Home Blog Page 266

বাংলাদেশের মেরিটাইম বিষয়ক চর্চাকে এগিয়ে নিতে সারথির ভূমিকায় চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ

প্রিয় পাঠক, সময় পরিক্রমায় আমরা পৌঁছেছি ছোট এক মাইলফলকের সামনে- বন্দরবার্তার অর্ধশততম সংখ্যাটি এ মুহূর্তে আপনার হাতে! বাংলাদেশে অপ্রতুল মেরিটাইম বিষয়ক চর্চার পটভূমিতে এ খাতের টেকনিক্যাল ও একাডেমিক নানা বিষয়সমূহ নিয়মিতভাবে বাংলা ভাষায় রচনা ও প্রকাশ নিঃসন্দেহে একটি বড় চ্যালেজ্ঞ। বন্দরবার্তা প্রকাশের মাধ্যমে এদেশে মেরিটাইম জ্ঞানভিত্তি এগিয়ে নিতে সারথির ভূমিকা নিয়েছে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ। ঠিক যে মুহূর্তে বাংলাদেশের মেরিটাইম শিল্প একটি বড় পরিবর্তনের সামনে দাঁড়িয়ে, গভীর সমুদ্রবন্দর থেকে সমুদ্র অর্থনীতির সুবিশাল কর্মযজ্ঞ, উচ্চ আয়ের দেশ হওয়ার পথে যে মেরিটাইম খাত থেকে পেতে হবে সবচেয়ে বড় সহযোগিতা- আমাদের অভিনিবেশ স্বার্থক হবে যদি বন্দরবার্তা সেখানে কিছুটা হলেও ভূমিকা রাখতে পারে। বন্দর কর্তৃপক্ষকে ধন্যবাদ, বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্য আশা জাগানিয়া অতি গুরুত্বপূর্ণ এই খাতটিকে জনপ্রিয় ও সংবেদনশীল করে তোলার স্বতপ্রণোদিত এই মহৎ উদ্যোগ নেওয়ার জন্য।

যে বিশাল কর্মযজ্ঞের সামনে দাঁড়িয়ে এই খাত, সেখানে দক্ষ কর্মশক্তি হিসেবে যথাযথভাবে তরুণদের তৈরি করা একটি অন্যতম চ্যালেঞ্জ। প্রথম থেকেই বন্দরবার্তা চেষ্টা করে যাচ্ছে মেরিটাইম বিষয়াবলির প্রাঞ্জল উপস্থাপনের মাধ্যমে তরুণদের এই খাতটিতে উৎসাহী করে তুলতে। সরকারের আন্তরিক উদ্যোগ, বাংলাদেশের মেরিটাইম খাতের ক্রমোন্নতি ও চ্যালেজ্ঞসমূহ বিশ্লেষণের পাশাপাশি দেশীয় বিনিয়োগকারীদের দৃষ্টি আকর্ষণ এবং নীতিনির্ধারক মহলকে এই খাতের বৈশ্বিক পরিবর্তনের হালনাগাদ তথ্য দিয়ে সহযোগিতা করে চলেছে বন্দরবার্তা।

সাথে থাকার জন্য আমরা কৃতজ্ঞ পাঠকদের কাছে। বন্দরবার্তা ঘিরে আপনাদের উচ্ছ্বাস-উদ্দীপনা আমাদের জুগিয়েছে অবিরাম অনুপ্রেরণা। প্রিয় পাঠক, আপনাদের প্রয়োজনে প্রতিনিয়ত আমরা বদলে ফেলছি বন্দরবার্তাকে- বিষয়সমূহে রাখছি বৈচিত্র্য, গুণগত মানে হয়েছি আরো তাৎপর্যপূর্ণ, অঙ্গসজ্জায় এনেছি নতুনত্ব। বন্দরবার্তা হয়েছে নবীনতর থেকে অভিজ্ঞতালব্ধ। এই সাফল্যের ভাগীদার তাই আপনিও, প্রিয় পাঠক।

বিশ^ অর্থনীতি যখন এখনো করোনাভাইরাস মহামারির বিপর্যয় কাটিয়ে ওঠার উপায় হাতড়ে বেড়াচ্ছে তখনই স্রোতের বিপরীতে বেশ প্রতাপের সাথে ঘুরে দাঁড়িয়েছে বাংলাদেশের অর্থনীতি। দূর্যোগকালে পুরোদমে সচলথাকা বন্দর ব্যবস্থাপনা ও অংশীজনদের সহযোগিতায় দ্রুতই স্বাভাবিক হয়ে উঠেছে আমাদের আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্য। সংকটকালীন সময়েও বাংলাদেশের মেরিটাইম বাণিজ্য আরেকটি সুখবর নিয়ে এসেছে। আন্তর্জাতিক সমুদ্রপথে বাংলাদেশ তার অবস্থান আরো পোক্ত করে নিচ্ছেÑ তরতরিয়ে বাড়ছে লাল সবুজের পতাকাবাহী জাহাজের সংখ্যা। চলতি বছরের প্রথম আট মাসে ১৬টি জাহাজ যুক্ত হয়েছে আমাদের সমুদ্রগামী জাহাজ বহরে। সরকারি ও ব্যক্তি খাত মিলে ৬২টি সমুদ্রগামী জাহাজ এখন পণ্য পরিবহন করছে সুনীল সাগরে। অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে আরো দুটি জাহাজ। স্বাধীনতার পাঁচ দশকে এসে এখন বলাই যায়, মেরিটাইম জাতি হিসেবে পুনরুত্থানের পথে বাংলাদেশ।

সমুদ্রগামী জাহাজ শিল্পের এই উল্লম্ফনের পিছনে প্রভাবকের ভূমিকা পালন করছে বাংলাদেশের পতাকাবাহী জাহাজ (সুরক্ষা) আইন ২০১৯। আইনটি ব্যবসাবান্ধব হওয়ায় বিনিয়োগকারীরা পুনরায় এই খাতে পুঁজি লগ্নি করছেন। এছাড়া করোনার কারণে পুরনো জাহাজের দাম বেশ কমে যাওয়ায় তা আশীর্বাদ হয়ে দেখা দিয়েছে বাংলাদেশের লগ্নিকারকদের কাছে। এবারের প্রধান রচনায় থাকছে বাংলাদেশের সমুদ্রগামী জাহাজ শিল্পের আদ্যোপান্ত।

কোভিড-১৯ মহামারি বিশ্বব্যাপী জাহাজ চলাচলের গতি কমিয়ে আনলেও আর্কটিক দিয়ে জাহাজ চলাচলে রাশ টানতে পারেনি। বৈশ্বিক উষ্ণায়নের ফলে বরফ গলে উন্মুক্ত হয়ে পড়ায় এই অঞ্চলে জাহাজ যাত্রা অস্বাভাবিক হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে। অঞ্চলটির সাইবেরিয়ার উপকূল বরাবর ব্যস্ততম লেনটি দিয়ে ২০১৬ থেকে ২০১৯ সাল পর্যন্ত জাহাজ চলাচল ৫৮ শতাংশ বেড়েছে। করোনাকালীন সময়ে ২০২০ সালের প্রথমার্ধে জলপথটি দিয়ে জাহাজগুলো ৯৩৫টি যাত্রা সম্পন্ন করেছে। পূর্ববর্তী বছরের একই সময়ে যেখানে যাত্রার সংখ্যা ছিল ৮৫৫টি। আর্কটিকে জল মাড়িয়ে জাহাজ চলাচলের এই যে উল্লম্ফন, তাতে চাপ বাড়ছে পরিবেশের ওপর, যা এই অঞ্চলের উষ্ণতা বৃদ্ধিতে গতি সঞ্চার করছে। আর্কটিকে উষ্ণায়ন ও জাহাজ চলাচল নিয়ে বিস্তারিত রয়েছে বিশেষ রচনায়।

মেরিটাইম পরিবহন ব্যবস্থার সর্বোচ্চ সেবা প্রদান সম্ভব হবে না যতক্ষণ পর্যন্ত না অংশগ্রহণকারীরা অর্জন ও সমস্যা সম্পর্কে সঠিক তথ্য সরবরাহ এবং গ্রাহকদের চাহিদার ভিত্তিতে প্রণীত তাদের পরিকল্পনার একক পদ্ধতি তৈরি না করছে। এছাড়া আধুনিক, দক্ষ ও নির্ভরযোগ্য মেরিটাইম সরবরাহ ব্যবস্থা সন্তোষজনকভাবে পরিচালনার জন্য যেটা দরকার হয় তা হলো সক্রিয় অংশীজনদের মধ্যে পারস্পরিক নির্ভরতার স্বীকৃতি দেওয়া। এটা করতে হলে এ খাতের অংশীজনদের সার্বক্ষণিক তথ্য বিনিময়ের কাজটা রপ্ত করতে হবে। বন্দর ও অংশীজনদের মধ্যে নিয়মিত ডেটা বিনিময়ের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে থাকছে বিশেষ প্রতিবেদন।

প্রিয় পাঠক, আপনাদের সাথে নিয়ে বাংলাদেশের মেরিটাইম সমৃদ্ধির পথে এগিয়ে যাব আরো অনেক দূর, সেই প্রত্যাশা রাখছি। সবাইকে বন্দরবার্তা পঞ্চাশতম সংখ্যা উদ্যাপনের শুভেচ্ছা। বাংলাদেশে প্রায়-অকর্ষিত এই পথে আমরা আরো সমৃদ্ধ হব সামনের দিনগুলোতে, এই আশা আর অমূলক নয়।

হাই ফং বন্দর, ভিয়েতনাম

ভিয়েতনামের রাজধানী হ্যানয় থেকে মাত্র ১২১ কিলোমিটার দূরত্বে অবস্থিত হাই ফং বন্দর প্রকৃতপক্ষে একটি পোর্ট গ্রুপ। কুনমিং-লাও চাই-হ্যানয়-হাই ফং ইকোনমিক করিডোরের শেষ প্রান্তে অবস্থিত হওয়ায় চীনের সাথে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোর নৌ যোগাযোগের ক্ষেত্রে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ যোগসূত্র হিসেবে কাজ করে হাই ফং। লয়েড’স থেকে ২০২০ সালে প্রকাশিত ব্যস্ততম কনটেইনার বন্দরের তালিকায় ৩১তম অবস্থানে থাকা উত্তর ভিয়েতনামের বৃহত্তম বন্দর হাই ফং পোর্ট গ্রুপ মূলত পাঁচটি শাখা বা ইউনিটে বিভক্ত। গ্রুপের ইউনিটগুলো হলো চুয়া ভে পোর্ট ব্রাঞ্চ, ট্যান ভু পোর্ট ব্রাঞ্চ, হোয়াং দিউ পোর্ট ওয়ান মেম্বার এলএলসি, হাই ফং পোর্ট মেডিকেল সেন্টার ওয়ান মেম্বার এলএলসি এবং কোম্পানি হাই ফং পোর্ট অপারেশনস টেকনিক্যাল ট্রেনিং ওয়ান মেম্বার এলএলসি। উত্তর ভিয়েতনামের অন্তত ১৭টি প্রদেশ, লাওসের উত্তর ভাগ এবং দক্ষিণ চীনের সাপ্লাই চেইনের অন্যতম শক্তিশালী স্তম্ভ এই বন্দর। 

১৮৭৬ সালে আনুষ্ঠানিকভাবে প্রতিষ্ঠিত হাই ফং বন্দর তার ইতিহাসের গোটা সময়জুড়ে দেশটির উত্তরাঞ্চলের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রবেশদ্বার হিসেবে পরিগণিত হয়েছে। বেতন-ভাতা বৃদ্ধি এবং সুপেয় পানির মৌলিক চাহিদা বন্দোবস্তের দাবিতে ঔপনিবেশিক দখলদারদের বিরুদ্ধে ১৯২৯ সালের নভেম্বরে এক ঐতিহাসিক আন্দোলনে নামেন হাই ফং বন্দরের ডক শ্রমিকরা। শ্রমিক আন্দোলনের ইতিহাসে অন্যতম অর্থবহ ও সংঘবদ্ধ প্রতিবাদের পর নিজেদের দাবি আদায় করে নেন কর্মীরা। দ্বিতীয় বিশ^যুদ্ধে মিত্রপক্ষের কৌশলগত ঘাঁটি হিসেবে ব্যবহার হওয়ার পর ১৯৫৫ সালে ফরাসি শাসনমুক্ত হয় হাই ফং বন্দর। প্রেসিডেন্ট হো চি মিনের নেতৃত্বে এর আধুনিকায়নের কাজ শুরু হয়। ২০১৪ সালে সরাসরি ভিয়েতনাম মেরিটাইম কর্পোরেশনের তত্ত্বাবধানে লিমিটেড লায়াবিলিটি জয়েন্ট স্টক কোম্পানি হিসেবে শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত হয় বন্দরটি।   

হাই ফংয়ের চুয়া ভে পোর্ট ব্রাঞ্চে মোট ৮৪৮ মিটার দৈর্ঘ্যরে পাঁচটি ব্রিজ রয়েছে, যেখানে সাধারণত সাধারণ কার্গো এবং কনটেইনার আসা-যাওয়া করে। বার্ষিক পাঁচ লাখ টিইইউ কনটেইনার ধারণক্ষমতার এ টার্মিনালে সর্বোচ্চ ২০ হাজার ডেড ওয়েট টনের জাহাজ ভিড়তে সক্ষম। ৯৮০ দশমিক ৬ মিটার দৈর্ঘ্যরে ট্যান ভু ব্রাঞ্চে পাঁচটি ব্রিজ থাকলেও আয়তনে এটি চুয়া ভে-এর তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ। ৫৫ হাজার ডিডব্লিউটি সক্ষমতার জাহাজ ভিড়তে পারে এখানকার টার্মিনালে, কনটেইনার ধারণক্ষমতা বার্ষিক ১০ লাখ টিইইউ। সাধারণ কার্গো পণ্যের জন্য বিশেষায়িত হোয়াং দিউ পোর্ট ওয়ান মেম্বার এলএলসিতে রয়েছে মোট ১ হাজার ৩৮২ মিটার দৈর্ঘ্যরে নয়টি ব্রিজ, বার্ষিক ধারণক্ষমতা ৬০ লাখ টন। সর্বোচ্চ ৫০ হাজার ডিডব্লিউটি অফলোডের জাহাজ ভিড়তে পারে এখানে। ক্রুজ শিপ টার্মিনালও রয়েছে হাই ফংয়ে, রাজধানীর একেবারে নিকটে হওয়ায় আন্তর্জাতিক যাত্রীবাহী বন্দর হিসেবেও পরিচিত এটি। 

হাই ফংয়ে আছে তিনটি আলাদা ট্রানশিপমেন্ট এরিয়া। বেন গট-ল্যাক হুয়েন ট্রান্সশিপমেন্ট এরিয়ায় আছে একটি অ্যাংকর পয়েন্ট, যেখানে সর্বোচ্চ ২০ হাজার ডিডব্লিউটি জাহাজ ভিড়তে পারে। হা লং ট্রান্সশিপমেন্ট এরিয়ায় অ্যাংকর পয়েন্ট তিনটি, জাহাজ ভিড়তে পারে ৩০ হাজার ডিডব্লিউটি পর্যন্ত। ল্যান হা ট্রান্সশিপমেন্ট অ্যাংকর পয়েন্ট তিনটি থাকলেও সর্বোচ্চ ৪০ হাজার ডিডব্লিউটি জাহাজকে সেবা দেওয়া হয় এখানে।

বন্দরের সকল টার্মিনালে আগামীতে যেন ৩০ হাজার থেকে ৪০ হাজার ডিডব্লিউটি জাহাজ ডকিং করানো যায়, সেজন্য ব্যাপক উন্নয়নযজ্ঞ চলছে হাই ফংয়ে। উপকূলবর্তী একটি দ্বীপের সাথে মেইনল্যান্ডকে সংযুক্তকারী সেতু নির্মাণের কাজ প্রায় শেষ। সেখানে নতুন একটি বাল্ক টার্মিনাল এবং তিনটি কনটেইনার টার্মিনাল নির্মাণের পরিকল্পনা চূড়ান্ত হয়েছে। নতুন এসব স্থাপনা এবং হাই ফং পোর্ট গ্রুপসহ পুরো বন্দর ব্যবস্থার নাম রাখা হবে ল্যাচ হুয়েন।

ক্রস স্টাফ

প্রাচীন ও মধ্যযুগে বহুল ব্যবহৃত নেভিগেশনাল ইকুইপমেন্ট ক্রস স্টাফ, যাকে স্থানভেদে ফোর-স্টাফ বা জ্যাকব’স স্টাফ নামে ডাকা হতো। খ্রিস্টপূর্ব ৪০০ শতক থেকে শুরু করে ১৮ শতাব্দীর মধ্যভাগ পর্যন্ত সমুদ্রপৃষ্ঠ এবং দিগন্ত রেখায় কোনো বস্তুর উচ্চতা ও দূরত্ব মাপতে নাবিকদের কাছে নির্ভরযোগ্য যন্ত্র ছিল এটি। দিগন্ত রেখার সাথে দিনের বেলায় সূর্য এবং রাতে শুকতারা বা অপর কোনো উজ্জ্বল নক্ষত্র যে কোণ উৎপন্ন করে, সেটি মাপা যায় ক্রস স্টাফের ১০, ৩০, ৬০ ও ৯০ ডিগ্রি কোণ চিহ্নিত ট্রানসম নামক একটি অংশের সাহায্যে। কৌণিক মান জানা থাকলে একজন নাবিক সহজেই নিজের অবস্থান, জাহাজের অভিমুখ, ল্যাটিচিউড এবং লংগিচিউড বের করতে পারেন।

ইতিহাসবিদদের মতে, প্রাচীন মেসোপটেমিয়ার (বর্তমান ইরাক) ক্যালডীয় সভ্যতার নাবিকদের হাতে ক্রস স্টাফের জন্ম হলেও একে নিখুঁত করে তোলার কৃতিত্ব আরবদের। ধীরে ধীরে পারস্য অঞ্চলেও জনপ্রিয় হয়ে ওঠে ক্রস স্টাফ। দ্বাদশ শতাব্দীতে ইউরোপ-এশিয়ার মধ্যবর্তী বাণিজ্য বৃদ্ধি পেলে ক্রস স্টাফ প্রথমে দক্ষিণ, পরে উত্তর ইউরোপেও জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। কাঠের নির্মিত এবং নড়ানো যায় এমন চারটি কাঠের হাতল পরস্পর ছেদ করে যে ক্রস আকৃতি তৈরি করে, তার ছেদন বিন্দুকে চোখের কাছে ধরে একজন নেভিগেটর কোনো কিছুর উচ্চতা নির্ণয় করতে পারেন। ক্রস স্টাফ ব্যবহারে চ্যালেঞ্জও কম ছিল না। সূর্যের দিকে তাকিয়ে যেসব নাবিক নিয়মিত কোণ মাপতেন, তাদের চোখের স্থায়ী ক্ষতি বা দৃষ্টিশক্তি হারিয়ে ফেলার মতো ঘটনা ঘটত প্রায়ই। আবার ক্রস স্টাফ ব্যবহারকারীকে দুদিকে একই সাথে চোখ রাখতে হতো, যন্ত্রের নিচের অংশ দিগন্তে এবং উপরের অংশ সূর্য বা নক্ষত্রের দিকে। নইলে হিসাবে বড় ধরনের গরমিল দেখা দেওয়ার সম্ভাবনা থাকে। ১৭৫০ সালের দিকে অকটেন্ট আবিষ্কার হওয়ার পর ধীরে ধীরে কালের গহ্বরে হারিয়ে যায় ক্রস স্টাফ।

টম ক্রিয়েন

বিশ শতকের একেবারে প্রথমদিকে পরিচালিত তিনটি অ্যান্টার্কটিক অভিযানের সদস্য ছিলেন বিশ্বখ্যাত সমুদ্র অভিযাত্রী টম ক্রিয়েন। আয়ারল্যান্ডের গর্টাকুরাউনে ১৮৭৭ সালে জন্ম নেওয়া এ দুঃসাহসী নাবিক অ্যাডভেঞ্চারের নেশায় মাত্র ১৫ বছর বয়সে পিতা-মাতাকে না বলেই নাম লেখান ব্রিটিশ রয়েল নেভিতে। ১৯০১ সালে নিউজিল্যান্ডে দায়িত্ব পালনের সময় রবার্ট ফ্যালকন স্কটের ১৯০১-১৯০৪ ডিসকভারি জাহাজের অ্যান্টার্কটিক এক্সপিডিশনে যোগ দেন। ১৯০২ সালের শীত মৌসুমে অ্যান্টার্কটিক প্যাক আইসে আটকে যায় ডিসকভারি। জাহাজসহ পুরো শীতকাল বরফে আটকে থাকার পর ১৯০৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে বরফ গলে আসার বদৌলতে ক্রিয়েনসহ বাকি নাবিকেরা মুক্তি পান।

১৯১০ সালে টেরা নোভা এক্সপিডিশনের জন্য আবারো ক্রিয়েনকে বেছে নেন স্কট। অভিযানের এক পর্যায়ে চরম প্রতিকূল অবস্থায় টানা ১৮ ঘণ্টা ট্রেকিং করে সঙ্গী লেফটেন্যান্ট ইভানসের জীবন বাঁচান ক্রিয়েন। অদম্য শারীরিক-মানসিক শক্তি এবং মানবিকতা প্রদর্শনের স্বীকৃতি হিসেবে তাঁকে সম্মানজনক অ্যালবার্ট মেডালে ভূষিত করে ব্রিটিশ সরকার।

১৯১৪ সালে তৃতীয় এবং শেষবারের অ্যান্টার্কটিক অভিযানে টম ক্রিয়েনদের জাহাজ এনডুরেন্সও বরফে আটকে যায় এবং শেষ পর্যন্ত বরফের চাপে চূর্ণ হয়ে যায়। এর আগেই ছোট কয়েকটি লাইফবোটে করে নাবিকেরা জীবন বাঁচান, দাঁড় টেনে উপস্থিত হন এলিফ্যান্ট আইল্যান্ডে। সেখান থেকে টম ক্রিয়েনসহ ছয়জন সাহায্যের আশায় জেমস কেয়ার্ডের লাইফবোটে বেরিয়ে পড়েন। তাদের অসীম বীরত্বপূর্ণ অভিযানের ফলেই এলিফ্যান্ট আইল্যান্ডে আটকে পড়া বাকি ২২ নাবিককে পরবর্তীতে উদ্ধার করা সম্ভব হয়।

১৯৩৮ সালে অ্যাপেনডিক্স ফেটে মৃত্যু হয় এই অসম সাহসী নৌ-অভিযাত্রীর।

ডাইন্যাস্টিস অব দ্য সি: দ্য শিপওনার্স অ্যান্ড ফিন্যানশিয়ারস হু এক্সপান্ডেড দ্য এরা অব ফ্রি ট্রেড

লেখক- লোরি অ্যান লারোকো

আন্তর্জাতিক মুক্ত বাণিজ্য এবং অর্থনৈতিক উন্নয়নের পেছনে সবচেয়ে ক্ষমতাধর অবস্থানে রয়েছে বিশ্ব নৌবাণিজ্যের শীর্ষস্থানীয় শিপিং কোম্পানিগুলো। মোনাকো থেকে হংকং, লন্ডন থেকে এথেন্স, সিঙ্গাপুর থেকে অসলো-পৃথিবীর সর্বত্রই জাহাজমালিক এবং এ খাতে বিনিয়োগকারীরা বহু দিনের প্রচলিত বাণিজ্যের ধারাকে আমূল বদলে বন্দর ব্যবস্থা, শুল্কায়ন প্রক্রিয়াকে আজকের গতিশীল চেহারায় এনেছেন। ব্রাজিলের কৃষিপণ্য আরবে, অস্ট্রেলিয়ার আকরিক লৌহ চীনে, মধ্যপ্রাচ্যের খনিজ তেল আমেরিকায় চলাচলের পথ সুগম করে আক্ষরিক অর্থেই বৈশ্বিক উন্নয়নের মাধ্যমে গোটা পৃথিবীকে এক সুতোয় বেঁধে রেখেছেন তারা। আবার লাভজনক ও গুরুত্বপূর্ণ হওয়ার পাশাপাশি নৌবাণিজ্যের বাজার খুবই অস্থিতিশীল। ভৌগোলিক রাজনীতি, সংস্কৃতি থেকে শুরু করে আবহাওয়ার ধাক্কা সামলে চলতে হয় এখানে বিনিয়োগকারীদের।

এত সব চালেঞ্জ জয় করে কীভাবে আন্তর্জাতিক শিপিং টাইকুন হয়ে উঠেছেন একেক জন? লোইস কর্পোরেশনের জিম টিশ, ফ্রন্টলাইন লিমিটেডের জন ফ্রেডরিকসেন, ন্যাভিওস মেরিটাইম হোল্ডিংয়ের অ্যাঞ্জেলিকি ফ্র্যানগু, টি কে কর্পোরেশনের পিটার ইভানসেন, ড্রেইফাস আর্মেচার গ্রুপের ফিলিপে লুইস-ড্রেইফাস, ডিভিবি ব্যাংকের ড্যাগফিন লুনডে, ওভারসিজ শিপহোল্ডিং গ্রুপের মর্টেন আর্নটজেন, ডব্লিউএল রস অ্যান্ড কোম্পানির উইলবার রসসহ শিপিং ইন্ডাস্ট্রির শীর্ষস্থানীয় বেশ কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের মালিকের জবানিতে লেখা হয়েছে ডাইন্যাস্টিস অব দ্য সি: দ্য শিপওনার্স অ্যান্ড ফিন্যানশিয়ারস হু এক্সপান্ডেড দ্য এরা অব ফ্রি ট্রেড। রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও পরিবেশগত বিভিন্ন পরিবর্তন সামলে আগামী দিনে নৌপরিবহন শিল্পের সম্ভাব্য চেহারা নিয়ে বর্তমান প্রজন্মের শিপিং ম্যাগনেটরা স্বতঃস্ফূর্ত এবং খোলামেলা আলোচনা করেছেন মার্কিন সাংবাদিক লোরি অ্যান লারোকোর বইতে। শিপিং ব্যবসায় ২০ জন বিখ্যাত ব্যক্তিত্ব তথা প্রতিষ্ঠানের নানা উত্থান-পতন, নাটকীয় বাঁকবদল উঠে এসেছে এখানে। যদি কারো মনে হয় শিপিং ইন্ডাস্ট্রি একঘেয়ে বা বৈচিত্র্যহীন, তাহলে সে যেন ডাইন্যাস্টিস অব দ্য সি পড়ে নেয়-এ কথা লিখেছে খোদ নিউইয়র্ক টাইমস।

২৯০ পৃষ্ঠার বইটি ২০১২ সালে প্রথমবারের মতো প্রকাশ করে মেরিন মানি ইনকর্পোরেটেড। ২৫ মার্কিন ডলারে হার্ডকভার, ১৫ ডলারে পেপারব্যাক এবং ১০ ডলারে কিন্ডল সংস্করণ মিলবে অ্যামাজনে।

আইএসবিএন ১০: ০৯৮৩৭১৬৩৩১

আইএসবিএন ১৩: ৯৭৮-০৯৮৩৭১৬৩৩৪।

ইনফোগ্রাফিক্স, মার্চ-২০১৮

৩০তম সাধারণ অধিবেশন ইন্টারন্যাশনাল মেরিটাইম অর্গানাইজেশন

২০১৭ সালের ২৭ নভেম্বর থেকে ৬ ডিসেম্বর যুক্তরাজ্যের লন্ডনে তাদের সদর দপ্তরে ইন্টারন্যাশনাল মেরিটাইম অর্গানাইজেশনের ৩০তম সাধারণ অধিবেশন অনুষ্ঠিত হয়। ১৬৫টি সদস্য রাষ্ট্র থেকে মোট ১৪০০ জন অংশগ্রহণ করেছিলেন সেই সভায়। তাছাড়াও সরকারি এবং বেসরকারি বহু প্রতিষ্ঠানের পর্যবেক্ষকরা সেখানে উপস্থিত ছিলেন।

দিক-নির্দেশনা এবং গৃহীত লক্ষ্যসমূহ

সাধারণ অধিবেশনে ২০১৮ থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত সময়কালের জন্য গৃৃহীত কৌশলগত পরিকল্পনায় একটি সংশোধিত মিশন স্টেটমেন্ট এবং সাতটি নবচিহ্নিত দিক-নির্দেশনার পাশাপাশি প্রথমবারের মতো একটি ভিশন স্টেটমেন্ট অন্তর্ভুক্ত করা হয়। এর মাধ্যমে মূলত জাতিসংঘের টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা এবং টেকসই উন্নয়নের জন্য ২০৩০ এজেন্ডা বাস্তবায়নে আইএমও’র অংশগ্রহণ সুনিশ্চিত ও দৃঢ় করা হয়েছে।

কৌশলগত দিক-নির্দেশনাগুলো হলো :

  •      আইএমও’র প্রায়োগিক ক্ষেত্র প্রসারিত করা – সব ধরনের লক্ষ্যমাত্রার কার্যকর, ফলপ্রসূ এবং নিয়মিত বাস্তবায়ন নিশ্চিত করতে হবে।
  •      নিয়ন্ত্রণ কাঠামোতে নতুন ও আধুনিক প্রযুক্তি সংযোজন – সমুদ্র নিরাপত্তা সঙ্কট এবং পরিবেশের উপর বহুমুখী প্রভাবের কথা বিবেচনা করে আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহারে ভারসাম্য আনতে হবে। এছাড়া আন্তর্জাতিক বাণিজ্য সহজ করে তোলার পাশাপাশি নির্মাণশিল্পে প্রযুক্তির কারণে সম্ভাব্য ব্যয় নিয়ে সচেতন থাকতে হবে। অন্যদিকে, সমুদ্রপথ ছাড়াও অন্যান্য অঙ্গনের সংশ্লিষ্ট কর্মীদের ওপর প্রযুক্তির প্রভাব বিবেচনায় আনা জরুরি।
  •      জলবায়ু পরিবর্তনে ইতিবাচক সাড়া দেওয়া – এক্ষেত্রে যথাযথ, সুদূরপ্রসারী ও বাস্তবিক সমাধান খুঁজে বের করার মাধ্যমে বায়ু দূষণে নৌবাণিজ্যের ভূমিকা কমিয়ে আনতে হবে।
  •      মহাসাগর নিয়ন্ত্রণ – যেসকল প্রক্রিয়া এবং কৌশলের মাধ্যমে মহাসাগর ও এর সম্পদের যথাযথ পরিচালনা এবং নিয়ন্ত্রণ করা হয়, সেসবে সরাসরি অংশগ্রহণ করতে হবে। আন্তর্জাতিক বাণিজ্য সহজ ও নিরাপদ করে তোলা – জাহাজ আগমন ও বহির্গমনের আনুষ্ঠানিকতা এবং দলিল ও প্রত্যয়নপত্রের ব্যবহার, এ ধরনের অফিশিয়াল রীতির দিকে লক্ষ্য রাখার মাধ্যমে সমুদ্র পরিবহন ব্যবস্থার প্রশাসনিক ভার কমিয়ে আনতে হবে।
  •      বিধিমালার কার্যকারিতা বৃদ্ধি – বাস্তবিক যেসকল প্রক্রিয়ার মাধ্যমে নীতি প্রণয়ন করা হয় তার উন্নতি সাধন প্রয়োজন। বাড়তি উপাত্ত সংগ্রহের মাধ্যমে সেসব নীতিকে আরো কার্যকরী করে তুলতে হবে। সিদ্ধান্ত গ্রহণে আরো ভালোভাবে ও বুদ্ধিবৃত্তিক উপায়ে বিধিমালার প্রয়োগ করা জরুরি। সদস্য রাষ্ট্র্রসমূহ ও ইন্ডাস্ট্রির তরফ থেকে যথাক্রমিক প্রতিক্রিয়া জানার মাধ্যমে আইওএম’র নিয়ন্ত্রণ কাঠামোতে সেসব অভিজ্ঞতা প্রাসঙ্গিকভাবে অন্তর্ভুক্ত করাও দরকার।
  •      প্রাতিষ্ঠানিক কার্যকারিতা নিশ্চিত করা Ñ একটি প্রতিষ্ঠান হিসেবে আইএমওসহ এর সকল সদস্য রাষ্ট্র, দাতা সংস্থা, দপ্তর এবং বেসরকারি সংস্থার মতো আইনগতভাবে দায়বদ্ধ সব অঙ্গ প্রতিষ্ঠানের সার্বিক কার্যদক্ষতা বাড়াতে হবে।

ভিশন স্টেটমেন্ট

সমুদ্র পরিবহন ব্যবস্থার বৈশ্বিক নিয়ন্ত্রক হিসেবে নিজেদের অবস্থান বহাল রাখবে আইএমও। এই খাতের প্রয়োজনীয়তা ও সামর্থ আরো অধিক হারে জানান দেওয়ার পাশাপাশি নৌবাণিজ্যের উন্নতি অব্যাহত থাকবে। একই সাথে প্রযুক্তি ও বিশ্ব বাণিজ্যের চলমান অগ্রগতির দিকে লক্ষ্য রাখার মাধ্যমে টেকসই উন্নয়নের জন্য ২০৩০ এজেন্ডা বাস্তবায়নের দিকে এগিয়ে যেতে হবে।

এক্ষেত্রে সক্রিয়ভাবে ক্রমবর্ধমান সঙ্কটসমূহ যথাযথভাবে চিহ্নিত, পর্যালোচনা ও বিশ্লেষণ করে টেকসই উন্নয়নের জন্য ২০৩০ এজেন্ডা এর লক্ষ্যমাত্রার প্রায়োগিক নিশ্চয়তা বৃদ্ধিতে সদস্য দেশগুলোকে সহায়তা প্রদান করবে আইএমও।

কারিগরি সহযোগিতার মাধ্যমে জাতিসংঘের টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রার প্রয়োগ

অধিবেশনটিতে তিনটি সিদ্ধান্ত গৃহীত হয় যা মূলত টেকসই উন্নয়ন অর্জন ও লক্ষ্যমাত্রার প্রয়োগে আইএমও’র কার্যক্ষমতা বৃদ্ধি করবে।

উত্থাপিত প্রথম প্রস্তাবে আইএমও’র কারিগরি সহযোগিতামূলক কর্মকান্ড এবং টেকসই উন্নয়নের জন্য ২০৩০ এজেন্ডা এর মধ্যকার যোগসূত্রগুলো চিহ্নিত করা হয়েছে। যেসব কার্যক্রমের মাধ্যমে টেকসই উন্নয়ন অর্জনের পাশাপাশি আইএমও বিধিমালার কার্যকরী প্রয়োগ ও দ্রুত অনুমোদন সম্ভব – আইএমও’র কারিগরি সহায়তা কমিটিকে সেগুলোর দিকে অধিক নজর দেওয়ার জন্য অনুরোধ করা হয়েছে। এক্ষেত্রে স্বল্পোন্নত দেশ, আফ্রিকার নৌপরিবহন ব্যবস্থা এবং উন্নয়নশীল দ্বীপ রাষ্ট্রসমূহের বিশেষ চাহিদাগুলো বিবেচনায় আনতে হবে।

দ্বিতীয় প্রস্তাবে সদস্য দেশগুলোকে জাতিসংঘ উন্নয়ন সহযোগিতামূলক কাঠামোর (ইউএনডিএএফ) সাপেক্ষে তাদের সমুদ্র সঙ্কটের সমন্বয় সাধনের জন্য পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। এর ফলশ্রুতিতে এসব দেশ তাদের মেরিটাইম কারিগরি সহযোগিতা কার্যক্রমের সঠিক অর্থায়ন এবং সহায়তার জন্য অধিক গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রগুলো আগে চিহ্নিত করে নিতে পারবে।

তৃতীয় সিদ্ধান্তে কার্যকরী এবং টেকসই কারিগরি সহায়তা কার্যক্রমের জন্য অর্থায়ন ও অংশীদারিত্ব ব্যবস্থার দিকে লক্ষ্য রাখা হয়েছে। সদস্য দেশ, আন্তর্জাতিক ও আঞ্চলিক প্রতিষ্ঠানসমূহ, বেসরকারি সংস্থা এবং ইন্ডাস্ট্রিগুলোকে নানাবিধ উপায়ে কারিগরি সহযোগিতায় সক্রিয় অংশগ্রহণের আমন্ত্রণ জানানো হয়। এর মাঝে রয়েছে দাতব্য কার্যক্রম, আইএমও মাল্টি-ডোনার ট্রাস্ট ফান্ডে আর্থিক জোগানের ব্যবস্থা করা, বিবিধ দ্বিপক্ষীয় চুক্তি সম্পাদন এবং অবৈতনিক পরামর্শদাতা ও দাতব্য যন্ত্রপাতি সরবরাহের মাধ্যমে অনার্থিক সহায়তা প্রদান।

সমুদ্র্রে প্লাস্টিক দূষণ

জাতিসংঘের টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা ১৪ (সমুদ্র ও মহাসাগর সংরক্ষণ এবং তাদের সম্পদসমূহের টেকসই ব্যবহার নিশ্চিত করা) মতে, ২০২৫ সালের মধ্যে সকল প্রকার সমুদ্র্র দূষণ রোধ করার পাশাপাশি ব্যাপক হারে তা কমিয়ে আনতে হবে। এর জন্য বিশেষ করে সামুদ্রিক আবর্জনা ও রাসায়নিক দূষণের দিকে খেয়াল রাখা প্রয়োজন। মহাসাগর নিয়ন্ত্রণ কাঠামোর অংশ হিসেবে চলমান এই প্লাস্টিক দূষণের সমস্যা আরো বেশি পর্যালোচনার দাবি রাখে বলে অধিবেশনে মন্তব্য করা হয়।

আইএমও এর মার্পোল চুক্তির ৫ নং সংযুক্তিতে জাহাজ থেকে মহাসাগরে সকল প্রকার প্লাস্টিক নিষ্কাশন নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। এছাড়াও লন্ডন কনভেনশন অ্যান্ড প্রোটকলের মতো বেশ কিছু সমঝোতা চুক্তি সমুদ্রে প্লাস্টিক অপসারণ নিয়ন্ত্রণ করে – সেগুলির সঠিক প্রয়োগের মাধ্যমেও এই দূষণ রোধ সম্ভব।

অধিবেশনে মার্পোল চুক্তির অধিভুক্ত সকল গোষ্ঠী, সদস্য রাষ্ট্র এবং আন্তর্জাতিক মহলকে জোর দেওয়া হয়েছে যেন তারা সামুদ্রিক পরিবেশ সংরক্ষণ কমিটির পরবর্তী সভায় এবং ২০১৮ সালের লন্ডন কনভেনশন অ্যান্ড প্রোটোকলের চুক্তিবদ্ধ গোষ্ঠীদের সম্মেলনে এর পরিপ্রেক্ষিতে প্রস্তাবনা পেশ করে।

পোলার কোডের দ্বিতীয় পর্যায়

পোলার কোড কার্যকর হয়েছিল ২০১৭ সালের ১ জানুয়ারি থেকে। সোলাস ও মার্পোল চুক্তির আওতায় এই বিধি মোতাবেক মেরু অঞ্চলের সমুদ্রে জাহাজ পরিচালনার ব্যাপারে বাড়তি নিয়মাবলি সংযোজন করা হয়, যা মেরু অঞ্চলের পরিবেশের নিরাপত্তা প্রদানে কাজ করে থাকে।

তবে সোলাস চুক্তিতে অপেক্ষাকৃত ছোট আকারের এবং মাছ ধরার জাহাজগুলো অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি। তাই ২০১৮ সালের মে মাসে পোলার কোডের দ্বিতীয় পর্যায়ে সেসব সংযোজিত হবে।

মাছ ধরার জাহাজে আইএমও নাম্বারিং স্কিমের প্রয়োগ

১০০ গ্রস টনের উপরে সব ধরনের জাহাজে আইএমও নাম্বারিং স্কিম ব্যবহার করা হয়। ১০০ গ্রস টন ধারণক্ষমতা ও তার ঊর্ধ্বে সব যাত্রীবাহী জাহাজ এবং ৩০০ গ্রস টন ধারণক্ষমতা ও তার ঊর্ধ্বে সকল মালবাহী জাহাজের জন্য এই স্কিম বাধ্যতামূলক। ২০১৩ সালের অধিবেশনে নাম্বারিং স্কিমের ঐচ্ছিক অনুমোদনের জন্য ১০০ গ্রস টনের মাছ ধরার জাহাজগুলোকে নির্ধারিত করা হয়। পরবর্তী ঐচ্ছিক অনুমোদন প্রক্রিয়ায় ১০০ গ্রস টনের নিচে যাত্রীবাহী জাহাজ, ইস্পাতনির্মিত ও ইস্পাতনির্মিত নয় এমন মাছ ধরার জাহাজ এবং ১০০ গ্রস টনের নিচে সর্বোচ্চ ১২ মিটার দৈর্ঘ্যের মোটরচালিত আন্তর্জাতিক সমুদ্রে বিচরণকারী মাছ ধরার জাহাজগুলো অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।

নাম্বারিং স্কিম ব্যবহার করে সমুদ্রে মাছ ধরার জাহাজ শনাক্ত করার ফলে তাদের মালিকানা নিশ্চিত করা যাবে সহজেই। ফলশ্রুতিতে অবৈধ, অনিয়ন্ত্রিত এবং বিলুপ্তপ্রায় মাছ ধরা প্রতিহত করা সম্ভব হবে। তাছাড়া এ ধরনের মাছ ধরার বিরুদ্ধে উদ্যোগ নিতে জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা এবং ইন্টারন্যাশনাল লেবার অর্গানাইজেশনের (আইএলও) সাথে জড়িত আছে আইএমও।

পোর্ট স্টেট কন্ট্রোল সংশোধন

নিম্নমানের জাহাজ শনাক্ত করার জন্য পোর্ট স্টেট কন্ট্রোল চূড়ান্ত ভূমিকা রাখে। অধিবেশনে পোর্ট স্টেট কন্ট্রোলের কার্যপ্রণালী সংশোধনের সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়।

এ সিদ্ধান্ত মতে ২০১১ সালের কার্যপ্রণালী হালনাগাদ করে ইন্টারন্যাশনাল সেফটি ম্যানেজমেন্ট কোডে পরিবর্তন আনা হয়েছে। সংশোধনের ক্ষেত্রে নাবিকদের প্রত্যয়ন, বিশ্রাম ও দায়িত্ব পালনের সময়কালের পাশাপাশি ‘১৯৭৪ সোলাস সম্মেলন’ এ গৃহীত সংশোধনসমূহের ঐচ্ছিক ও দ্রুততর প্রয়োগ এবং বাধ্যতামূলক নীতিমালার ব্যাপারে আলোকপাত করা হয়।

২০১০ এইচএনএস প্রোটোকল অনুমোদনের সুপারিশ

তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের মতো (এলএনজি) বিপজ্জনক ও ক্ষতিকর রাসায়নিক পদার্থ সমুদ্রপথে পরিবহনের ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক ও জাতীয় দায়বদ্ধতা তৈরির লক্ষ্যে একটি সর্বজনীন ব্যবস্থা গ্রহণের পদ্ধতি বিবেচনায় নেওয়ার জন্য অধিবেশনে উপস্থিত সদস্যদের কাছে সুপারিশ করা হয়।

সদস্য দেশগুলোকে ২০১০ সালের এইচএনএস (হ্যাজার্ডাস অ্যান্ড নকশাস সাবস্ট্যান্সেস) প্রোটোকল অনুমোদন করা বা তাতে সম্মতি দেওয়ার প্রস্তাব করা হয়। একই সাথে এইচএনএস প্রোটোকল কার্যকর করে তোলা ও সংশ্লিষ্ট নীতিসমূহ প্রয়োগ করার জন্য এবং নতুন শাসনতন্ত্র গঠনে সকল সদস্যকে একত্রে কাজ করার আহ্বান জানানো হয়।

ইন্স্যুরেন্স সার্টিফিকেট প্রদানের প্রতিনিধি নির্বাচন

১৯৯২ সালের ‘ইন্ট্যারন্যাশনাল কনভেনশন অন সিভিল লায়াবিলিটি ফর অয়েল পলিউশন ড্যামেজ’ এবং ২০১০ এইচএনএস কনভেনশনের আওতায় ইন্স্যুরেন্স সার্টিফিকেট প্রদানের প্রতিনিধি কর্তৃপক্ষ নির্বাচনের সুযোগ সৃষ্টির উদ্দেশ্যে অধিবেশনে একটি সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়।

২০১০ এইচএনএস কনভেনশন এবং ১৯৯২ সিভিল লায়াবিলিটি কনভেনশনে ইন্স্যুরেন্স সার্টিফিকেট প্রদানের জন্য প্রতিনিধি নির্বাচনের কোনো স্পষ্ট কাঠামোর উল্লেখ নেই। তবে ২০০১ এর বাঙ্কার্স কনভেনশন, ২০০২ এথেন্স কনভেনশন এবং ২০০৭ নাইরোবি রেক রিমুভাল কনভেনশনে কাঠামো সুনির্দিষ্ট করা আছে।

অধিবেশনের গৃহীত সিদ্ধান্তে বলা হয়, ২০১০ এইচএনএস কনভেনশন বা সিভিল লায়াবিলিটি কনভেনশনের আওতায় একটি রাষ্ট্র তার স্বীকৃত কোনো প্রতিষ্ঠান বা সংস্থাকে এসকল কনভেনশনের জন্য প্রয়োজনীয় ইন্স্যুরেন্স সার্টিফিকেট ও আর্থিক নিরাপত্তা প্রদানের দায়িত্ব অর্পণ করতে পারবে।

একই সাথে জানিয়ে দেওয়া হয়, এই প্রতিনিধি নির্বাচন প্রক্রিয়ার ফলে সে সকল সার্টিফিকেটের প্রতি নির্বাচনকারী রাষ্ট্রের দায়বদ্ধতার উপর কোনো প্রভাব পড়বে না।

সতর্কবাণী ছাড়া মিসাইল নিক্ষেপকে নিন্দা

উত্তর কোরিয়ার সাম্প্রতিক মিসাইল নিক্ষেপের ফলে সমুদ্রপথে জাহাজ তথা আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ভয়াবহ আশঙ্কার সম্মুখীন হয়েছিল। এ ধরনের অতর্কিত আক্রমণের প্রতি দৃঢ়ভাবে নিন্দা জানিয়েছে আইএমও কাউন্সিল।

আইএমও বাজেট চূড়ান্তকরণ

২০১৮ ও ২০১৯ অর্থবছরে প্রতিষ্ঠানটির ফলাফলভিত্তিক ও কর্মসূচির বাজেট গৃহীত হয়; যা ২০১৮ সালের জন্য ৩১,৮৬৪,০০০ পাউন্ড এবং ২০১৯ সালের জন্য ৩৩,২৪২,০০০ পাউন্ড।

আইএমও কাউন্সিল নির্বাচন

২০১৮-২০১৯ দ্বিবর্ষের জন্য ৪০ সদস্যের আইএমও কাউন্সিল নির্বাচন করা হয় এই অধিবেশনে। পুনর্গঠনের পরামর্শসহ ২০১৮ সালের জুন মাসে অনুষ্ঠিতব্য ১২০তম সেশনে অধিবেশনের কার্যপ্রণালী পর্যালোচনার জন্য নির্বাচিত কাউন্সিলকে নির্দেশ দেওয়া হয়।

কাউন্সিল চেয়ারম্যান নির্বাচন

২০১৭ সালের ৭ ডিসেম্বর নব-নির্বাচিত কাউন্সিলের সভায় চীনের শিয়াউজি জাং-কে কাউন্সিল চেয়ারম্যান হিসেবে নির্বাচিত করা হয়। তবে ভাইস-চেয়াম্যান নির্বাচন পিছিয়ে ২০১৮ সালের জুলাই মাসে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। চেয়ারম্যান নির্বাচনের পাশাপাশি সাবেক চেয়ারম্যান, যুক্তরাষ্ট্রের জেফ ল্যান্টজের প্রতি তাঁর দায়িত্বশীলতার জন্য কাউন্সিল আন্তরিক কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করে।

ওয়াটার ট্রান্সপোর্ট সেল (ডব্লিউটিসি)

নদীমাতৃক দেশ বাংলাদেশ। সারাদেশে জালের মত ছড়িয়ে আছে অসংখ্য নদী। দেশ ও দেশের বাইরের বিভিন্ন উৎপত্তিস্থল থেকে ভূখন্ডের মধ্য দিয়ে কোথাও একা আবার কোথাও এক বা একাধিক ধারা মিলিত হয়ে বঙ্গোপসাগরে গিয়ে মিশেছে। নদী আর সাগরের সংযোগ সৃষ্টি করে দিয়েছে প্রাকৃতিক নৌযোগাযোগ ব্যবস্থার। নদীকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে বড় বড় শহর, বিস্তৃতি ঘটেছে ব্যবসা বাণিজ্য আর শিল্পের। বিভিন্ন জনপথকে একসূত্রে গেঁথে দিয়েছে নদী। বড় বড় নদীগুলোকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে নদী বন্দর। বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা নিত্য প্রয়োজনীয় আর শিল্পপণ্য চট্টগ্রাম বন্দর হয়ে লাইটার জাহাজে করে পৌঁছে যাচ্ছে এসব নদী বন্দরে। বিস্তৃত নৌযোগাযোগ ব্যবস্থা আর লাইটার জাহাজের নিরবিচ্ছিন্ন সেবা দেশের ব্যবসা বাণিজ্যকে করে তুলেছে প্রাণচঞ্চল।

চট্টগ্রাম বন্দরের উন্নয়ন ও অগ্রগতির সাথে তাল মিলিয়ে চলতে এবং সারাদেশে লাইটার জাহাজের মাধ্যমে পণ্য পরিবহনে শৃঙ্খলা আনতে ২০০৫ সালে বাংলাদেশ কার্গো ভেসেল ওনার্স এসোসিয়েশন (বিসিভোয়া) ও কোস্টাল শিপ ওনার্স এসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (কোয়াব) একসাথে মিলিত হয়ে প্রতিষ্ঠা করেছে ওয়াটার ট্রান্সপোর্ট সেল বা ডব্লিউটিসি। এ সেল গঠনের মূল উদ্দেশ্য ছিল চট্টগ্রাম বন্দরের বর্হিনোঙ্গরে মাদার ভেসেল থেকে থেকে বন্দরের জেটি কিংবা দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে নৌপথে আমদানিকৃত পণ্য সহজে ও কম খরচে পৌঁছে দেয়া এবং চট্টগ্রাম বন্দর তথা দেশের টেকসই উন্নয়নের স্বার্থে অভ্যন্তরীণ জাহাজ দ্বারা পণ্য পরিবহনের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা ও বন্ধুত্বপূর্ণ পরিবেশ সৃষ্টি করা। ডব্লিউটিসি চট্টগ্রাম বন্দরের বর্হিনোঙ্গরে মাদার ভেসেলের অবস্থানকাল কমানোর পাশাপাশি বন্দরের সুনাম বৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছে। ওয়াটার ট্রান্সপোর্ট সেল গঠনের আগে আমদানিকারক ও লাইটার মালিকদের মধ্যে প্রত্যক্ষ যোগাযোগ ছিল না। ফলে ভাড়া ও পণ্য পরিবহনে বিশৃঙ্খলা ছিল। ডব্লিউটিসি আমদানিকারক, কার্গো এজেন্ট এবং লাইটার জাহাজ মালিকসহ সংশ্লিষ্ট সকল পক্ষের মধ্যে সমন্বয়কের ভূমিকা পালন করছে। দেশের বিভিন্ন প্রান্তে আমদানিকারকের দুয়ারে পণ্য পৌঁছানোর যুক্তি সংগত ভাড়া নির্ধারণ করে দেয় ডব্লিউটিসি, ফলে অতিরিক্ত ভাড়া গ্রহণের সুযোগ নেই। উদাহরণস্বরূপ বলা যেতে পারে চট্টগ্রাম থেকে ঢাকার গন্তব্যে প্রতিটন সিমেন্ট ক্লিংকার পরিবহনে আমদানিকারককে লাইটার ভাড়া বাবদ ৪২৭ টাকা গুণতে হয়।

বর্তমানে ওয়াটার ট্রান্সপোর্ট সেলের অধীনে প্রায় ৭৫০ টির অধিক লাইটার জাহাজ চলাচল করে। যেগুলোর পরিবহন সক্ষমতা প্রায় ৯ লক্ষ মেট্রিক টন। ওয়াটার ট্রান্সপোর্ট সেলের হিসাবমতে এসব লাইটার বছরে ১ কোটি ৮০ লক্ষ মেট্রিক টন পণ্য পরিবহন করে। ডব্লিউটিসি প্রতিষ্ঠার পর থেকে চট্টগ্রাম বন্দরে আসা মাদার ভেসেল থেকে অভ্যন্তরীণ বিভিন্ন গন্তব্যে পণ্য পরিবহনে কাজ করছে। সঠিক সময়ে মাদার ভেসেল থেকে পণ্য খালাসে লাইটার সরবরাহ করে ডব্লিউটিসি। ফলে আমদানিকারককে মাদার ভেসেলকে কোন প্রকার ক্ষতিপূরণ দিতে হয়না, এতে প্রচুর বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয় হচ্ছে।

আমদানিকারকের পণ্য পরিবহনে নৌপথে চলাচলকারী জাহাজগুলোকে নির্দিষ্ট নিয়মকানুন মেনে চলতে হয়। বর্হিনোঙ্গর থেকে পণ্য পরিবহনে ইচ্ছুক এমন নৌযানকে পণ্য পরিবহনের আগে অবশ্যই ওয়াটার ট্রান্সপোর্ট সেলে নিবন্ধিত হতে হয়। এক্ষেত্রে সরকারি রাজস্ব পরিশোধ ও সার্ভে সার্টিফিকেট ছাড়া কোন নৌযানকে পণ্য পরিবহনের অনুমতি দেয় না ওয়াটার ট্রান্সপোর্ট সেল। ফলে সরকারি রাজস্ব আদায়েও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে ডব্লিউটিসি। এছাড়া সরকারি নিষেধাজ্ঞা আছে ও রাজস্ব পরিশোধ করা হয়নি এমন পণ্য পরিবহনে লাইটার বরাদ্দ দেয় না ডব্লিউটিসি।

চট্টগ্রাম বন্দরে যেমন বর্হিনোঙ্গর থেকে জেটিতে জাহাজ ভিড়তে বার্থিং মিটিং পরিচালিত হয়, ঠিক তেমনি পণ্য পরিবহনে লাইটার জাহাজ বরাদ্দ দিতে প্রতিদিন ওয়াটার ট্রান্সপোর্ট সেলের অফিসে বার্থিং মিটিং অনুষ্ঠিত হয়। তবে মাদার ভেসেলের আধিক্য ও লাইটার জাহাজ স্বলতার কারণে মাঝে মাঝে বার্থি মিটিং অনুষ্ঠিত হয়না। আমদানিকারকের দেয়া লাইটার জাহাজের চাহিদার ভিত্তিতে লাইটার বরাদ্দ দেয়া হয়। আমদানিকারকের পক্ষে কার্গো বা পণ্যের এজেন্ট ওয়াটার ট্রান্সপোর্ট সেলে চাহিদা উত্থাপন করেন। শুধুমাত্র লাইটার বরাদ্দ দেয় এমন নয়, লাইটার কোন গন্তব্যে যাচ্ছে তা নিয়মিত মনিটরিংও করে ওয়াটার ট্রান্সপোর্ট সেল। এছাড়া লাইটার বরাদ্দ পাওয়ার পর, আমদানিকারকের নির্দিষ্ট গন্তব্যে পণ্য খালাস পর্যন্ত যে কোন সমস্যা বা সৃষ্ট জটিলতা মীমাংশায় কাজ করে ডব্লিউটিসি। ফলে আমদানিকারকে পণ্যের কোন ধরণের ঝামেলা বা সমস্যায় পড়তে হয়না সঠিক সময়ে পণ্যের প্রাপ্তি নিয়ে। এছাড়া খাদ্যদ্রব্য ও কৃষিকাজে ব্যবহৃত সার পরিবহনের তথ্য সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়কে সরবরাহ করে ডব্লিউটিসি। ফলে একদিকে যেমন খাদ্যদ্রব্যের বাজার স্থিতিশীল রাখতে সহায়তা করছে, ঠিক তেমনি দেশের কৃষি উৎপাদন প্রক্রিয়া স্বাভাবিক রাখতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে ডব্লিউটিসি।

বন্দর শিল্পে রূপান্তর আনবে ২০১৮

আন্তর্জাতিক আইন সংস্থা ইনস অ্যান্ড কো এর মতে, বন্দর শিল্পের জন্য একটি নির্ধারণী বছর হতে যাচ্ছে ২০১৮ সাল। আর সে কারণেই সামনের বছরটিকে রূপান্তরের বছর হিসাবে আশা করতে পারেন বন্দর অপারেটররা।

অর্থনৈতিক গতিধারা পরিবর্তনের ঝোঁক, বাণিজ্য প্রবাহ এবং বিশ্বব্যাপী ডেমোগ্রাফিক নিদর্শন বদলে যাবার ফলে রূপান্তরটি ঘটবে। এর পাশাপাশি পোর্টের মালিকানা এবং আধুনিকায়ন ও সম্প্রসারণের যে চলমান বিনিয়োগ তা, পরিবর্তনের মাধ্যমেও রূপান্তর ত্বরান্বিত হবে।

সাম্প্রতিক সময়ে বিশ্বব্যাপী বন্দরগুলোর ভাগ্য পরিবর্তিত হয়েছে। এজন্য শেষ কয়েক বছরকে আলাদাভাবে চিহ্নিত করা হয়।ইনস অ্যান্ড কো এর গ্লোবাল পোর্টস অ্যান্ড মেরিটাইম ইনফ্রাসট্রাকচার প্রাকটিস প্রধান টন ভ্যান ডেন বসচ একথা বলেন।

আফ্রিকা থেকে এশিয়া, ইউরোপ থেকে আমেরিকা পর্যন্ত কোনো অপারেটরই বন্দরের কার্যাবলী এবং এর বাণিজ্যিক বাস্তবতায় যে বদল এসেছে তা এড়াতে পারে না। সকল প্রত্যাশা এবং সম্ভাবনার প্রেক্ষিতে বলা যায়, এই টার্মিনালগুলো এবং তাদের চলমান উন্নয়নের জন্য ২০১৮ সাল একটি রূপান্তরযোগ্য বছর হিসাবে প্রস্তুত হয়ে আছে। এবং যেসব অপারেটর সফলভাবে এই নৌপথগুলোতে জাহাজ চলাচল অব্যাহত রাখতে পারবে তারাই প্রকৃত বাণিজ্যিক সুবিধা পাবে।

সেক্ষেত্রে চীনের বেল্ট এবং রোড ইনিশিয়েটিভই হলো এশিয়া ও আফ্রিকার পোর্টগুলোর পরিবর্তনের মূল চালিকাশক্তি।

ধারণা করা হচ্ছে, গত ১২ মাসে চীন এককভাবে পোর্ট এবং টার্মিনালে ২০ বিলিয়ন মার্কিন ডলার বিনিয়োগ করেছে।

বেল্ট এবং রোডসম্বন্ধে পশ্চিমের সচেতন হয়ে ওঠার বছর যদি হয় ২০১৭, তাহলে ২০১৮ সাল হচ্ছে সেই বছর যখন এর প্রভাব স্পষ্ট হয়ে দেখা দেবে। প্রকৃতপক্ষে, আমরা ইতিমধ্যেই দেখতে পাচ্ছি বেল্ট এবং রোডের ম্যাক্রো-ইকোনমিকিক প্রভাব স্পষ্টত প্রতীয়মান হতে শুরু করেছে বিশ্বজুড়ে।

এর মধ্যে একটি হলো মালিকানার একত্রীকরণ। সম্প্রতি কসকো ও চায়না শিপিং একত্রে যৌথ সংস্থা হয়েছে। ২০২০ নাগাদ, ধারণক্ষমতায় এরা বৃহত্তম কনটেইনার টার্মিনাল অপারেটর হয়ে দাঁড়াবে। এবং এ কারণেই বৈশ্বিক র‌্যাংকিং-এ তাদের অবস্থান চতুর্থ এবং অষ্টম থেকে আরো উন্নীত হবে এ সময়কালে মধ্যে। বিশ্ব বাণিজ্য পরিচালনায় নিশ্চিতভাবেই এটি একটি নতুন ভারসাম্য আনবে।

ছোট ছোট পোর্ট অপারেটররা ভাবতে পারেন যে, এই গতি পরিবর্তনের ধারায় নিকট ভবিষ্যতে এই সেক্টরে তাদের অবস্থান কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ যে বিষয়টি বুঝতে হবে তা হলো, কেউই এই উন্নয়ন থেকে অনাক্রম্য নয়। বরং তারা সেইসব অপারেটরদের বাণিজ্যিক সুযোগ-সুবিধা প্রদান করবে যারা এখান থেকে সর্বোচ্চ সুবিধা বের করে নিতে পারবে।

উদীয়মান এবং সীমান্তের দেশগুলোতে পোর্টের সুযোগ-সুবিধা দ্রুত বৃদ্ধি, সম্প্রসারণ এবং আধুনিকীকরণ হলো নতুন বাণিজ্য-পথ খোলা এবং ভোক্তা বাজার উদারীকরণের সরাসরি প্রতিফলন।

যদি ছোট অপারেটররা তহবিল সুরক্ষিত করতে পারে, তবে বড় বড় খেলোয়াড় দ্বারা পরিচালিত নতুন অপারেটরদের সাথে তাদের প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার সম্ভাবনা থাকবে। সবচেয়ে সফল হবে সেইসব কৌশল যেগুলো দীর্ঘমেয়াদী এবং ব্যাপকভাবে অর্থনৈতিক গতিধারাকে প্রতিফলিত করতে পারবে।

ইনস অ্যান্ড কো সংস্থা, অপারেটরদের ২০১৮ এবং তার পরের সময়ের পরিকল্পনার জন্য বিশেষ বাণিজ্যিক মান হিসাবে একটি ক্ষেত্র নির্দেশ করে যা ট্রান্সশিপমেন্ট নয়, বরং ক্রমান্বয়ে গেটওয়ে অপারেশনের দিকে ঝুঁকছে। এশিয়া ও আফ্রিকাতে বাণিজ্য প্রবাহ পরিবর্তনের এই নির্দিষ্ট কারণগুলো এখন ক্যাপটিভ মার্কেট ভেঙ্গে ফেলার জন্য প্রস্তুত হয়েছে।

ভ্যান ডেন বসচ বলেন আমরা কঙ্গো বা পূর্ব তিমুরের মতো দেশের দিকে তাকালে পরিষ্কারভাবেই দেখতে পাই যে, অপারেটররা গেটওয়ে টার্মিনাল স্থাপন করার মাধ্যমে এসব বাজারকে বিশ্ব বাণিজ্যে উন্মুক্ত করে দেবার কাজ শুরু করে দিয়েছে।

এটি এমন একটি প্যাটার্ন, বিশ্বব্যাপী যার পুনরাবৃত্তি ঘটে: বেল্ট এবং রোডের বিনিয়োগ স্থানীয় অবকাঠামো ও পরিবহন সংযোগগুলোর উন্নয়ন ঘটাচ্ছে এবং অপারেটররা নির্মাণ যজ্ঞের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। সত্যি করে বলতে গেলে, সীমান্তবর্তী স্থানীয় অঞ্চলে কার্গো ভলিউমগুলোর পৌঁছানোর জন্য বিকল্প উপায় নেই বললেই চলে। যেসব পোর্ট অপারেটররা এই গতিধারা পরিচালনা করতে পারবে এবং যারা শুরুতেই এই বাজারে প্রবেশ করবে তারা নিজ নিজ দেশে স্থায়ী ও অপরিহার্য হিসাবে নিজেদেরকে গড়ে তুলতে সক্ষম হবে।

তবুও এই আইন সংস্থার ধারণা, উদীয়মান বাজারগুলোতে অর্থায়ন একটি বিরাট চ্যালেঞ্জ হিসাবেই থাকবে। এর পাশাপাশি কমপ্লায়েন্স, দুর্নীতি এবং ঘুষ-বিরোধী বিষয়গুলোতো থাকছেই। কিন্তু মৌলিকভাবে সংস্থাটি বিশ্বাস করে যে, আগামী বছর বিশ্বব্যাপী বন্দর শিল্পের বিনিয়োগে বিস্তৃত পরিসরে আরও বেশি গতি দেখা যাবে ।

২০১৮ সালে বন্দর বিশ্বে দেখা যাবে অটোমেশন এবং ব্লকচেইনের মতো নতুন নতুন উদ্ভাবনী প্রযুক্তি ব্যবহারে অব্যাহত গবেষণা এবং উন্নয়ন প্রচেষ্টা। যদিও এটি আশা করা ভুল হবে যে, আগামী ১২ মাসের মধ্যেই এগুলোর যেকোনো একটা সত্যিকারের গেম-চেঞ্জার হয়ে উঠবে। কিন্তু আমরা এমন একটা সুস্পষ্ট প্রতিবিম্ব আশা করতেই পারি যেখানে, সম্ভাব্য বাণিজ্যিক অ্যাপ্লিকেশনগুলো এবং বন্দর পরিচালনায় প্রতিটি প্রযুক্তির সুবিধাগুলোর মেলবন্ধন ঘটবে।

ইনস অ্যান্ড কো এর প্রতিবেদন অবলম্বনে-

বন্দরবার্তা ডেস্ক

শিপ হ্যান্ডলিং অপারেটর

দেশের আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্যের প্রায় ৯২ ভাগ পরিবাহিত হয় চট্টগ্রাম বন্দরের মাধ্যমে। সরাসরি অর্থনীতি সংশ্লিষ্ট এ বিশাল কর্মযজ্ঞে চট্টগ্রাম বন্দরের সাথে জড়িয়ে রয়েছে অনেকগুলো প্রতিষ্ঠান। যাদের নিরলস পরিশ্রম চট্টগ্রাম বন্দরের সাথে সাথে অর্থনীতির প্রাণসঞ্চার করতে প্রতিনিয়ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। শুধুমাত্র পণ্য খালাস ও জাহাজীকরণকে চট্টগ্রাম বন্দরের মূল কাজ হিসেবে বিবেচনা করা হলে এ প্রক্রিয়ার গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ে রয়েছে শিপ হ্যান্ডলিং অপারেটর। চট্টগ্রাম বন্দরের হ্যান্ডলিং কার্যক্রমের অর্ধেকের বেশি হয়ে থাকে বহির্নোঙরে আর বাকিটুকু হয় বন্দরের নিজস্ব জেটিতে। বহির্নোঙরে হ্যান্ডলিংয়ের কাজটি করে থাকে শিপ হ্যান্ডলিং অপারেটর। শতাংশের হিসেবে মোট কনটেইনার ও কার্গো হ্যান্ডলিংয়ের প্রায় ৪৫ ভাগ হ্যান্ডলিং করে শিপ হ্যান্ডলিং অপারেটর। এককভাবে যদি খোলা পণ্য বা বাল্ক হ্যান্ডলিং হিসেব করা হয় তবে এ অংশীদারিত্ব প্রায় ৭৫ ভাগ।

কর্ণফুলী নদীকে কেন্দ্র করে কয়েকশ বছর আগে গড়ে উঠেছে এ বন্দর। চলন, বলন আর জোয়ার ভাটার কারণে কর্ণফুলীর মনমর্জি বুঝেই চলাচল করতে হয় পণ্যবাহী জাহাজকে। আর নির্দিষ্ট গভীরতার কারণে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা বেশি ড্রাফটের বড় বড় জাহাজকে (মাদার ভেসেল) অবস্থান করতে হয় বর্হিনোঙ্গরে। ফলে এসব জাহাজকে বন্দরের মূল জেটিতে আনতে কর্ণফুলীর চ্যানেলের নির্দিষ্ট গভীরতায় চলাচল উপযোগী করতে আংশিক পণ্য খালাস কিংবা বহির্নোঙরে পুরো পণ্য খালাসে প্রয়োজন হয় শিপ হ্যান্ডলিং অপারেটরদের। এখান থেকে খালাসকৃত পণ্য লাইটার জাহাজের মাধ্যমে পৌঁছে যায় আমদানিকারকের দুয়ারে। চট্টগ্রাম বন্দরের বহির্নোঙর ছাড়াও বঙ্গোপসাগরের বিশাল জলরাশির কুতুবদিয়া ও মাতারবাড়ি পর্যন্ত চলে এ কার্যক্রম। বন্দরের মত শীত, গ্রীষ্ম কিংবা বর্ষায় ২৪ ঘন্টা হ্যান্ডলিং কার্যক্রম চলে এখানে।

শিপ হ্যান্ডলিং অপারেটররা চট্টগ্রাম বন্দরের নিবন্ধিত অপারেটর। দরপত্রের মাধ্যমে ৫ বছরের জন্য নিয়োজিত হয়ে থাকে প্রতিষ্ঠানগুলো। বর্তমানে ৩০টি প্রতিষ্ঠান চট্টগ্রাম বন্দরের বহির্নোঙরে পণ্য খালাসের কাজ করছে। অর্থনীতি ও দেশের চলমান উন্নয়ন কর্মকান্ডের সাথে তাল মিলিয়ে গত কয়েক বছরে চট্টগ্রাম বন্দরে বেড়েছে আমদানির পরিমাণ। এ বিশাল পরিমাণ পণ্য হ্যান্ডলিংয়ে প্রতিনিয়ত চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে হচ্ছে চট্টগ্রাম বন্দরকে। বিশেষ করে অবকাঠামোগত উন্নয়ন প্রকল্পের জন্য আমদানিকৃত নির্মাণ সামগ্রী যেমন পাথর ও অন্যান্য ভারী যন্ত্রপাতি আমদানির পরিমাণ সবচেয়ে বেশি বেড়েছে। এ বিশাল পরিমাণ বাড়তি পণ্য হ্যান্ডলিংয়ে চট্টগ্রাম বন্দরকে আরো বেশি চ্যালেঞ্জের মুখে ঠেলে দিচ্ছে। বন্দরের পাশাপাশি উন্নয়ন প্রকল্পের এ বাড়তি হ্যান্ডলিংয়ের কাজটি করছে শিপ হ্যান্ডলিং অপারেটররা। বাল্ক বা খোলা পণ্যের প্রায় তিন চতুর্থাংশই হ্যান্ডলিং হচ্ছে বহির্নোঙরে। শুধুমাত্র উন্নয়ন প্রকল্পের জন্য আনা সামগ্রীই নয়, নিয়মিতভাবে শিপ হ্যান্ডলিং অপারেটররা গম, ভুট্টাসহ অন্যান্য ফুড গ্রেইন, রেফশিট, চিনি, সিমেন্ট ক্লিংকার, স্ক্র্যাপ স্টিল, কয়লা ও ভারী যন্ত্রপাতি হ্যান্ডলিং করে আসছে। পদ্মা সেতু, পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের জন্য আনা ভারি যন্ত্রপাতি হ্যান্ডলিং করে নির্দিষ্ট সময় ও গন্তব্যে পৌঁছে দিতে ভূমিকা রাখে শিপ হ্যান্ডলিং অপারেটররা।

বন্দরের জেটিতে জাহাজ ভিড়িয়ে পণ্য খালাস করতে যেমন নির্দিষ্ট প্রক্রিয়া অনুসরণ করতে হয়, তেমনি বহির্নোঙরে পণ্য খালাস করতেও অনুসরণ করতে হয় নির্দিষ্ট প্রক্রিয়া। শিপ হ্যান্ডলিং অপারেটররা মূলত আমদানিকৃত খোলা পণ্য খালাস করে থাকে। রপ্তানি পণ্য হ্যান্ডলিংয়ের পরিমাণ একেবারেই নগণ্য। আমদানিকারক পণ্য আমদানির জন্য প্রথমে এলসি খোলেন। শিপিং এজেন্ট আমদানিকারকের পক্ষে জাহাজে করে পণ্য আমদানির ঘোষণা দেন। এরপর শিপিং এজেন্টের মনোনীত শিপ হ্যান্ডলিং অপারেটর পণ্য খালাসের প্রক্রিয়া শুরু করেন। শিপ হ্যান্ডলিং অপারেটররা মাদার ভেসেল থেকে লাইটার জাহাজে পণ্য খালাস করে থাকে। আমদানিকারক শিপ হ্যান্ডলিং অপারেটরকে লাইটার জাহাজ সরবরাহ করে। এজন্য অবশ্য আমদানিকারককে লাইটার জাহাজ নিয়ন্ত্রক সংস্থা ওয়াটার ট্রান্সপোর্ট সেলের মাধ্যমে লাইটার বরাদ্দ নিতে হয়। আমদানিকারকের লাইটার জাহাজে শিপ হ্যান্ডলিং অপারেটররা পণ্য খালাসে ব্যবহৃত যন্ত্রপাতি, শ্রমিক ও কর্মচারী নিয়ে বহির্নোঙরে যায়। যন্ত্রপাতির মধ্যে রয়েছে গ্রেভ, স্ক্যাভেটর, পে-লোডার ইত্যাদি। মাদার ভেসেলে পৌঁছে শিপ হ্যান্ডলিং অপারেটরের সুপারভাইজার জাহাজের সুপারভাইজার ও ক্যাপ্টেনের সাথে যোগাযোগ করে খালাস প্রক্রিয়া শুরু করেন। এ পর্যায়ে সরকারি কাস্টম ডিউটি ও বন্দরের পাওনা চার্জসমূহ আদায় হয়েছে কিনা যাচাই বাছাই করা হয়। এরপর আমদানিকারক ও জাহাজের সার্ভেয়ার পণ্যের সার্ভে কাজ শেষ করেন। সার্ভে কাজ শেষ হওয়ার পর মাদার ভেসেলের ক্রেন ও শিপ হ্যান্ডলিং অপারেটরদের যন্ত্রপাতির সমন্বয়ে পণ্য খালাস শুরু হয়।

চট্টগ্রাম বন্দরের নিবন্ধিত শিপ হ্যান্ডলিং অপারেটরদের প্রতিদিন ১০-১২ হাজার টন পণ্য খালাসের সক্ষমতা রয়েছে। বর্তমানে লাইটার জাহাজ সংকটের কারণে সক্ষমতার পুরোটা কাজে লাগানো যাচ্ছেনা। একটি মাদার ভেসেল থেকে পণ্য খালাসে শিপ হ্যান্ডলিং অপারেটরদের ১৮-২০ দিন সময় লাগছে। যা লাইটার জাহাজ প্রাপ্তির উপর নির্ভর করে আরো হ্রাস পায়। তবে বহির্নোঙরে পণ্য খালাসের সুবিধার কারণে তা নৌপথে দেশের বিভিন্ন স্থানে পৌঁছে যাচ্ছে সহজেই। চট্টগ্রাম বন্দরের বর্হিনোঙ্গরে খালাসকৃত পণ্য লাইটারে করে নারায়ণগঞ্জ, নওয়াপাড়া, খুলনা, বরিশাল ও বগুড়াসহ দেশের নানান প্রান্তে নৌবন্দরগুলোতে তথা আমদানিকারকের দোরগোড়ায় পৌঁছে যাচ্ছে। এতে একদিকে যেমন অর্থের সাশ্রয় হচ্ছে তেমনি দ্রুততম সময়ের মধ্যে তা পৌঁছে যাচ্ছে নির্দিষ্ট গন্তব্যে।