Home Blog Page 6

মানবজমিনে প্রকাশিত সংবাদের বিষয়ে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের বক্তব্য

গত ১৩ই নভেম্বর দৈনিক মানবজমিনে ‘বিদেশিদের হাতে যাচ্ছে পানগাঁও কন্টেইনার টার্মিনাল’ শীর্ষক সংবাদের বিষয়ে ব্যাখ্যা দিয়েছে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ। এতে বলা হয়, যথাযথ প্রক্রিয়া অবলম্বন করে, একটি Consulting Firm এর মাধ্যমে EOI পদ্ধতি অবলম্বন করে প্রাথমিকভাবে Pre-Qualification, পরবর্তীতে PPR অনুযায়ী কমিটি গঠন করে Technical Evaluation এবং Financial Evaluation সম্পন্নকরণপূর্বক যথাযথ প্রক্রিয়া অবলম্বন করে টার্মিনাল অপারেটর নিয়োগের ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে। PPR অনুযায়ী মূল্যায়ন কমিটিতে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ এবং নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের প্রতিনিধি ছাড়াও চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন অধ্যাপক, স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের একজন ঊর্ধ্বতন প্রকৌশলী অন্তর্ভুক্ত ছিলেন। এ ছাড়া Consulting প্রতিষ্ঠানের (IIFC) দুইজন পরামর্শক সার্বক্ষণিকভাবে মূল্যায়ন প্রক্রিয়ায় জড়িত ছিলেন।

প্রকৃত সত্য হচ্ছে, পুরো প্রক্রিয়া অত্যন্ত স্বচ্ছভাবে, উন্মুক্ত দরপত্র আহ্বান এবং যথাযথ প্রক্রিয়া অবলম্বন করে EOI পদ্ধতির মাধ্যমে এবং PPR অনুসরণ করে একটি মূল্যায়ন কমিটির মাধ্যমে যথাযথ প্রক্রিয়ায় মূল্যায়ন সম্পন্ন করে টার্মিনাল অপারেটর নিয়োগের সুপারিশ করা হয়েছে। উক্ত টার্মিনালে EOI পদ্ধতিতে টার্মিনাল অপারেটর নিয়োগের লক্ষ্যে পরামর্শক সেবা প্রদানের জন্য গত ২৫/০৩/২০২৪ইং তারিখে IIFC এর সঙ্গে চুক্তি সম্পাদিত হয়। Invitation for EOI এর বিপরীতে Pre-qualification ডকুমেন্ট ক্রয়কারী ০৬ (ছয়)টি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে প্রি-কোয়ালিফিকেশন দাখিলের নির্ধারিত তারিখে অর্থাৎ ০৫/০৯/২০২৪ ইং তারিখে ৩ (তিন)টি প্রতিষ্ঠান প্রি-কোয়ালিফিকেশন প্রস্তাব দাখিল করে। IIFC এর প্রতিনিধির উপস্থিতিতে দাখিলকৃত প্রি-কোয়ালিফিকেশন প্রস্তাব মূল্যায়ন করে মূল্যায়ন কমিটি ৩টি প্রতিষ্ঠানেরই প্রি-কোয়ালিফিকেশন প্রস্তাব Substantially Responsive মর্মে গণ্য করে।

পরবর্তীতে পরামর্শক প্রতিষ্ঠান IIFC দ্বিতীয় পর্যায়ে RFP ডকুমেন্ট দাখিল করে। প্রি-কোয়ালিফাইড বিবেচিত ৩টি প্রতিষ্ঠানের অনুকূলে RFP ডকুমেন্ট প্রেরণ করা হয়, তৎমধ্যে ২টি প্রতিষ্ঠান RFP দাখিল করে। মূল্যায়ন কমিটি ও IIFC এর প্রতিনিধিগণ বিস্তারিত যাচাই-বাছাইয়ের মাধ্যমে দাখিলকৃত RFP এর মূল্যায়ন কার্যক্রম সম্পন্ন করে রেসপনসিভ বিডার নির্বাচিত করেন। ব্যাখ্যায় বলা হয়, সর্বশেষ গত ০৯/১১/২০২৫ তারিখে পরামর্শক প্রতিষ্ঠান IIFC এর তত্ত্বাবধানে পিপিআর বিধিমালা অনুসরণক্রমে মূল্যায়ন কমিটি দরপত্রের কার্যক্রম সম্পন্ন করে এবং চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের বোর্ডের অনুমোদনক্রমে টার্মিনাল অপারেটর নিয়োগের সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। সম্পূর্ণ প্রক্রিয়াটি সম্পন্ন করতে প্রায় ১ (এক) বছর ৮ (আট) মাস সময় লেগে যায়- তাই বিদেশি প্রতিষ্ঠানকে তাড়াহুড়া করে কাজ দেয়ার বিষয়টি প্রতিবেদকের মনগড়া ও কল্পনাপ্রসূত।

প্রতিবেদনে উল্লেখিত অনিয়মতান্ত্রিক ভাবে দুইটি কোম্পানিকে বাদ দেয়ার বিষয়টি একেবারেই মিথ্যা। Pre-qualification এ তিনটি প্রতিষ্ঠান কৃতকার্য হয় এবং ওই তিনটি প্রতিষ্ঠানকেই Request for Proposal (RFP) ডকুমেন্ট প্রেরণ করা হয়। তার মধ্যে দুইটি প্রতিষ্ঠান Request for Proposal (RFP) দাখিল করে। ১ (এক)টি প্রতিষ্ঠান নিজেরাই RFP দাখিল করা থেকে বিরত থাকে। দাখিল করা দুইটি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে একটি প্রতিষ্ঠান উল্লেখযোগ্য দুইটি দলিল দাখিল করেনি। ফলে মূল্যায়ন কমিটি এবং Consulting Firm উক্ত প্রতিষ্ঠানটিকে সর্বসম্মতিক্রমে Non-Responsive হিসাবে বিবেচনা করে। এতেই প্রমাণিত হয় যে, দুইটি কোম্পানিকে ইচ্ছাকৃতভাবে বাদ দিয়ে একটি কোম্পানিকে কাজ দেয়ার বিষয়টি সঠিক নয়।

লালদিয়া হবে দেশের প্রথম বিশ্বমানের গ্রিন পোর্ট: প্রধান উপদেষ্টা

প্রধান উপদেষ্টা প্রফেসর ড. মুহাম্মদ ইউনূস

ডেনমার্কভিত্তিক মায়ার্স্ক গ্রুপের মালিকানাধীন এপিএম টার্মিনালের সাথে লালদিয়া কনটেইনার টার্মিনাল প্রকল্পে ৩০ বছরের কনসেশন চুক্তি স্বাক্ষর হতে যাচ্ছে। এই লালদিয়া হবে দেশের প্রথম বিশ্বমানের গ্রিন পোর্ট বলে জানিয়েছেন প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূস।

বৃহস্পতিবার (১৩ নভেম্বর) দুপুরে জাতির উদ্দেশ্যে দেওয়া ভাষণে তিনি এ কথা বলেন।

প্রধান উপদেষ্টা বলেন, অভ্যুত্থানের পর দায়িত্ব গ্রহণ করে অর্থনীতিকে গভীর গহ্বর থেকে উদ্ধার করা ছিল আমাদের জন্য একটি বিরাট চ্যালেঞ্জ। গত ১৫ মাসে আমরা সেই চ্যালেঞ্জ উৎরাতে সক্ষম হয়েছি। রপ্তানি, বৈদেশিক বিনিয়োগ ও রিজার্ভসহ অর্থনীতির সবগুলো সূচকে দেশ ইতিবাচক ধারায় ফিরেছে। লুট হয়ে যাওয়া ব্যাংকিং খাত ইতোমধ্যে ঘুরে দাঁড়িয়েছে, মানুষের আস্থা ফিরে এসেছে। ব্যাংকিং খাতকে আরও শক্তিশালী করতে নানামুখী পদক্ষেপ চলমান রয়েছে।

তিনি বলেন, অভ্যুত্থান-পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন দেশের বৈদেশিক বিনিয়োগ হ্রাস পেলেও বাংলাদেশে গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী প্রথম বছরে বৈদেশিক প্রত্যক্ষ বিনিয়োগ অর্থাৎ এফডিআই ১৯ দশমিক ১৩ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। এটি বৈশ্বিক প্রবণতার বিপরীতে এক অনন্য অর্থনৈতিক দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে।

আগামী সপ্তাহে ডেনমার্কভিত্তিক মায়ার্স্ক গ্রুপের মালিকানাধীন এপিএম টার্মিনালস বি.ভি.-এর সঙ্গে লালদিয়া কনটেইনার টার্মিনাল প্রকল্পে ৩০ বছরের কনসেশন চুক্তি স্বাক্ষর হতে যাচ্ছে। এই চুক্তির আওতায় ইউরোপীয় এই কোম্পানি ৫৫০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার বিনিয়োগ করবে। এটি এযাবৎকালে বাংলাদেশে ইউরোপের সর্বোচ্চ একক বিনিয়োগ।

লালদিয়া টার্মিনাল নির্মাণে ৬ হাজার ৭০০ কোটি টাকা বিনিয়োগ করবে ডেনমার্কের এপিএম টার্মিনালস

চট্টগ্রাম বন্দরের লালদিয়া কনটেইনার টার্মিনাল নির্মাণ এবং এটি পরিচালনার দায়িত্ব পাচ্ছে ডেনমার্কভিত্তিক প্রতিষ্ঠান এপিএম টার্মিনালস। এ প্রতিষ্ঠানটি এপি মোলার মার্সক গ্রুপের সহযোগী প্রতিষ্ঠান। সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্বের (পিপিপি) আওতায় এ টার্মিনাল নির্মাণের জন্য ৫৫ কোটি ডলার বা প্রায় ৬ হাজার ৭০০ কোটি টাকা বিনিয়োগ করবে কোম্পানিটি।

এ নিয়ে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ ও এপিএম টার্মিনালসের মধ্যে আগামী সপ্তাহে চূড়ান্ত চুক্তি স্বাক্ষর হবে। চুক্তি স্বাক্ষরের পরপরই প্রতিষ্ঠানটি বাংলাদেশকে ২৫০ কোটি টাকা ‘সাইনিং মানি’ হিসেবে দিবে। ঢাকায় এই চুক্তি স্বাক্ষর অনুষ্ঠানে উপস্থিত থাকবেন এপিএম টার্মিনালসের গ্লোবাল চেয়ারম্যান ও ডেনমার্কের একজন মন্ত্রী।

বুধবার অর্থনৈতিক বিষয়–সংক্রান্ত উপদেষ্টা পরিষদের কমিটিতে এ চুক্তির বিষয়ে অনুমোদন দেওয়া হয়। পরে বিকেলে রাজধানীর ফরেন সার্ভিস একাডেমিতে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে সরকারের এ সিদ্ধান্তের বিষয়ে জানান বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (বিডা) নির্বাহী চেয়ারম্যান ও পাবলিক প্রাইভেট পার্টনারশিপ (পিপিপি) কর্তৃপক্ষের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) চৌধুরী আশিক মাহমুদ বিন হারুন (আশিক চৌধুরী)।

সংবাদ সম্মেলনে আরও উপস্থিত ছিলেন চট্টগ্রাম বন্দর চেয়ারম্যান রিয়ার এডমিরাল এস. এম. মনিরুজ্জামান, প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব শফিকুল আলম ও চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের সদস্য কমডোর আহমেদ আমিন আবদুল্লাহ।

আশিক চৌধুরী জানান, আগামী ডিসেম্বর বা জানুয়ারিতে লালদিয়া কনটেইনার টার্মিনাল প্রকল্পের নির্মাণকাজ শুরু হতে পারে। তিন বছরের মধ্যে নির্মাণ শেষ করে ২০২৯ সালে টার্মিনালটি চালু করার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে সরকার। এরপর ৩০ বছর টার্মিনালটি পরিচালনা করবে এপিএম টার্মিনালস। পরে উভয় পক্ষ চাইলে আরও ১৫ বছর চুক্তির মেয়াদ বাড়াতে পারে।

একই সভায় ঢাকার পানগাঁও ইনল্যান্ড কনটেইনার টার্মিনালটি চালু করার বিষয়েও আলোচনা হয়েছে জানিয়ে বিডা নির্বাহী চেয়ারম্যান বলেন, ‘আগামী সপ্তাহে এ–সংক্রান্ত আরেকটি চুক্তি স্বাক্ষর হবে।

আশিক চৌধুরী বলেন, লালদিয়া কনটেইনার টার্মিনাল প্রকল্পটি হবে বাংলাদেশের ইতিহাসে ইউরোপ থেকে আসা সবচেয়ে বড় প্রত্যক্ষ বৈদেশিক বিনিয়োগ বা এফডিআই। এতে বাংলাদেশ সরকারের এক টাকাও বিনিয়োগ করতে হবে না। প্রকল্পটির মোট ব্যয় ৫৫০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার, যা পুরোপুরি বহন করবে এপিএম টার্মিনালস। আগামী তিন বছরে এই অর্থ বাংলাদেশে আসবে। এই পুরো অঙ্কটাই এফডিআই হিসেবে গণ্য হবে।

আশিক চৌধুরী জানান, লালদিয়া কনটেইনার টার্মিনালটি বছরে ৮ থেকে ১০ লাখ টিইইউ পর্যন্ত কনটেইনার পরিচালনা করতে সক্ষম হবে। ফলে চট্টগ্রাম বন্দরের সার্বিক কনটেইনার হ্যান্ডেলিং সক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়বে।

সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, লালদিয়া কনটেইনার টার্মিনালের অবস্থান হবে পতেঙ্গার চট্টগ্রাম বোট ক্লাব–সংলগ্ন কর্ণফুলী নদী তীরের পাশে। সমুদ্রের কাছাকাছি হওয়ায় লালদিয়া টার্মিনালে চট্টগ্রাম বন্দরের নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনালের তুলনায় দ্বিগুণ আকারের জাহাজ ভিড়তে পারবে। এর ফলে সিঙ্গাপুর বা শ্রীলঙ্কায় ট্রান্সশিপমেন্টের প্রয়োজন হবে না, টার্ন অ্যারাউন্ড সময় কমবে, রপ্তানির গতি বাড়বে এবং সরাসরি ইউরোপে যাতায়াতের সুযোগ তৈরি করবে। টার্মিনালটি ২৪ ঘণ্টা পরিচালিত হবে। এ ছাড়া নতুন টার্মিনালটি চালু হলে সরাসরি ৫০০ থেকে ৭০০ লোকের কর্মসংস্থান হবে।

ডেনমার্কের প্রতিষ্ঠান এপিএম টার্মিনালস বিশ্বে প্রায় ৬০টি টার্মিনাল পরিচালনা করছে। বৈশ্বিক শীর্ষ ২০টি টার্মিনালের মধ্যে ১০টি পরিচালনা করছে এপিএম টার্মিনালস।

আশিক চৌধুরী আরও জানান, ডেনমার্কের প্রতিষ্ঠান নির্মাণ করলেও লালদিয়া টার্মিনালের মালিকানা থাকবে বাংলাদেশ সরকারের অধীনে। এপিএম টার্মিনালস আমাদের জমির ওপর একটি নতুন (গ্রিনফিল্ড) প্রকল্প হিসেবে টার্মিনাল নির্মাণ করবে এবং ৩০ বছর মেয়াদে এটি পরিচালনা করবে। এরপর সম্পূর্ণ সম্পত্তি সরকারের কাছে হস্তান্তর করবে।

এপিএম টার্মিনালস টার্মিনালটি পরিচালনা করলেও বন্দর ব্যবহারকারীদের জন্য চার্জ নির্ধারণে সরকারের নিয়ন্ত্রণ বজায় থাকবে বলে জানান বিডা নির্বাহী চেয়ারম্যান। তিনি বলেন, ‘আমাদের নিয়ন্ত্রক সংস্থা চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ একটি নির্দিষ্ট সীমা নির্ধারণ করে দেবে, যাতে অতিরিক্ত মাশুল আরোপ করা না যায়।

চলতি বছরেই চূড়ান্ত হচ্ছে ন্যাশনাল পোর্ট স্ট্র্যাটেজি: নৌপরিবহন উপদেষ্টা

নৌপরিবহন এবং শ্রম ও কর্মসংস্থান উপদেষ্টা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব:) ড. এম সাখাওয়াত হোসেন বলেছেন, দেশের স্থল, নৌ ও সমুদ্র বন্দরসমূহের দীর্ঘমেয়াদি ও টেকসই উন্নয়নের লক্ষ্যে বর্তমান সরকার ন্যাশনাল পোর্ট স্ট্র্যাটেজি শীর্ষক একটি জাতীয় কৌশলপত্র তৈরি করছে।

মঙ্গলবার (১১ নভেম্বর) দুপুরে রাজধানীর একটি হোটেলে নৌপরিবহন মন্ত্রণালয় আয়োজিত এবং জাপান সরকার ও জাইকা’র সহযোগিতায় প্রণীতব্য বাংলাদেশ ন্যাশনাল পোর্ট স্ট্র্যাটেজি ২০২৫ চূড়ান্তকরণের লক্ষ্যে সংশ্লিষ্ট সকল অংশীজনদের সাথে মতবিনিময় সভায় এ কথা বলেন।

ড. এম সাখাওয়াত হোসেন বলেন, ন্যাশনাল পোর্ট স্ট্র্যাটেজির খসড়া প্রণয়নের কাজ শেষ পর্যায়ে রয়েছে। আশা করছি এই বছরের মধ্যেই এই স্ট্র্যাটেজি চূড়ান্তকরণের কাজ শেষ হবে এবং আগামী বছরের জানুয়ারি থেকে কার্যকর করা হবে।

বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে দেশের বন্দরসমূহ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে। বন্দরকেন্দ্রিক ব্যবসা-বাণিজ্য, আমদানি-রফতানি দেশের জিডিপিতে অসামান্য অবদান রেখে চলেছে। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য যে, গত ৫৪ বছরেও বাংলাদেশে কোনও সমন্বিত বন্দর ব্যবস্থাপনা কৌশলপত্র প্রণয়ন করা হয়নি। প্রত্যেকটি বন্দর পৃথক পৃথকভাবে তাদের কার্যক্রম ও উন্নয়ন পরিকল্পনা গ্রহণ করে থাকে। উন্নত বিশ্বের ন্যায় বাংলাদেশেও আধুনিক বন্দর ব্যবস্থাপনা নিশ্চিতকল্পে নৌপরিবহন এবং উপদেষ্টা ড. এম সাখাওয়াত হোসেন দায়িত্ব গ্রহণের সাথে সাথে ‘ন্যাশনাল পোর্ট স্ট্র্যাটেজি’ প্রণয়ণের উদ্যোগ গ্রহণ করেন। উপদেষ্টা এ কৌশলপত্র প্রদানের লক্ষ্যে উচ্চ পর্যায়ে একটি কমিটি গঠন করেন। উক্ত কমিটি বিশ্বের বিভিন্ন উন্নত দেশের পোর্ট স্ট্র্যাটেজি পর্যালোচনা পূর্বক দেশি-বিদেশি বিশেষজ্ঞদের থেকে প্রাপ্ত পরামর্শের ভিত্তিতে দেশের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো প্রণীতব্য ‘ন্যাশনাল পোর্ট স্ট্র্যাটেজি’ এর খসড়া প্রস্তুত করেছে।

বিশ্বের বিখ্যাত বন্দরগুলো এখন ডিজিটালাইজেশনের মাধ্যমে তাদের কার্যক্রম পরিচালনা করছে। এর ফলে সেখানে বেশি বেশি বিদেশি বিনিয়োগ হচ্ছে বলে উল্লেখ করেন নৌপরিবহন উপদেষ্টা। তিনি বলেন, আমাদের মেরিটাইম সেক্টরেও আরো বেশি দেশি-বিদেশি বিনিয়োগকে আকৃষ্ট করতে এবং একটি কার্যকর ও টেকসই বন্দর ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করতে বর্তমান সরকার দায়িত্ব গ্রহণের সাথে সাথেই ‘ন্যাশনাল পোর্ট স্ট্র্যাটেজি’ প্রণয়ণের উদ্যোগ গ্রহণ করে।

এই কৌশলপত্রের মাধ্যমে একটি সমন্বিত, শক্তিশালী ও যুগোপযোগী বন্দর কাঠামো গড়ে তোলা হবে জানিয়ে উপদেষ্টা বলেন, ‘বন্দরকেন্দ্রিক সব সেবাকে একটি প্লাটফর্মে আনতে মেরিটাইম সিঙ্গেল উইন্ডো চালু করা হবে। যেখানে ব্যবসায়ীরা স্বল্পতম সময়ের মধ্যে হয়রানিমুক্ত সেবা পাবে।

এ সময় উপদেষ্টা ‘ন্যাশনাল পোর্ট স্ট্র্যাটেজি’ প্রণয়নের মাধ্যমে দেশের বন্দর ব্যবস্থাপনায় একটি নতুন অধ্যায়ের সূচনা হতে যাচ্ছে বলে উল্লেখ করেন।

নৌপরিবহন উপদেষ্টা দেশের সমুদ্রবন্দর ও অভ্যন্তরীণ নদী-বন্দরগুলোর কার্যক্রমের সাথে স্থলবন্দরগুলোর কার্যক্রমকে সমান্তরালে সংযুক্ত রেখে যাবতীয় কার্যক্রম পরিচালনার উপর ন্যাশনাল পোর্ট স্ট্র্যাটেজিতে গুরুত্বারোপ করা হয়েছে বলেও জানান। জাতীয় এ কৌশলপত্র প্রণয়নের মাধ্যমে দেশের মেরিটাইম সেক্টরে একটি বৈপ্লবিক পরিবর্তন হবে বলেও উপদেষ্টা আশাবাদ ব্যক্ত করেন।

মতবিনিময় সভায় সভাপতির বক্তব্য নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের সচিব ড. নূরুন্নাহার চৌধুরী, এনডিসি জাপান সরকার ও জাইকা-কে উক্ত কৌশলপত্র প্রণয়নে সার্বিক সহযোগিতার জন্য কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, নৌপরিবহন উপদেষ্টার সার্বিক দিক নির্দেশনায় প্রণীত ন্যাশনাল পোর্ট স্ট্র্যাটেজি আধুনিক বন্দর ব্যবস্থাপনায় নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচন করবে। এটি ভবিষ্যৎ মেরিটাইম সেক্টরের এক অনবদ্য দলিল। চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান রিয়ার এডমিরাল এস. এম. মনিরুজ্জামান সভায় ফোকাল পারসন হিসেবে বক্তব্য রাখেন। তিনি নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়সহ সকল অংশীজনকে ধন্যবাদ জানান।

এ সময় নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন বিভিন্ন দপ্তর-সংস্থার প্রধানগণ ও মন্ত্রণালয়ের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।

চট্টগ্রাম বন্দরের ট্যারিফ পুনর্নির্ধারণ ন্যায্য এবং অনিবার্য যে কারণে

সম্প্রতি রাজধানীর ইন্ডিপেনডেন্ট ইউনিভার্সিটিতে সেন্টার ফর বে-অব-বেঙ্গল স্টাডিজ (সিবিওবিএস) আয়োজিত এক সেমিনারে আমি একটি প্রবন্ধ উপস্থাপন করি। প্রবন্ধের উপসংহারে এ বিষয়টি আমি বিশেষভাবে উল্লেখ করেছি যে নৌবাণিজ্য বিষয়ক শিক্ষার উন্নয়ন ও বিকাশের ক্ষেত্রে মারাত্মক ঘাটতি রয়েছে বাংলাদেশের। জ্ঞানের কোনো বিকল্প নেই, জানা কথা, আর জ্ঞানভিত্তিক সমাজ প্রতিষ্ঠার কাজে ব্যর্থ হলে সামুদ্রিক বাণিজ্য দূরে থাক, কোনো ক্ষেত্রেই আমাদের কোনো অগ্রগতি টেকসই হবে না। উল্টো বরং রাষ্ট্রের কাক্সিক্ষত সামাজিক এবং অর্থনৈতিক উন্নয়ন কার্যক্রম পদে পদে বাধাগ্রস্ত হতে থাকবে। দুঃখজনক বাস্তবতা হচ্ছে, এ দেশীয় জনগোষ্ঠীর অধিকাংশ লোকজন, যারা নাবিক কিংবা বাণিজ্যিক নৌপরিবহন খাতে নিরাপত্তা কিংবা জরিপখাত সংক্রান্ত কোনো কাজে পেশাগতভাবে যুক্ত নন, তাদের মধ্যে নৌবাণিজ্য সম্পর্কে সাধারণ জ্ঞানেরও ভয়াবহ ঘাটতি রয়েছে। এ অজ্ঞতা সমাজের অন্যান্য ক্ষেত্রের মধ্যেও প্রতিফলিত, বিশেষত গণমাধ্যমে; চট্টগ্রাম বন্দরের ট্যারিফ সমন্বয় ঘিরে সংশ্লিষ্ট মহলের চলমান বিতর্ক সংক্রান্ত অনেক প্রতিবেদনের মধ্যেই আমরা যে ঘাটতির বিষয়টি সুস্পষ্ট দেখতে পাচ্ছি।

তিনটি বিষয় আমাদের সকলকে প্রথমেই উপলব্ধি করতে হবে। প্রথমত, বিশে^র তাবৎ বাণিজ্যের মধ্যে সমুদ্র পরিবহন বাণিজ্য হচ্ছে সর্বাধিক আন্তর্জাতিক মাত্রার বাণিজ্য, আন্তর্জাতিক ঘটনা প্রবাহ এবং ভূরাজনীতি বিশ্ব নৌবাণিজ্যে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাবক। দ্বিতীয়ত, শিপিং বা ফ্রেইট খরচের প্রশ্নটি এ খাত সংশ্লিষ্ট অনেকগুলো ভিন্ন ভিন্ন ক্ষেত্রের ওপর নির্ভর করে, বন্দর ট্যারিফ যার মধ্যে ক্ষুদ্রতম। তৃতীয়ত, বিশে^র অনেক উন্নয়নশীল দেশই বন্দরব্যয় খাতে ভর্তুকি দিয়ে থাকে, ফলে সে ট্যারিফ বিশে^র অন্যান্য দেশ কিংবা তাদের নিজেদের বাস্তব অর্থনৈতিক ব্যয়ের সঙ্গেও সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।

১৯৯০ দশক থেকে বৈশি^ক শিপিং খাতটি কনটেইনার পদ্ধতির সূচনা, প্রযুক্তিখাতের অগ্রগতি, ডিজিটালাইজেশন ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার আবির্ভাব- ইত্যাদির সুবাদে এক বৈপ্লবিক পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে অগ্রসর হয়েছে। বিশ্বের অনেক দেশ যদিও এ অগ্রগতির সাথে তাল মেলাতে পারেনি; তার কারণ ছিল তাদের ডিজিটাল এবং ভৌত উভয় প্রকার অবকাঠামো নির্মাণ ও দক্ষ মানবসম্পদের পেছনে প্রয়োজনীয় বিনিয়োগ সক্ষমতার ঘাটতি। বিদ্যমান এ পরিস্থিতি কাজে লাগিয়ে বৈশ্বিক ক্যারিয়ারগুলো তুচ্ছ অজুহাতের সুযোগেও ক্রমান্বয়ে অতিরিক্ত সারচার্জ আরোপ করে চলেছে এবং ক্ষমতাধর এসব শীর্ষ খেলোয়াড়ের বাজার আধিপত্যের কারণে ক্ষুদ্র অর্থনীতির দেশগুলি এখনও তাদের এসব অন্যায্য শর্ত মেনে চলতে বাধ্য হচ্ছে।

আমার ব্যক্তিগত অভিমত, চট্টগ্রাম বন্দরের ট্যারিফ পুননির্ধারণের কাজটি আরো বহু আগেই সমাধা হওয়া উচিত ছিল। বিগত ৩৯ বছরে বাংলাদেশ ও বিশ্বজুড়ে বাণিজ্যব্যয় বহুগুণ বেড়েছে; বহুকিছু বদলেছে ইতোমধ্যে, বদলায়নি শুধু বন্দর ট্যারিফ। উপরন্তু, ট্যারিফে সূচিত সা¤প্রতিক সংশোধন, আমার হিসেবে, যথেষ্ট যুক্তিসঙ্গত এবং সামগ্রিক বাণিজ্য খরচেও তার প্রভাব অতি নগণ্য। বন্দরের উচিত ছিল সমূহ ব্যয়ের হিসাব বিশ্লেষণের মাধ্যমে গোটা বিষয়টি জনসমক্ষে তুলে ধরা। এ কাজটি না করায় ট্যারিফবৃদ্ধির ব্যাপারে গণমাধ্যমেও বিভ্রান্তিকর প্রতিবেদন তৈরির সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। এ বিষয়ক বিভ্রান্তি দূরীকরণের লক্ষ্যে আমি নিজেই একটি কনটেইনার ফিডার জাহাজ, একটি ব্রেক-বাল্ক জাহাজ এবং একটি বাল্ক ক্যারিয়ার- মোট তিনটি জাহাজের ব্যয়ের তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখেছি, চট্টগ্রাম বন্দরের ট্যারিফ বৃদ্ধির প্রভাব প্রকৃতই যৎসামান্য।
  
আমার এ বিশ্লেষণে আমি জাহাজের উপর প্রযোজ্য মাশুল, পাইলটেজ, বার্থ ভাড়া, টাগ চার্জ এবং বার্থিং-আনবার্থিং চার্জসহ কেবলমাত্র ব্যয়ের ক্ষেত্রগুলোই অন্তর্ভুক্ত করেছি।
ব্রেক-বাল্ক জাহাজ এমভি সেরুলিয়ান, জিআরটি ১৯,৪৫৪ এবং কার্গো ফ্রেইট টন ৮,১৩২.৫৭। পুরোনো ট্যারিফে চট্টগ্রাম বন্দরে তাদের খরচের হিসাব ১৩,৯৫০.৭৭ মার্কিন ডলার; নতুন ট্যারিফে এটি বেড়ে হবে ২৬,০৯৫.৯৪ ডলার। ১২,১৪৫.১৭ ডলারের এ বৃদ্ধিটি চোখের দেখায় দেখতে বড় অঙ্ক মনে হলেও বাস্তবক্ষেত্রে তার প্রায়োগিক মূল্য অতিশয় নগণ্য- প্রতি ফ্রেইট টনে দেড় ডলার মাত্র।
কনটেইনার ফিডার জাহাজ এমভি ইন্টারএশিয়া ফরোয়ার্ড, জিআরটি ১৭,২১১ এবং ধারণক্ষমতা (লোডিং এবং আনলোডিং) ১৫০০ টিইইউ; পুরোনো ট্যারিফে তাদের খরচ ১১,৬৩৪.৫০ ডলার, যা নতুন ট্যারিফে ১৯,৮৫৫.৫৯ ডলার হবে; এখানে পার্থক্য ৮,২২১.২৪ ডলার; প্রতি কনটেইনারে মাত্র ২.৭৫ ডলার।

এবার একটি বাল্কারের খরচের হিসাব খতিয়ে দেখা যাক।
বাল্ক ক্যারিয়ার এমভি মেঘনা রোজ (জিআরটি ৩১,২৫৪ এবং ধারণক্ষমতা ৫৫,০০০ মেট্রিক টন)। পুরোনো ট্যারিফে তাদের বন্দরব্যয় ছিল ৮,৬৬২.০৫ ডলার, নতুন ট্যারিফে সেটি হবে ১০,৯৯৮.২৮ ডলার। পার্থক্য ২,৩৩৬.২৪ ডলার; অর্থাৎ টনপ্রতি মাত্র ০.০৪ ডলার; বাংলাদেশি মুদ্রায় পাঁচ টাকার কম।
আমার ব্যক্তিগত অভিমত অনুসারে, যে জাহাজমালিক বা ভেসেল অপারেটর কনটেইনার-প্রতি ২.৭৫ ডলার কিংবা মেট্রিক টন প্রতি ১.৫০ ডলারের এ ব্যয়বৃদ্ধির ঘটনাটি সামাল দিতে পারছেন না, তার জন্য এই ব্যবসা ছেড়ে দেয়াই উত্তম। লক্ষণীয়, ড্রাই-বাল্ক ও ব্রেক-বাল্ক বাণিজ্যে সম্পৃক্ত কেউই কিন্তু ট্যারিফ বৃদ্ধিতে আদৌ তেমন উদ্বিগ্ন হননি; মূলত কনটেইনার জাহাজ অপারেটররাই বিষয়টি নিয়ে অহেতুক বাড়াবাড়ি করছেন। আমাদের অধিকাংশ আমদানি পণ্য, যেমন, খাদ্যশস্য, সার, ক্লিংকার ইত্যাদি বাল্ক জাহাজযোগে আসে এবং সেখানে এক টন কার্গোতে মাত্র পাঁচ টাকা ব্যয়বৃদ্ধির ঘটনাটির কোনো তাৎপর্যই নেই। অথচ গণমাধ্যমে ভুলভাবে ফেনিয়ে এটাকেই বলা হচ্ছে, ব্যবসায়ীদের বন্দর খরচ নাকি ৪১ শতাংশ বেড়ে গেছে। চট্টগ্রাম বন্দরের উচিত ছিল একটি সংবাদ সম্মেলন আয়োজনের মাধ্যমে নির্জলা সত্যটি দেশের সামনে সুস্পষ্টভাবে তুলে ধরা এবং ব্যবসায়ী এবং ভোক্তা সমাজের মধ্যে বিরাজিত এ সংক্রান্ত ভুল ধারণাগুলি দূর করা।

নৌবাণিজ্যখাতের একটি অনিবার্য বাস্তবতা হচ্ছে- বর্তমানে আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ার এবং শিপিং কার্টেলগুলির প্রভাব-প্রতিপত্তি এতই বেশি যে ছোট অর্থনীতিগুলোর পক্ষে তাদের এ জাতীয় অনিয়ম প্রতিহত করা, এককথায়, অসম্ভব। আলোচনার মাধ্যমে হয়তো এর কিছুটা সমাধান নির্ণয় সম্ভব, কিন্তু আলোচনার টেবিলে বসে একটি শক্ত অবস্থান নিতে হলে নিজেদেরও কিছু সক্ষমতা থাকতে হয়। এখানেই নিহিত রয়েছে আমাদের নীতি নির্ধারণী স্তরের গুরুতর ব্যর্থতা- যেখানে উচিত ছিল কনটেইনার ফিডার জাহাজ সংগ্রহ করা- সেখানে তা না করে বাল্ক ক্যারিয়ার কেনা হয়েছে একটার পর একটা।

চীনে নির্মিত জাহাজের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের আরোপিত নতুন ফি-সংক্রান্ত বিষয়টিতে আমাদের নীতিনির্ধারকরা যথাযথ মনোযোগ দিয়েছেন কি না, সে ব্যাপারেও আমি খুব একটা নিশ্চিত নই। ইউএসটিআর বিলিং কোড ৩৩৯০-এফ৪ এর অ্যানেক্স-২ এর সুস্পষ্ট নির্দশনা:
“চীনে নির্মিত জাহাজ অপারেটরদের জন্য অ্যানেক্স-২ অনুযায়ী সার্ভিস-ফি প্রযোজ্য হবে। এর ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে আবারও বলা হয়েছে, মার্কিন শুল্ক ও সীমান্ত সুরক্ষা ব্যবস্থা, সিপিবি এবং ইউএস কোস্টগার্ড বিধিমালায় (প্লেস-অব-বিল্ড) বা নির্মাণস্থানের সংজ্ঞার সঙ্গে সঙ্গতি রক্ষাপূর্বক- এক্ষেত্রে ‘চীনে নির্মিত জাহাজ’ বলতে গণপ্রজাতন্ত্রী চীনে নির্মিত যে কোনো জাহাজকে বুঝতে হবে। বন্দরের প্রবেশপত্র বা ছাড়পত্র বিবরণীতে (সিবিপি ফরম নং ১৩০০) কিংবা তার ইলেকট্রনিক সংস্করণেও এ জাতীয় জাহাজ ‘চীনে নির্মিত’ হিসেবে উল্লিখিত হবে।”
অনুচ্ছেদে ফি আদায়, অতিরিক্ত অর্থপ্রদান ও ফেরত সংক্রান্ত অংশে বলা হয়েছে, এ নির্দেশনার আওতায় চীনে নির্মিত কোনো জাহাজ যখন যুক্তরাষ্ট্রের শুল্কসীমা বহিভর্‚ত কোনো অঞ্চল থেকে মার্কিন কোনো বন্দরে আসবে, তখন ওই জাহাজের অপারেটরকে (যদি তিনি অ্যানেক্স-১ এর অনুচ্ছেদ এফ-এর সংজ্ঞানুযায়ী চীনের নাগরিক বা প্রতিষ্ঠান না হয়ে থাকেন) নিচের যে কোনো একটি হিসাব পদ্ধতি অনুসারে নির্ধারিত সর্বোচ্চ ফি পরিশোধ করতে হবে:

১৪ অক্টোবর ২০২৫ থেকে: প্রতি নেট টনে ১৮ মার্কিন ডলার
১৭ এপ্রিল ২০২৬ থেকে: প্রতি নেট টনে ২৩ মার্কিন ডলার
১৭ এপ্রিল ২০২৭ থেকে: প্রতি নেট টনে ২৮ মার্কিন ডলার
১৭ এপ্রিল ২০২৮ থেকে: প্রতি নেট টনে ৩৩ মার্কিন ডলার

(তথ্যসূত্র: ইউএসটিআর নোটিশ অব অ্যাকশান অ্যান্ড প্রপোজড অ্যাকশান ইন সেকশন ৩০১)

এখানে লক্ষণীয় যে ৫৫,০০০ ডিডবিøটির নিচের জাহাজের ক্ষেত্রে কিন্তু এই ফি প্রযোজ্য নয়। সেক্ষেত্রে বিএসসির আরেকটি ভুল সিদ্ধান্ত ছিল- প্রথমত চীনে নির্মিত বড় জাহাজ কেনা এবং তা-ও আবার ৫৫,০০০ ডিডবিøউটির অধিক ক্ষমতাসম্পন্ন জাহাজ। প্রতিবেদনের তথ্য অনুসারে, “বাংলাদেশ শিপিং করপোরেশন (বিএসসি) পূর্ব থেকে নির্বাচিত যুক্তরাষ্ট্র-ভিত্তিক প্রতিষ্ঠান হেলেনিক ড্রাই বাল্ক ভেঞ্চারস এলএলসি কোম্পানির নিকট থেকে জাহাজ ক্রয় করবে এবং প্রতিটি জাহাজের ডিডবিøউটি হবে ৫৫,০০০-৬৬,০০০।”

জাহাজগুলি মার্কিন কোম্পানির কাছ থেকে কেনা হলেও ইউএসটিআর সংজ্ঞানুসারে এগুলিকে শেষ পর্যন্ত কিন্তু ‘চীনে নির্মিত’ জাহাজ হিসেবেই বিবেচনা করা হবে। উপরন্তু ৫৫,০০০ ডিডবিøউটির নিচের জাহাজের জন্য প্রযোজ্য অব্যাহতি সুবিধা থেকেও বঞ্চিত থাকবে এসব জাহাজ। জাহাজ কেনার এ সিদ্ধান্তটি বিএসসি যেদিন নিয়েছে, সেটি ছিল ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর; পক্ষান্তরে, ইউএসটিআর তাদের নতুন শুল্ক আরোপের ঘোষণা প্রকাশ করেছে তারও পাঁচ মাস আগে, ২০২৫ সালে ১৭ এপ্রিল। বিষয়টি নিঃসন্দেহে বিএসসি নেতৃত্বের অদূরদর্শিতার সুস্পষ্ট প্রতিফলন। তাদের উচিত ছিল ৫০,০০০ ডিডবিøউটির জাহাজ কিনে ফি থেকে অব্যাহতির সুবিধা নেয়া- কিংবা আরো ভালো ছিল, গিয়ারলেস সেলুলার কনটেইনার জাহাজ কিনে (বাংলাদেশ ফ্ল্যাগ ভেসেল প্রটেকশন অ্যাক্ট ২০১৯-এর সুবিধা কাজে লাগিয়ে) কনটেইনার শিপিং বা আন্তর্জাতিক লাইনার বাণিজ্যে যুক্ত হওয়া- যে সক্ষমতা অর্জন করাটা আমাদের দেশের জন্য কৌশলগতভাবে অতীব গুরুত্বপূর্ণ।
আন্তর্জাতিক লাইনার বাণিজ্যে যুক্ত হওয়াটা আমাদের জন্য কৌশলগতভাবে এ কারণেই গুরুত্বপূর্ণ, যেহেতু, আমাদের বৈদেশিক মুদ্রা ভাÐার গঠন ও জিডিপিতে তৈরি পোশাক এবং ভোগ্যপণ্য রপ্তানি খাতের একটি বড় অবদান রয়েছে। চট্টগ্রামের প্রস্তাবিত লালদিয়া কনটেইনার টার্মিনালে ২৫০ মিটার দৈর্ঘ্য ও ১১.৫ মিটার ড্রাফটের জাহাজ নোঙর করতে পারবে। অর্থাৎ ৪,০০০ কনটেইনারবাহী জাহাজও এখানে সহজেই ভিড়তে পারবে। আমাদের রপ্তানিমুখী পণ্য বিশেষত পোশাক হাল্কা বিধায় ৫০০০ টিইইউ অর্থ্যাৎ ৪৫০০০ ডিডবিøউটি জাহাজের প্রস্তাবিত লালদিয়া কনটেইনার টার্মিনালে আগমন সম্ভব হবে।

বিএসসির উচিত বিদ্যমান সুযোগসমূহ কাজের লাগানোর বিষয়টি এখনই সর্বোচ্চ গুরুত্ব সহযোগে বিবেচনা করা এবং বাল্ক-ক্যারিয়ারের পরিবর্তে তুলনামূলক সাশ্রয়ী গিয়ারলেস সেলুলার কনটেইনার জাহাজ সংগ্রহের প্রতি আরো বেশি মনোযোগ নিবদ্ধ করা। এটি করা গেলে দেশের ফিডারিং ট্রেডে আমাদের অনন্য সক্ষমতা গড়ে উঠবে। এর জোরেই শীর্ষ ক্যারিয়ারগুলির অনিয়ম মোকাবিলায় দরকষাকষির টেবিলে বসে আমরা নিজেদের জন্য একটি মজবুত ও কার্যকর অবস্থান গড়ে নিতে সক্ষম হব।

লেখক পরিচিতি:
খন্দকার আর. জামান তাসমানিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীন অস্ট্রেলিয়ান মেরিটাইম কলেজের প্রাক্তন ছাত্র। কনটেইনারযুগের প্রাথমিক দিনগুলিতে তিনি পাঁচ বছরেরও অধিককাল অস্ট্রেলিয়ার মেরিটাইম ট্রেড-খাতে কাজ করেছেন। ১৯৯৬ সালে অস্ট্রেলিয়ার চার্টার্ড ইনস্টিটিউট অব লজিস্টিকস অ্যান্ড ট্রান্সপোর্টের ফেলো নির্বাচিত হন। একই বছর, বাংলাদেশ নৌবাহিনীর প্রথম নৌপ্রধান প্রয়াত রিয়ার অ্যাডমিরাল এম এইচ খানের সাথে যৌথভাবে বাংলাদেশে ওই ইনস্টিটিউটের একটি শাখা প্রতিষ্ঠা করেন; প্রয়াত অ্যাডমিরাল ছিলেন এর প্রেসিডেন্ট এবং লেখক ছিলেন অনারারি সেক্রেটারি। দেশে ফেরার পর তিনি তাদের পারিবারিক কোম্পানি, অলসিজ শিপিং লিমিটেডে একজন শিপিং এজেন্ট হিসেবে কর্মজীবন শুরু করে ধাপে ধাপে জাহাজ চার্টারার এবং অপারেটর পদে উন্নীত হন এবং বর্তমানে এর ব্যবস্থাপনা পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।
২০০৭-০৯ সালে ইউরোপীয় ইউনিয়নের অর্থায়নে এবং বাংলাদেশ বাণিজ্য মন্ত্রণালয় এবং আইএমও বিশেষজ্ঞদের সাথে যৌথ উদ্যোগে বাস্তবায়িত বাংলাদেশ ট্রেড সাপোর্ট কর্মসূচির কম্পোনেন্ট-৪ (মেরিটাইম ট্রান্সপোর্ট)-এর জন্য স্থানীয় পরামর্শদাতাদের দলের নেতৃত্ব প্রদানের জন্য তাকে নির্বাচিত করে ইইউ। আন্তর্জাতিক এবং স্থানীয় প্রকাশনায় শিপিং এবং লজিস্টিকস বিষয়ে তাঁর লেখা অসংখ্য নিবন্ধ প্রকাশ হয়েছে বিগত সময়ে।

দেশের ক্ষতি করে কাউকে বন্দরের কোনো টার্মিনাল দেওয়া হবে না

দেশের ক্ষতি করে কাউকে বন্দরের কোনো টার্মিনাল দেওয়া হবে না বলে জানিয়েছেন নৌ পরিবহন মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) এম সাখাওয়াত হোসেন।

সোমবার (১০ নভেম্বর) সকালে নগরের পতেঙ্গায় লালদিয়ার চর কনটেইনার ইয়ার্ড উদ্বোধনকালে তিনি এ কথা বলেন। এ সময় নৌপরিবহন সচিব নুরুন্নাহার চৌধুরী, বন্দর চেয়ারম্যান রিয়ার এডমিরাল এস এম মনিরুজ্জামানসহ বন্দর ও নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।

উপদেষ্টা বলেন, বন্দর নিয়ে অনেকে অনেক কথা বলবে। উন্নতি করতে হলে প্রযুক্তি, টাকা-পয়সা দরকার আছে। বন্দর ঘিরে চার-পাঁচ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ হবে। উন্নত দেশের বেশিরভাগ বন্দর অপারেটররা চালাচ্ছে। আমরা কেন পিছিয়ে যাব। তাই আমরাও চেষ্টা করছি। যারা বিজনেস করে তাদের জন্য লালদিয়ার চর টার্মিনাল বড় সুযোগ। ১০ হাজার কনটেইনার রাখার ক্যাপাসিটি বাড়বে।

অনুষ্ঠানে জানানো হয়, ১৪ একর জমিতে লালদিয়ার চর টার্মিনাল হয়েছে। ১৫০০ ট্রাক রাখার ক্যাপাসিটি আছে। হেভি লিফট কার্গো জেটি ব্যাকআপ থাকবে ৮ একর। এপিএম টার্মিনাল এরিয়া ১০ একর।

উপদেষ্টা বে টার্মিনাল এলাকায় পরিবহন টার্মিনাল, তালতলা কনটেইনার ইয়ার্ড (ইস্ট কলোনি সংলগ্ন) উদ্বোধন এবং এক্সওয়াই শেড ও কাস্টমস অকশন শেড পরিদর্শন করেন।

বে টার্মিনাল পরিদর্শন শেষে উপদেষ্টা বলেন, আমি প্রথম যখন বে টার্মিনাল এলাকায় এসেছিলাম তখন একটা বিতর্ক ছিল বে টার্মিনাল করা হবে কি হবে না। দেখলাম জায়গাটি। এখানে ব্রেক ওয়াটার হবে। আমি দেখলাম এটা খুবই আদর্শ জায়গা। চট্টগ্রাম বন্দর প্রধান বন্দর। যদিও আমাদের আরও কিছু বন্দর আছে। চট্টগ্রাম বন্দর দিন দিন বিজি হচ্ছে। বে টার্মিনাল পুরোনো প্রজেক্ট। আমরা সিদ্ধান্ত দিয়েছি এ টার্মিনাল হবে। এরপর বহুদূর আমরা এগিয়েছি। এখানে দুইটি আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান ডাইরেক্ট ইনভেস্টমেন্ট করছে। সরকার টু সরকার পদ্ধতিতে এখানে কাজ হবে।

আশা করব এ টার্মিনাল ইউজ শুরু হবে। একটা আলাদা রোডের পরিকল্পনা দেওয়া হবে। ভবিষ্যতে রেল কানেকশন হবে। ভবিষ্যৎ প্ল্যান থাকতে হবে। এ এলাকা পরিবর্তন হয়ে যাবে। এ এলাকায় ইকোনমিক অ্যাকটিভিটি হবে। আমি আশা করি, আমরা যে পরিবর্তন শুরু করেছি তা ভবিষ্যতে দ্রুততর হবে। লালদিয়া কমপ্লিট হলে বে টার্মিনালের কাজ শুরু হবে। বে টার্মিনাল গ্রিন পোর্ট হবে।

ঢাকা-সিউল অর্থনৈতিক সম্পর্কের ভবিষ্যৎ গঠনে সিইপিএ গুরুত্বপূর্ণ : রাষ্ট্রদূত

বাংলাদেশে দক্ষিণ কোরিয়ার রাষ্ট্রদূত ইয়ং-সিক পার্ক বলেছেন যে, ঢাকা ও সিউলের মধ্যে প্রস্তাবিত সার্বিক অর্থনৈতিক অংশীদারিত্ব চুক্তি (সিইপিএ) দুই দেশের ভবিষ্যৎ অর্থনৈতিক সহযোগিতার ভিত্তি হিসেবে কাজ করবে।

‘চলমান সিইপিএ আলোচনা, যা আমাদের ভবিষ্যৎ অর্থনৈতিক অংশীদারিত্বের কাঠামো হিসেবে কাজ করবে, কোরিয়া-বাংলাদেশ সম্পর্ককে এগিয়ে নেওয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হবে,’ তিনি বলেন।

রাষ্ট্রদূত পার্ক রোববার দুপুরে ঢাকার একটি হোটেলে অনুষ্ঠিত ‘ভূ-রাজনৈতিক গতিশীলতার মধ্যে পথপ্রদর্শন: কোরিয়া-বাংলাদেশ ভবিষ্যৎ অংশীদারিত্বের দিকে’ শীর্ষক ‘কোরিয়া-বাংলাদেশ নীতি বিষয়ক সেমিনার’-এ এই মন্তব্য করেন।

তিনি কোরিয়ার দীর্ঘমেয়াদি বাংলাদেশের উন্নয়ন সহায়তা ও দ্বিপক্ষীয় অংশীদারিত্বের পরবর্তী পর্যায়ের জন্য প্রস্তুতির প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেন।

তিনি বলেন, ‘কোরিয়ার উন্নয়ন অভিজ্ঞতা অনন্য। আমরা একসময় সাহায্যগ্রহিতা দেশ ছিলাম এবং পরবর্তী সময়ে দাতা দেশ হিসেবে রূপান্তরিত হয়েছি। ঠিক যেমনভাবে আমাদের আরএমজি খাতে সহযোগিতা বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে অবদান রেখেছে, তেমনি কোরিয়া ভবিষ্যতেও বাণিজ্য, বিনিয়োগ এবং অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রে সহযোগিতা সম্প্রসারণ করবে।’

সেমিনারে নীতি বিশেষজ্ঞ, একাডেমিক, উন্নয়ন সহযোগী এবং বেসরকারি খাতের প্রতিনিধিরা অংশগ্রহণ করেন। সেখানে দুই দেশের মধ্যে কৌশলগত ও অর্থনৈতিক সম্পর্ক আরও দৃঢ় করার উপায় নিয়ে আলোচনা হয়।

সাবেক রাষ্ট্রদূত ফারুক সোবহান সেমিনারের সঞ্চালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। বাংলাদেশ থেকে অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে ছিলেন রাষ্ট্রদূত হুমায়ুন কবীর, রাষ্ট্রদূত মুস্তাফিজুর রহমান, অধ্যাপক ড. পারভেজ করিম আব্বাসী এবং ড. সেলিম রাইহান। কোরিয়া থেকে অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে ছিলেন ড. সং কিউংজিন, ড. লি সুন-চুল এবং ড. সং চি-উং।

অংশগ্রহণকারীরা লক্ষ্য করেন যে, এই আলোচনা গত পাঁচ দশকে কোরিয়া-বাংলাদেশ সম্পর্কের ধারাবাহিক বৃদ্ধির প্রতিফলন। এছাড়া তারা ভবিষ্যতে উন্নত উৎপাদন, অবকাঠামো (সড়ক, বন্দর ও বিদ্যুৎ), ডিজিটাল রূপান্তর, এবং মানুষ-মানুষের বিনিময় খাতে সহযোগিতা সম্প্রসারণের প্রয়োজনীয়তাও তুলে ধরেন।

চট্টগ্রামে জলাবদ্ধতা নিরসনে ৭৫ শতাংশ অগ্রগতি

চট্টগ্রাম নগরের জলাবদ্ধতা হ্রাসে নেয়া পদক্ষেপে এরমধ্যেই ৭৫ শতাংশ সমস্যা সমাধান হয়েছে। এ অগ্রগতির প্রতিবেদন ৫ নভেম্বর প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূসের কাছে উপস্থাপন করা হয়েছে।

চট্টগ্রাম বিভাগের কমিশনার ড. মুহাম্মদ জিয়াউদ্দিন রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন যমুনায় অনুষ্ঠিত বৈঠকে জলাবদ্ধতা হ্রাসে চলমান প্রকল্পগুলোর অগ্রগতি তুলে ধরেন। পরে ফরেন সার্ভিস একাডেমিতে এক সংবাদ সম্মেলনে প্রধান উপদেষ্টার উপ-প্রেস সচিব আবুল কালাম আজাদ মজুমদার জানান, চারটি প্রধান প্রকল্পের মধ্যে ৮৮ শতাংশ কার্যক্রম এরমধ্যেই সম্পন্ন হয়েছে।

বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন সড়ক পরিবহন ও সেতু উপদেষ্টা মুহাম্মদ ফাওজুল কবির খান, শিল্প উপদেষ্টা আদিলুর রহমান খান, মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক উপদেষ্টা ফারুক ই আজম, বীর প্রতীক, চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান প্রকৌশলী নুরুল করিম, চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান রিয়ার এডমিরাল এস এম মনিরুজ্জামান, জেলা প্রশাসক (ডিসি) সাইফুল ইসলাম এবং নাগরিক প্রতিনিধিরা।

আজাদ মজুমদার বলেন, ‘প্রধান উপদেষ্টা গত ১৪ মে চট্টগ্রাম সফরের সময় নির্দেশ দিয়েছিলেন, এ বছরের মধ্যে শহরের জলাবদ্ধতা অন্তত ৫০ শতাংশ কমাতে হবে। এ নির্দেশনা অনুযায়ী, স্থানীয় সংস্থাগুলোর পাশাপাশি বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর ৩৪ ইঞ্জিনিয়ার কনস্ট্রাকশন ব্রিগেডও প্রকল্প বাস্তবায়নে অংশগ্রহণ করেছে।’

৩৪ ইঞ্জিনিয়ার কনস্ট্রাকশন ব্রিগেডের ব্রিগেডিয়ার জেনারেল শামসুল আলম জানান, প্রধান উপদেষ্টার ৫০ শতাংশ লক্ষ্য থাকা সত্ত্বেও সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর সম্মিলিত প্রচেষ্টায় তা অতিক্রম করে ৭৫ শতাংশ জলাবদ্ধতা নিরসন করা সম্ভব হয়েছে।

রিপোর্ট অনুযায়ী, ২০২৩ সালে চট্টগ্রাম নগরের ১১৩টি এলাকায় আট থেকে নয় ঘণ্টা জলাবদ্ধতা স্থায়ী হতো। চলতি বছর তা কমে ২১টি এলাকায় দুই থেকে চার ঘণ্টার মধ্যে সীমিত হয়েছে। ২০২৬ সালের মধ্যে এ সংখ্যা ১০টিতে নামিয়ে আনা এবং ২০২৭ সালের মধ্যে সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে আনার লক্ষ্য রয়েছে।

সভায় জানানো হয়, চট্টগ্রামের জলাবদ্ধতার প্রধান কারণ দুর্বল বর্জ্য ব্যবস্থাপনা। প্রতিদিন প্রায় ৮০০ টন বর্জ্য শহরের খাল ও ড্রেনে জমে পানি প্রবাহে ব্যাঘাত ঘটাচ্ছে। চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের সক্ষমতা অনুযায়ী প্রতিদিন দুই হাজার ৭০০ থেকে দুই হাজার ৮০০ টন বর্জ্য অপসারণ করা সম্ভব হলেও শহরে দৈনিক উৎপাদিত বর্জ্যের পরিমাণ প্রায় তিন হাজার ২০০ টন।

চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, পানি অপসারণের জন্য ১২টি পাম্প বসানো হচ্ছে, যার মধ্যে ১০টি এরমধ্যেই চালু করা হয়েছে। সব পাম্প চালু হলে প্রতিদিন প্রায় ২৪ কোটি লিটার পানি অপসারণ করা সম্ভব হবে। এছাড়া নগরজুড়ে আরও ৫৬টি পাম্প বসানোর কাজ চলছে।

জলাবদ্ধতা নিরসনের অগ্রগতি দেখে সন্তোষ প্রকাশ করে প্রধান উপদেষ্টা বলেন, ‘চট্টগ্রামে জলাবদ্ধতা হ্রাসের প্রথম ধাপ সম্পন্ন হয়েছে। এখন আমরা দ্বিতীয় ধাপে কাজ শুরু করবো।’

তিনি সব সংস্থাকে লিখিত পরিকল্পনা জমা দেয়ার নির্দেশ দেন এবং চট্টগ্রাম বিভাগের কমিশনারকে সমন্বয়কারীর দায়িত্ব দেন।

চট্টগ্রামের স্থায়ী নাগরিক হিসেবে প্রধান উপদেষ্টা চাক্তাই খালের পুনর্নির্মাণ অগ্রগতিও জানতে চান। চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান ইঞ্জিনিয়ার নুরুল করিম জানান, চাক্তাই খাল থেকে পানি সরানোর জন্য ১২টি পাম্প বসানো হয়েছে, যার মধ্যে ১০টি এরমধ্যেই কার্যকর রয়েছে। সব পাম্প চালু হলে প্রতিদিন ২৪ কোটি লিটার পানি অপসারণ করা সম্ভব হবে। শহরের পানি নিষ্কাশনের জন্য মোট ৫৬টি পাম্প বসানো হচ্ছে।

চট্টগ্রাম বন্দর পরিদর্শনে জার্মান উপ-রাষ্ট্রদূত

দেশের প্রধান সমুদ্রবন্দর পরিদর্শন করেছেন বাংলাদেশে নিযুক্ত জার্মানের উপরাষ্ট্রদূত আন্জা কার্সটেন এবং জার্মানের ইকনোমিক অ্যাটাচে মেলানিক ফ্যানার। বুধবার (৫ নভেম্বর) তারা চট্টগ্রাম বন্দরে আসার পর বন্দরের সদস্য (হারবার ও মেরিন) কমডোর আহমেদ আমিন আব্দুল্লাহর সাথে সৌজন্য সাক্ষাৎ করেন।

জার্মানের উপ-রাষ্ট্রদূত চট্টগ্রাম বন্দরের বর্তমান পরিচালনাগত ক্ষমতা ও দক্ষতা, বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্প, নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়ে সন্তোষ প্রকাশ করেন।

তিনি বন্দরের উন্নয়নে ডিজিটালাইজেশন, মানবসম্পদ উন্নয়ন এবং বাংলাদেশে জার্মানের পণ্যসামগ্রী রপ্তানিসহ সংশ্লিষ্ট বিষয়ে সার্বিক সহযোগিতার আশ্বাস দেন।

জার্মানের উপরাষ্ট্রদূতকে চট্টগ্রাম বন্দরের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার ওপর একটি তথ্যচিত্র দেখানো হয়।

সাক্ষাৎ শেষে প্রতিনিধিদল চট্টগ্রাম বন্দরের অপারেশনাল কার্যক্রম পরির্দশন করেন এবং বন্দরের সার্বিক অগ্রগতি ও কর্মদক্ষতার প্রশংসা করেন।

এ সফর আগামীতে বাংলাদেশ-জার্মান সম্পর্ক বিশেষ করে চট্টগ্রাম বন্দরকে ঘিরে একটি নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাবে বলে আশা করছেন সংশ্লিষ্টরা।

বন্দর-কূটনীতি ও নেট-জিরোর আলোকে চট্টগ্রাম বন্দরের পরবর্তী অভিযাত্রা

জাপানের কোবেতে অনুষ্ঠিত ওয়ার্ল্ড পোর্ট কনফারেন্সে আইএপিএইচ প্রেসিডেন্ট জেন্স মেয়ার ও এমডি ড. প্যাট্রিক ভারহোয়েভেনের সাথে চট্টগ্রাম বন্দর চেয়ারম্যান রিয়ার এডমিরাল এস এম মনিরুজ্জামান

কোবে থেকে বঙ্গোপসাগর

এ বছর ৭-১০ অক্টোবর আমি জাপানের কোবে শহরে আন্তর্জাতিক বন্দর ও হারবার সমিতি (আইএপিএইচ) আয়োজিত বিশ^ বন্দর সম্মেলনে যোগদান করি। এতে অংশগ্রহণের পেছনে প্রথম থেকেই সুস্পষ্ট দুটি লক্ষ্য ছিল আমার- এক. সংলাপকে অংশীদারিত্বে রূপান্তর করা এবং দুই. বাংলাদেশের সমুদ্রখাতকে তার পরবর্তী অভিযাত্রার লক্ষ্যে উপযুক্ত সক্ষমতায় প্রস্তুত করা। বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় প্রতিটি বন্দর কর্তৃপক্ষ কোবে সম্মেলনে হাজিরা দেন। এরাই বস্তুত বৈশি^ক নৌপরিবহন নীতিমালা নির্ধারণের ক্ষেত্রে নিয়ামক শক্তি হিসেবে পরিগণিত। চট্টগ্রাম বন্দরের জন্য একটি শক্তিশালী অবস্থান নিশ্চিত করার লক্ষ্যে সমুদ্রখাতের এ বিশ^সভায় অংশ নেয়াটা বস্তুত আমাদের জন্যও ছিল এক অনন্য সুযোগ।

বাংলাদেশের প্রতিনিধি হিসেবে এ সম্মেলনে অংশ নিতে পারাটা ব্যক্তিগতভাবে আমার নিজের জন্যও ছিল বিশেষভাবে সম্মানজনক; আর সেটিও কিনা এমন এক সময়ে- যখন দেশের সমুদ্রখাতের উন্নয়নে অভ‚তপূর্ব গুরুত্ব প্রদানের ঘোষণা দিয়েছেন অন্তবর্তী সরকারের মাননীয় প্রধান উপদেষ্টা নোবেল বিজয়ী ড. মুহাম্মদ ইউনূস। তাঁর প্রশাসন এ সত্য যথার্থই উপলব্ধি করেছে যে বঙ্গোপসাগর আজ শুধু আমাদের কৌশলগত সীমান্তই নয়, বরং সেটি বাংলাদেশের আগামী প্রবৃদ্ধিরও মূলভিত্তি বটে। চট্টগ্রাম বন্দরের সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং এর লজিস্টিক্স আধুনিকীকরণের প্রতি সরকারের নিবিড় অঙ্গীকার মূলত বৃহত্তর জাতীয় আকাক্সক্ষারই প্রতিফলন, যে আকাক্সক্ষার সারমর্ম: সমুদ্রখাতের দক্ষতাকে দেশের অর্থনৈতিক নবায়নের ভরকেন্দ্র হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা।

বৈশ্বিক বাণিজ্যের সঙ্গে বাংলাদেশের সংযোগ প্রতিষ্ঠা

সম্মেলনের এক অবকাশে হামবুর্গ বন্দর কর্তৃপক্ষের শীর্ষ নির্বাহী ইয়েন্স মেয়ার এবং জাপানের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠককালে আমি ইউরোপ ও জাপানের সঙ্গে বাংলাদেশের সরাসরি নৌ-রুট চালুর প্রস্তাব তুলে ধরি। রুটগুলি চালু করা গেলে জাহাজের ট্রানজিট টাইম কমবে, ব্যয়ভার হ্রাস পাবে; ক্রমবর্ধমান অনিশ্চয়তামুখী এক বাজারে রপ্তানিকারকদের জন্য একটি ন্যূনতম নির্ভরযোগ্য শিডিউল নিশ্চিত করা সম্ভব হবে। ইয়েন্স মেয়ার এ ব্যাপারে আন্তরিক সহযোগিতার অঙ্গীকার ব্যক্ত করে বলেন, প্রস্তাবটি বাস্তবায়নের লক্ষ্যে তিনি জার্মান ট্রেড প্রোমোশন কাউন্সিলের সহায়তা নিয়ে উভয় বন্দরের মধ্যে একটি টেকসই ‘এন্ড-টু-এন্ড’ লজিস্টিক্স ব্যবস্থা গড়ে তুলবেন। এছাড়া, জাপানের সাথে সরাসরি নৌ-যোগাযোগ প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে শুরু থেকেই এর বাণিজ্যিক সম্ভাব্যতা নিশ্চিতের ব্যাপারে আগ্রহ প্রকাশ করেন জাপানি কর্তৃপক্ষ।

সম্মেলনে আইএপিএইচ ব্যবস্থাপনা পরিচালক ড. প্যাট্রিক ভারহোভেনের সঙ্গেও আমার একদফা সাক্ষাত ঘটে। এ সময় আমরা চট্টগ্রাম বন্দরের উন্নয়ন অগ্রাধিকার ও তার ক্রমবর্ধমান আন্তর্জাতিক প্রভাব সম্পর্কে মত-বিনিময় করি। আমাদের আলোচনার মধ্য দিয়েই আমার কাছে এটি সুস্পষ্ট হয়ে ওঠে যে বৈশি^ক সমুদ্রখাত পরিচালনার ক্ষেত্রে বর্তমানে কেবল একজন অনুসারী হিসেবে নয়, বরং বাংলাদেশকে একটি গঠনমূলক কণ্ঠস্বর হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে।

কেন জরুরি ছিল কোবে ২০২৫

এমন এক সময়ে এসে এই কোবে সম্মেলন অনুষ্ঠিত হলো যখন বৈশি^ক বাণিজ্য একটি গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণ অতিক্রম করছে। সম্মেলনের বিভিন্ন অধিবেশনে আলোচ্যসূচির মধ্যেও তার প্রতিফলন দেখা গেছে- ভ‚রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা, জ্বালানি রূপান্তর ও ডিজিটাল বিপর্যয়ের বর্তমান সময়ে বন্দরগুলো কোন প্রক্রিয়ায় নিজেদের অভিযোজিত করে নেবে। চট্টগ্রাম বন্দরের জন্য শিক্ষাগুলি ছিল অত্যন্ত সময়ানুগ এবং অতীব প্রাসঙ্গিক।

প্রথমত, বাণিজ্যিক অস্থিরতা এ সময়ে বিশ^জুড়েই এক কাঠামোগত বাস্তবতা। সুতরাং পরিকল্পনার শুরু থেকেই তার মধ্যে নমনীয়তার প্রশ্নটিকে জায়গা করে দিতে হবে। দ্বিতীয়ত, নৌপরিবহন খাতে গোটা বিশ^ই বর্তমানে অত্যন্ত দ্রæতগতিতে ডিকার্বনাইজেশনের পথে হাঁটতে শুরু করেছে এবং আগামী দিনের বিনিয়োগ প্রসঙ্গটিও বহুলাংশে নির্ভর করবে এটার ওপর। তৃতীয়ত, দ্রæততম সময়ে সাইবার সহনশীলতা (রেজিলেন্স) নিশ্চিত করাটা আমাদের জাতীয় অর্থনৈতিক নিরাপত্তার জন্যই অপরিহার্য হয়ে উঠেছে। সম্মেলনে আলোচিত এসব প্রতিটি প্রসঙ্গ চট্টগ্রাম বন্দরের সংস্কার কার্যক্রমের মধ্যে সরাসরি প্রতিফলিত রয়েছে এবং এর আলোকেই নৌবিশে^ পরবর্তী অভিযাত্রার লক্ষ্যে নিজেদের প্রস্তুত করে নিচ্ছে চট্টগ্রাম বন্দর।

দক্ষতার মাধ্যমে উত্থান

দেশের প্রতিটি ক্ষেত্রে চলমান অগ্রগতির ছাপ ইতোমধ্যেই দৃশ্যমান। চট্টগ্রাম বন্দরে রেকর্ডসংখ্যক কনটেইনার হ্যান্ডলিংয়ের সাফল্য প্রমাণ করছে বাংলাদেশের শিল্পখাতের বুনিয়াদ সম্প্রসারিত হবার সুবাদে বর্তমানে রপ্তানি ও আমদানি উভয় খাতেই আমাদের প্রবৃদ্ধি ঘটছে। প্রত্যেক মাসে আমরা পূর্বেকার থ্রুপুট রেকর্ড ভেঙে এগিয়ে চলেছি। এতে আরো প্রমাণ হচ্ছে যে বাংলাদেশের লজিস্টিক্স নেটওয়ার্কের ওপর দিনদিন বৈশি^ক আস্থা ক্রমশ বৃদ্ধি পাচ্ছে। আর এ প্রবৃদ্ধিই এখন অবকাঠামো সক্ষমতার পাশাপাশি প্রযুক্তি ও প্রক্রিয়াগত দক্ষতা বৃদ্ধির এক নতুন চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দিয়েছে আমাদের সামনে।

বন্দরের গতিশীলতা ধরে রাখতে আমরা ধারাবাহিকভাবে টার্মিনালগুলি উন্নত করছি, জাহাজের টার্ন-অ্যারাউন্ড টাইম কমিয়ে আনছি এবং রিয়েল-টাইম কার্গো ট্র্যাকিংয়ের লক্ষ্যে উন্নত ডেটা সিস্টেম চালু করছি। বৈশ্বিক বাজারে প্রতিযোগিতা-সক্ষম, প্রাসঙ্গিক ও টেকসই থাকার লক্ষ্যে সমুদ্র বাণিজ্য এবং লজিস্টিক করিডরে আন্তর্জাতিক শুদ্ধাচার প্রতিপালনে চট্টগ্রাম বন্দর শতভাগ অঙ্গীকারাবদ্ধ। আমাদের আপাত কর্তব্য বন্দরের অপারেশনাল অর্জনকে একটি কৌশলগত সক্ষমতায় রূপান্তর করা, যাতে বৈশ্বিক বন্দর ক‚টনৈতিক মহলে চট্টগ্রাম বন্দর নিজের জন্য সুদৃঢ় একটি অবস্থান নিশ্চিত করতে পারে।

বিশ^সভায় বাংলাদেশের জোরালো কণ্ঠ

আইএপিএইচ বিশ্বব্যাপী বন্দরগুলোর অনুসরণীয় আন্তর্জাতিক মান নির্ধারণে একটি গুরুত্বপূর্ণ ভ‚মিকা পালন করে। সমিতির বার্ষিক সাধারণ সভায় নির্বাচিত পরিচালনা পর্ষদ সমুদ্রখাতের গবেষণা, নীতি প্রণয়ন ও প্রযুক্তিগত উন্নয়নের ক্ষেত্রে যাবতীয় দিকনির্দেশনা প্রদান করে। এ প্রক্রিয়ার মধ্যে সক্রিয় অংশগ্রহণের মাধ্যমে বাংলাদেশ নিজেকে বৈশ্বিক এজেন্ডার একজন অনুসারী মাত্র নয়, বরং এজেন্ডার গতি নির্ধারক হিসেবেও গুরুত্বপূর্ণ ভ‚মিকা রাখতে পারবে।

প্রার্থী মনোনয়ন, প্রযুক্তিগত ওয়ার্কিং গ্রæপ কার্যক্রমে অংশগ্রহণ এবং ডিজিটাল ইয়ার্ড ম্যানেজমেন্ট বা ঘূর্ণিঝড় সহনশীল অবকাঠামোর মতো নিজেদের একান্ত উদ্ভাবনগুলি যদি আমরা এ সভায় তুলে ধরতে পারি, তাহলে বৈশি^ক নৌ-বাণিজ্যের নীতিনির্ধারণী আলোচ্যসূচিতে বিশে^র উন্নয়নশীল নৌ-জাতিগুলির বিদ্যমান বাস্তবতার যথার্থ প্রতিফলনও নিশ্চিত করা সম্ভব হবে।

নেট-জিরো রূপান্তরে পথনির্দেশ

কোবে সম্মেলনে নেট-জিরো নির্গমন লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের ওপর জোর গুরুত্ব আরোপ করা হয়েছে। বিনিয়োগকারী এবং নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলিরও প্রত্যাশা, বন্দরগুলির পরিবেশগত অগ্রগতির বিষয়টি এক্ষেত্রে বরাবর পরিমাপযোগ্যভাবে প্রদর্শিত থাকবে।

চট্টগ্রাম বন্দরের ক্ষেত্রে আমরা নেট-জিরো রূপান্তর প্রক্রিয়াটি ধাপে ধাপে বাস্তবায়নের পরিকল্পনা করছি। প্রথম ধাপে বন্দরে ‘এনার্জি-রেডি’ বার্থ স্থাপন, দক্ষ বিদ্যুৎ ব্যবস্থাপনা, এবং নিরাপত্তা অবকাঠামোর আধুনিকীকরণ নিশ্চিত করা হবে। পরবর্তী ধাপগুলোতে ক্রমান্বয়ে সবুজ মিথানল, সবুজ অ্যামোনিয়া ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের (এলএনজি) মতো পরিচ্ছন্ন জ্বালানি হ্যান্ডলিংয়ের সক্ষমতা তৈরি করা হবে। আমাদের লক্ষ্য এসব পদক্ষেপের মাধ্যমে আমরা প্রকৃতপক্ষে কতটুকু উপকৃত হচ্ছি, সেটিকে একটি হিসাবের আওতায় নিয়ে আসা, প্রাকৃতিক দুর্যোগ চলাকালীন ‘ডাউনটাইম’ বা কাজ স্থগিত রাখার সময়সীমা কমিয়ে আনা, তীরভ‚মির বিদ্যুৎ সংযোগের গতিবৃদ্ধি করা, এবং ঘূর্ণিঝড়ের পর দ্রæততম সময়ের মধ্যে কার্যক্রম শুরুর সক্ষমতা তৈরি করা। এ সবকিছুরই মূল উদ্দেশ্য পরিবেশ রক্ষার অঙ্গীকারটি যাতে শুধু মুখের কথার মধ্যে আটকে না থেকে সেটা একটি বাস্তব এবং আর্থিক বিশ্বাসযোগ্যতায় রূপ নিতে পারে; বিনিয়োগকারীরা যাতে পরিষ্কার দেখতে পারে যে গৃহীত পরিবেশবান্ধব পদক্ষেপগুলো আসলেও অর্থনৈতিকভাবে ফলপ্রসূ।

ডিজিটালাইজেশন ও সাইবার নিরাপত্তা

আধুনিক বন্দরগুলি আজকাল কংক্রিটের অবকাঠামোর চেয়ে সফটওয়্যার অবকাঠামোর ওপর অনেক বেশি পরিমাণে নির্ভরশীল। ফলত আমাদের মনে রাখা উচিত, অটোমেশন উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি করে সত্য, কিন্তু একই সঙ্গে সেটি সাইবার হুমকির ঝুঁকিটিও বাড়িয়ে তোলে।

এক্ষেত্রে আমাদের কৌশল হবে সাইবার নিরাপত্তার বিষয়টি ইয়ার্ড টেলিমেট্রি থেকে শুরু করে কাস্টমস ডাটা বিনিময় সংক্রান্ত প্রতিটি নতুন সিস্টেমের মধ্যে শুরু থেকেই অঙ্গীভ‚ত করা। সাইবার প্রস্তুতি ও প্রতিরোধ সক্ষমতা আরও শক্তিশালী করার লক্ষ্যে আইএপিএইচ নেটওয়ার্কের মাধ্যমে আমরা অংশীদার বন্দরগুলোর সঙ্গে যৌথ সিমুলেশন এবং এ সংক্রান্ত অন্যান্য অনুশীলন পরিচালনা করব। উচ্চ-নিরাপত্তা মানদÐ পূরণকারী টার্মিনাল অপারেটরদের জন্য এক্ষেত্রে বিশেষ প্রণোদনার ব্যবস্থাও থাকবে। এর ফলে ঝুঁকি কমবে, কাজের ধারাবাহিকতা নিশ্চিত হবে এবং ন্যূনতম মাত্রায় নেমে আসবে অংশীদারদের বীমা ব্যয়।

ডেটা-নির্ভর দক্ষতা

কোবে সম্মেলনে প্রকাশিত বিশ্বব্যাংকের নবায়িত পোর্ট রিফর্ম টুলকিট এবং ২০২৫ কনটেইনার পোর্ট পারফরমেন্স ইনডেক্স অনুযায়ী বর্তমান যুগে তথ্যই হচ্ছে যে কোনো বন্দরের প্রতিযোগিতা-সক্ষমতার মূল ভিত্তি।

অযথা টার্মিনাল বিস্তারের বদলে এক্ষেত্রে আমাদের লক্ষ্য, লজিস্টিক্সের দক্ষতা বৃদ্ধি এবং আইডল-টাইম (অকেজো-সময়) বিলোপনের মাধ্যমে ‘কংক্রিটবিহীন সক্ষমতা’ বাড়িয়ে তোলা। বন্দরে শিগগিরই এআই-ভিত্তিক ডিজিটাল ট্র্যাকিং ও মনিটরিং সিস্টেম চালু হবে। এ সিস্টেমে কার্গো, ট্রাক ও ট্রেনের চলাচল একস্থান থেকেই তদারকি করা সম্ভব হবে। ড্যাশবোর্ডের গুরুত্বপূর্ণ সূচকগুলো- যেমন, ক্রেন কতবার মাল তুলছে-নামাচ্ছে কিংবা জাহাজ সময়মতো আসছে কি না- এগুলিও দৃশ্যমান হবে। এ তথ্যগুলি চুক্তি-প্রণোদনায় যুক্ত করা হলে সরকারি-বেসরকারি উভয় পক্ষের স্বার্থ আরো সুসমন্বিত হবে এবং নিশ্চিত হবে গতিশীল উন্নতি।

বৈশ্বিক শুদ্ধাচার শিক্ষণ ও তার চর্চা

অগ্রণী অবস্থানে থাকতে হলে বাংলাদেশকে বৈশি^ক অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা গ্রহণের পাশাপাশি তাতে নিজের সক্রিয় অবদানও রাখতে হবে। এক্ষেত্রে আইএপিএইচ পরিচালিত ডিজিটালাইজেশন, মানবসম্পদ উন্নয়ন ও জলবায়ু অভিযোজন সংক্রান্ত ওয়ার্কিং গ্রæপে বাংলাদেশি প্রকৌশলীদের অন্তর্ভুক্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে আমাদের।

পরবর্তী আইএপিএইচ সাসটেইনেবিলিটি অ্যাওয়ার্ডস আয়োজনে আমরা আমাদের ঘূর্ণিঝড় মোকাবিলা ব্যবস্থাপনা ও ইয়ার্ডের পানি নিষ্কাশন সংক্রান্ত উদ্ভাবনগুলো তুলে ধরব। পাশাপাশি, বিশে^র বিভিন্ন বন্দরের মধ্যে কর্মী বিনিময় ও পারস্পরিক অভিজ্ঞতা ভাগাভাগির লক্ষ্যে আমরা সিস্টার-পোর্ট অংশীদারিত্ব আরো বাড়িয়ে তুলব। এসব প্রতিটি উদ্যোগই বৈশি^ক সামুদ্রিক মানদÐ নির্ধারণী শীর্ষফোরামে বাংলাদেশের অবস্থান আরো দৃঢ় এবং মজবুত করবে।

হামবুর্গ ও জাপানের সঙ্গে সরাসরি নৌ-রুট

প্রত্যক্ষ সেবা প্রদান করাই আমাদের কর্মকৌশলের মূল লক্ষ্য। জার্মানির বাণিজ্য-উন্নয়ন সংস্থার সহায়তায় পরিকল্পিত চট্টগ্রাম-হামবুর্গ রুট চালু করা সম্ভব হলে ট্রানশিপমেন্ট হাবের ওপর বাংলাদেশের বর্তমান নির্ভরতা ব্যাপকভাবে কমে আসবে এবং পরিবহন সময়সূচিতেও কাক্সিক্ষত স্থিতিশীলতা আনা সম্ভব হবে। অনুরূপ, চট্টগ্রাম-জাপান নৌ-সংযোগ চালু হলে দেশের পোশাক, চামড়া ও ক্ষুদ্র-প্রকৌশল খাতজাত পণ্যসমূহের জন্য উচ্চমূল্যের বাজারে প্রবেশের অনন্য সুযোগ তৈরি হবে। এ সুবাদে পরিবহনকাল এবং কার্বন নিঃসরণ, দুটোই হ্রাস পাবে আশাতীতভাবে।

পরিকল্পিত এসব উদ্যোগ বাস্তবায়নে একটি জয়েন্ট টাস্কফোর্স গঠন করা হবে। এ টাস্ক ফোর্স কাস্টমস, লজিস্টিক্স ও রিফার (শীতল পণ্যবাহী কনটেইনার) সময়সূচির মধ্যে একটি সুষ্ঠু সমন্বয় নিশ্চিত করবে। পাইলট ভয়েজে রপ্তানিকারক ও আমদানিকারক প্রতিষ্ঠানগুলির অংশগ্রহণের সুযোগ রাখার ফলে ব্যবস্থাটি আরো বিশ্বস্ত এবং কার্যকর হবে। ক্যারিয়ার এবং বিনিয়োগকারীরাও এর ফলে চট্টগ্রাম বন্দরের প্রতি আরো বেশি আগ্রহী হতে শুরু করবে। এ সকল উদ্যোগের সার্থক সমন্বয়ের ফলশ্রæতিতে একটি ‘ডুয়াল-হাব’ বাণিজ্য মডেলও তৈরি করা সম্ভব হবে। ফলত এতে বাংলাদেশের বাণিজ্য-কার্যক্রম ক্রমশ আরও বৈচিত্র্যময় হয়ে উঠবে; পাশাপাশি, বৈশি^ক পর্যায়ের যে কোনো অর্থনৈতিক ধাক্কা সামাল দেয়ার ক্ষেত্রেও তাকে সুদৃঢ় এবং স্থিতিশীল থাকার শক্তি জোগাবে।

অর্থায়ন ও গ্রাহকমুখীনতা

কোবে সম্মেলনে জোর দিয়ে বলা হয়েছে- যে কোনো টেকসই পরিকল্পনার মেরুদÐ হলো একটি বিশ্বাসযোগ্য অর্থায়ন। চট্টগ্রাম বন্দর এক্ষেত্রে একটি ‘এনার্জি-হাব’ মডেল অনুসরণ করছে যেখানে শিল্প জ্বালানির চাহিদা ও পরিচ্ছন্ন জ্বালানি সরবরাহের সহাবস্থান- প্রথম দিন থেকেই অর্থনৈতিকভাবে টেকসই থাকার বিষয়টি নিশ্চিত করবে। বেøন্ডেড ফাইন্যান্স, সুস্পষ্ট বিধি-বিধান, এবং অ্যাঙ্কর-টেন্যান্ট চুক্তি হবে এসব অর্জনের চাবিকাঠি।

অভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ একজন বন্দর-গ্রাহকের দৃষ্টি দিয়ে বন্দর-কার্যক্রমের বিচার করার বিষয়টি। পণ্য মালিক ও নৌপরিবহন সংস্থাগুলোর মূল চাওয়া- নির্ভরযোগ্যতা, স্বচ্ছতা, এবং পরিবেশের প্রতি আন্তরিক দায়িত্বশীলতা। চট্টগ্রাম বন্দরের ডিজিটাল সংস্কার ও টেকসই বিনিয়োগ কার্যক্রমগুলিও বস্তুত তাদের এ প্রত্যাশা পূরণের লক্ষ্যেই গৃহীত। আশা করা যায়, এসব পদক্ষেপের মধ্য দিয়েই পারস্পরিক সেই আস্থা নির্মিত হবে, যার সুবাদে আমরা সকল পক্ষের মধ্যে একটি দীর্ঘমেয়াদী বাণিজ্যিক সুসম্পর্ক গড়ে তুলতে সক্ষম হব।

আগামীর পথ

কোবে সম্মেলনে চট্টগ্রাম বন্দরের অংশগ্রহণ আমাদের যে বার্তা দেয়, তা হচ্ছে, বর্তমান নৌবিশে^ বাংলাদেশ বিশ^-নেতৃত্বের একজন অনুসারী মাত্র নয়, বরং বৈশি^ক পর্যায়ে প্রয়োজনীয় নেতৃত্ব প্রদানের জন্যেও সে পূর্ণ প্রস্তুত। পাশাপাশি, ড. ইউনূসের আধুনিক ও বিশ^মুখীন অর্থনীতির রূপকল্প বাস্তবায়নের ক্ষেত্রেও নির্ধারিত জাতীয় কর্মকৌশলের প্রাণকেন্দ্রে রয়েছে সামুদ্রিক উন্নয়নের প্রশ্নটি। এক্ষেত্রে আমাদের এখনকার দায়িত্ব ডেটা-নির্ভর দক্ষতা, নেট-জিরো প্রস্তুতি, ও সাইবার রেজিলেন্স অর্জন এবং এর পাশাপাশি, ইউরোপ ও জাপানের সঙ্গে সরাসরি নতুন নৌপথ গড়ে তোলার মাধ্যমে তাঁর এ রূপকল্পের একটি বাস্তবসম্মত রূপদান করা।

জাঢ্যতা নয়, উদ্যমী পরিকল্পনার মধ্য দিয়েই আগামীর পথে অগ্রসর হতে পারে একটি বন্দর। জাতীয় পর্যায়ের অঙ্গীকার এবং নজিরবিহীন কর্মদক্ষতার প্রবৃদ্ধি প্রদর্শনের মাধ্যমে কোবে সম্মেলনে আমরা নিজেদের জন্য আগামী দিনের যে পথরেখাটি তৈরি করেছি, তা থেকেই সুস্পষ্ট যে বাংলাদেশের নৌ-ভবিষ্যৎ ইতোমধ্যেই তার নির্মাণপ্রক্রিয়া শুরু করে দিয়েছে। দেশের প্রতিটি মহল যথার্থই উপলব্ধি করতে পারছেন যে বঙ্গোপসাগর আজ আমাদের জন্য শুধুই একটি সীমান্ত মাত্র নয়, বরং এটাই আমাদের বৈশ্বিক অংশীদারত্ব ও টেকসই ভবিষ্যৎ সমৃদ্ধির মহীসোপান।