Home Blog Page 268

১৬৮৫ সালেই চট্টগ্রাম দখলের চেষ্টা ব্রিটিশদের

ব্রিটিশদের দখলে চট্টগ্রাম

ভারতবর্ষে ব্রিটিশদের আগমন ব্যবসায়ী হিসেবে। কিন্তু ব্যবসা ও ক্ষমতা নিরঙ্কুশ বিস্তারের লক্ষ্যে ক্রমশ তারা এখানকার রাষ্ট্রনীতিতে হস্তক্ষেপ শুরু করে। অবস্থানগত কারণে ব্রিটিশদের বাণিজ্য প্রসারে চট্টগ্রাম বন্দর ছিল বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। একদিকে বাংলার শাসকদের সাথে দ্বন্দ্ব, অন্যদিকে মগ জলদস্যু এবং অন্যান্য ঔপনিবেশিক দেশগুলোর উপর আধিপত্য বিস্তার করতে ১৬৮৫ সালে ব্রিটিশরা প্রথম চট্টগ্রাম দখলের চেষ্টা চালায়। এডমিরাল নিকেলসনের নেতৃত্বে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির নৌবহরের চট্টগ্রাম বন্দর দখলের প্রচেষ্টা সেবার ব্যর্থ হয়। অবশেষে ১৭৬০ সালে বাংলার শেষ স্বাধীন নবাব মীর কাশেম বর্ধমান ও মেদিনীপুরসহ চট্টগ্রামকে ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির চিফ ভেরলেস্টের কাছে হস্তান্তর করেন।

ব্রিটিশ-বার্মা যুদ্ধ

১৭৮৪ সালে বার্মার শাসক আরাকান রাজ্য দখল করে নেয়। স্বাধীনতা লাভের প্রচেষ্টায় আরাকানের কিছু নাগরিক বার্মার শাসকদের বিরুদ্ধে লড়াই চালিয়ে যায়। এরা মূলত চট্টগ্রাম, আসাম ও মণিপুরের জঙ্গলে লুকিয়ে থেকে বার্মা রাজার বিরুদ্ধে যুদ্ধ করত। ১৮২৪ সালে আরাকানে নিযুক্ত বার্মিজ গভর্নর এই বিদ্রোহীদের নিশ্চিহ্ন করতে আসামের কাছাড়, জৈন্তাপুর এবং চট্টগ্রামের গভীর জঙ্গলে একদল সেনা পাঠায়। এই ঘটনার প্রেক্ষিতে বার্মা সরাসরি ব্রিটিশদের সাথে যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ে। আরাকান সেনাদলটি নাফ নদীর তীরে অবস্থিত শাহপরী দ্বীপ দখল করে নেয়। এরপর সেখান থেকে ৮০০০ বার্মিজ সেনার একটি দল চট্টগ্রাম শহরের দিকে অগ্রসর হতে থাকে। পথে তারা রামুতে অবস্থিত ব্রিটিশ সেনা ছাউনিতে হামলা চালায়। এই ঘাঁটির দায়িত্বে ছিল ৩০০ দেশীয় সিপাহী, যাদের কাছে ছিল কিছু দেশি অস্ত্র আর দুটি বন্দুক। এই সেনাদলকে সহজেই পরাজিত করে বার্মিজ বাহিনী চট্টগ্রামের দিকে অগ্রসর হতে শুরু করে। তবে তাদের এই অভিযান বর্ষার কারণে থেমে যায়। প্রবল বৃষ্টিপাতে পাহাড়ি রাস্তা চলাচলের অনুপযোগী হয়ে পড়লে তারা রামুতে অবস্থান করতে থাকে। কিন্তু ইতিমধ্যে ব্রিটিশরা বার্মার রাজধানী রেঙ্গুন আক্রমণ করলে বার্মিজ এই বাহিনীকে রাজধানী রক্ষার লড়াইয়ে সেখানে ফিরে যেতে হয়। এভাবেই বার্মার শাসকদের চট্টগ্রাম অভিযানের ইতি ঘটে।

চট্টগ্রামে সিপাহী বিদ্রোহ

ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির শাসনের সময় চট্টগ্রাম অঞ্চল কোম্পানির কাছে শান্তিপূর্ণ এলাকা হিসেবে বিবেচিত ছিল। তবে ১৮৫৭ সালে সারা ভারতে সিপাহী বিদ্রোহ ছড়িয়ে পড়লে চট্টগ্রামেও তার প্রভাব পড়ে। চট্টগ্রামে ১৮৫৭ সালের ১৮ নভেম্বরে দেশীয় সিপাহীদের নিয়ে গঠিত ৩৪ নেটিভ ইনফেন্ট্রি বাহিনীর দ্বিতীয়, তৃতীয় এবং চতুর্থ কোম্পানি বিদ্রোহ ঘোষণা করে। তারা প্রথমে জেলখানায় হামলা চালায় এবং সেখানকার কারাবন্দীদের মুক্ত করে দেয়। এরপর বিদ্রোহীরা সরকারি তিনটি হাতি এবং ট্র্রেজারি লুট করে। ট্রেজারি থেকে লুট করা ২৭,৮০০ পাউন্ড অর্থ এবং হাতি নিয়ে সিপাহীরা ত্রিপুরার (কুমিল্লা) পাহাড়ি অঞ্চলে চলে যায়। ট্রেজারি লুটের সময় দেশীয় একজন পুলিশ কনস্টেবল বিদ্রোহীদের হাতে নিহত হয়। যদিও সিপাহীদের উদ্দেশ্য ছিল ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা, এদেশি মানুষের রক্তপাত ঘটানো নয়। বিদ্রোহীরা পাহাড়ি এলাকায় পৌঁছালে ত্রিপুরার রাজা এবং স্থানীয়রা তাদের আটক করে ব্রিটিশদের কাছে হস্তান্তর করে।

বন্দরের প্রাণ ফিরল আসামের চা’য়ে!

ভারতে ব্রিটিশ শাসনের শুরুতে কলকাতা বা চট্টগ্রাম নয়, বন্দর হিসেবে পশ্চিমবঙ্গের হুগলীর সমৃদ্ধি ঘটে। তবে সিপাহী বিদ্রোহের পর থেকে চট্টগ্রাম বন্দরের ব্যবহার বাড়তে শুরু করে। ১৮৮৫ সালে প্রকাশিত ব্রিটিশ ইম্পিরিয়াল গেজেটে চট্টগ্রাম বন্দরে জাহাজের আগমন বাড়তে থাকার বিষয়টি বেশ গুরুত্বের সাথে উল্লেখ করা হয়। সেখানে দেখা যায় ১৮৮১-৮২ সালে চট্টগ্রাম বন্দরে জাহাজের আগমন এবং এই বন্দর দিয়ে আমদানি ও রপ্তানির পরিমাণ বিগত বছরগুলোর তুলনায় দারুণ বৃদ্ধি পেয়েছিল। এই কারণে বন্দরে পণ্য পরিবহনে গতি আনতে ১৮৮৩ সালে ব্রিটিশ সরকার চটগ্রাম থেকে দাউদকান্দি পর্যন্ত রেললাইন নির্মাণের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে।

১৮৬০-৬১ সালে চট্টগ্রাম বন্দরে ৬৬টি জাহাজ প্রবেশ করে। সে বছর এই বন্দর দিয়ে পণ্য আমদানি ও রপ্তানির সামগ্রিক পরিমাণ ছিল ৯,৭৪৩ টন। পরবর্তী পাঁচ বছরে চট্টগ্রাম বন্দরের ব্যবহার নাটকীয় রকমের বৃদ্ধি পায়। ১৮৬৫ সালে মোট ২২১টি জাহাজ চট্টগ্রাম বন্দরে প্রবেশ করে এবং মোট রপ্তানি-আমদানি পণ্যের পরিমাণ ছিল ৪৪,২৮২ টন।

১৮৮১-৮২ সালে এই বন্দরে ৭৭১টি জাহাজ ভেড়ে  এবং এই সময়ে ১,৭৩৬,৪৮০ সেন্টাম ওয়েট বা হাইড্রোওয়েট টন (এক সেন্টাম বা হাইড্রোওয়েট টন সমান ১১২ পাউন্ড) পরিমাণ পণ্য আমদানি করা হয়, যার মূল্য ছিল  ৪৭১,৮৬১ পাউন্ড। চট্টগ্রাম থেকে রপ্তানি পণ্য নিয়ে ৭৭৩টি জাহাজ বন্দর ত্যাগ করে, যার পরিমাণ ছিল ২৫১,৩৪৩ সেন্টাম বা হাইড্রোওয়েট টন, আর এর মূল্য ছিল ১৪০,৮৩০ পাউন্ড। এই অর্থ বছরে বন্দরের মোট আয়ের পরিমাণ ছিল ৬,০৮২ পাউন্ড।

বন্দরের এই প্রবৃদ্ধির একটি প্রধান কারণ আসামের চা। সেই সময় ইংল্যান্ডকে চড়া মূল্যে – শুধু রূপার পরিবর্তেই চা কিনতে হত চীন থেকে। তাই স্কটল্যান্ডের নাগরিক রবার্ট ব্রুস ১৮২৩ সালে আসামে চায়ের গাছ আবিস্কার করলে, সেখানে চা বাগান তৈরির হিড়িক পড়ে যায়। এই চা রপ্তানির জন্য সবচেয়ে উপযুক্ত বন্দর হিসেবে বিবেচিত হয় চট্টগ্রাম। যার ফলে চাল ও পাটের সাথে আসামের চা ঊনবিংশ শতকের শেষ পর্যায়ে চট্টগ্রাম বন্দরের পুরোনো গৌরবের অনেকটা ফিরিয়ে আনতে সাহায্য করে।

বার্ষিক সাংস্কৃতিক পরিবেশনা মেধাবী শিক্ষার্থীদের সংবর্ধনা

চট্টগ্রাম বন্দর যেমন দেশের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখে চলেছে তেমনি সামাজিক দায়িত্ব হিসেবে পরিচালনা করে আসছে প্রাথমিক, মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক পর্যায়ের ১০ টি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। বন্দর পরিচালিত শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো ভাল ফলাফল ও সহ-পাঠ্য কার্যক্রম  চর্চার মাধ্যমে এ অঞ্চলের শিক্ষার্থীদের মানসিক বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। শিক্ষার্থীদের ভাল ফলাফলে অনুপ্রাণিত করতে রয়েছে পুরস্কার। আর সুপ্ত প্রতিভা বিকাশে শিক্ষার্থীদের নানান পরিবেশনা নিয়ে আয়োজন করা হয় সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের। বন্দর কর্তৃপক্ষ উচ্চ বিদ্যালয়, বন্দর বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণে মনোজ্ঞ সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান এবং পিএসসি, জেএসসি ও এসএসসি পরীক্ষায় জিপিএ-৫ প্রাপ্ত শিক্ষার্থীদের ‘চেয়ারম্যানস্ অ্যাওয়ার্ড’ প্রদান অনুষ্ঠানের আয়োজন ছিল ২২, ২৩ ও ২৪ মে। টানা তিনদিন তিনটি অনুষ্ঠানের প্রস্তুতি চলেছে পুরো মাস জুড়ে। অনুষ্ঠান ঘিরে শিক্ষার্থীদের মধ্যে ছিল উৎসাহ উদ্দীপনা আর বিদ্যালয়গুলোতে ছিল উৎসবের আমেজ। বন্দর কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যানসহ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সরব উপস্থিতি এসব অনুষ্ঠানকে দিয়েছে বাড়তি মাত্রা।

সেরাদের জন্য চেয়ারম্যানস্ অ্যাওয়ার্ড

বন্দর পরিচালিত স্কুলসমূহের কৃতি ছাত্রছাত্রীদের উৎসাহিত করতে ২০০৪ সালে ‘চেয়ারম্যানস্ অ্যাওয়ার্ড’ প্রদান চালু করেন চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের তৎকালীন চেয়ারম্যান একেএম শাহাদাত হোসেন। এরই ধারাবাহিকতায় এবারো পিএসসি, জেএসসি, জেডিসি, দাখিল ও এসএসসি পরীক্ষায় জিপিএ-৫ প্রাপ্ত ছাত্রছাত্রীদের দেয়া হয়েছে এ পুরস্কার। গত ২৪ মে শহীদ মুন্সী ফজলুর রহমান অডিটোরিয়ামে বন্দর পরিচালিত প্রাথমিক ও মাধ্যমিক পর্যায়ের ২৪৬ জন ছাত্রছাত্রীকে দেয়া হয় এ পুরস্কার। বন্দর কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান রিয়ার এডমিরাল এম খালেদ ইকবাল প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থেকে ছাত্রছাত্রীদের হাতে সনদ ও প্রাইজমানি তুলে দেন। অনুষ্ঠানে বন্দর কর্তৃপক্ষের পরিচালক (প্রশাসন) সাদেকা বেগমের সভাপতিত্বে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বন্দর কর্তৃপক্ষের সদস্য- কমডোর জুলফিকার আজিজ, জাফর আলম, কমডোর শাহীন রহমান এবং কামরুল আমিন।

বন্দর কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান রিয়ার এডমিরাল এম খালেদ ইকবাল বলেন, ‘ধারাবাহিকভাবে ভাল ফলাফল করতে হবে। নির্দিষ্ট সময় পড়ালেখার বাইরে নিয়মিত খেলাধুলা ও সাংস্কৃতিক চর্চা করতে হবে।’

এবারের চেয়ারম্যানস্ অ্যাওয়ার্ড অনুষ্ঠানে ২০১৫ সালের পিএসসি পরীক্ষায় জিপিএ-৫ প্রাপ্ত বন্দরের চারটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ৬৪ জন, এবতেদায়ী পরীক্ষায় জিপিএ-৫ প্রাপ্ত বন্দর মোহাম্মদীয়া দাখিল মাদ্রাসার ৩ জন, বন্দর কর্তৃপক্ষ উচ্চ বিদ্যালয়ের ২০১৫ সালের জেএসসি পরীক্ষায় গোল্ডেন জিপিএ-৫ প্রাপ্ত ৮ জন, সাধারণ জিপিএ-৫ প্রাপ্ত ১৬ জন, এসএসসি পরীক্ষায় ২০১৫ ও ২০১৬ সালে গোল্ডেন জিপিএ-৫ প্রাপ্ত ৭ জন, সাধারণ জিপিএ-৫ প্রাপ্ত ২৩ জন, বন্দর কর্তৃপক্ষ বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের ২০১৫  সালের জেএসসি পরীক্ষায় গোল্ডেন জিপিএ-৫ প্রাপ্ত ১৪ জন, সাধারণ জিপিএ-৫ প্রাপ্ত ৩২ জন, ২০১৫ ও ২০১৬ সালের এসএসসি পরীক্ষায় গোল্ডেন জিপিএ-৫ প্রাপ্ত ১১ জন ও সাধারণ জিপিএ-৫ প্রাপ্ত ৩১ জন এবং বন্দর মোহাম্মদীয়া দাখিল মাদ্রাসার ২০১৫ সালের জেডিসি পরীক্ষায় গোল্ডেন জিপিএ-৫ প্রাপ্ত ২ জন, সাধারণ জিপিএ-৫ প্রাপ্ত ৫ জন, ২০১৫ ও ২০১৬ সালের দাখিল পরীক্ষায় গোল্ডেন জিপিএ-৫ প্রাপ্ত ১ জন ও সাধারণ জিপিএ-৫ প্রাপ্ত ১৯ জনকে সনদ ও প্রাইজমানি প্রদান করা হয়। এছাড়া বন্দর কর্তৃপক্ষ বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় ও বন্দর কর্তৃপক্ষ উচ্চ বিদ্যালয় থেকে মেধা ও বুদ্ধিমত্তার বিচারে ৫ জন করে ১০ জন চৌকষ শিক্ষার্থীকে চেয়ারম্যানস্ অ্যাওয়ার্ড প্রদান করা হয়।

শতাধিক ছাত্রীর অংশগ্রহণে মনোজ্ঞ সাংস্কৃতিক পরিবেশনা

প্রত্যেকটি শিশুরই একটি নিজস্ব জগৎ আছে। পড়ালেখার পাশাপাশি ছবি আঁকা, গান, নাচ, খেলাধুলা ও নিজেদের ভালোলাগার বিষয়গুলো নিয়ে থাকতে চায় তারা। কিন্তু বাস্তবে তা হয়ে উঠে না। অভিভাবকদের চাওয়া পাওয়ার ভীড়ে হারিয়ে যায় শিশুদের স্বকীয়তা। চলমান জীবনের এই বাস্তবচিত্র নাটকের মাধ্যমে উপস্থাপন করেছেন বন্দর কর্তৃপক্ষ বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের একদল শিক্ষার্থী। ‘লেখাপড়া’ শিরোনামের এই নাটকের মাধ্যমে শিক্ষার্থীরা শিশুদের উপর কোনো কিছু চাপিয়ে না দিয়ে তাদের স্বকীয়তা ও স্বতঃস্ফূর্ততার উপর অভিভাবকদের গুরুত্ব দেয়ার আহ্বান জানিয়েছে। গত ২৩ মে বিদ্যালয়ের বার্ষিক পুরস্কার বিতরণী ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে চমকপ্রদ এ উপস্থাপনা প্রশংসা কুড়িয়েছে সবার।

নাটকের পর যাপিত জীবনের আরেক সমস্যা ‘মোবাইল ফোনের বিড়ম্বনা’ নিয়ে ব্যতিক্রমী মূকাভিনয় উপস্থাপন করে শিক্ষার্থীরা। ‘আমি তাকডুম তাকডুম বাজাই বাংলাদেশের ঢোল’ গানের সাথে নৃত্যের তালে তালে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের শুরু হয়। এরপর একে একে আধুনিক গান, যন্ত্রসংগীতের সুরে নৃত্য, জারিগান, ভাওয়াইয়া গান, আবৃত্তি, আধুনিক ও পাহাড়ী নৃত্য নিয়ে মঞ্চে আসেন শিক্ষার্থীরা। প্রায় শতাধিক ছাত্রীর এসকল পরিবেশনা মুগ্ধ করে দর্শকদের।

অনুষ্ঠানের প্রথম পর্বে বিদ্যালয়ের বার্ষিক প্রতিবেদন উপস্থাপন করেন বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষিকা রাফিয়া খাতুন। এরপর একাডেমিক ফলাফলে মেধাস্থান অর্জনকারী শিক্ষার্থী, জেএসসি ও এসএসসি পরীক্ষায় জিপিএ-৫ প্রাপ্ত শিক্ষার্থী, রচনা প্রতিযোগিতা, বিতর্ক প্রতিযোগিতায় বিজয়ী এবং সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণকারী সকল শিক্ষার্থীকে পুরস্কৃত করা হয়।

পুরস্কারে অনুপ্রাণিত হলো বালকেরাও

বন্দর কর্তৃপক্ষ উচ্চ বিদ্যালয়ের বার্ষিক পুরস্কার বিতরণী ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান গত ২২ মে শহীদ মুন্সী ফজলুর রহমান অডিটোরিয়ামে উদ্যাপিত হয়েছে।

বিদ্যালয়ের বার্ষিক প্রতিবেদন উপস্থাপন করেন প্রধান শিক্ষক মো. মোকতার হোসাইন। বিদ্যালয়ের শিক্ষক মো. রেজাউল আবেদীনের সঞ্চালনায় অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথির বক্তব্য রাখেন বন্দরের পর্ষদ সদস্য জাফর আলম এবং কামরুল আমিন।

প্রধান অতিথির বক্তব্যে বন্দর কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান বলেন, ‘শিক্ষার্থীদের পড়ালেখার পাশাপাশি আধুনিক বিশ্বে নিজেকে একজন যুগোপযোগী ও চরিত্রবান মানুষ হিসেবে গড়ে উঠতে হবে। শিক্ষা অর্জনের মূল উদ্দেশ্য সনদ অর্জন নয়, মূল উদ্দেশ্য হতে হবে দেশ ও মানুষের কল্যাণে একজন আত্মপ্রতিষ্ঠিত সুনাগরিক হিসেবে গড়ে উঠা।’

দ্বিতীয় পর্বে অতিথিরা ৭ম-১০ম শ্রেণির বার্ষিক পরিক্ষায় শীর্ষ স্থানের ৩ জন, জেএসসি ও এসএসসি পরিক্ষায় জিপিএ-৫ প্রাপ্ত ও সাংস্কৃতিক প্রতিযোগীতার বিজয়ী ছাত্রদের পুরস্কার প্রদান করা হয়। এছাড়া নৌস্কাউটে প্রেসিডেন্ট অ্যাওয়ার্ডপ্রাপ্ত ১০ম শ্রেণির ছাত্র আলজবি হোসেনকে বিশেষ পুরস্কার দেওয়া হয়। এরপর ছাত্রদের অংশগ্রহণে মনোজ্ঞ সাংস্কৃতিক পরিবেশনা অনুষ্ঠিত হয়। আধুনিক গান, আঞ্চলিক গান, জারিগান, নাচ, আবৃত্তি এবং কৌতুক পরিবেশনের মাধ্যমে অতিথি ও দর্শকদের মুগ্ধ করেন ছাত্ররা।

বিশ্বের প্রথম মিথানল চালিত ফেরি চালু করছে স্টেনা লাইন

ভবিষ্যতের জন্য টেকসই ও পরিবেশবান্ধব সমুদ্রপরিবহন ব্যবস্থা বিনির্মাণে প্রয়োজন উন্নততর প্রযুক্তি। এজন্য বিকল্প জ্বালানি হিসেবে স্টেনা লাইন বেছে নিয়েছে মিথানলকে। সুইডেনের কিয়েল-গোথেনবার্গ জলপথে প্রতিষ্ঠানটি সম্প্রতি চালু করেছে বিশ্বের প্রথম মিথানল চালিত ফেরি।

২৬ মার্চ ‘স্টেনা জার্মানিকা’ ফেরিটি দু’মাসের রূপান্তর প্রক্রিয়ার পরিসমাপ্তি ঘটিয়ে পুনরায় কার্যক্ষেত্রে প্রবেশ করেছে। এরই মাধ্যমে বিশ্বের প্রথম শিপিং কোম্পানি হিসেবে স্টেনা লাইন পরিবেশবান্ধব মিথানলকে প্রধান জ্বালানী হিসেবে ব্যবহারকারী জাহাজের পরিচালনা প্রতিষ্ঠান হিসেবে ইতিহাসে স্থান করে নিল। এই মাইলফলককে স্মরণীয় করে রাখতে ২৭ মার্চ কিয়েলে এবং ৩০ মার্চ গোথেনবার্গে উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। 

স্টেনা লাইনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা কার্ল জোহান হ্যাগম্যান বলেন. ‘মিথানলের সম্ভাবনা নিয়ে আমরা নিঃসন্দেহে আশাবাদী, নৌপরিবহন খাতের ভবিষ্যৎ জ্বালানি হতে যাচ্ছে এটি। সাথে পরিবেশ সুরক্ষায় যা নৌখাতে একটি অভূতপূর্ব বিপ্লবের সূচনা করবে’।

মিথানল সহজে পচনশীল, পরিবেশবান্ধব এবং সাশ্রয়ী। এর ব্যবহারের ফলে নৌযানসমূহ থেকে সালফার ও অন্যান্য ক্ষতিকর উপাদান নিঃসরণের হার ৯৯% পর্যন্ত হ্রাস পাবে। শিপইয়ার্ডে স্টেনা জার্মানিকার ফুয়েল সিস্টেম ও ইঞ্জিন পরিবর্তনের কাজটি সম্মিলিতভাবে করেছে স্টেনা লাইন ও ওয়ার্টসিলা। ফেরিটিতে ব্যবহৃত প্রযুক্তিকে বলা হয় ডুয়াল ফুয়েল প্রযুক্তি যেখানে মিথানল প্রধান জ্বালানি হিসেবে থাকলেও জরুরি মুহূর্তে মেরিন গ্যাস অয়েল (এমজিও) ব্যবহারের সুযোগ থাকবে।

স্টেনা জার্মানিকার রূপান্তরিকরণ হয়েছে পোল্যান্ডের ড্যানস্ক শহরের রেমোনতোভা শিপইয়ার্ডে। ইউরোপীয় ইউনিয়নের ‘মোটরওয়েজ অফ দ্য সিজ’ উদ্যোগ এই প্রকল্পে সহযোগিতা প্রদান করেছে। মোট ২২ মিলিয়ন ইউরো ব্যয়ে সম্পন্ন এই প্রকল্প এরই মাঝে প্রযুক্তির সৃষ্টিশীল ব্যবহার এবং পরিবেশগত সুরক্ষার জন্য প্রশংসিত হয়েছে।  

স্টেনা লাইন বহু বছর ধরে এনার্জি সেভিং প্রোগ্রামে (ইএসপি) বিনিয়োগ করে আসছে যা টেকসই পরিবেশ উন্নয়নে প্রতিষ্ঠানটির অঙ্গীকারেরই প্রকাশ। 

মিথানলের নানাদিক

মিথানল একটি বর্ণহীন তরল পদার্থ যা উৎপন্ন হয় মূলত প্রাকৃতিক গ্যাস. কয়লা, জৈববর্জ্য অথবা কার্বন ডাই অক্সাইড থেকে। জ্বালানি হিসেবে মিথানলের ব্যবহারে অন্যান্য আন্তর্জাতিক জ্বালানির তুলনায় সালফারের নিঃসরণ ৯৯% এবং নাইট্রোজেনের নিঃসরণ ৬০% পর্যন্ত হ্রাস পায়। এছাড়াও এটি ব্যবহারে ক্ষতিকর পার্টিকেলের (পিএম) নিঃসরণ ৯৫% এবং কার্বন ডাই অক্সাইডের নিঃসরণ ২৫% কমে যায়। মিথানল থেকে নিঃসরিত উপাদানের পরিমাণ তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) হতে নিঃসরিত উপাদানের প্রায় সমান। কিন্তু মিথানলের উৎপাদন প্রক্রিয়া তুলনামূলক সহজ এবং এর ব্যবহারে প্রয়োজনীয় অবকাঠামোগত চাহিদাও কম।

সূত্র: প্রেস রিলিজ, স্টেনা লাইন ডট কম

অনুলিখন- মনীষ দাশ

প্রদায়ক, বন্দরবার্তা

শায়েস্তা খানের আমলে মুঘলদের দখলে এলো চট্টগ্রাম

আরাকান আমলে চট্টগ্রাম বন্দরের সমৃদ্ধি ঘটলেও সে সময় দৌরাত্ম বেড়ে যায় পর্তুগীজ এবং মগ জলদস্যুদের। এরা চট্টগ্রামের আশেপাশে সন্দ্বীপের মত দ্বীপে ঘাঁটি গেড়ে বাংলার বিভিন্ন অঞ্চলে লুটপাট করত এবং লুটের সামগ্রী চট্টগ্রাম বন্দরে এনে বিক্রি করত। মূল্যবান সামগ্রী ছাড়াও তারা বাংলার বিভিন্ন অঞ্চল থেকে কিশোর-কিশোরী কিংবা সাধারণ নাগরিকদের তুলে নিত দাস হিসেবে বিক্রি করার উদ্দেশ্যে।

বাংলায় যখন জলদস্যুরা অত্যাচার চালাচ্ছিল সে সময় সম্রাট শাহজাহানের চার পুত্রের মধ্যে সিংহাসন নিয়ে দ্বন্দ্বে পরাজিত শাহ সুজা পালিয়ে আরাকানে আশ্রয় নেন। শাহ সুজার কন্যাকে আরাকান রাজ বিয়ে করতে চান, কিন্তু মুঘল যুবরাজ শাহ সুজা কিছুতেই আরাকান রাজার কাছে তার কন্যাকে বিয়ে দেবেন না। এই নিয়ে সংঘর্ষে শাহ সুজা সপরিবারে নিহত হন। মুঘল সিংহাসন দখলে শাহ সুজা ছিলেন আওরঙ্গজেবের প্রতিদ্বন্দ্বী। তবুও  ভ্রাতৃ হত্যা মেনে নিতে পারেন নি সম্রাট আওরঙ্গজেব। অবিলম্বে তিনি চট্টগ্রামকে আরাকান মুক্ত করতে তার অন্যতম সেরা সেনাপতি শায়েস্তা খানকে অভিযানের আদেশ প্রদান করেন। তবে চট্টগ্রাম দখল এত সহজ ছিল না, কারণ চট্টগ্রাম ছিল আরাকানদের এক সমৃদ্ধ বন্দর, যেখানে ছিল এক শক্তিশালী নৌঘাঁটি এবং দুর্ভেদ্য দুর্গ। এই বাহিনীতে ছিল ঘুরবা, জালবা, খালুস ও ঢুমাস নামের নৌযান। এগুলো এমন শক্ত কাঠ দিয়ে বানানো হত যে ছোট আকারের কামানের ঘায়েও ক্ষতিগ্রস্ত হত না।

শায়েস্তা খান যখন বাংলার সুবেদার বা শাসক হয়ে আসেন সে সময় চট্টগ্রাম মারাক-উ নামের এক আরাকান রাজ্যের প্রধান বন্দর। ফলে বন্দরের নিরাপত্তার জন্য আরাকান সম্রাট এক  শক্তিশালী নৌবাহিনী গঠন করেছিল। তবে চট্টগ্রামের নিযুক্ত বেশ কিছু আরাকানী শাসকের বিশ্বাসঘাতকতার কারণে আরাকান সম্রাট প্রতি বছর চট্টগ্রামে  নতুন করে একদল সেনা পাঠাতেন।

চট্টগ্রাম বন্দর এবং দুর্গ ছিল আরাকান সাম্রাজ্যের গর্ব। চারপাশের সুউচ্চ পাহাড় আর ঘন জঙ্গল দ্বারা প্রাকৃতিক ভাবে সুরক্ষিত ছিল তা। চট্টগ্রাম থেকে ফেনী যেতে ৯৯টি নালা পার হতে হত। এই সকল নালা বর্ষকালে থাকত খুবই খরস্রোতা। দুর্গটি ছিল কর্ণফুলী নদীর পাড়ে। দুর্গের একপাশে প্রায় ৮ গজ প্রশস্ত এক গভীর পরিখা খনন করা হয়। দুর্গের ভেতর দুটি ঝর্ণা প্রবাহিত ছিল। ঝর্ণা দুটির পানি এসে কর্ণফুলী নদীতে পড়ত। বর্ষাকালে এই ঝর্ণা বেশ বড় আকারের খালে পরিণত হত।

৮ মার্চ, ১৬৬৪ সালে শায়েস্তা খান বাংলার সুবেদার হিসেবে নিয়োগ প্রাপ্ত হন। ঢাকায় এসে তিনি একটি শক্তিশালী নৌবাহিনী গড়ে তোলার উদ্যোগ গ্রহণ করেন। তৈরি হয় ৭৬৮টি নৌকার সশস্ত্র এক বহর। তার এই নৌবহরের অবস্থান ছিল ঢাকায়। এই বাহিনীতে ৯২৩ জন ফিরিঙ্গি বা পর্তুগীজ নাবিক ছিলেন। নবাব মূলত হুগলীর পর্তুগীজদের তার নৌবহরে অর্ন্তভুক্ত করে নেন। পুরো এই নৌবহর প্রতিপালনে বার্ষিক ব্যয় হত তখনকার ৮ লাখ রুপি। এই অর্থ আসত নবাবের ১১২টি মহল বা জমিদারী থেকে যেগুলো নাওয়ারা নামে পরিচিত ছিল। চট্টগ্রাম অভিযানের প্রস্তুতি হিসেবে নবাব হুগলী বন্দরে অবস্থিত ডাচ বা ওলন্দাজ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানিকে আদেশ করেন তার সেনাদলকে সাহায্য করার জন্য।

চট্টগ্রাম অভিযানের আগে মীর মুর্তাজা খান নামে নবাবের এক সেনাপতি ঢাকা এবং এর আশেপাশের এলাকা থেকে প্রায় হাজার খানেক কুঠার সংগ্রহ করেন। এই সকল কুঠার চট্টগ্রামের জঙ্গল কাটার জন্য ব্যবহার করা হয়। যাত্রা শুরুর কয়েকদিনের মধ্যে নবাবের পুত্র বুজুর্গ উম্মিদ খান সমস্ত সেনাদল নিয়ে ফেনী নদী পার হন। তিনি ছিলেন এই বাহিনীর প্রধান সেনাপতি। ফেনী নদীর অপর পাড় থেকে শুরু হত আরাকান রাজত্ব। ফেনীর কাছে জাগদিয়া নামক এলাকায় একটি মুঘল ঘাঁটি ছিল। মুঘল সেনাদল এই ঘাঁটি থেকে চট্টগ্রামে চূড়ান্ত হামলার জন্য প্রস্তুতি নেয়। সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয় স্থল এবং নৌপথে হামলা চালানো হবে।

নবাবের বাহিনীতে ২৮৮টি নৌযান ছিল। এগুলোর মধ্যে ছিল ঘুরাব, সালাব, কোষা, জালবা, বাচারি, পারেন্দা নামক নৌকা। ২৩ জানুয়ারি, ১৬৬৬ সালে কর্ণফুলী নদীর মোহনায় মুঘল নৌবাহিনী আরাকান নৌবাহিনীর উপর আক্রমণ চালায়। দুইদিনের মধ্যেই মুঘল বাহিনীর নৌযুদ্ধ কৌশলের কাছে আরাকান নৌবাহিনী হার মানতে বাধ্য হয়। এই নৌযুদ্ধে নবাবের বাহিনী শত্রুপক্ষের ১৩৫ টি নৌযান দখল করে। তবে চট্টগ্রাম দুর্গ থেকে আরাকান সেনারা প্রতিরোধ চালিয়ে যাচ্ছিল। নৌযুদ্ধের পরাজয়ের পর তাদের মনোবল ভেঙ্গে পড়ে ফলে দুর্গ রক্ষায় নিয়োজিত আরাকানী সেনারা পালিয়ে যেতে শুরু করে। ১৬৬৬ সালের ২৬ জানুয়ারি আরাকান দুর্গের পতন ঘটে। চট্টগ্রামের আরাকানী শাসককে সপরিবারে বন্দী করে ঢাকায় নিয়ে যাওয়া হয়। শায়েস্তা খানের চট্টগ্রাম জয়ের মধ্যে দিয়ে এই অঞ্চল এবং বন্দর মুঘল ভারতের বাংলা পরগণা বা প্রদেশের এক অংশে পরিণত হয় যা আজ বাংলাদেশের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ।

মেরিটাইম বিশ্বে সাইবার নিরাপত্তা

২০১১ সালের জুন মাস, বেলজিয়ামের অ্যান্টওয়ার্প বন্দরের কম্পিউটারাইজ্ড কার্গো ট্র্যাকিং ব্যবস্থায় সবার অলক্ষ্যে ঢুকে পড়ল একদল হ্যাকার। তাদের উদ্দেশ্য মাদক লুকানো কার্গোগুলো কোথায় আছে সেই তথ্য মাদক চোরাকারবারীদের কাছে পাচার করা। চোরাকারবারীরা মাদক সরিয়ে ফেললে হ্যাকাররা কার্গোগুলোর সকল তথ্য গায়েব করে দিত, ফলে কেউ জানতো না কিভাবে আসছে মাদকের চালান। সবার চোখকে ফাঁকি দিয়ে দুইবছর ধরে হ্যাকাররা এই অপতৎপরতা চালিয়ে আসছিল।  এতে দেশটিতে বাড়তে থাকে মাদক অপরাধের সংখ্যা। কিন্তু মূল অপরাধীদের নাগাল পাচ্ছিল না পুলিশ। অবশেষে ২০১৩ সালে বন্দরে বেলজিয়াম ও ডাচ পুলিশের যৌথ অভিযানের মাধ্যমে অপরাধী হ্যাকার চক্রটি ধরা পড়ে।

এটা ছোট একটা ঘটনার উদাহরণ মাত্র। অন্যান্য সেক্টরের মত মেরিটাইম বিশে^ও ইন্টারনেটের অবাধ প্রসার এবং ব্লু টুথ, ওয়াইফাইসহ ওয়্যারলেস নেটওয়ার্কের সহজপ্রাপ্যতার কারণে একজন সাইবার অপরাধী এখন খুব সহজেই সুরক্ষিত কম্পিউটার ব্যবস্থায় ঢুকে কিংবা ব্যবহারকারীর অজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে এবং ক্ষতিকর প্রোগ্রাম (স্প্যাম, ভাইরাস, ম্যালওয়্যার ইত্যাদি) পাঠিয়ে কম্পিউটার ব্যবস্থার নিয়ন্ত্রণ নিতে পারে। এই খাতে অসচেতনতা ও দক্ষ প্রযুক্তিবিদের অপ্রতুলতা সেই ঝুঁকি বাড়িয়ে দিয়েছে বহুগুণ। বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, যেকোনো সময় সাইবার আক্রমণের শিকার হতে পারে নৌপরিবহন খাত।

ব্যবসা বাণিজ্যের ক্ষেত্র যতই প্রসারিত হচ্ছে, ততই বাড়ছে তথ্যপ্রযুক্তির ব্যবহার। অর্থাৎ বাড়ছে সফ্টওয়্যার নির্ভরতা। সফ্টওয়্যারগুলো তৈরি হয় অসংখ্য কোডের সমন্বয়ে। একজন প্রোগ্রামার যখন কোনো সফ্টওয়্যারের কোড লেখেন তখন প্রতি হাজার লাইন কোডে গড়ে ১০ থেকে ৫০টি ভুল থাকে। বড় কর্পোরেশনগুলোর তৈরি সফ্টওয়্যারের ক্ষেত্রে ভুলের এই পরিমাণ প্রতি হাজার লাইনে ০.৫টি পর্যন্ত নেমে আসে। আপাতদৃষ্টিতে নগণ্য মনে হলেও যখন আমরা জানতে পারি যে মাইক্রোসফটের উইন্ডোজ অপারেটিং সিস্টেমে ৫০ মিলিয়ন লাইন কোড এবং গুগলে সর্বমোট ২ বিলিয়ন লাইন কোড রয়েছে, তখন কোডের এই মহাসাগরে ভুলের পরিমাণ হিসাব করলে তা একটি সফল সাইবার অ্যাটাক ঘটানোর জন্য যথেষ্ট।

কেপিএমজি, ইওয়াই, রিস্ক ডট নেট এর মতো ম্যানেজমেন্ট কনসালটেন্সি প্রতিষ্ঠানের গবেষণায় উঠে এসেছে ‘সাইবার আক্রমণ’ বর্তমানে ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলোর পরিচালন ঝুঁকিসমূহের মধ্যে অগ্রগণ্য। নিত্যনতুন কৌশল অবলম্বন করে সাইবার অপরাধীরা হাতিয়ে নিচ্ছে অর্থ এবং মূল্যবান তথ্য। ২০১৬ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে ড্রাইডেক্স ম্যালওয়ার ব্যবহার করে অপরাধীরা নিউইয়র্কের ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংকে রক্ষিত বাংলাদেশ ব্যাংকের ১০১ মিলিয়ন মার্কিন ডলার হাতিয়ে নেয় যার পুরোটা এখনো উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি। সম্প্রতি বিশ্বব্যাপী ওয়ানাক্রাই র‍্যানসমওয়্যার ক্রিপ্টোওয়ার্মের আক্রমণে হাজার হাজার কম্পিউটার অচল হয়ে পড়ে। বিশ্বের মোট বাণিজ্যের সিংহভাগ নৌপরিবহন খাতের মাধ্যমে হয় বলে এই শিল্প আক্রান্ত হবার ঝুঁকিও বেশি।

সাইবার নিরাপত্তা খাতে বিনিয়োগে বড় সমস্যা হচ্ছে, অনেক জাহাজ কোম্পানি সরাসরি সাইবার আক্রমণে কোনো ধরনের আর্থিক ক্ষতির সম্মুখীন না হলেও তাদের ব্যবহৃত সফ্টওয়্যারের রক্ষণাবেক্ষণ ও নিরাপত্তায় প্রচুর অর্থ খরচ করে। ফলে কোম্পানি পরিচালনায় নানা সমস্যার সৃষ্টি হয়। এতে তারা সাইবার নিরাপত্তায় অর্থ খরচে উৎসাহ হারিয়ে ফেলে। আবার অনেক কোম্পানি আছে যারা সাইবার নিরাপত্তার বিষয়ে অবস্থান নেবার মতো সুসংগঠিত অবস্থায় নেই। ‘সি এশিয়া’য় প্রকাশিত সর্বশেষ পরিসংখ্যান অনুযায়ী নৌপরিবহন খাতের ৫৫% কোম্পানিই স্বীকার করেছে সাইবার আক্রমণ ঠেকাতে তাদের সুনির্দিষ্ট কোনো নীতিমালা নেই। সাইবার নিরাপত্তা খাতের কনসালটেন্সি ফার্ম সাইবারকিলের এক পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, এই শিল্পের সাথে জড়িত এবং উইন্ডোজ ওয়েবসার্ভার ব্যবহারকারী কোম্পানিগুলোর মাঝে ৩৭ শতাংশই মাইক্রোসফ্টের সিকিউরিটি প্যাচ ইনস্টল করেনি। এতে করে কোম্পানিগুলোর সার্ভার হ্যাকারদের আক্রমণের সর্বোচ্চ ঝুঁকিতে রয়েছে।

প্লাইমাউথ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে প্রকাশিত এক প্রবন্ধে বলা হয়েছে, অনেক জাহাজ পরিচালনাকারী কোম্পানি পুরনো সফ্টওয়্যার সিস্টেম ব্যবহার করার কারণে বিপদজ্জনক অবস্থার সম্মুখীন হতে পারে। আইনপ্রয়োগকারী সংস্থাগুলোও নৌপরিবহন শিল্প সাইবার হামলার ঝুঁকিতে আছে জানিয়ে সতর্কবার্তা দিয়েছে। প্রযুক্তির দ্রুত পরিবর্তনের কারণে অপরাধীরা সহজেই অরক্ষিত সিস্টেমে ঢুকে পড়ছে। সমুদ্রগামী জাহাজগুলোর সাথে ডাঙ্গার স্থাপনাসমূহের অব্যাহত যোগাযোগ, স্মার্ট ফোন, ক্লাউড কম্পিউটিংয়ের ক্রমবর্ধমান ব্যবহার, ইন্টারনেট ও সামাজিক যোগাযোগ নেটওয়ার্কের প্রসার- সবকিছুই নৌখাতের এই ঝুঁকি বাড়িয়ে দিচ্ছে প্রতিনিয়ত।

নৌখাত সামনের দিনগুলিতে যেসব সাইবার হামলার মুখোমুখি হতে পারে

  • ইমেইল স্পুফিংয়ের মাধ্যমে ভুয়া অ্যাকাউন্টে ফান্ড ট্রান্সফার
  • জিপিএস সিস্টেম হ্যাক করে জাহাজকে ভুল গন্তব্যে পরিচালিত করা
  • ভাসমান তেল প্ল্যাটফর্মের ভারসাম্য নষ্ট করে দিয়ে সেটিকে বন্ধ করে দেয়া
  • কার্গো/কনটেইনার ম্যানেজমেন্ট নেটওয়ার্কে প্রবেশ করে সবার অলক্ষ্যে চোরাই পণ্যবাহী কার্গো/কনটেইনার সরিয়ে ফেলা
  • শিপিং কোম্পানির কম্পিইটার হ্যাক করে মূল্যবান কার্গোবাহী ও অপ্রতুল নিরাপত্তা ব্যবস্থাসম্পন্ন জাহাজ খুঁজে নিয়ে সেটিকে হাইজ্যাক করা

সাইবার হামলা ঠেকানোর কোনো সুনির্দিষ্ট সমাধান নেই। সাইবার নিরাপত্তায় বিশেষজ্ঞরা পাঁচটি ভিত্তির কথা উল্লেখ করেছেন। প্রথমেই ঝুঁকিগুলো চিহ্নিত করতে হবে। এমন ঝুঁকি প্রতিষ্ঠানের অভ্যন্তরীণ বা বাহ্যিক হতে পারে। এরপর আসবে ঝুঁকি সনাক্তকরণ। এছাড়া অন্য ভিত্তিগুলো হলো- প্রতিরোধ, সম্ভাব্য সাইবার ঝুঁকি মোকাবেলায় প্রস্তুতি ও হামলা পরবর্তী সময়ে স্বাভাবিক কার্যক্রম পুনরুদ্ধার। ২০১৫ সালে প্রকাশিত লন্ডনের লয়েড সাময়িকীর মতে প্রতিবছর বিশ্বজুড়ে সাইবার হামলার কারণে নৌপরিবহন খাতে কোম্পানিগুলোর ৪০০ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের আর্থিক ক্ষতি হচ্ছে। এর পাশাপাশি অন্যান্য ক্ষতির পরিমাণও কম নয়।

সাইবার হামলা ঠেকাতে করণীয়

  • ডাঙ্গার কর্মীবাহিনী থেকে শুরু করে জাহাজের নাবিক, নৌখাতের সকল স্টেকহোল্ডারদের মাঝে সচেতনতা বৃদ্ধিই হলো সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। কারণ সাইবার আক্রমণকারীরা মূলত মানুষের ভুলকে পুঁজি করেই তাদের আক্রমণ পরিচালনা করে থাকে। ৯৭% ক্ষেত্রে তারা মানবীয় আবেগকে হাতিয়ার বানিয়ে ব্ল্যাকমেইলিংয়ের মাধ্যমে তাদের কাজ হাসিল করে নেয়।
  • গবেষণায় দেখা গেছে হ্যাকাররা বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই নেভিগেশন, প্রপালশন কিংবা কার্গো সম্পর্কিত সিস্টেমগুলোকে টার্গেট করে। বিশ্ববাণিজ্যের ৯০% সম্পন্ন হয় নৌপরিবহন ব্যবস্থার মাধ্যমে। তাই এই শিল্পের নিরাপত্তা বিধানে ব্যবহার করতে হবে সর্বাধুনিক প্রযুক্তি। এই শিল্পের সাথে জড়িত কোম্পানিগুলোর উচিত নিয়মিত তাদের নেটওয়ার্কের অবস্থা পর্যালোচনা করা। অপারেটিং সিস্টেম, এন্টিভাইরাস সফ্টওয়্যার, ওয়েব ব্রাউজার, ফায়ারওয়াল- সবকিছুকেই পর্যবেক্ষণ ও হালনাগাদের আওতায় রাখতে হবে। একইসাথে এসব বিষয়ে কর্মীদের সচেতন করার লক্ষ্যে নিয়মিত প্রশিক্ষণের কোনো বিকল্প নেই।
  • বিশ্বে সাইবার হামলার অধিকাংশই ঘটে থাকে দুর্বল পাসওয়ার্ড হ্যাকিংয়ের মাধ্যমে। কোম্পানিগুলোর উচিত তাদের পাসওয়ার্ডগুলো যথাযথভাবে নির্বাচন করা এবং নিয়মিত সেগুলো পরিবর্তন করা। খেয়াল রাখতে হবে যাতে একই পাসওয়ার্ড একাধিক নেটওয়ার্কে ব্যবহৃত না হয় এবং নির্দিষ্ট ব্যক্তিবর্গব্যতিত পাসওয়ার্ড অন্যদের নিকট না পৌঁছায়।
  • সাইবার নিরাপত্তা ব্যবস্থায় ত্রুটি খুঁজে পাবার সর্বোত্তম উপায় হচ্ছে একাজে একদল পেশাদার কর্মী নিয়োগ করা। এরকম দলকে বলা হয় এথিক্যাল হ্যাকার যারা কোম্পানিগুলোর নিরাপত্তা ব্যবস্থায় ত্রুটি খুঁজে পেতে নিজেরাই সীমিত পরিসরে সাইবার হামলা চালায় এবং সেই ত্রুটিগুলো কাটিয়ে উঠতে সাহায্য করে। এই ব্যবস্থা এতটাই ফলদায়ী যে গুগল, ফেসবুকের মতো টেকজায়ান্টদেরও এথিক্যাল হ্যাকারদের শরণাপন্ন হতে হয়। আপাতদৃষ্টিতে এই পদ্ধতি ব্যয়বহুল মনে হলেও এতে করে কোম্পানির মূল্যবান সম্পদ ও সুনাম সাইবার আক্রমণ থেকে সুরক্ষিত থাকে।
  • বৈশ্বিক নৌপরিবহনখাত বিভিন্ন ধাপে বিভক্ত (জাতীয়, আঞ্চলিক, আন্তর্জাতিক) হওয়ায় ইন্টারন্যাশনাল মেরিটাইম অর্গানাইজেশন (আইএমও) এর উচিত সদস্য দেশগুলোকে সাথে নিয়ে সাইবার হামলা মোকাবেলায় সুনির্দিষ্ট কার্যতালিকা এবং নীতিমালা ঠিক করা। বর্তমানে এই খাতের বাহ্যিক নিরাপত্তা বিষয়ে নীতিমালা (আইএসপিএস) থাকলেও সাইবার নিরাপত্তার বিষয়টি সম্পূর্ণ উপেক্ষিত। একইসাথে এই শিল্পের সাথে সংযুক্ত প্রতিষ্ঠানগুলোরও উচিত নিজেদের নিরাপত্তা রক্ষায় অভ্যন্তরীণ নীতিমালা প্রণয়ন করা যাতে করে হামলাকারীরা সহজে তাদের নেটওয়ার্কে প্রবেশ করতে না পারে। 

আধুনিক নৌযানগুলোতে সংযুক্ত হয়েছে এমন সব ‘সিস্টেম’ যেখানে জাহাজ পরিচালনা ও তথ্যপ্রযুক্তির ব্যবহার অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িয়ে গেছে। ভবিষ্যতের সফ্টওয়্যার নির্ভর পৃথিবীতে টিকে থাকতে এই খাতে প্রযুক্তিজ্ঞানে প্রশিক্ষিত কর্মীবাহিনী তৈরি করা আবশ্যক যারা সফ্টওয়্যার পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণে হবেন স্বাবলম্বী।

বাংলাদেশের বন্দরগুলোর সক্ষমতা বাড়ছে, হচ্ছে অবকাঠামোগত আধুনিকায়ন। আসছে নতুন নতুন বন্দর। সরকারের ডিজিটাল বাংলাদেশ বাস্তবায়নে মেরিটাইম সেক্টরেও প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ছে সমানুপাতিক হারে। তাই সচেতনতা তৈরি হচ্ছে সাইবার নিরাপত্তা নিয়েও। সেই ধারাবাহিকতায় চট্টগ্রাম বন্দরের নিরাপত্তায় ২০০৪ সাল থেকে আইএসপিএস কোড মানা হচ্ছে। নেয়া হচ্ছে বিশেষ পরিকল্পনা ও প্রশিক্ষণ ব্যবস্থা। নিরাপত্তা বিষয়ে সর্বাধুনিক উদ্ভাবন সম্পর্কে জানতে মেরিটাইম সিকিউরিটি নিয়ে আয়োজিত হতে পারে আন্তর্জাতিক সেমিনার ও ওয়ার্কশপ। নিরাপত্তার প্রশ্নটিকে প্রাধিকার বিবেচনা করে বাংলাদেশের মেরিটাইম সেক্টরকে এগিয়ে নিতে হবে নিñিদ্রভাবে।

সূত্র: সী ট্রেড মেরিটাইম নিউজ, সাইবার রিস্ক ম্যানেজমেন্ট বিষয়ে আইএমও গাইডলাইন ও ইএনআইএসএ

মনুষ্যবিহীন জাহাজ: নৌপরিবহনের ভবিষ্যৎ

সড়ক পথে এমন গাড়ির কথা আমরা শুনতে পাচ্ছি, যা চালক ছাড়াই চলে যাবে নিজ গন্তব্যে। সেক্ষেত্রে সামুদ্রিক জাহাজ কেন পিছিয়ে থাকবে! এই প্রেক্ষাপটে জাহাজ মালিকেরা চাইছে এমন এক ধরনের জাহাজ যা নাবিক ছাড়াই তরতর করে এগিয়ে যাবে তার গন্তব্যে। এ ধরনের জাহাজ নির্মাণে হাত দিয়েছে রোলস রয়েস নামের এক কোম্পানি, আশা করা হচ্ছে আগামী দশ থেকে পনের বছরের মধ্যে সমুদ্রে নামতে যাচ্ছে এই জাহাজ। এটি মূলত রিমোট কন্ট্রোলের সাহায্যে চলবে। 

সমুদ্রে যে সমস্ত দূর্ঘটনা ঘটে তার কারণ নাবিক কিংবা ক্যাপ্টেনের ভুল সিদ্ধান্ত, যাদের অনেক সময় চাপের মুখে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে হয়। অনেক সময় একটানা কাজের কারণে নাবিকেরা ক্লান্ত হয়ে পড়ে, যার ফলে তারা ভুল করে বা এই অবস্থায় মানবিক ত্রুটির ঘটনা ঘটে। সমুদ্রে অনেক সময় দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে হয়, সে সময় অনেক ক্যাপ্টেন কিংবা নাবিক ধীর গতিতে তাদের প্রতিক্রিয়া প্রদর্শন করে। কিছু কিছু ক্ষেত্রে জাহাজে যন্ত্রপাতি মেরামত কিংবা রক্ষণাবেক্ষণে ত্রুটি দেখা দেয়, ফলে সমুদ্রগামী জাহাজ যে কোন সময় দূর্ঘটনায় পড়তে পারে। জাহাজ বীমা শিল্পের সাথে যুক্ত কোম্পানিগুলোর জন্য এই ধরনের মানবীয় ভুল সবচেয়ে উদ্বেগের কারণ।    

অ্যাালিয়াঞ্জ এস.ই-এর তথ্য অনুসারে শতকরা ৭৫ শতাংশ জাহাজ দূর্ঘটনার কারণ নাবিকেরা, যাদের গ্রহণ করা সিদ্ধান্ত ভুল হওয়ার ফলে জাহাজের দূর্গতি ঘটে।  নরওয়ের ‘সুরক্ষা ও ক্ষতিপূরণ’ ভিত্তিক ক্লাব ‘গার্ড এজ’ সংবাদ প্রদান করছে যে ৭০-৮০ শতাংশ জাহাজ দূর্ঘটনার পেছনে দায়ী মানবীয় ত্রুটি। আগামীতে মনুষ্যবিহীন জাহাজ হতে যাচ্ছে এই ধরনের মানবীয় ত্রুটির এক সমাধান। তবে, এটাই সবচেয়ে গ্রহণযোগ্য সমাধান হবে কী না, ভাবনাটা তাই নিয়ে।

কেবল নিরাপত্তা নিশ্চিত করা ছাড়াও মনুষ্যবিহীন জলযান মালিকের খরচ কমিয়ে আনবে। কারণ এর জন্য মালিককে নাবিক নিয়োগ করতে হবে না, এই ধরনের জাহাজে নাবিকদের থাকার জন্য বাড়তি জায়গার প্রয়োজন হবে না। এর ফলে জাহাজ আরো কার্যকর ও দ্রুত গতিতে চলতে সক্ষম হবে।  জাহাজ মালিকেরা এই ধরনের জাহাজের প্রতি আগ্রহী হয়ে উঠেছে, কারণ এই ধরনের জাহাজ রক্ষণাবেক্ষণ ও চলাচলের খরচ কমিয়ে আনতে সক্ষম। রোলস রয়েস-এর ভবিষ্যদ্বাণী অনুসারে মনুষ্যবিহীন জাহাজে জলদস্যুরা হানা দিতে আগ্রহী হবে না। জলদস্যুরা মূলত নাবিকদের বন্দী করে মুক্তিপণ আদায় করে। যদি জাহাজে কোন নাবিক না থাকে তাহলে তারা কাকে বন্দী করে মুক্তিপণ আদায় করবে? তবে এই যুক্তির যারা বিপক্ষে তারা বলছেন, মানুষ ছাড়া যে সমস্ত যান সমুদ্রে চলাচল করবে সেগুলোতে জলদস্যুদের হামলার সম্ভাবনা আরো বেশি, কারণ কেবল সশস্ত্র নিরাপত্তা কর্মীরাই পারে জলদস্যুদের প্রতিহত করতে। তবে ড্রোন-এর মত প্রযুক্তি হয়তো নাবিকবিহীন জাহাজগুলোর চলাচলকে নিরাপদ করতে পারে।

একটা জাহাজ নিজে নিজে চলছে, আর নাবিকদের বদলে জাহাজ চালাচ্ছে সেফ মেশিন- এমন চিন্তা নতুন কিছু নয়। যেমন, আধুনিক জাহাজগুলো কাগজের চার্টের বদলে সূক্ষ্ম ইলেক্টনিক চার্ট এবং অটোমেটিক রাডার প্লটিং এইড (এআরপিএ) পদ্ধতির উপর নির্ভরশীল, এছাড়াও আন্তর্জাতিক নিয়ম অনুসারে অনেক জাহাজে এখন আনম্যান্ড মেশিনারি স্পেস বা ইউএমএস নামক যন্ত্র বসানো হয়েছে। এই যন্ত্রটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে মেশিন রুমের তাপমাত্রা বাড়ার বিষয়টি বুঝতে সক্ষম, এছাড়াও মেশিন রুমে আগুন লাগলে কিংবা পানি ঢুকে গেলে এই যন্ত্র সাথে সাথে সঙ্কেত প্রদান করতে থাকে। এতে নাবিকদের পক্ষে দ্রুত প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করা সম্ভব হয়। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে জাহাজে ইউএমএস প্রযুক্তির ব্যবহার ব্যাপক বৃদ্ধি পেয়েছে। জাহাজের নিরাপত্তা ও রক্ষণাবেক্ষণের জন্য এটি এক গুরুত্বপুর্ণ যন্ত্রে পরিণত হয়েছে। স্বয়ংক্রিয় নৌযান কী পরিমাণ নাবিক কমিয়ে আনবে, তার এক ধারণা দিচ্ছে বিশাল আকারের কনটেইনার পরিবাহী জাহাজগুলো। যেমন,  ১,৮০,০০০ হাজার টন পর্যন্ত কনটেইনার বহন করতে পারা মারেস্ক ট্রিপল-ই শ্রেণীর জাহাজ চলানোর জন্য মাত্র ১৩ জন নাবিকের প্রয়োজন।              

বর্তমানে প্রযুক্তি যেভাবে এগিয়ে যাচ্ছে, তাতে এটা নিশ্চিত যে আগামীতে এমন সব জাহাজ নির্মাণ করা হবে যেগুলো মাটি থেকে রিমোট কন্ট্রোলের সাহায্যে চালানো সম্ভব।

এ ধরনের জাহাজ কী কী ধরনের সুবিধা প্রদান করতে যাচ্ছে সে বিষয়ে স্বচ্ছ ধারণা পাওয়া যাচ্ছে। জাহাজ নির্মাতা কোম্পানিগুলোর প্রযুক্তিগত দক্ষতা এখন এমন এক পর্যায়ে চলে এসেছে যে কোম্পানিগুলো এই ধরনের জাহাজ নির্মাণের খুব কাছে চলে এসেছে। কিন্তু তারপরেও এই ধরণের জাহাজ নির্মাণে বেশ কিছু বাধা রয়েছে। মূলত জাহাজ মালিক, জাহাজ বীমাকারী প্রতিষ্ঠান ও শিপিং কোম্পানিগুলোকে এই সকল বাধা পার হতে হবে। মনুষ্যবিহিন জাহাজ নির্মাণের প্রথম বাঁধা হচ্ছে এই সংক্রান্ত আইন, কারণ এখন পর্যন্ত এই বিষয়ে কোন আন্তর্জাতিক আইন নেই। বাণিজ্যিক কার্যক্রমের উদ্দেশ্যে এই ধরনের জাহাজ পরিচালনার জন্য প্রয়োজন হবে আন্তর্জাতিক চুক্তি সম্পাদনের। যেমন, কীভাবে এই সকল জাহাজ চলাচলের সময় নির্ধারণ করা হবে এবং এই সমস্ত জাহাজের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ বীমার ধরণ কেমন হবে সেগুলো নির্ধারণ করতে হবে। তবে আন্তর্জাতিক নিয়ম সংশোধন না করলেও, এই ধরণের মনুষ্যবিহীন জাহাজকে সমুদ্রে জীবনের নিরাপত্তা বিষয়ক সম্মেলন (সোলাস) এর নীতির সাথে খাপ খাইয়ে নিতে এবং আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা ব্যবস্থাপনা নীতি (আইএসএম) মেনে চলতে হবে ।

সোলাস, সমুদ্রে নিরাপত্তা ব্যবস্থাপনা নিয়ে ব্যাপকভাবে কাজ করে থাকে, যার মধ্যে রয়েছে নৌযান পরিচালনা ও জাহাজের নিরাপত্তা, যা নাবিকদের নিরাপত্তার জন্য অত্যন্ত প্রয়োজন। মনুষ্যবিহীন জাহাজ হয়তো এই সকল আইন মেনে চলতে সক্ষম হবে না, কারণ বর্তমান আইনে জাহাজ পরিচালনার জন্য জাহাজে অন্তত কয়েকজন নাবিকের উপস্থিতি প্রয়োজন। ফলে সমুদ্রে এই ধরণের জাহাজ চলাচল হবে অবৈধ এবং সমুদ্র আইন বিরোধী। তবে ‘উপকূল ধরে চলা জাহাজ’ কিংবা ‘ক্রু-অপারেশন সেন্টার’ যেভাবে কার্যক্রম পরিচালনা করে, সেক্ষেত্রে এই ধরণের আইন প্রয়োজ্য নয়, যার ফলে এই ধরনের নিয়মের আওতায় মনুষ্যবিহীন জাহাজ পরিচালনা করা সম্ভব হবে। আগামী  সোলাস সম্মেলনে এই ধরণের জাহাজ চলাচলে নিরাপত্তার সংজ্ঞা সংশোধন করা হবে কি না, বা এই বিষয়ে আইন তৈরি করা হবে কি না, সেটাই এখন গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। তবে একটা বিষয় পরিষ্কার, মনুষ্যবিহীন জাহাজ নির্মাতা প্রতিষ্ঠান এবং সোলাস একই লক্ষ্যে কাজ করছে, আর সেটা হচ্ছে সমুদ্রে জাহাজের নিরাপত্তা।

বীমার ক্ষেত্রে কী ধরনের ঝুঁকি আসতে পারে  তার হিসেব করা হয় সুনির্দিষ্ট তথ্যের ভিত্তিতে। নির্মাতারা কী কী উপাদান দিয়ে মনুষ্যবিহীন জাহাজ তৈরি করছে, এই তথ্য ছাড়া এই জাহাজ কী ধরণের ঝুঁকিতে পড়তে পারে সে বিষয়ে কোন গ্রহণযোগ্য তথ্য নেই। কীভাবে এই রিমোট কন্ট্রোল জাহাজ পরিচালনার করা হবে, তার উপর ভিত্তি করে এর বীমার ধরণ নির্ধারণ করা হবে। এই ধরণের জাহাজে নিরাপত্তা ঝুঁকি কম থাকবে, সেটা পরিষ্কার, তবে এই ধরণের জাহাজে নতুন ঝুঁকি দেখা দিতে পারে, যেমন ইন্টারনেট বা সাইবার হামলার মত ঝুঁকি। এই ধরণের জাহাজে যে সমস্ত সিস্টেম ও সফটওয়্যার ব্যবহার করা হবে সেগুলোতে যে হামলা হবে না, তার নিশ্চয়তা কোথায়? এগুলোর সিস্টেমের মাঝে ভাইরাস বা ম্যালওয়ার প্রবেশ করতে পারে, এমন কী এর সিস্টেম কেউ হয়তো হ্যাকও করে নিতে পারে।

প্রযুক্তির উন্নয়নের একটা বড় কারণ হচ্ছে সমুদ্রে চলাচল করা জাহাজের নিরাপত্তার উন্নতি ঘটানো। তবে প্রযুক্তি নিজে সব কিছু করতে পারে না, প্রযুক্তিকে পরিচালনার জন্য প্রয়োজন মানুষের। এই সকল জাহাজ পরিচালনার আইনগত ভিত্তি ও নীতি নির্ধারণে মানুষের ভাবনা অনিবার্য, যে সকল আইনের মধ্যে দিয়ে এই সমস্ত জাহাজ তার বাণিজ্যিক কার্যক্রম পরিচালনা করবে। এই আইনের ভিত্তি যথাযথ না হলে মনুষ্যবিহীন জাহাজ চলাচলের চিন্তা কেবল কাগজে কলমে থেকে যাবে। এখন এই বিষয়ে আইন ও নীতি তৈরির করার জন্য চাপ ক্রমশ বাড়ছে, আশা করা হচ্ছে ‘সোলাস ২০২৪’ সম্মেলনে মনুষ্যবিহীন জাহাজ চলাচল সংক্রান্ত আইন প্রস্তুত করা হবে, যা হবে ইউএমএস অনুরূপ এক আইন, যে আইন ইতোমধ্যে বিদ্যমান।

যে বিষয়টি এখন পরিষ্কার সেটি হচ্ছে স্বয়ংক্রিয়ভাবে চলতে সক্ষম হবে এমন জাহাজ নির্মাণের দিকে পৃথিবী এগিয়ে যাচ্ছে, যা হবে নিরাপদ জাহাজ চলাচলের এক পরবর্তী যৌক্তিক পদক্ষেপ। এই শিল্পের সাথে জড়িত ব্যক্তিরা এখন জাহাজ নির্মাতা প্রতিষ্ঠানের সাথে মিলে ভবিষ্যতের জাহাজ নির্মাণের আইনগত ও বাণিজ্যিক পদক্ষেপ গ্রহণের বিষয়ে কাজ শুরু করতে যাচ্ছে।

সূত্র:

ঝযরঢ়ং, চড়ৎঃং ম্যাগাজিনের ২০ মার্চ ২০১৭ সংস্করণ থেকে

অনুলিখন: বিজয় মজুমদার     

পথচলায় চট্টগ্রাম পৌরসভা

বাংলার শেষ স্বাধীন নবাব মীর কাশেম-এর সাথে ১৭৬১ সালে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি চুক্তি অনুসারে চট্টগ্রাম শহরের শাসনভার বৃটিশদের হাতে ন্যস্ত হয়। তখন মূলত সিভিলিয়ান বা সরকারি কর্মচারীরা শহরের দেখাশুনা করত। এই সময় চট্টগ্রাম ছিল বৃটিশ ভারতের এক ছোট্ট শহর, কিন্তু সময়ের সাথে সাথে এর পরিধি ক্রমশ বাড়তে থাকে। এ কারণে চট্টগ্রাম শহরের উন্নতির লক্ষ্যে ১৮৫৬ সালে এক নগর উন্নয়ন কমিটি গঠিত হয়। এই কমিটির প্রথম কাজ নির্ধারণ করা হয় শহরের নাগরিকদের জীবন যাত্রার উন্নতিকরণ। চট্টগ্রাম শহর মিউনিসিপাল বোর্ড গঠন হওয়ার আগে নগরের উন্নয়নের জন্য এটাই ছিল প্রথম কোনো কমিটি। এই কমিটির একটা নামও প্রদান করা হয়, সরকারি নথিতে এই কমিটির নাম লেখা আছে “চট্টগ্রাম শহরের পয়ঃনিস্কাশন ব্যবস্থা উন্নয়ন কমিটি”। তবে কমিটি কেবল শহরের ময়লা পরিস্কার নয়, সাথে শহরের চারপাশ দিয়ে বয়ে যাওয়া প্রাকৃতিক খালসমূহের নিস্কাশন এবং রাস্তাঘাট নির্মাণের কাজেও হাত দেয়। সরকারি নথিতে আরো জানা যাচ্ছে এই কমিটির প্রথম আলোচনা সভার দিনটি হচ্ছে ১৮৫৬ সালের ১৪ মে। বিভাগীয় কমিশনার সি. স্টেয়ার ছাড়াও কমিটির বাকী বৃটিশ সদস্যরা হলেন সি চ্যাপম্যান, ডাব্লিউ বিটসন, এইচ জে বেমবার, ডাব্লিউ এইচ হেন্ডারসন এবং জি সি ফ্লেচার। এই কমিটিতে স্থানীয় নাগরিকদের হয়ে প্রতিনিধিত্ব করে দুজন। এদের নাম  ঠাকুর বক্শ তিওয়ারি এবং হর চন্দ্র রায়। কমিশনার স্টেয়ার সাহেব পদাধিকার বলে এই কমিটির সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন। 

কমিটির প্রথম সভায় আলোচনার বিষয় ছিল শহরের জলনিস্কাশন ব্যবস্থা। এই সময়ে চট্টগ্রাম শহরের চারপাশ দিয়ে বয়ে যাওয়া প্রাকৃতিক খালগুলোতে জলাবদ্ধতা দেখা দেয়। এছাড়া শহরের পানীয় জলের সঙ্কট প্রকট আকার ধারণ করে, বিশেষ করে যারা সে সময় শহরের সীমানায় বাস করত, তাদের জন্য। এই খালগুলোর উন্নতির জন্য কমিটি বিশেষ পদক্ষেপ গ্রহণ করে।

এই খালসমূহের উন্নয়ন কাজ শুরু করার আগে এলাকার ভূমি, খাল ও পুকুর নিয়ে এক জরিপ পরিচালনা করার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়। মেসার্স জার্ভিস এন্ড রাসেল কোম্পানিকে এই কাজের দায়িত্ব প্রদান করা হয়। কোম্পানি যাতে দ্রুত কাজ সমাপ্ত করতে পারে তার জন্য লেফটেনেন্ট গভর্ণর অগ্রীম ১০০০ টাকা প্রদানের আদেশ দেন।            

একই সভায় এই কমিটি আরেকটি সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। গাছ কাটার পারিশ্রমিক নির্ধারণ করা। কারণ এই সময়ে শহরের চারপাশ জুড়ে জঙ্গল ছিল। এমনকি দিনের বেলায় এই সকল জঙ্গলে বাঘ দেখা যেত। বাঘের হাতে মানুষের আহত বা নিহত হওয়ার ঘটনা শোনা যেত চারপাশে। যার ফলে জঙ্গল পরিস্কার করতে গিয়ে গাছ কাটার জন্য প্রচুর কাঠুরিয়ার প্রয়োজন হত। তাই সভায় অন্য যে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করা হয়, সেটি হচ্ছে কীভাবে স্থানীয় কারাবন্দীদের গাছ কাটার কাজে লাগানো যায়। এই কমিটি জেলা ম্যাজিস্ট্রেটের কাছে অনুরোধ জানায়, যেন কারাগারে অবস্থিত বন্দীদের খাল ও ঝোপঝাড় কাটার কাজে লাগানো হয়। কিন্তু কাজের শুরুতে এই কমিটি আর্থিক সঙ্কটে পড়ে যায়। যার ফলে প্রাদেশিক সরকার প্রধান লেফটেনন্ট গভর্ণর-এর কাছে কমিটির সভাপতি আনুরোধ জানাল যেন এই কাজের জন্য আরো ১০,০০০ টাকা প্রদান করা হয়। 

জরিপ কাজের দায়িত্ব প্রাপ্ত জার্ভিস এন্ড রাসেল সে বছরই চট্টগ্রামে এসে উপস্থিত হয় এবং দ্রুত কাজ শুরু করে। এই কাজের জন্য প্রতিষ্ঠানটি মুনু নামের একজন সার্ভেয়ারকে নিযুক্ত করে। এই কাজের জন্য সার্ভেয়ারের পারিশ্রমিক ধরা হয় ৩০০ টাকা।

বন্দরের গতিশীলতা ধীরে ধীরে বাড়তে শুরু করে। বেশি সংখ্যক জাহাজ ভেড়ার ফলে প্রয়োজন হয়ে পড়ে বাড়তি কুলির। অনেকে বিভিন্ন স্থান থেকে কাজের সন্ধানে চট্টগ্রামে এসে কুলিতে পরিণত হয়। এদের অনেকে বিভিন্ন অপরাধের সাথে জড়িয়ে পড়ে। প্রশাসনের কাছে এরা ‘ডেনজার কুলি’ বা ‘বিপজ্জনক কুলি’ হিসেবে অভিহিত হয়। অজ্ঞাতনামা এইসব কুলিদের দ্বারা সংঘঠিত অপরাধের পরিমাণ বাড়তে শুরু করলে বৃটিশ প্রশাসন চিন্তিত হয়ে পড়ে। ১৫ জুলাই, ১৮৫৬ সালে কমিটি দ্বিতীয়বারের মত আলোচনায় বসে, আলোচনার বিষয়বস্তু হিসাবে নির্ধারণ করা হয় কীভাবে ডেনজার কুলিদের নিয়ন্ত্রণ করা যায়। সভায় সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয় বন্দরে বাড়তে থাকা অপরাধ নিয়ন্ত্রণে এই সমস্ত কুলিদের উপর নজর রাখা হবে। শহরের সার্ভেয়ার বা জরিপের দায়িত্বে নিয়োজিত মি. রিভেট- এর পক্ষে সকল কুলিদের উপর নজর রাখা সম্ভব ছিল না। ফলে মি. এভেরিকে এই কাজের দায়িত্ব গ্রহণ করতে বলা হয়।

উন্নয়ন কমিটির একার পক্ষে ক্রমবর্ধমান সকল কাজ সামলানো মুশকিল হয়ে পড়ে। সরকার শহরের দায়িত্ব শহরের নিজস্ব প্রশাসনের হাতে প্রদান করার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে, আর এই সিদ্ধান্তের মধ্যে দিয়ে জন্ম নেয় ‘চিটাগং মিউনিসিপালিটি’ বা ‘চট্টগ্রাম পৌরসভা’।  

২২ জুন, ১৮৬৩ সালে চট্টগ্রাম শহর আনুষ্ঠানিক ভাবে পৌরসভায় পরিণত হল। সদ্য গঠিত পৌরসভাকে পাঁচটি ওয়ার্ডে ভাগ করা হয়, যাদের অভিহিত করা হত এ, বি, সি, ডি এবং ই ওয়ার্ড নামে। পৌরসভার প্রথম প্রশাসক হিসেবে নিয়োগ প্রাপ্ত হন মি. জে ডি ওয়ার্ড।

আজকের এই বিশাল বাণিজ্যিক মহানগরী চট্টগ্রামকে দেখে কল্পনা করা মুশিকল যে সদ্য গঠিত পৌরসভাটি ছিল অতি ক্ষুদ্র এক নগরী। তখনকার চট্টগ্রামের আয়তন ছিল মাত্র ছয় বর্গ মাইল। নানা ঘাত-প্রতিঘাত পেরিয়ে সেই চট্টগ্রাম আজ বাংলাদেশের বাণিজ্যিক রাজধানী।

অপারেশন জ্যাকপট নিয়ে চলচ্চিত্র

১৯৭১ সালে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে চট্টগ্রাম বন্দরের গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত অবস্থানের বিষয়টি যুদ্ধে লিপ্ত সব পক্ষের সমর বিশারদদের যুদ্ধ পরিকল্পনা ও রণনীতি নির্ধারণে অন্যতম বিবেচ্য ছিল। পাকিস্তানি দখলদার বাহিনী চেয়েছিল যে কোন মূল্যে কর্ণফুলী নদীর নাব্যতা ও চট্টগ্রাম বন্দর সচল রেখে পশ্চিম পাকিস্তান থেকে তাদের সরবরাহ ব্যবস্থা অক্ষুণœ ও নিরাপদ রাখতে। অপরদিকে মুক্তিবাহিনী এবং তাদের সহায়তাকারী বন্ধুদেশ ভারতের লক্ষ্য ছিল প্রতিপক্ষকে হীনবল করতে তাদের প্র্রধান পশ্চাদসুবিধা চট্টগ্র্রাম বন্দর অচল করে দেয়া। এ প্রেক্ষাপটেই কর্ণফুলী নদীতে অবস্থানরত বিদেশী জাহাজ বিষ্ফোরণ ঘটিয়ে ডুবিয়ে দিয়ে বন্দরকে অচল করা এবং একই সাথে বিশ্ববাসীকে মুক্তিযুদ্ধের ব্যাপকতা সম্পর্কে জানান দেয়া। এই অভিযান পরিকল্পনারই নাম ‘অপারেশন জ্যাকপট’। এটা ছিল ১৯৭১ এর ১৫ আগস্ট চট্টগ্রাম বন্দরে ৩৯ জন নৌকমান্ডোর এক মৃত্যুঞ্জয়ী দুঃসাহসী অভিযান। ঐ রাতে কর্ণফুলী নদীতে ৯টি জাহাজ লিমপেট মাইন দিয়ে বিষ্ফোরণ ঘটিয়ে ডুবিয়ে দেয় নৌকমান্ডোরা। একই দিন মংলা সমুদ্রবন্দর, নারায়ণগঞ্জ ও চাঁদপুর নদীবন্দরেও আলাদা আলাদা দলে নৌকমান্ডোদের যুগপৎ অভিযান চলে। পৃথিবীর নৌযুদ্ধ এবং বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে এ এক অনবদ্য কীর্তি। সামান্যতম ক্ষয়ক্ষতির শিকার না হয়ে এ ছিল শতভাগ সফল এক অভিযান এবং বিশ্বকে তাক লাগিয়ে দেয়া এই সমর কুশলতা আজ যুদ্ধবিদ্যা ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়।

চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ (চবক) এই বীরত্বপূর্ণ ও গৌরবময় কীর্তিকে চিরস্মরণীয় করে রাখতে একটি অনুপম উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। অপারেশন জ্যাকপটের লোমহর্ষক, রোমাঞ্চকর কাহিনী সহ বন্দরের মুক্তিযুদ্ধ ও সোয়াত জাহাজ প্রতিরোধের ঘটনাবলী নিয়ে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের প্র্রযোজনায় নির্মিত হতে যাচ্ছে একটি পূর্ণদৈর্ঘ্য যুদ্ধ চলচ্চিত্র। বন্দরের সাবেক চেয়ারম্যান এবং বর্তমান নৌপ্রধান এডমিরাল নিজামউদ্দিন আহমেদ মুক্তিযোদ্ধা নৌমন্ত্রী শাজাহান খান এর অনুপ্রেরণায় চলচ্চিত্রটি নির্মাণের এই ব্যতিক্রমী আয়োজনের উদ্যোগ নেন ও প্রস্তুতি কাজের সূচনা করেন। পরবর্তীতে মাননীয় নৌমন্ত্রী মুক্তিযুদ্ধ, তথ্য ও সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের মাননীয় মন্ত্রীদের সাথে আলোচনা করে চলচ্চিত্রটি দ্রুত এগিয়ে নেবার নির্দেশ দেন। এরই পরিপ্রেক্ষিতে চবক এর বর্তমান চেয়ারম্যান রিয়ার এডমিরাল এম খালেদ ইকবাল এই চলচ্চিত্র নির্মাণকে তার অন্যতম অগ্রাধিকারমূলক কাজ হিসেবে গণ্য করছেন। এ কাজের সাথে যুক্ত সকলকে তিনি নিরন্তর প্রেরণা ও উৎসাহ যুগিয়ে চলচ্চিত্রটি নির্মাণ শুরুর দ্বারপ্রান্তে নিয়ে এসেছেন।

চলচ্চিত্রটি নির্মাণের জন্য ইতোমধ্যেই তখনকার চট্টগ্রাম বন্দর ও সংলগ্ন এলাকার দৃশ্যপট ও জীবনধারা সম্পর্কে তথ্য উপাত্ত সংগ্রহ এবং আনুষাঙ্গিক গবেষণা প্র্রায় শেষ হয়ে এসেছে। পাশাপাশি ছবির পান্ডুলিপি প্রণয়নের কাজও অনেকদূর এগিয়েছে। সংশ্লিষ্ট ক্ষেত্রে মেধাসম্পন্ন ও প্রথিতযশা ব্যক্তিবর্গ এ কাজে যুক্ত রয়েছেন। বন্দর কর্তৃপক্ষ এই চলচ্চিত্র নির্মাণকে তাদের জন্য অত্যন্ত মর্যাদাপূর্ণ কাজ হিসেবে গণ্য করছেন এবং এ চ্যালেঞ্জ সফলতার সাথে সম্পন্ন করতে তারা দৃঢ়সংকল্পবদ্ধ। সৃজনশীল এই প্রয়াসকে সফল করতে চবক এর সদস্য জাফর আলম, সচিব ওমর ফারুক, হিসাব বিভাগের কর্মকর্তা সন্দীপন চৌধুরী ও এস এম মারুফ সহ বন্দর কর্মকর্তাদের একটি দল নিরলস কাজ করে যাচ্ছেন।

আ.ক.ম. রইসুল হক বাহার

মুক্তিযোদ্ধা, প্রাক্তন বন্দর কর্মকর্তা, সাংবাদিক ও লেখক, অপারেশন জ্যাকপট চলচ্চিত্র গবেষণা দলের সদস্য

স্বপ্নের শহর হবে চট্টগ্রাম

বন্দরনগরী চট্টগ্রাম। মানচিত্রের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলে অবস্থিত এ শহরটিকে দেশের বাণিজ্যিক রাজধানী হিসেবে অভিহিত করা হয়। পাহাড়, সমুদ্র এবং উপত্যকায় ঘেরা প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের জন্য প্রাচ্যের রাণী হিসেবেও যার নাম ছড়িয়েছে। এশিয়ায় ৭ম এবং বিশ্বের ১০ম দ্রুততম ক্রমবর্ধমান এই নগরী উন্নয়নের পথযাত্রায় হতে চলেছে বাংলাদেশের সিঙ্গাপুর! এ প্রতিতুলনা একটু অবাক শোনালেও উন্নয়ন সংশ্লিষ্টরা এমনই আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন।

নতুন নতুন প্রকল্পে লাখ লাখ মানুষের কর্মসংস্থানের মাধ্যমে বিশ্বের অন্যতম শীর্ষ মাথাপিছু আয়ের শহর হতে পারে চট্টগ্রাম। বিশেষজ্ঞদের মতে, দুই লাখ কোটি টাকার ধারাবাহিক বিনিয়োগ লক্ষ্যমাত্রা আর চীন-ভারতের সঙ্গে বাণিজ্যিক সংযোগকে গুরুত্ব দিয়ে নিকট ভবিষ্যতেই এ বন্দরনগরী একটি সমৃদ্ধ মেগাসিটিতে রূপান্তর হতে পারে।

২০১৬ সালের শুরুতেই চীন ও চট্টগ্রামের সংযোগ ঘিরে জাতীয় অগ্রগতির স্বপ্ন বুনেছিল দেশ। সে সময় ঢাকায় চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়াং-ইর নেতৃত্বে মন্ত্রী পর্যায়ের বৈঠকে চট্টগ্রাম-মিয়ানমার হয়ে কুনমিং পর্যন্ত সড়ক যোগাযোগ, রামু-কক্সবাজার, রামু-গুনধুম ডুয়েলগেজ রেললাইন এবং মিরসরাই ও আনোয়ারায় ‘স্পেশাল ইকোনমিক জোন’ স্থাপনে আশাবাদ উঁকি দেয়। আর এই আশাবাদ চীনের রাষ্ট্রপতি শি জিনপিংয়ের বাংলাদেশ সফরের মধ্য দিয়ে কার্যকর হওয়ার পথ উন্মুক্ত করে।

চট্টগ্রামকে ঘিরেই হচ্ছে কর্ণফুলী টানেল, মাতারবাড়ী বিদ্যুৎ কেন্দ্র, মহেশখালী এলপিজি টার্মিনাল, বাঁশখালী কয়লা বিদ্যুৎ কেন্দ্র, রাউজানে ষষ্ঠ বিসিক শিল্প নগরী, বন্দরের সক্ষমতা বৃদ্ধিতে বে-টার্মিনাল, ফ্লাইওভার ও পর্যটন শিল্পের উন্নয়নে পারকি সৈকতে হোটেল ও অন্যান্য সুবিধা।

এর মধ্যে স্বপ্নের কর্ণফুলী টানেল নিয়ে নতুন করে আশার আলো দেখছেন স্থানীয় উদ্যোক্তারা। তারা বলছেন, বৃহত্তর চট্টগ্রাম তথা গোটা দেশের অর্থনীতিতে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন আনবে এই টানেল। নদীর তলদেশে যোগাযোগের এমন পথ বদলে দিয়েছে বিশ্বের অনেক দেশের অর্থনীতি। মিয়ানমার হয়ে চীনের সঙ্গে সড়কপথে বাংলাদেশের যুক্ত হওয়ার যে অপার সম্ভাবনা, তারও মাধ্যম হতে পারে এই টানেল।

এ প্রসঙ্গে সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের সম্প্রতি বলেন, ‘চীনের সাংহাই সিটির মতো চট্টগ্রাম নগরীতে পরিকল্পিত দুটি শহর গড়ে তুলতে চায় সরকার। কর্ণফুলী নদীর তলদেশে সাড়ে তিন কিলোমিটার দীর্ঘ টানেল নির্মাণের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। শীঘ্রই নির্মাণ কাজ শুরু হবে। নির্ধারিত সময়ে (চার বছর) নির্মাণকাজ শেষ হবে।’

সব ঠিক থাকলে আগামী ২০১৮-২০ সালের মধ্যে বৃহৎ আকারের প্রকল্পগুলোর কাজ শেষ হবে। জানা গেছে, বিনিয়োগ আকর্ষণে চীনা উদ্যোক্তাদের জন্য আনোয়ারায় ৭৭৪ একর জমির ওপর আলাদা অর্থনৈতিক অঞ্চল গড়ে তোলা হচ্ছে। বেজা সূত্র জানায়, দেশের রফতানিমুখী জাহাজ নির্মাণ শিল্প, ইলেকট্রনিকস পণ্যসামগ্রী, ফার্নেস ও সিমেন্ট শিল্পকে সর্বাধিক প্রাধান্য দিয়ে আনোয়ারায় বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল গড়ে তোলা হবে। এছাড়া রাউজানে চট্টগ্রামের ষষ্ঠ বিসিক শিল্প নগরী প্রতিষ্ঠা হচ্ছে যার নির্মাণ কাজ ২০১৯ সালের মধ্যে শেষ হবে।

এদিকে আনোয়ারায় কোরিয়ান ইপিজেডটিতে বেশ কয়েকটি বড় প্রতিষ্ঠান ইতোমধ্যে বিনিয়োগ করেছে। অন্যদিকে মিরসরাইয়ে শিল্প প্রতিষ্ঠান স্থাপনে উপযোগী করার জন্য ইতোমধ্যে সাড়ে ৫০০ একর ভূমিতে কাজ শুরু হয়েছে। অর্থনৈতিক অঞ্চলটি স্থাপিত হলে এখানে আগামী ১৫ বছরে ৩০ লাখ মানুষের কর্মসংস্থান হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এখানে গড়ে উঠবে বিমানবন্দর, ছোট নৌবন্দর, বিদ্যুৎকেন্দ্র, জাহাজ নির্মাণ শিল্প ও অটোমোবাইলসহ ভারী শিল্প-কারখানা। খুলে যাবে অর্থনীতির নতুন দুয়ার।

এ ছাড়া চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের বে-টার্মিনাল নির্মাণ, লালদিয়া, পতেঙ্গা ও অত্যাধুনিক কর্ণফুলী কনটেইনার টার্মিনাল, অনুমোদনপ্রাপ্ত কয়লাবিদ্যূৎ কেন্দ্রের কয়লা ল্যান্ডিংয়ের জন্য বার্থ তৈরি, হিন্টারল্যান্ড সংযোগ, ‘গ্রিনপোর্ট’ কনসেপ্টকে ধারণ করে দূষণমুক্ত বন্দর প্রতিষ্ঠায় নানা প্রকল্প প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। রয়েছে উড়াল সেতু, সড়ক সংস্কার, খাল-নদী খনন, পানি সরবরাহ প্রকল্পসহ বন্দর কর্তৃপক্ষ, সিটি করপোরেশন, সিডিএ, ওয়াসা ইত্যাদি সংস্থায় হাজার হাজার কোটি টাকার প্রকল্প। স্পেশাল ইকোনমিক জোন, টানেল নির্মাণসহ বাস্তবায়নাধীন প্রকল্পগুলোতে লাখ লাখ মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে বলেও আশাবাদ রয়েছে চট্টগ্রামবাসীর।

চট্টগ্রামের সংসদ সদস্য, মঈন উদ্দিন খান বাদল জানান, চট্টগ্রামের উন্নয়নে দুই লাখ কোটি টাকা বিনিয়োগের স্বপ্ন দেখা হচ্ছে। চট্টগ্রামের উন্নয়ন মানেই বাংলাদেশের উন্নয়ন, এটি জাতীয় উন্নয়নের সমার্থক। চট্টগ্রামকে কেন্দ্র করে বিনিয়োগের যে বৈশ্বিক আগ্রহ, এটিকে ঠিকমতো কাজে লাগাতে পারলে চট্টগ্রাম অবশ্যই সিঙ্গাপুর হবে।’

চট্টগ্রামের মেয়র আ জ ম নাছির উদ্দিন বলেন, ‘বিশ্বমানের নগরী গড়তে হলে বিনিয়োগ ও কাজে গতিশীলতার পাশাপাশি নাগরিক সমর্থন-সহায়তাও প্রয়োজন’।

হাজার বছর ধরে শিল্প বাণিজ্যের জন্য চট্টগ্রাম ঐতিহাসিকভাবেই আদর্শ জায়গা। চট্টগ্রামকে একটি অত্যাধুনিক নগরীতে রূপান্তরের সব সম্ভাবনাই এখন হাতের নাগালে, তবে এজন্য সর্বাগ্রে চাই স্বচ্ছতার সাথে সঠিক সমন্বয় ও উন্নয়ন কাজের গতিশীলতা। আর একটি উন্নত নগরীর নির্মাণ ও রক্ষণাবেক্ষনে প্রয়োজন নাগরিকদের স্বতস্ফূর্ত অংশগ্রহন।

১১ ধাপ এগিয়ে পৃথিবী সেরা ১০০ বন্দরের তালিকায় ৭৬ তম চট্টগ্রাম বন্দর

বিশ্ববাণিজ্যের ধীরগতিও প্রভাব ফেলেনি চট্টগ্রাম বন্দরের অগ্রযাত্রায়। ১১ ধাপ এগিয়ে কর্মমুখর চট্টগ্রাম বন্দর এখন বিশ্বসেরা ১০০ বন্দরের তালিকায় ৭৬তম। এ কথা জানিয়েছে বিশ্বের সবচেয়ে পুরোনো চলমান প্রকাশিত জার্নাল ‘লয়েড’স লিস্ট’। ২০১৫ সালে কনটেইনার হ্যান্ডলিংয়ের সংখ্যা হিসাব করে তারা এই অবস্থান নির্ধারণ করেছে। লয়েড’স লিস্ট বলছে, বিশ্ববাণিজ্যে ধীরগতি সত্ত্বেও চট্টগ্রাম বন্দর এই প্রবৃদ্ধি অর্জন করেছে।

১৭৩৪ (মতান্তরে ১৬৯২) সালে লন্ডনের লয়েড’স কফি হাউজ থেকে সাপ্তাহিক হিসেবে আত্বপ্রকাশ ক’রে, মাঝে দ্বি-সাপ্তাহিক থেকে দৈনিকে রূপান্তরিত হয়ে ২০১৩ সাল পর্যন্ত ৬০,৮৫০ তম সংখ্যা প্রকাশের পর ছাপানো সংস্করণ বন্ধ করে লয়েডস লিস্ট। এরপর থেকে তারা ডিজিটাল সংস্করণে প্রতিমুহুর্তে মেরিন ও শিপিং সম্পর্কিত তথ্য হালনাগাদ করে যাচ্ছে।  প্রায় একই সময়ে ১৭৬০ সালে লয়েড’স রেজিস্টার নামে যাত্রা শুরু করা লয়েড’স এর আরও একটি প্রতিষ্ঠান বর্তমানে বিজ্ঞান ও ইঞ্জিনিয়ারিং এর গবেষণা ও শিক্ষাখাতে বিশ্বব্যাপি ৭৪টি দেশে সক্রিয় আছে।

জানা যায়, বিশ্ববাণিজ্যে ধীরগতির কারণে ২০১৫ সালে অনেক বন্দরই কনটেইনার পরিবহনে পিছিয়ে ছিল। সেরার তালিকায় স্থান পাওয়া ১০০টি বন্দরের মধ্যে ৩৬টি বন্দরেই কনটেইনার পরিবহন কমেছে যার মধ্যে ব্যতিক্রম অবস্থানে রয়েছে চট্টগ্রাম বন্দর।

বন্দর কর্তৃপক্ষের ভাষ্যে, কনটেইনার পরিবহনের হার বাড়তে থাকায় বন্দর এই স্থান অর্জন করে নিয়েছে। যেভাবে কনটেইনার পরিবহন বাড়ছে তাতে বন্দরের অবকাঠামো দ্রুত সম্প্রসারণে যাওয়া ছাড়া বিকল্প নেই। এ জন্য ব্যাপক আকারে সম্প্রসারণের কাজে হাত দেওয়া হচ্ছে।

হিসাব অনুযায়ী, ২০১৫ সালে এই বন্দর দিয়ে কনটেইনার ওঠা-নামা হয় ২০ লাখ ২৪ হাজার ২০৭ টিইইউস। আগের বছরের চেয়ে কনটেইনার পরিবহন বেড়েছে প্রায় ১৭ শতাংশ। এ বছরের আগস্ট পর্যন্ত প্রায় সাড়ে ১৫ লাখ টিইইউস কনটেইনার পরিবহন হয়েছে। বছর শেষে তা ২৩-২৪ লাখে পৌঁছাতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। শিল্পকারখানার কাঁচামাল ও মেগা প্রকল্পের যন্ত্রপাতি ও সরঞ্জাম আনার কারণে কনটেইনার পরিবহনের হার দ্রুত বাড়ছে।

আনন্দের কথা এই, কনটেইনার পরিবহনের এই হার বৃদ্ধি দেশের অর্থনৈতিক অগ্রগতি নির্দেশ করছে। কারণ, রফতানি পণ্যের প্রায় পুরোটাই পরিবহন হয় কনটেইনারে করে। আবার কনটেইনারে আমদানি পণ্যের সিংহভাগই শিল্পের কাঁচামাল। পোশাক রপ্তানির পরিমাণ বাড়ার কারণে বন্দরে কনটেইনার পরিবহনে অগ্রগতি হচ্ছে। কনটেইনার আমদানি-রপ্তানির বড় অংশই পোশাকশিল্পের কাঁচামাল এবং তৈরি পোশাক। এ ছাড়া ওষুধশিল্প, ইস্পাত কারখানাসহ অসংখ্য কারখানার কাঁচামাল আনা-নেওয়া হয় এই কনটেইনারে করেই।

গত ৭ অক্টোবর অগ্রগতির সনদ নৌপরিবহনমন্ত্রী শাহজাহান খান, এমপি’র উপস্থিতিতে চট্টগ্রাম বন্দর চেয়ারম্যান রিয়ার অ্যাডমিরাল এম খালিদ ইকবালের হাতে তুলে দেন লয়েড’স লিস্টের প্রতিনিধি ক্যাপ্টেন জিল্লুর রহমান।

বন্দর চেয়ারম্যান রিয়ার এডমিরাল খালিদ ইকবাল বলেন, ‘সাত বছরের ব্যবধানে চট্টগ্রাম বন্দরে কনটেইনার ওঠানামা দ্বিগুণ হয়ে ২০ লাখ এককে উন্নীত হয়েছে। এ বছর শেষে এই ওঠানামা ২২ লাখ একক ছাড়িয়ে যাবে। প্রবৃদ্ধির সঙ্গে সক্ষমতা বৃদ্ধিতে আমরা পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করে যাচ্ছি।’

ওয়ার্ল্ড পোর্ট সোর্স ওয়েব পোর্টাল অনুযায়ী, বিশ্বে আনুমানিক ৪ হাজার সক্রিয় বন্দর রয়েছে। তবে নিয়মিত কনটেইনার ওঠানো নামানো হয় এমন বন্দর আছে ৫০০টি।

সেরা তালিকার এক নম্বরে চীনের সাংহাই। ২০১৫ সালে এই বন্দর দিয়ে পরিবহন হয় ৩ কোটি ৬৫ লাখ একক কনটেইনার। দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে সিঙ্গাপুর বন্দর। সেরা ১০টি বন্দরের মধ্যে চীনের রয়েছে সাতটি বন্দর।

আরও আনন্দের যে, সেরা ১০০ বন্দরের তালিকার পাশাপাশি লয়েড’স লিস্ট প্রকাশিত চীন ব্যতীত অন্যান্য এশিয়ান বন্দর সমূহের মধ্যে দ্রুতবর্ধনশীল বন্দরের তালিকায় চট্টগ্রাম বন্দর তৃতীয় অবস্থানে রয়েছে। লয়েড’স লিস্ট এর সেই তালিকার একাংশ নিচে দেয়া হল।