন্টারন্যাশনাল কাউন্সিল অন ক্লিন ট্রান্সপোর্টেশন (আইসিসিটি) সম্প্রতি একটি গবেষণা প্রকাশ করেছে। সেখানে তারা হিসাব করে দেখিয়েছে, ২০১৯ সালেও যদি নিষেধাজ্ঞা কার্যকর করা যেত তাহলেও আর্কটিকে চলাচলকারী তিন-চতুর্থাংশ জাহাজ এখনো এইচএফও পরিবহন বা জ¦ালানি হিসেবে ব্যবহারের সুযোগ পেত। এখন যেহেতু আর্কটিকে চলাচলকারী জাহাজের সংখ্যা বাড়ছে; স্বাভাবিকভাবেই বলা যায় নিষেধাজ্ঞার বাইরে থাকা জাহাজের সংখ্যাও একইভাবে বাড়বে। এর ফলে হয়তো নিষেধাজ্ঞাটি কার্যকারিতা হারাবে।
আর্কটিকে চলাচলকারী জাহাজে এইচএফও পরিবহন ও ব্যবহার বন্ধের প্রস্তাবটি দিয়েছে ফিনল্যান্ড, জার্মানি, আইসল্যান্ড, নেদারল্যান্ডস, নিউজিল্যান্ড, নরওয়ে, সুইডেন ও যুক্তরাষ্ট্র। প্রস্তাবের পেছনে তাদের যুক্তি হচ্ছে আর্কটিকে কোনোক্রমে যদি তেল নিঃসরণের ঘটনা ঘটে, তাহলে তার পরিণতি হবে ভয়াবহ। আর্কটিকের সংবেদনশীল বাস্তুতন্ত্রের ওপর দীর্ঘদিন এর প্রভাব থেকে যাবে।
কিন্তু রাশিয়া এর বিপক্ষে অবস্থান নেয়। যুক্তি তুলে ধরে তারা বলে, নিষেধাজ্ঞাটি এই অঞ্চলের স্থানীয় জনগণ ও শিল্পের ওপর বিরূপ প্রভাব ফেলবে। কারণ এখানকার প্রত্যন্ত অঞ্চলগুলোতে জ্বালানি তেল, খাদ্য ও অন্যান্য পণ্য পরিবহনের একমাত্র মাধ্যম জাহাজ। তাই তেল নিঃসরণের ঝুঁকি হ্রাসের কথা ভেবে জাহাজে এইচএফও ব্যবহার বন্ধের সিদ্ধান্ত কতটা সুফল বয়ে আনবে, সেটি পরিষ্কার নয়।
রাশিয়ার যুক্তি বিবেচনায় নিয়ে আর্কটিকের উপকূলবর্তী যেসব দেশ তাদের জলসীমায় জাহাজ পরিচালনা করছে, তাদেরকে ২০২৯ সালের জুলাই পর্যন্ত ছাড় দেওয়া হয়েছে খসড়ায়। আইসিসিটির প্রাক্কলন অনুযায়ী, ২০১৯ সালে যদি নিষেধাজ্ঞাটি কার্যকর করা যেত, তাহলে আর্কটিকের জলসীমায় চলাচলের উপযোগী জাহাজের সংখ্যা দাড়াতে ৩৬৬টিতে। এর মধ্যে ৩২৫টিই রাশিয়ার পতাকাবাহী। এসব জাহাজের সবই যে আর্কটিক সম্প্রদায়ের মানুষদের পণ্য সরবরাহে নিয়োজিত, এমনটি নয়। অনেকে আর্কটিক থেকে সম্পদ আহরণ করে অন্যত্র তা পরিবহনও করছে।
আইসিসিটি তাদের গবেষণায় আরো দেখিয়েছে, নিষেধাজ্ঞাটি ২০১৯ সালে কার্যকর হলে এইচএফও পরিবহন কমতো ৩০ শতাংশ। এবং আর্কটিকের জলপথে চলাচলকারী জাহাজের জ্বালানি হিসেবে এর ব্যবহার হ্রাস পেত ১৬ শতাংশ। সেই সাথে কার্বন নিঃসরণ কমতো ৫ শতাংশ। তবে ছাড় না দিলে এর প্রভাবটা হতো ব্যাপক। সেক্ষেত্রে জ্বালানি হিসেবে এইচএফওর ব্যবহার ৭৫ শতাংশ পর্যন্ত কমানো সম্ভব হতো। এর ফলে কার্বন নিঃসরণ হ্রাস করা যেত এক-পঞ্চমাংশের বেশি।
এখন অবস্থা যা দাঁড়াচ্ছে, তাতে করে নতুন নতুন বাল্ক ক্যারিয়ার ও অয়েল ট্যাংকার আর্কটিকের জলে নামছে। অব্যাহতির সুযোগ নিয়ে ২০২৯ সালের জুলাই পর্যন্ত এসব জলযান এইচএফও পরিবহনের পাশাপাশি জ্বালানি হিসেবে তা ব্যবহারও করবে। একে একেবারেই অগ্রহণযোগ্য বলছেন পরিবেশবাদীরা।
ক্লিন আর্কটিক অ্যালায়েন্সের উপদেষ্টা সিয়ান প্রায়রের মতে, চূড়ান্ত খসড়ায়ও যদি অব্যাহতির সুযোগ বহাল থাকে, তাহলে ২০২৪ সালের মাঝামাঝি যখন এটি কার্যকর হবে তখন এর ফল হবে সামান্যই। তাই সব ধরনের অব্যাহতির সুযোগ বাতিল করে নীতিমালাটি আরও কঠোর করতে হবে।
অনড় কোনো তথ্যের ওপর দাঁড়িয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণের অভিজ্ঞতার মুখে আমাদের কতটা পড়তে হয়? ধরুন একটা ছাপা কাগজ, যাতে লিপিবদ্ধ আছে কোনো বন্দরে জাহাজের আগমন ও ছেড়ে যাওয়ার সম্ভাব্য সময়। কিংবা ধরুন বার্থিংয়ের জন্য সংরক্ষিত তালিকা। এসব তথ্যসংবলিত কাগজটি যতক্ষণে ছাপা হচ্ছে, ততক্ষণে হয়তো তথ্যগুলো আর নতুন থাকছে না।
ডিজিটাল উদ্ভাবন এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি পরিসরে গৃহীত হচ্ছে। রিয়েল-টাইম ডেটায় এই প্রবেশ আরো কিছু অন্বেষণের সুযোগ এনে দিচ্ছে, যা কার্যক্রমের প্রথাগত ধরনকেই চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলে দিচ্ছে। আগামী দিনের কোম্পানির সাফল্য তাই কেবল স্মার্ট সিদ্ধান্ত গ্রহণের মধ্যে নিহিত নেই। প্রথাগত ভূমিকা ও পদ্ধতিকে চ্যালেঞ্জ জানানোর মধ্যেও এর সাফল্য লুকিয়ে আছে।
ডিজিটাল ডেটা প্রবাহে ক্রমবর্ধমান প্রবেশগম্যতার ওপর ভিত্তি করে বিভিন্ন শিল্পের সঠিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের সুযোগ তৈরি হচ্ছে। সবকিছুই এখন স্মার্ট হওয়ার দাবি করছে যেমন স্মার্ট শিপ, স্মার্ট পোর্ট, স্মার্ট কোম্পানি ইত্যাদি। বিভিন্ন পক্ষ এখন স্থানীয় ও হরিজোন্টাল তথ্য বিনিময় (কোনো প্রতিষ্ঠানের সমপর্যায়ের কর্মী, বিভাগ ও ইউনিটের মধ্যে একই তথ্য বিনিময়) কমিউনিটি প্রতিষ্ঠায় সামিল হচ্ছে, যাতে করে তারা তথ্য সম্পর্কে হালনাগাদ থাকার সুযোগ পায়। অনেকে এটা করলেও সেটা কি স্মার্ট সিদ্ধান্ত গ্রহণে নিজেদের সক্ষম করে তোলার প্রয়োজনে, অথবা মেরিটাইম পরিবহন সেবায় সত্যিকারের সহযোগিতার ভিত্তিতে, সেই প্রশ্ন কিন্তু থাকছেই।
বলা যায়, মেরিটাইম পরিবহন ব্যবস্থার সর্বোচ্চ সেবা প্রদান সম্ভব হবে না যতক্ষণ পর্যন্ত না অংশগ্রহণকারীরা অর্জন ও সমস্যা, ধারণা সম্পর্কে সঠিক তথ্য সরবরাহ এবং গ্রাহকদের চাহিদার ভিত্তিতে প্রণীত তাদের পরিকল্পনার একক পদ্ধতি তৈরি না করছে। এটা করতে হলে এ খাতের অংশীজনদের সার্বক্ষণিক তথ্য বিনিময়ের কাজটা রপ্ত করতে হবে।
মেরিটাইম শিল্পের প্রকৃতি
মেরিটাইম শিল্পকে প্রায় সময়ই একটি স্বয়ংসম্পূর্ণ ইকোসিস্টেম হিসেবে বিবেচনা করা হয়। এই ইকোসিস্টেমে আছে বহু অংশগ্রহণকারী, যাদের বেশির ভাগই একে অন্যের প্রতিযোগী। একই সাথে সুনির্দিষ্ট কিছু বাজার বা বাণিজ্যের জন্য তারা বিভিন্ন জোটেরও শরিক। এভিয়েশন শিল্পে বিভিন্ন পক্ষ সহযোগিতার যে পদ্ধতি অবলম্বন করে থাকে, মেরিটাইম শিল্পে সে ধরনের একক কোনো কর্তৃপক্ষের অভাব রয়েছে। এটাই এই শিল্পের বিভিন্ন অংশীজনের মধ্যে স্বপ্রণোদিত হয়ে তথ্য বিনিময়কে আবশ্যক করে তোলে, যাতে ডিজিটাল সেবা থেকে উৎসারিত মূল্যের পুরোটা অর্জন করা যায়।
এছাড়া আধুনিক, দক্ষ ও নির্ভরযোগ্য মেরিটাইম সরবরাহ ব্যবস্থা সন্তোষজনকভাবে পরিচালনার জন্য যেটা দরকার হয় তা হলো সক্রিয় অংশীজনদের মধ্যে পারস্পরিক নির্ভরতার স্বীকৃতি দেওয়া। নিজেদের পরিকল্পনাগুলোর মধ্যে সামঞ্জস্য আনতে প্রত্যেকেই তাদের অগ্রগতি ও সমস্যার কথাগুলো যাতে একে অপরের সাথে বিনিময় করতে পারে। কিন্তু ঐতিহাসিকভাবে যেটা হয়ে আসছে তা হলো তথ্যের অপর্যাপ্ততা ও পরিকল্পনা জটিলতার কারণে অনেক অপারেটরই ‘আগে আসলে আগে পাবেন’ নীতিতে চলছে, আদতে যা অদক্ষ ও অনির্ভরযোগ্য। সেই সাথে ব্যয়সাশ্রয়ীও নয়।
মেরিটাইম খাতে স্থাপিত তথ্য-প্রযুক্তি ব্যবস্থার দিকে তাকালেও একই চিত্র দেখা যায়। ব্যবস্থাটি যারা সরবরাহ করছে, তাদের নিয়ন্ত্রণের বাইরে আর কোনো ব্যবস্থার সাথে সংযুক্ত নয় অনেকে। এর ফলে খণ্ডিত ও বাস্তবতাবিবর্জিত অবস্থাগত ধারণার ভিত্তিতে যেসব সিদ্ধান্ত নেওয়া হচ্ছে, তাতে করে অপারেটররা সম্পদের খুব কমই কাজে লাগাতে পারছে। অনেক সময় সম্পদের অপচয়ও হচ্ছে।
সঠিক সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে অবস্থাগত ধারণার গুরুত্ব
স্বয়ংসম্পূর্ণ ইকোসিস্টেমের অংশীজনরা প্রাপ্ত অবস্থাগত ধারণার ওপর ভিত্তি করেই সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে থাকে। এর অর্থ হচ্ছে তথ্য-প্রযুক্তি ব্যবস্থা সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানের জোগান দেওয়া ডেটার বাইরেও অপারেটরদের কাছ থেকে আরো তথ্য ব্যবহার করা হয় এক্ষেত্রে। অবস্থাগত ধারণা এমন একটি বিষয়, তৎক্ষণাৎ সিদ্ধান্ত গ্রহণের চাহিদা পূরণের জন্য যা অত্যাবশক। মেরিটাইম শিল্পকে প্রতিনিয়ত যেহেতু নতুন পরিস্থিতির সাথে মানিয়ে নিতে হচ্ছে, তাই অন্যদের সেবা দিতে অবকাঠামো ও সম্পদ কখন আলাদা করে রাখতে হবে সে-সম্পর্কিত সিদ্ধান্তকে ভিত্তি হিসেবে ব্যবহার করাটা জরুরি। এটা হতে হবে যতটা সম্ভব সাম্প্রতিক তথ্যের ভিত্তিতে, নতুন ও পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে যা প্রতিনিয়ত হালনাগাদ হয়।
তবে বাস্তবতা হলো অনেক তথ্য-প্রযুক্তি ব্যবস্থাতেই জাহাজের আগমন-নির্গমন সময় অথবা ঠিক কোন সময়ে কার্যক্রম শুরুর পরিকল্পনা করা হয়েছে সে সম্পর্কিত তথ্য হালনাগাদ করা হয় না। এটা নির্বিঘ্ন পোর্ট কল প্রক্রিয়াকে বাধাগ্রস্ত করে। মোটকথা, অপারেটর তাদের সিদ্ধান্তের ভিত্তি হিসেবে বিভিন্ন উৎস থেকে যেসব ডেটা ব্যবহার করছে, সময়মতো কার্যক্রম পরিচালনার স্বার্থে সেগুলোর সঠিকতা যাচাই করা সবচেয়ে জরুরি।
মেরিটাইম খাতে কানেক্টেড ডিভাইস যেমন স্মার্ট কনটেইনার এখন দ্রুত বাড়ছে। এর ফলে অতিরিক্ত ও সম্পূরক ডেটা উৎসে প্রবেশগম্যতাও আগামীতে বাড়বে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এসবের পরিপ্রেক্ষিতে সঠিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রয়োজনীয়তা সমহারে বাড়ছে।
পরিস্থিতিটা কেবল বন্দরে জাহাজের সঠিক সময়ে আগমন বা নির্গমন অথবা কোনো আবদ্ধ কিংবা নিয়ন্ত্রিত জলপথ-সংক্রান্ত হতে পারে। তবে সামগ্রিক যে প্রয়োজন তার ভিত্তি বিভিন্ন গ্রাহকের চাহিদামাফিক সমন্বিত ও সন্তোষজনক সেবা প্রদান করা। উদাহরণ হিসেবে পোর্ট কলের কথা উল্লেখ করা যেতে পারে। বিশেষ করে যখন একই সময়ে একই স্থানে একই সেবার চাহিদা তৈরি হয়।
যখন এককভাবে কোনো ঘটনা সম্পর্কে আগাম ধারণা করা হয় তখন প্রাক্কলিত সরবরাহ ব্যবস্থার মধ্যে কিছু সম্ভাবনা থেকে যায়, যেগুলো ভাবনার মধ্যেই আসেনি। অনেক অপারেটরই তাই আগাম ধারণার সঠিকতা বৃদ্ধিতে কাজ করছে এবং ঘটনাগুলো যখন সামনে আসছে, সে অনুযায়ী কর্মকাণ্ড পরিচালনা করছে। বিকল্প ব্যবস্থা প্রত্যক্ষ করা এবং সে অনুযায়ী ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা বদলে নেওয়ার ঠিক বিপরীত এটা। এর মধ্য দিয়ে সত্যিকারের মূল্য তৈরির জন্য যেটা পূর্বশর্ত তা হলো মানদ- এবং প্রবেশগম্যতার একক পদ্ধতি।
শেষ কথা
সহযোগিতামূলক একটি ব্যবস্থার মধ্যে থেকে স্বল্প ও দীর্ঘমেয়াদি স্মার্ট সিদ্ধান্ত গ্রহণের মধ্যেই ভবিষ্যৎ লুকিয়ে আছে। সাম্প্রতিক অভিজ্ঞতায় আমরা দেখেছি, মেরিটাইম শিল্পে বিশেষ কোন ঘটনাটি ঠিক কখন ঘটবে, সে সম্পর্কে আগাম ভবিষ্যদ্বাণী করাটা সত্যিই কঠিন। প্রাথমিক পরিকল্পনা যেহেতু স্থির নয়, তাই পরিকল্পনা প্রতিনিয়ত হালনাগাদ করা প্রয়োজন।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা যেমন বিগ ডেটা অ্যানালিটিকস ও মেশিন লার্নিং পদ্ধতির প্রয়োগে ডেটা বিশ্লেষণের মাধ্যমে এ ধরনের বাধা উতরে যাওয়ার একটা প্রচেষ্টা ইতিমধ্যেই শুরু হয়েছে। এখানেও অমীমাংসিত একটি প্রশ্ন থেকে যাচ্ছে, আর তা হচ্ছে এর মাধ্যমে মেরিটাইম শিল্পের অংশীজনরা তাদের চাহিদা অনুযায়ী অবকাঠামো ও সম্পদের সর্বোচ্চ ব্যবহারে সমর্থ হবে কিনা। মেরিটাইম পরিবহনের বিভিন্ন গ্রাহক যেমন কার্গো মালিক ও সহায়ক অন্যান্য পরিবহন মাধ্যমকে এ ধরনের উদ্যোগ কাক্সিক্ষত নির্ভরতার নিশ্চয়তা দিতে পারবে কিনা সে নিয়েও সংশয় আছে। এ কারণেই ডেটা বিনিময়ের উপযুক্ত পরিবেশ তৈরি করাটা জরুরি, যাতে করে এ শিল্প-সংশ্লিষ্ট কেউ কোনো নতুন তথ্যের সাথে পরিচিত হলে একই পরিবেশের মধ্যে থেকে কমিউনিটির অন্যদের সাথে যেন তা বিনিময় করতে পারে। সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় প্রাক্কলিত ডেটা সামনে আনা, তাতে প্রবেশ করা ও তাকে ব্যবহার করার সম্ভাবনা যে প্রক্রিয়াটিকে চালিত করছে, বিষয়টি তেমন নয়। ডিজিটাল সম্ভাবনার এই নতুন ময়দানে নামতে চাইলে যেটা প্রয়োজন তা হলো পদ্ধতিগুলো হালনাগাদ করে নেওয়ার পাশাপাশি মেরিটাইম শিল্পে দীর্ঘদিন ধরে কার্যক্রম পরিচালনা করে আসছে, এমন প্রতিষ্ঠানগুলোকে নতুন ভূমিকায় অবতীর্ণ হওয়া।
নিলামে বিক্রি করতে না পারায় ৪৮ হাজার ৮৭০ কেজি বিপজ্জনক কেমিক্যাল ধ্বংস করেছে চট্টগ্রাম কাস্টম হাউস। সুনামগঞ্জের ছাতকে লাফার্জ হোলসিম সিমেন্ট কোম্পানির একটি ডিও সাইকেল প্রকল্পে এসব কেমিক্যাল ৬ ডিসেম্বর ধ্বংস করা হয়। প্রায় ১৫ বছরের পুরনো ক্ষতিকর এসব রাসায়নিক চট্টগ্রাম বন্দরের পি শেড থেকে গত ২ ডিসেম্বর তিনটি কাভার্ড ভ্যানে পাঠানো হয়। এ ধরনের রাসায়নিক ধ্বংসের ব্যবস্থা এবং অভিজ্ঞ লোকবল কেবল হোলসিম সিমেন্টের রয়েছে। ফলে সেখানেই ধ্বংসের উদ্যোগ নেওয়া হয়।
কাস্টমসের নিলাম শাখার ডেপুটি কমিশনার ফয়সাল বিন রহমান জানান, ‘‘৪৮ হাজার ৮৭০ কেজি বিপজ্জনক কেমিক্যাল ধ্বংস করতে তিনটি কাভার্ড ভ্যানে সুনামগঞ্জ পাঠানো হয়। প্রতিটি গাড়িতে কাস্টমসের প্রতিনিধি ছিল। পণ্য ধ্বংস করার সংশ্লিষ্ট কমিটির সদস্যরাও উপস্থিত ছিলেন। লাফার্জ হোলসিম সিমেন্ট কোম্পানির একটি ডিও সাইকেল প্রকল্পে ধ্বংসের কারণে দেশে একমাত্র তারাই এ ধরনের কেমিক্যাল ধ্বংসের প্রক্রিয়া রেখেছে।’’
যেকোনো ধরনের পণ্য ধ্বংসের আগে পরিবেশ অধিদপ্তরের কাছে স্থান নির্ধারণের বিষয়ে পরামর্শ চায় কাস্টম কর্তৃপক্ষ। কেমিক্যাল ধ্বংসের জন্য পরিবেশ অধিদপ্তর চট্টগ্রাম কার্যালয়ের অনুমতি চাইলে বিপজ্জনক পণ্য হওয়ায় সিদ্ধান্তের জন্য মহাপরিচালকের অনুমতি চাওয়া হয়। সেখান থেকে সুনামগঞ্জের ছাতকে লাফার্জ হোলসিম সিমেন্ট কোম্পানির ডিও সাইকেল প্রকল্পে এসব কেমিক্যাল ধ্বংসের পরামর্শ দেওয়া হয়।
হালচাষের লাঙল আমদানির ঘোষণা দিয়ে তিন কনটেইনার ভর্তি প্রসাধনসামগ্রী এনেছে এক আমদানিকারক। ঢাকার চকবাজারের ৫/এ গোলাম মোস্তফা লেন ঠিকানার সালেহ ট্রেডিংয়ের নামে সিঙ্গাপুর থেকে ৩০ টন পাওয়ার টিলারের ‘লাঙল’ ঘোষণায় তিন কনটেইনার পণ্য আমদানি করা হয়। গত ১১ জানুয়ারি এমভি এক্সপ্রেস কাবরু জাহাজে কনটেইনারগুলো বন্দরে এলেও খালাসের প্রক্রিয়া শুরু করেনি আমদানিকারক। ১১ মাস বন্দর ইয়ার্ডে ফেলে রাখার পর কাস্টমসের হাতে ১০ ডিসেম্বর জব্দ হয় কনটেইনার তিনটি।
চট্টগ্রাম কাস্টমস গোয়েন্দা দল এআইআর শাখার প্রধান রেজাউল করিম বলেন, ‘‘জাহাজ থেকে নামার পর কনটেইনার তিনটি এত দিন পড়ে থাকায় আমাদের সন্দেহ ঘনীভূত হচ্ছিল। এরপর আমরা নজরদারি বাড়াই। সবার উপস্থিতিতে বন্দর ইয়ার্ডে কনটেইনার খুলে পণ্যের কায়িক পরীক্ষা করা হয়। সেখানে ঘোষণা অনুযায়ী কোনো আমদানি পণ্য (লাঙল) পাওয়া যায়নি।’’ এ সময় লাঙলের পরিবর্তে প্রায় ৫০ টন শর্তসাপেক্ষে আমদানিযোগ্য প্রসাধনসামগ্রী পাওয়া যায়। এর মধ্যে রয়েছে জনসন, সানসিল্ক, ডাভ শ্যাম্পু, পলমোলিভ সোপ, শাওয়ার জেল, ফেয়ার অ্যান্ড লাভলি ক্রিম, জিলেট শেভিং ফোম ইত্যাদি। আটক চালানে ২০ ফুট দীর্ঘ দুটি কনটেইনার এবং ৪০ ফুট দীর্ঘ একটি কনটেইনার রয়েছে। সবমিলিয়ে আড়াই কোটি টাকা শুল্ক ফাঁকির অপচেষ্টা হয়েছিল এ চালানে।
মধ্যপ্রাচ্য, যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের বাজারে ইলিশ মাছ রপ্তানির অনুমোদন চেয়ে গত আগস্ট থেকে নভেম্বর পর্যন্ত চার মাসে ২৬টি প্রতিষ্ঠান বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে আবেদন করেছে। তবে এজন্য মৎস্য অধিদপ্তরের লাইসেন্স থাকা বাধ্যতামূলক হলেও এদের মধ্যে তা আছে কেবল ১২টি প্রতিষ্ঠানের।
মৎস্য অধিদপ্তরের কর্মকর্তাদের মতে, রপ্তানির অনুমোদন শেষ পর্যন্ত দেওয়া হবে কিনা, তা এখন পুরোপুরি নির্ভর করছে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের ওপর। সাধারণত দেশের সীমানা ছাড়িয়ে ইলিশ ভারত পর্যন্ত যায়। তাও পূজা-পার্বণ উপলক্ষেই ভারতে ইলিশ রপ্তানি করে বাংলাদেশ। তাও আবার পুরো ভারতে নয়, পশ্চিমবঙ্গের রাজধানী কলকাতায়। এছাড়া মধ্যপ্রাচ্যের সংযুক্ত আরব আমিরাতেও (ইউএই) কিছু ইলিশ রপ্তানি হয়।
ইলিশ কি এবার ইউরোপ, আমেরিকা ও মধ্যপ্রাচ্যের অন্য দেশগুলোতেও যাবে এমন প্রশ্নের জবাবে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা বলছেন, দেশে বছর বছর ইলিশের উৎপাদন বাড়ছে বলে সমস্যা নেই। এতে কিছু বৈদেশিক মুদ্রা আয় হবে এমন আশার কথাই বলছেন তাঁরা।
বাণিজ্য সচিব মো. জাফর উদ্দীন বলেন, ‘‘এখন পর্যন্ত কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি। আবেদনগুলো অনুমোদন করা যায় কিনা, সেজন্য আমরা তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ করছি। এ ব্যাপারে মৎস্য অধিদপ্তরে চিঠিও পাঠিয়েছি।’’
মৎস্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, দেশে ২০১৪-১৫ অর্থবছরে ৩ লাখ ৮৭ হাজার টন ইলিশ ধরা পড়েছিল। ২০১৮-১৯ অর্থবছরে তা বেড়ে হয়েছে ৫ লাখ ৩৩ হাজার টন।